১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভারত আরও ২শ’ কোটি ডলারের ঋণ দিচ্ছে

  • অক্টোবরে চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ নতুন ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) ২০০ কোটি ডলারের আন্তর্জাতিক ঋণ চুক্তি হচ্ছে অক্টোবরে। এর অংশ হিসেবে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর সঙ্গে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করেছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। এ বৈঠকে ভারতের দেয়া ঋণ পাওয়ার শর্ত শিথিল করার তাগিদ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া ইআরডির পক্ষ থেকে দ্রুত লিখিত মতামত দেয়ার জন্য বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে জানান, এখনও অনেক প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে। মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর লিখিত মতামত পাওয়ার পর ইআরডি সেগুলো এক সঙ্গে করে একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করবে। সেটি ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। সেখানে ভেটিং হয়ে গেলে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিতে হবে। তারপর সেটি প্রস্তাব আকারে পাঠানো হবে ভারতে। সেখানে যদি তাদের কোন মতামত থাকে থাহলে সেটি তারা পাঠাবে। তা না হলে বাংলাদেশের প্রস্তাব অনুমোদন দিলে তখন দুই দেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে। এসব প্রক্রিয়া শেষ করতে আড়াই থেকে তিন মাস সময় লাগবে। সে হিসেবে অক্টোবরের আগে চুক্তি স্বাক্ষর সম্ভব হবে না।

এক প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, আমরাতো চেষ্টা করছি যত দ্রুত সম্ভব চুক্তি করতে। কিন্তু ধাপগুলো শেষ না করলে তো সেটি হবে না। কাজেই তাড়াতাড়ি যাতে এই প্রক্রিয়াগুলো শেষ করা যায় সে চেষ্টা করা হবে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে এ আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও এশিয়া ডেস্কের প্রধান আসিফ-উজ-জামান। বৈঠক সূত্র জানায়, এতে অংশ নেয়া মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর প্রতিনিধিরা ভারতীয় ঋণের শর্ত শিথিল করার তাগিদ দিয়েছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে ইআরডি বলেছে মৌখিকভাবে না বলে লিখিতভাবে আপনাদের মতামত জানান।

অন্যদিকে নতুন এলওসির ২০০ কোটি ডলার ঋণের সুদের হার ও শর্ত চলমান প্রথম এলওসির ১০০ কোটি ডলারের (২০ কোটি অনুদান) ঋণের মতোই হতে পারে বলে জানা গেছে। সে হিসেবে নতুন ঋণের সুদহার হবে ১ শতাংশ। শর্ত হিসেবে চলমান ঋণের মতোই নতুন প্রকল্পগুলোর জন্য অন্তত ৭৫ শতাংশ পণ্য ও সেবা অবশ্যই ভারত থেকে আমদানি করতে হবে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, নতুন এলওসির আওতায় প্রকল্প নেয়া শুরু হচ্ছে। সবার আগেই হাতে নেয়া হবে এস্টাবলিশমেন্ট অব ইন্ডিয়ান ইকোনমিক জোন ইন মংলা এ্যান্ড ভেড়ামারা প্রকল্পটি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরে হওয়া সমঝোতা চুক্তির ১৩ প্রকল্পের তালিকায় না থাকলেও এ প্রকল্পে নীতিগত অনুমোদন দেয়ার জন্য সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে শীঘ্রই একটি প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করে একনেক সভায় উপস্থাপনের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। ফলে দেশে শিল্প খাতে বিদেশী বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে। কারিগরি খাতে দক্ষ শ্রমিক গড়ে উঠবে। স্থানীয়দের কাজের সক্ষমতাও বাড়বে।

সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাবে (পিডিপিপি) দেখা যায়, শীঘ্রই প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়ে ২০১৭ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের মেয়াদ নির্ধারণের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। পিডিপিপিতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ভারতীয় ২০০ কোটি ডলারের ঋণের আওতায় এর অর্থায়ন হবে।

