২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যাঁর নামের ওপর পতাকার মতো দুলতে থাকে স্বাধীনতা

  • সিরাজুল এহসান

১৯৭৭ সাল। বর্বরদের হাতে সপরিবারে জাতির পিতা নিহত হওয়ার প্রায় দুই বছর হয়েছে পার। দেশ তখনও শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। খুনিদের দাপটে জাতি তখন প্রায় বোবা। আতঙ্ক আর অত্যাচারের আগুনে ঝলসে যাচ্ছে শুভবুদ্ধি। তবুও এর মধ্যে বিবেকের শির উঁচু হয়ে দেখা দেয়। একটি সৃষ্টিকর্ম তোলে আলোড়ন। সেটি গল্প। গল্পটির নাম ‘মৃতের আত্মহত্যা’। লিখলেন আবুল ফজল। যদিও তিনি সে সময়ের সরকারের একজন উপদেষ্টা। তা হলেও তিনি বিবেক বিক্রি ও আত্মসমর্পণ করেননি নষ্টের কাছে। বিবেকের তাড়নায় এ গল্প লিখে জাতির পিতার খুনিদের প্রতি জানালেন ঘৃণা। এমন শৈল্পিক আর নান্দনিক প্রতিবাদী গল্প সেই বৈরী সময়ে এক সৎসাহসী উচ্চারণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

গল্পটির প্রেক্ষাপট মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একটি দেশ, যেখানে বঙ্গবন্ধুর খুনিরা আশ্রয় নিয়েছে পরিবারসহ। য়ুনুস সেই খুনি সৈনিকদের একজন। স্ত্রী সোহেলি। সোহেলির বান্ধবী আফরোজা আরেক খুনি সৈনিকের স্ত্রী। স্বামী-স্ত্রীর স্বাভাবিক শারীরিক সম্পর্কের সময় সোহেলি য়ুনুসকে আর মানুষ ভাবতে পারে না। তার মনে হয় স্বামী একজন খুনি, শরীরে লেগে আছে মানুষের রক্ত। তার মধ্যে জাগে বিবমীষা। শরীর তো জাগেই না ভালোবাসা আরও দূরের ব্যাপার। য়ুনুসের কাছেও সোহেলিকে মনে হয় মরা মাছের মতো। স্ত্রী কোনোভাবে শান্তি-স্বস্তি পায় না। তাদের সন্তান বকুলের ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তিত। সন্তান ও নিজের পরিচয় নিয়ে এতটাই লজ্জিত সেই কথা প্রকাশ পায় বান্ধবী আফরোজার সঙ্গে কথপোকথনের মাধ্যমে, এভাবেÑ ‘খুনীর বৌ, বকুল খুনীর সন্তান। এ পরিচয় কি করে আমি বহন করবো? বড় হলে সেওবা কি করে বইবে এ বোঝা? আফরোজা আপা, আত্মহত্যা করে আমি এ যন্ত্রণার হাত থেকে রেহাই পেতে চাই।’ যন্ত্রণাবিদ্ধ সোহেলি খুনির সঙ্গে এক ঘরে, এক বিছানায় বাস করতে গিয়ে এতটাই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, শেষ পর্যন্ত আত্মহননের মাধ্যমে নিজের মুক্তি খোঁজে। খুনিরা এতটাই পাষ- যে, কখনো নিজেরা অনুতপ্তও হয়নি। অথচ তাদেরই ঘরে পোষ্য, স্বজন, অর্ধাঙ্গিনী পর্যন্ত অনুশোচনায় হয়েছে দগ্ধ।

জাতির পিতা নিহত হওয়ার পর দেশ-সমাজ, আর মানবমনে যে প্রতিক্রিয়া আর শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছিল তা এক প্রতীকী ব্যঞ্জনায় আমরা পাই প্রথাবিরোধী শিল্পস্রষ্টা হুমায়ুন আজাদের ‘জাদুকরের মৃত্যু’ গল্পে। তিনি বেদনাহত হয়ে উল্লেখ করেন এভাবেÑ ‘পরদিনই লাশ পাওয়া গেল শহরের চৌরাস্তায়। বর্বরদের একটি বিশাল ছুরিকা আমূল গাঁথা জাদুকরের হৃৎপি-ে।

