২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম ॥ ইসলামে শহীদের মর্যাদা

শহীদের মর্যাদা অপরিসীম। ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইসলামের জন্য কা’বা চত্বরে প্রথম শহীদ হয়েছিলেন হযরত সুমাইয়া রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হা। তিনি ছিলেন হযরত আম্মার রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হুর আম্মাজান। আবু জাহেল হযরত সুমাইয়া (রাদি.)কে ধরে এনে কা’বা শরীফের চত্বরে বল্লম দিয়ে আঘাতের পর আঘাত করে হত্যা করে। তবুও হযরত সুমাইয়া (রাদি.) লাইলাহা ইল্লাল্লাহু উচ্চারণ করতে করতে মৃত্যুর কোলে লুটিয়ে পড়েন। ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মার্চ মদিনা থেকে ৮০ মাইল দূরে অবস্থিত বদর প্রান্তরে সংঘটিত যুদ্ধে ১৪ জন সাহাবী শহীদ হয়েছিলেন। তাঁদের মাযার শরীফ বদর প্রান্তরে রয়েছে। বদর যুদ্ধের পরের বছর মদিনা মনওয়ারা থেকে তিন মাইল উত্তরে অবস্থিত ওহুদ পর্বতের পাদদেশে সংঘটিত ওহুদ যুদ্ধে ৭০ জন সাহাবী শহীদ হন। এই যুদ্ধে হযরত হামযা রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হুও শহীদ হন। এমনিভাবে বহু সাহাবী শহীদ হয়ে ইসলামের পতাকা সমুন্নত রাখেন।

চার খোলাফায়ে রাশেদীনের তিনজনই শহীদ হন। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হুর দশ বছর ছয় মাস স্থায়ী (৬৩৪-৬৪৪ খ্রি.) খিলাফতকালের সমাপ্তি ঘটে শাহাদতের মাধ্যমে। তাঁর খিলাফত আমলে আফ্রিকার ত্রিপলী হতে আফগানিস্তান সমগ্র এলাকা ইসলামী সাধারণতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত হয়।

এই সাধারণতন্ত্রের ৩৪টি প্রদেশ ছিল। তাঁর মাযার শরীফ হুযুর (সা.)-এর রওজার মধ্যে রয়েছে। এক নাসারা গোলাম আবুলুলু ফিরোজের অতর্কিত ছুরিকাঘাতে পহেলা মহররম শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর স্থলাভিষিক্ত খলিফা হন হযরত উসমান ইবনে আফফান রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হু। তাঁর ১২ বছর স্থায়ী খিলাফত আমলের ছয় বছর ভালভাবেই অতিবাহিত হয়, কিন্তু পরবর্তী ছয় বছর গোলযোগের মধ্যে কাটে এবং ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুন গোলযোগ সৃষ্টিকারী বিদ্রোহী দল গভীর রাতে হযরত উসমান (রাদি.)-এর বাসভবনে প্রবেশ করে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করে। তাঁর রক্তাক্ত লাশ মুবারক তিনদিন যাবত সেখানেই পড়ে থাকে। অতঃপর হযরত আলী করমাল্লহু ওয়াজহাহুর উদ্যোগে রাতের বেলায় সঙ্গোপনে জান্নাতুল বাকীতে দাফন করা হয়। খিলাফতের সেই মহাসঙ্কটকালে মদিনার মুহাজির ও আনসার নেতৃবৃন্দ হযরত আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহুকে খলিফা নির্বাচিত করেন। হযরত আলী করমাল্লাহু-ওয়াজহাহু প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী দ্বিতীয় জন। ইসলাম গ্রহণ করার সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। তিনি হযরত ফাতিমার স্বামী এবং হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হুসাইনের আব্বাজান। খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর খিলাফতের রাজধানী মদিনা মনওয়ারা থেকে বহুদূরে ইরাক সীমান্তে অবস্থিত কুফা নামক স্থানে স্থানান্তরিত করেন। হযরত আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহুর বিরুদ্ধে একটি গোঁড়া উগ্রবাদী দল আবদুল্লাহ্ ইবনে ওয়াহ্হাবের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ হয়। তারা লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ্Ñ আল্লাহ্র হুকুম ছাড়া কারও হুকুম মানি না সেøাগান তুলে খিলাফতের বিভিন্ন স্থানে বিদ্রোহের আগুন প্রজ্ব¡লিত করে। এরা ইতিহাসে খারেজী দল নামে পরিচিত। এই খারেজীরা আবদুর রহমান ইবনে মালজুম এক ঘাতককে কুফা প্রেরণ করে। ৬৬১ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি সে কুফার মসজিদে ঘাপটি মেরে হযরত আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহুর মসজিদে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকে। হযরত আলী করমাল্লাহু ওয়াজহাহু ফজরের সালাতে ইমামতির জন্য দাঁড়াতে যাবেন এমন সময় ইব্নে মালজুম তাঁর কপালের ওপর বিষাক্ত তরবারির আঘাত করে। আঘাতটি ছিল মারাত্মক। তিনি লুটিয়ে পড়েন এবং তিন দিন পরে শাহাদাত লাভ করেন। তাঁর মাযার শরীফ কোথায় তা জানা যায়নি। আব্বাসী খলিফা হারুনর রশীদ এক স্বপ্ন দেখে কুফা থেকে ৫ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত নাজাফের মাশহাদে আলী মাজার স্থাপন করেন।

৬৮০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র ইমাম হুসাইন রাদিআল্লাহু তা’আলা আন্হু কুফার অদূরে ফোরাত নদীর কিনারে অবস্থিত কারবালা প্রান্তরে ১০ মহররম তারিখে শহীদ হন। এই শহীদের স্মরণে এক কবিতায় মওলানা মুহম্মদ আলী জওহার বলেন, কত্লে হুসাইন আসলমে মরণে ইয়াযীদ হ্যায়। ইসলাম জিন্দা হোতা হ্যায় র্হ কারবালা কি বা’দ।

শহীদানের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন: যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদের মৃত বলো না বরং তারা জীবিত কিন্তু তোমরা উপলব্ধি করতে পারো না (সূরা বাকারা : আয়াত ১৫৪)।

আরও ইরশাদ হয়েছে : যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদের কখনও মৃত মনে করো না, বরং তারা জীবিত এবং তাদের রব্-এর নিকট হতে তারা জীবিকা প্রাপ্ত (সূরা আল ইমরান, আয়াত ১৬৯)।

শহীদগণ জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা লাভ করবেন।

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা,

ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা.),

সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।