২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুক্তিযুদ্ধে আনসারদের ত্যাগের কাহন

  • বই

বাঙালীর স্বাধিকারের রক্তমাখা পথচলায় বাতিঘর হিসেবে বিবেচিত বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলনে আনসার বাহিনীর ভূমিকার কথা জানলে যে কোন দেশপ্রেমিক বা সচেতন নাগরিকের মন খারাপ হতে পারে। পাশাপাশি যখন স্বাধিকারের চরম মুহূর্ত একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাহিনীটির অংশগ্রহণ, চরম ত্যাগের কথা জানা যায় তখন বুকটা ভরে যায় গর্বে। এমন একটা কথা উঠতেই পারে- তাহলে কি এ বাহিনীটি বায়ান্নর কৃতকর্মের দায় এড়াতে বা সংশোধন করতে মুক্তির মাহেন্দ্রক্ষণে যুক্ত হলো? আসলে কিন্তু তা নয়। বায়ান্ন সালে পাকিস্তানী শাসকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সরকারের আজ্ঞাবাহী একটি বাহিনী ছাড়া এর বাইরে কিছু ভাবা বা করার অবকাশ তাদের ছিল না।

তখন বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। একাত্তরে যখন পুরো পাকিস্তানের প্রশাসনের ওপর আওয়ামী লীগের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ কাজ করছে তখন অন্যান্য নিয়মিত বাহিনীর পাশাপাশি এই বাহিনীটিও মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঙালীর মুক্তির লক্ষ্যে সর্বশক্তি দিয়ে।

সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার যুদ্ধের একেবারেই শুরুতে ২৬ মার্চেই এ বাহিনী পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে। এদের অংশগ্রহণের শুরুর ক্ষণটির চিত্র মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত এবং মোঃ মাহবুবুর রহমান ও মীর ফেরদৌস হোসেন সংকলিত ‘মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনী’ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে এভাবেÑ ‘সিরাজগঞ্জের আনসারের এ্যাডজুডেন্ট (যুদ্ধকালীন) এস এম জহুরুল হক তালুকদার যুদ্ধ শুরু হলে ২৬ মার্চ সিরাজগঞ্জ মহকুমায় (বর্তমান জেলা) এসডিও এ কে সামসুদ্দিনের (সিএসপি) সঙ্গে পরামর্শ করে যুদ্ধে অংশগ্রহণের পদক্ষেপ নেন।... অতঃপর তাঁরা অস্ত্র সমেত কিছু নেতৃস্থানীয় লোকজন নিয়ে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ির (শাহজাদপুর) বকুলতলায় সমবেত হন। অস্ত্র ও গোলা বারুদ বণ্টন এবং যুদ্ধ পরিচালনার ব্যাপারে সার্বিক আলোচনার পর তারা ওখানে বসেই মাটি হাতে নিয়ে দৃপ্তকণ্ঠে শপথ নেন যে, ‘...আমরা দেশ রক্ষার্থে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে সদা প্রস্তুত থাকব...।’

স্বাধীনতা যুদ্ধে আনসার বাহিনীর অবিস্মরণীয় অবদানের কথা গত ৪৪ বছরে তেমন আলোচিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাস জানতে এ প্রজন্ম বা গবেষকদের ‘মুক্তিযুদ্ধে আনসার বাহিনী’ নামের গ্রন্থটি না পড়লে জানাটা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে।

আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার সরকারী গেজেট, যুদ্ধাহত ও শহীদদের তালিকা গ্রন্থে সন্নিবেশিত হওয়ায় এটির গুরুত্ব বেড়েছে। আনসারের ইতিহাস ও সুদূর অতীতের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকা-ের সংক্ষিপ্ত বিবরণ জিজ্ঞাসু পাঠকের কৌতূহল মেটাতে সহায়তা করবে। বেশ কিছু ঐতিহাসিক ছবি বইটিকে সমৃদ্ধ করেছে। ধ্রুব এষের প্রচ্ছদে গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে সুবর্ণ প্রকাশনী।