আমরাও আবার ময়লা হয়ে উঠলাম, আমাদের ঘরবাড়িগুলো হয়ে উঠল রোগা শালিকের মতো, শস্যের কণায় আবার পচন ধরল। আমাদের ছোট দেশটিকে আবার মনে হতে লাগল মরা দোয়েলের মতো। স্বপ্ন দেখা ভুলে গেলাম আমরা। আমরা বেঁচে রইলাম, তবুও বেঁচে রইলাম না; আমরা মরে যাইনি, তবুও আমরা বেঁচে নেই।... জাদুকরের কথা, খুবই গোপনে, বলত কেউ কেউ; তাঁর কথা মনে হলে তাঁর বুকে গেঁথে থাকা ছুরিকাটিকে মনে পড়ত আমাদের। কোথা থেকে এসেছিল সেই জাদুকর, যে আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছিল? স্বপ্নের মতো সত্য আর সত্যের মতো স্বপ্ন দেখানোর জন্যে সে আবার কবে আসবে?’ কী কাব্যিক আকুতি ঝরে পড়েছে প্রতিটি বাক্যে! পাঠান্তে কি তাই মনে হয় না? বর্তমান বাস্তবতা কি বলে দিচ্ছে না এই জাদুকরের অভাব? এই জাদুকরই তো হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। যাঁর বাঁশির সুরে একাত্তরে এসেছিল জনজোয়ার। মুক্তিপাগল মানুষ জীবন বাজি রেখে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা। একদল পথভ্রষ্ট কুলাঙ্গার, অকৃতজ্ঞ বাঙালির নামে কলঙ্ক এ জাতিকে করেছে পিতৃহীন। জাদুকরের ফিরে আসার অপেক্ষার অর্থই একটি আকাক্সক্ষার মধ্যে নিপতিত হওয়া। জাদুকর হয়তো সশরীরে আর ফিরে আসবেন না, তা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। জীবিত মুজিবের চেয়ে লোকান্তরের মুজিব আরও যে শক্তিশালী হয়ে উঠছেন তা দিন দিন প্রতিভাত হচ্ছে আমাদের সামনে। তাঁর আদর্শের ঝা-া আজ উড্ডীন। তিনি অমর, অজর। তাঁর নাম বাঙালির হৃদয়ে রৌদ্রোজ্জ্বল হয়ে আছে। সে কথা কবি শামসুর রাহমান বলেন এভাবেÑ

‘...ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর রৌদ্র ঝরে

চিরকাল, গান হয়ে

নেমে আসে শ্রাবণের বৃষ্টিধারা; যাঁর নামের ওপর

কখনো ধুলো জমতে দেয় না হাওয়া.

ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর পাখা মেলে দেয়

জ্যোৎস্নার সারস,

ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর পতাকার মতো

দুলতে থাকে স্বাধীনতা, ...’

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম বললে তা ধৃষ্টতার শামিল সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি প্রতিটি বাঙালিরই শুধু নয়, বাঙালি জাতিরই আত্মপরিচয়। সেই পরিচয়ের কথা সব্যসাচী কবি সৈয়দ শামসুল হক বলেন ‘পরিচয়’ কবিতায়Ñ

...এসেছি বাঙালি ক্ষুদিরাম আর সূর্যসেনের থেকে।

এসেছি বাঙালি জয়নুল আর অবন্ ঠাকুর থেকে।

এসেছি বাঙালি রাষ্ট্রভাষার লাল রাজপথ থেকে।

এসেছি বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর থেকে।

কোনো শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই কোনো হত্যাকা- মেনে নিতে পারে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যার পর এদেশেরই একটি মহল তা নীরবে নয় প্রকাশ্যেই সমর্থন করে। এতে বহির্বিশ্বে পিতৃহন্তারক জাতি হিসেবে বাঙালির ললাটে লাগে কলঙ্কের মসি। যে মানুষটি নিজের সব কিছু ত্যাগ করে, জেল-জুলুম সয়ে একটি স্বাধীন দেশ, নতুন জাতি উপহার দিলেন তাঁকেই স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ বছরের মাথায় হত্যা করে জাতি হিসেবে সুনাম ভূলুণ্ঠিত করালো সেই জাতিরই কতিপয় মানুষ নামধারী পাষ-। কেন হত্যা করা হলো এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের মতো যার বুক তাঁকে? হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ এক বাঙালিকে? একথা সত্য প্রথমত, পাকিস্তানের ভূখ- থেকে বিচ্ছিন্ন করে এ ভূখ-কে স্বাধীন করার প্রতিশোধ নিতেই তাঁকে হত্যা করা হয়। দ্বিতীয়ত, ষাট-সত্তর দশকে বিশ্বব্যাপী জেগে ওঠা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী শক্তি ও নেতৃত্বকে দমনের বৈশ্বিক ষড়যন্ত্রের অংশ এ হত্যাকা-। দীর্ঘ সময় এর হত্যার বিচার নিয়ে বিভিন্ন শাসক গোষ্ঠীর অনীহা, তাচ্ছিল্য, অসহযোগিতা জাতির ভাবমূর্তি করে বিনষ্ট।

