২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডেটলাইন ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ ধানমণ্ডি ৩২

ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের নারকীয় ঘটনার বর্ণনা রয়েছে অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘বাংলাদেশ : এ লিগেসি অব ব্লাড’ বইয়ে। বইয়ের কিছু চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো :

...ধানম-ির ৩২ নম্বর বাড়ির অবস্থা গোলযোগপূর্ণ। ভোর সোয়া পাঁচটার মধ্যেই মেজর মহিউদ্দিন, নূর হুদার নেতৃত্বে পরিচালিত প্রধান ঘাতকদলটি শেখ মুজিবের বাড়ি পৌঁছে গিয়েছিল। তাদের সঙ্গে পাঁচ ট্রাকভর্তি ১২০ জন সৈন্য আর একটি হাউইটজার ছিল। মিরপুর রোডের লেকের পাড়ে হাউইটজারটি শেখ মুজিবের বাড়ির মুখোমুখি বসানো হলো। আরও কিছু ট্রাকে করে সৈন্য এসে পুরো বাড়িটার চতুর্দিক ঘিরে ফেলে। তারপরই মেজরবৃন্দ আর তাদের লোকেরা ভেতরে ঢুকে পড়ে।

বাড়ির এলাকার বাইরে প্রহরারত সশস্ত্র পুলিশ কালো উর্দিপরা ভারি অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সৈন্য দেখে ভড়কে যায়। এবং কোন প্রকার বাদানুবাদ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করে। গেটে প্রহরারত ল্যান্সার প্রহরীরা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিল না ঠিকই। কিন্তু যখন তারা তাদেরই সহকর্মী আর তাদেরই কিছু অফিসারকে দেখতে পেলো, তখন তারা ঐ কালো উর্দি পরিহিত লোকদের ভেতরে আসার সুবিধে করে গেট ছেড়ে দিলো। ঐ সময় শেখ মুজিবের ব্যক্তিগত প্রহরীরা বারান্দায় ঘুমন্ত ছিল। আনাগোনার শব্দ শুনে ওরা জেগে উঠে। গেইট দিয়ে অচেনা লোকদের অস্ত্র নিয়ে ঢুকতে দেখে তারা তাদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র থেকে গুলি চালায়। আর্টিলারির শামছুল আলমের মাথায় গুলি লেগে সঙ্গে সঙ্গেই সে মারা যায়। ল্যান্সার বাহিনীর আর একজন সৈন্য গুরুতরভাবে আহত হয়। সঙ্গীদের ঢলে পড়তে দেখে আর বাড়ির ভেতর থেকে প্রচ- প্রতিরোধের কারণে সৈন্যরা তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেখ মুজিবের দেহরক্ষীদের খতম করে দিয়ে তারা বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। ঢুকেই তারা নিচতলায় প্রতিটি রুম পালাক্রমে তল্লাশি করে দেখে।

...প্রচ- গুলি বিনিময়ের শব্দে হাউইটজারের ক্রুরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। প্রবল প্রতিরোধের আশঙ্কায় তারা তাদের হাউইটজার থেকে রকেট নিক্ষেপ করতে শুরু করে। রকেটের প্রথম দুটিই ধানম-ির লেকের দু’পাশে গিয়ে পড়ে। তারপর তারা তাদের কামান উঁচিয়ে আরও ছয় রাউন্ড রকেট নিক্ষেপ করে। একটিও লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম হলো না। কামান থেকে এতবেশি জোরে রকেটগুলি নিক্ষিপ্ত হয়েছিল যে, এর একটা প্রায় চার মাইল দূরে মোহাম্মদপুরে এক বিহারির বাড়িতে গিয়ে পড়ে। ঐ রকেটের আচমকা আঘাতে দু’ব্যক্তি নিহত ও অনেক লোক আহত হয়।

শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল আর শেখ জামাল সঙ্গে সঙ্গে তাদের স্টেনগান হাতে নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু বেশিক্ষণ টিকতে পারেনি কামাল। সিঁড়ির গোড়ার দিকেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সে। অবশ্য নিহত হবার আগে সে আরও দু’জন সৈন্যকে আহত করতে পেরেছিল।

শেখ মুজিব নিজেও খুব তাড়াতাড়ি কিছু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে আক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা চালান। প্রথমেই তিনি টেলিফোন করেন রক্ষীবাহিনীর সদর দফতরে। সেদিন রক্ষীবাহিনীর কমান্ডিং অফিসার ব্রিগেডিয়ার নূরুজ্জামান আর কর্নেল সাবিহউদ্দিন দেশে ছিল না। তিনি বহু চেষ্টা করে অন্য কোন সিনিয়র অফিসারকেও মিলাতে পারলেন না। উপায় না পেয়ে তিনি সেনাবাহিনীর স্টাফ প্রধান, জেনারেল শফিউল্লাহকে ফোন করেন এবং তার মিলিটারি সেক্রেটারি ব্রিগেডিয়ার মাশহুরুল হককে ফোন করে অবিলম্বে সাহায্য পাঠাবার নির্দেশ দেন। সর্বশেষ ফোনটি করেন সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের ডাইরেক্টর, কর্নেল জামিলকে।