সিরাজুল এহসান

একজন উত্তর পুরুষ কথা

মাত্র ১২টি উপন্যাস লিখেই কথাকার রশীদ করীম বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন, যেমন তাঁর বিষয়বৈচিত্র্যের কারণে, তেমনি সমকালীনতাকে অতিক্রম করে মানবের চিরকালীন অনুভূতিকে স্পর্শ করেছেন তিনি। তাঁর উপন্যাসে একই সঙ্গে এসেছে দেশবিভাগের যন্ত্রণা, শৈশবের জন্য হাহাকার, প্রেমবোধের বহুবৈচিত্র্যের প্রকাশ, যুদ্ধধ্বস্ত মানসিক ক্ষয়, সম্পর্কের টানাপোড়েন, উচ্চবিত্তের ক্লেদ, মধ্যবিত্তের বিহ্বলতা, সময়ের বদলে যাওয়া মনোভূমির চালচিত্র। লেখক হিসেবে রশীদ করীমের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, চেনাজানা গ-ির বাইরে কখনো তিনি এক পা-ও ফেলেননি, তেমনি পক্ষপাতদুষ্টতা ছিল না নির্দিষ্ট কোনো মতবাদের প্রতি, নির্মোহ এবং নিস্পৃহভাবে তিনি যেন ওপর থেকে তাকিয়ে জীবনকে যেভাবে দেখেছেন, সেভাবেই চিত্রিত করেছেন।

উত্তর-প্রজন্মের কথাসাহিত্যিক হামিদ কায়সার সম্পাদিত রশীদ করীমের ওপর স্মারকগ্রন্থ ‘একজন উত্তম পুরুষ’-এ বিভিন্ন লেখকের লেখনীতে উঠে এসেছে উল্লিখিত বিষয়াদিই। এ স্মারকগ্রন্থে যেমন রশীদ করীমের বন্ধুবেষ্টিত জীবনধারার চিত্রটি খুঁজে পাওয়া যাবে, তেমনি মিলবে সেই ষাট দশক থেকে শুরু করে আজকের শূন্য দশকের সৃজনশীল আধুনিক, মেদহীন ভাষা আর উপস্থাপনার অভিনবত্বের কারণে। কাল ও সময়ভেদে এ কালজয়ী লেখক সম্পর্কে মূল্যায়ন বিভাজিত হয়েছে তিনটি ভাগে।

সাহিত্যজীবনের সূচনাকালÑ ‘প্রথম সকালে’, খ্যাতির মধ্য গগনের মূল্যায়নকেÑ ‘রোদেলা দুপুরে’, এবং মৃত্যু-পরবর্তীকালের মূল্যায়নকে ‘গোধূলি সন্ধ্যায়’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গ্রন্থটির সম্পাদক লিখছেনÑ ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র পর যদি কোনো বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকের নাম স্মরণ করতে হয়Ñ তিনি রশীদ করীম। তাঁর এই স্মারকগ্রন্থটি যদি নতুন প্রজন্মের কথাশিল্পী এবং সাহিত্য-গবেষকের কাছে গ্রহণীয় হয়ে ওঠে তবেই কেবল শ্রম সার্থক মনে করবো।’ প্রথম পর্ব (প্রথম সকালে) লিখেছেন : আনিসুজ্জামান, আবদুল হক, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, আবুল ফজল, আহসান হাবীব, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, হাসান হাফিজুর রহমান প্রমুখ। দ্বিতীয় পর্ব (রোদেলা দুপুরে) লিখেছেন : অরুণ সেন, আবুল হোসেন, আহমেদ আশরাফ, ইমদাদুল হক মিলন, কবীর চৌধুরী, কায়সুল হক, কেএম সোবহান, খান সারওয়ার মুরশিদ, গুণময় মান্না, জাফর আহমদ রাশেদ, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, তসলিমা নাসরিন, নুরউল করিম খসরু, পান্না কায়সার, বুলান্দ জাভীর, বেলাল চৌধুরী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, মজিদ মাহমুদ, মনি হায়দার, মফিদুল হক, মশিউল আলম, মহাদেব সাহা, মাওলা প্রিন্স, মারুফ রায়হান, মাসুদুজ্জামান, মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ, মোস্তফা হোসেইন, রুবী রহমান, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শামসুর রাহমান, শামসুজ্জামান খান, সরদার আবদুস সাত্তার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুস্মিতা ইসলাম, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ আলী কবীর, সৈয়দ শামসুল হক, সৈয়দ হায়দার, হাসনাত আবদুল হাই প্রমুখ।

তৃতীয় পর্ব (গোধূলি সন্ধ্যায়) লিখেছেন : আতাউস সামাদ, আহমাদ মাযহার, গনযালেস ডি কস্তা, পিয়াস মজিদ, তিশনা মহিউদ্দীন, মফিদুল হক, রফিক কায়সার, রোজী, শহীদ ইকবাল, সাগুফতা শারমীন তানিয়া, সাযযাদ কাদির, সুস্মিতা ইসলাম, সৈয়দ আনওয়ারুল হাফিজ, সৈয়দ সাদরুল হুদা, সৌভিক রেজা, হামিদ কায়সার প্রমুখ। সবশেষে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ‘রশীদ করীম : কালস্রোত’ শিরোনামে কথাশিল্পী রশীদ করীমের জীবনপঞ্জি।

অঞ্জন আচার্য