আশার কথা হলো, তাঁর সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠা আওয়ামী লীগ বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে সরকার গঠন করে সেই খুনিদের বিচার ও দ- নিশ্চিত করে। জাতির ঘাড়ে দীর্ঘদিন চেপে থাকা কলঙ্কমোচনের যাত্রা হয় শুরু। বেশির ভাগ খুনিদের দ- কার্যকর হলেও এখনও বিদেশে পালিয়ে থাকা দ-প্রাপ্ত ডালিম, রশিদ, নূর, মোসলেহউদ্দিনের দ- কার্যকর করা যায়নি। এখানে একটি সমস্যাই বাধা হয়ে আছে। আত্মগোপনকৃত দেশগুলোর সঙ্গে বন্দি, অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। যদিও প্রক্রিয়ার অগ্রগতি হয়েছে, তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূমিকাই প্রধান হবে এমনটাই স্বাভাবিক। জাতির দাবিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ওই খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার যাবতীয় উদ্যোগ, পদক্ষেপ গ্রহণ এ সরকার ছাড়া যে গত্যন্তর নেই তা বলাই বাহুল্য। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে গড়া, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব প্রদানকারী এ দলটির কাছে মানুষের প্রত্যাশা বেশি। নানামত ও পথের মানুষ আছেন এ দেশে। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সমর্থনকারী রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে কোনো আপস করে না। এই মহান নেতা এখন আর কোনো দলের নন। একটি কথা এখানে না বললেই নয়, বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মদদে গড়ে ওঠা ধর্মীয় মৌলবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠীর অনুপ্রবেশ ঘটেছে এ দেশে। নৈরাজ্য সৃষ্টিসহ অরাজকতার পাঁয়তারা করছে। হামলা চালাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি, মুক্তচিন্তার প্রগতিশীল মানুষের ওপর। ঘটাচ্ছে হত্যাকা-। নানাভাবে বিঘœ ঘটানোর অপচেষ্টায় রত যুদ্ধাপরাধের এগিয়ে চলা বিচারিক কার্যক্রমকে। এদের নেপথ্যে বিদেশে অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির মদদ রয়েছে বলে প্রতিভাত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনার হত্যার পরিকল্পনাও এঁটেছিল এই যৌথ গোষ্ঠী। একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও পঁচাত্তরের ঘাতক এক সূত্রে গাঁথা, পথচলাও একসঙ্গে। এসব অপকা- রোধে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি একত্রিত হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। সময়ই বলে দিচ্ছে একাত্তরের মতো জাতির দাঁড়ানো দরকার আবার এক মঞ্চে, ওই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে।

বঙ্গবন্ধুর দ-প্রাপ্ত খুনিদের ফিরিয়ে এনে দ- কার্যকর করা এখন সময়ের দাবি। যতদিন একজন খুনিও বেঁচে থাকবে ততদিন জাতির পিতার আত্মা যেমন শান্তি পাবে না তেমনি ‘ঘাতক’ জাতি হিসেবে মুছতে থাকা কলঙ্কের কালির শেষ বিন্দুটুকুও মুছবে না।

বঙ্গবন্ধু শুধু বছরান্তে একদিন বা দুইদিন স্মরণ করার মতো মহামানব নন। সারা মাস, সারা বছর তিনি জেগে আছেন বাঙালির অন্তরে। যতদিন থাকবে বাংলা, বাঙালি, বাংলা ভাষা ততদিন তিনি থাকবেন মুক্তিদাতা, স্বাধীনতার স্থপতি হিসেবে। বহুলশ্রুত, করুণ রসে আর্দ্র সরল বাক্য বিন্যাসের একটি গানের অন্তরার মাধ্যমে বলা যেতে পারে এভাবেÑ শত্রুরা তাঁর যতই করুক,/ হিংসা আর বদনাম/বাঙালি কি ভুলতে পারে/ বঙ্গবন্ধুর নাম?