মাত্র পক্ষকাল আগে শেখ মুজিব কর্নেল জামিলকে ঐ পদের জন্যে বিশেষভাবে নির্বাচন করেন। জামিল একটুও দেরি করলো না। পোশাক পরিধানের সময় না পেয়ে তার পায়জামার ওপরে ড্রেসিং গাউনটি চড়িয়ে দিয়ে লাল ভোক্সওয়াগন গাড়িতে করে সে প্রেসিডেন্টের সাহায্যে ছুটে চললো। প্রচ- বেগে গাড়ি হাঁকিয়ে এসে পৌঁছালো প্রেসিডেন্টের বাড়ির দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু ধানম-ির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িটি তখন কারবালায় পরিণত হয়ে গেছে। জামিল তার গাড়ি নিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকতে চেয়ে ব্যর্থ হলো। গেটের বাইরে তাকে থামিয়ে দিলো সৈন্যরা। অত্যন্ত কড়া ভাষায় বাক্য বিনিময়ে সঙ্গে সঙ্গেই জামিল তার গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। গাড়ি ফেলে সৈন্যদের পাশ কাটিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়তে চাইলেই সৈন্যরা গুলি চালিয়ে দেয় জামিলের বুকে আর মাথায়। টলতে টলতে প্রেসিডেন্টের বাড়ির গেটের গোড়ায় মৃত্যুর হিমশীতল কোলে ঢলে পড়ে জামিল। জীবনের বিনিময়েও সে শেখ মুজিবের কোন কাজে লাগতে পারলো না।

এরই মধ্যে বাড়ির সর্বত্র ওরা ছড়িয়ে পড়েছে। মেজর মহিউদ্দিন, হুদা আর নূর বাড়ির প্রতিটি কামরা মুজিবের খোঁজে তন্ন তন্ন করে চষে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে মহিউদ্দিন মুজিবকে পেয়ে গেলো। সে দু’তলায় উঠতে সিঁড়ির গোড়ায় পা ফেলতেই শেখ মুজিবকে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পায়। তাদের মধ্যে দূরত্ব ২০ ফুটের বেশি হবে না।

শেখ মুজিবের পরনে একটি ধূসর বর্ণের চেক লুঙ্গি আর সাদা পাঞ্জাবি। ডান হাতে ছিল তাঁর ধূমপানের পাইপটি।

শেখ মুজিবকে হত্যা করার দৃঢ় মনোবল নিয়ে এ অভিযানে বেরুলেও মহিউদ্দিন শেখ এর সামনাসামনি দাঁড়িয়ে পুরোপুরিভাবে মনোবল হারিয়ে ফেলে। মহিউদ্দিন আমতা আমতা করে তাকে বলেছিল, ‘স্যার আপনি আসুন।’

‘তোমরা কি চাও?’ মুজিব অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় জিজ্ঞেস করলো। ‘তোমরা কি আমাকে খুন করতে চাও? ভুলে যাও। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তা করতে পারেনি। তোমরা কি মনে করো, তা করতে পারবে?’

মুজিব স্পষ্টতই সময় কাটাতে চাচ্ছিলেন। তিনি তো আগেই বেশ কয়েক জায়গায় ফোন করে রেখেছেন। ইতিমধ্যে নিশ্চয়ই লোকজন তাঁর সাহায্যে ছুটে আসছে। সেই সময়ে তিনি অত্যন্ত সাহসের পরিচয় দিচ্ছিলেন। পরে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিতে গিয়ে ফারুক আমাকে বলেছিল, ‘শেখ মুজিবের ব্যক্তিত্ব ছিল অত্যন্ত প্রবল। মহিউদ্দিন তাঁর ব্যক্তিত্বের কাছে একেবারে নতজানু হয়ে পড়েছিল। ঐ মুহূর্তে নূর চলে না আসলে কি যে ঘটতো তা আমার আন্দাজের বাইরে।’

‘মহিউদ্দিন তখনো ঐ একই কথা বলে চলছিল, ‘স্যার, আপনি আসুন।’

আর অন্যদিকে শেখ মুজিব তাকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় ধমকিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় নূর এসে পড়ে। তার হাতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। সে বুঝে ফেলে, মুজিব সময় কাটাতে চাইছেন। মহিউদ্দিনকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে নূর চিৎকার করে আবোল তাবোল বকতে বকতে তার স্টেনগান থেকে মুজিবের প্রতি ‘ব্রাশ ফায়ার’ করে। শেখ মুজিব তাকে কিছু বলার আর সুযোগ পেলেন না।

স্টেনগানের গুলি তাঁর বুকের ডানদিকে একটি বিরাট ছিদ্র করে বেরিয়ে গেলো। গুলির আঘাতে তাঁর দেহ কিছুটা পিছিয়ে গেলো। তারপর নিস্তেজ হয়ে তাঁর দেহ মুখ-থুবড়ে সিঁড়ির মাথায় পড়ে গেলো। বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের মহান নেতার প্রাণহীন দেহ সিঁড়ি দিয়ে কিছুদূর গড়িয়ে গিয়ে থেমে রইলো। তাঁর ধূমপানের প্রিয় পাইপটি তখনও তিনি শক্তভাবে ডান হাত দিয়ে ধরে রেখেছিলেন।

সময় তখন সকাল ৫টা ৪০ মিনিট। বাঙ্গালী জাতির সঙ্গে শেখ মুজিবের প্রচ- ভালবাসার চিরতরে অবসান ঘটলো।