গত জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার দ্বিতীয় এলওসির আওতায় ১৩ প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী, ভারতীয় এই ঋণের আওতায় মোট ২৩৭ কোটি ডলারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে, যার ৩৭ কোটি ডলার বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেয়া হবে। আগের ১৩ প্রকল্পের মধ্যে রেলের উন্নয়নে রয়েছে ৪৯ কোটি ডলার ব্যয়ের তিনটি প্রকল্প। এগুলো হলো- ৩৮ কোটি ডলার ব্যয়ে রেলপথের খুলনা-দর্শনা সেকশনকে ‘ডাবল লাইনে’ উন্নীতকরণ, ১৩ কোটি ডলার ব্যয়ে পার্বতীপুর-কাউনিয়া রেললাইনকে ডুয়েলগেজে উন্নীতকরণ, ১০ কোটি ৫০ লাখ ডলার ব্যয়ে সৈয়দপুর রেল স্টেশনের ওয়ার্কশপ নির্মাণ।

নৌপরিবহন খাতে আশুগঞ্জ নদীবন্দরের আধুনিকায়ন প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭ কোটি ৪২ লাখ ডলার। এ খাতের আরেকটি প্রকল্প হলোÑ আশুগঞ্জ বন্দরের অভ্যন্তরীণ কন্টেনার টার্মিনাল উন্নয়ন প্রকল্প। এর জন্য ব্যয় হবে ৫ কোটি ৯১ লাখ ডলার। ভারতের ঋণের অর্থে ৪৯টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও দুটি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট উন্নয়ন করা হবে। এর জন্য ৩৫ কোটি ১৩ লাখ ডলার ব্যয় ধরা হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষে নতুন করে ১ লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাবে।

পরিবহন খাতের মধ্যে ৪ কোটি ৮১ লাখ ডলার ব্যয়ে বিআরটিসির জন্য ৫০০টি ট্রাক সংগ্রহ, ৫ কোটি ৮৪ লাখ ডলার দিয়ে বিআরটিসির জন্য দ্বিতল বাস ক্রয় এবং ৬ কোটি ৯১ লাখ ডলার ব্যয়ে সড়ক ও জনপথের জন্য উন্নত যন্ত্রপাতি আমদানি। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে ভারতীয় ঋণে চারটি মেডিক্যাল কলেজ ও একটি জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২ কোটি ডলার। এছাড়া অন্য প্রকল্পের মধ্যে ১২ জেলায় আইটি হাইটেক পার্ক নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ কোটি ১০ লাখ ডলার।

সূত্র জানায়, বর্তমান চলমান এলওসির আওতায় প্রকল্পগুলোর মধ্যে ইতোমধ্যে সমাপ্ত হয়েছে ৭টি প্রকল্প। বাকিগুলো বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। মোট ১৪টি প্রকল্পের মধ্যে যে ৭টি প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজ শেষ হয়েছে সেগুলো হলো- ৮১টি বগি ট্যাঙ্ক ওয়াগন সংক্রান্ত প্রকল্প, ৫০টি আর্টিকুলেটেড ও ৮৮টি সিঙ্গেল ডেকার এসি বাস সংক্রান্ত, ১০ লোকোমোটিভ সংক্রান্ত প্রকল্প, ১৬৫ ব্রডগেজ (বিজি) ট্যাঙ্ক ওয়াগন সংক্রান্ত প্রকল্প, প্রকিউরমেন্ট অব ১৬ লোকোমোটিভ প্রকল্পের আওতায় সবগুলো লোকোমোটিভ এসেছে, ১৭০ ফ্ল্যাট ওয়াগন সংক্রান্ত প্রকল্পটি শেষ হয়েছে।

অন্যদিকে ভারতীয় ঋণের অর্থে বাস্তবায়নাধীন থার্ড-ফোর্থ লাইন ডুয়েল গেজ সংক্রান্ত প্রকল্পটি কন্সালটেন্ট নিয়োগ প্রস্তাব মূল্যায়ন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এর আগে প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়েছে। এতে আরও নতুন কম্পোনেন্ট যুক্ত হয়েছে। গত বছরের ১৪ এপ্রিল ভারতের পক্ষ থেকে এটি বাস্তবায়নের ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে।