১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান

  • আহমদ ছফা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং শেখ মুজিবুর রহমান একটি যমজ শব্দ। একটাকে বাদ দিয়ে অন্যটার অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি। এই সত্য যারা অস্বীকার করবে, তাদের সঙ্গে কোনরকমের বিতর্ক, বাদ-প্রতিবাদ করতেও আমরা রাজি হব না। একটি জাতি হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই অঞ্চলে বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের ফলে যে সম্ভাবনা মূর্ত হয়ে উঠেছে তার কৃতিত্ব অবশ্যই শেখ মুজিবকে দিতে হবে। আর একই সঙ্গে এই জাতির বিকাশ এবং আত্মপ্রকাশের পথে যে মেঘ-কুয়াশা সঞ্চিত হয়েছে যার ফলে জাতির টিকে থাকার ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, তার জন্যেও আমরা কিছুটা হলেও শেখ মুজিবকে দায়ী করব।

বস্তুত শেখ মুজিব সমালোচনার উর্ধে কোন ব্যক্তি নন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে সুবিধাবাদী কৌশল এতবেশি ক্রিয়াশীল ছিল যে, তা আখেরে তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি নানাভাবে সন্দেহভাজন করে তুলেছিল। এমনকি সপরিবারে নিহত হওয়ার পরেও এই সমস্ত প্রশ্ন তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে এবং হবে। একজন বড় মানুষ যখন ইতিহাসে দীর্ঘ ছায়া বিস্তার করেন, তাঁকে নিয়ে যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর এই ধরনের বিতর্ক চলতে থাকে।

‘যদি’ কিংবা ‘কিন্তু’ দিয়ে ইতিহাস হয় না। সত্যিকার ইতিহাস হলো যা ঘটে গেছে তার সঠিক বিবরণ। ঘটনা পবিত্র কিন্তু তার ব্যাখ্যা নানারকম হতে পারে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে মুজিবের নাম এমন অচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে, যত প-িত হোন না কেন, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের নিপুণতা এবং যুক্তির মারপ্যাঁচ দেখিয়ে কোনো ব্যক্তি একটা থেকে আর একটাকে পৃথক করতে পারবেন না।

শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকাকে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়কালীন অন্য দশটা রাজনৈতিক দলের ভূমিকার সঙ্গে অবশ্যই তুলনামূলক মানদ- প্রয়োগ করে বিচার করতে হবে। বাংলাদেশ শেখ মুজিবের চাইতে প্রজ্ঞাবান রাজনৈতিক নেতা হয়তো ছিলেন, তাঁর চাইতে মেধাবী রাজনৈতিক নেতারও হয়তো অভাব ছিল না, জাতির সবচাইতে নির্যাতিত অংশের সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো নেতাও এদেশে ছিল না, এই কথা বললে সত্য বলা হবে না।

কিন্তু একটি জাতির অন্তস্থ সত্তা প্রাণ-পাতালের উত্তাপে আত্মপরিচয় অনুসন্ধান করার তাগিদে বাঙলার ইতিহাসের স্মরণকালের সবচাইতে মতত্তম ও ব্যাপক জনযুদ্ধটিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তার বেগ-আবেগ সবটুকু ধারণ করেছিলেন শেখ মুজিব, অন্য কোনো নেতা নন। নিঃসন্দেহে সেই সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে এমন কিছু উর্বরা উপাদান ছিল, যা শেখ মুজিবকে এই জাতির স্রষ্টা হতে সহায়তা করেছিল। ঘটনা এবং সময়ের উত্তাপের মধ্যে আশ্চর্য সারবান কিছু উপাদান যেমন ছিল, এই মানুষটির মধ্যেও সেইসব ধারণ করার একটা ক্ষমতা ছিল। একটা পচা ডিমকে ইনকুয়েবেটর যন্ত্রের মধ্যে রাখলে একটা বাচ্চা তৈরি হতে পারে। তা না করে ডিমটিকে এমনি রেখে দিলে সময়ের ব্যবধানে আপনা-আপনিই পচে যাবে। সুতরাং ১৯৬৫ সালের পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে একটা মৌলিক উপাদান বিরাজমান ছিল। আন্দোলনের নানা স্তর এবং সংগ্রামের নানা ধাপ পেরিয়ে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে তা একটি সলিড আকার ধারণ করেছিল। ঐ মৌলিক উপাদানটি হলো বাঙালী জাতির স্বাধীনতার দাবি। শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন ও কর্মের যত কঠোর সমালোচনাই করা হোক না কেন, তিনি যে সংগ্রামটিকে চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রবাহিত করে নিয়েছিলেন সেটা একটা তর্কাতীত সত্য।

একজন বা একাধিক ব্যক্তির শারীরিক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটা রাজনৈতিক মিশনকে হত্যা করা যায় না। কারণ ব্যক্তির মৃত্যু ঘটতে পারে, কিন্তু আদর্শের মরণ নেই। শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যু-পরবর্তী বাংলাদেশে কি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল? তখন আওয়ামী লীগ দেশের সবচাইতে বড় দল। তাছাড়া সহায়ক শক্তি ছিল ন্যাপ এবং বাংলাদেশর কমিউনিস্ট পার্টি। এছাড়াও ছিল অনেক বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবী। সেদিন একটি কণ্ঠও এই নৃশংস হত্যাকা-ের প্রতিবাদ করেনি। পরবর্তী পর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমানে অনুসৃত রাষ্ট্রাদর্শটি সম্পূর্ণ অকেজো ঘোষণা করে নতুন একটি রাষ্ট্রদর্শন এখানে চাপিয়ে দেওয়া হয়, যা আমাদের জনগণের অধিকাংশের কখনো কাক্সিক্ষত ছিল না। সবচাইতে পরিতাপের বিষয় এই যে, শেখ মুজিবুর রহমানের অনুগত ভক্ত এবং রাজনৈতিক কর্মীবৃন্দ এই প্রক্রিয়াটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। এই কথাও সত্য যে, শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর যে ব্যক্তিটি ক্ষমতার আসনে আসীন হয়েছিলেন তিনি তাঁর বিরোধী বা বিপক্ষ দলের কেউ নন। তাঁরই মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্য এবং ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী। এইভাবে ১৯৭৫ সাল থেকে শুরু করে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের অনুসৃত বাঙালী জাতীয়তাবাদের আদর্শটি নস্যাৎ করার কাজ তাঁর দল বুঝে না বুঝে যে ভূমিকা পালন করেছিল এবং করে যাচ্ছে তার তুলনায় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির ভূমিকা বোধ করি বেশি নয়। কারণ স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি তো ঐ আদর্শের বিরোধিতা আগাগোড়াই করে আসছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একবার আওয়ামী লীগ বিভক্ত হয় এবং জাসদের সৃষ্টি হয়। ১৯৭৫ সালের পর আবার আওয়ামী লীগ ভাঙ্গে এবং মিজান-আওয়ামী লীগের জন্ম হয়। তার পরে আবার আওয়ামী লীগ দু’টুকরো হয় এবং আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে বাকশালের সৃষ্টি হয়। এখন শোনা যাচ্ছে আবার আওয়ামী লীগ ভাঙবে এবং ব্যারিস্টার কামাল হোসেনসহ কতিপয় নেতা বেরিয়ে নতুন দল করবেন। ১৯৭২ সাল থেকে শুরু করে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ভেতরের এই ভাঙ্গন প্রক্রিয়াটি প্রত্যক্ষ করলে আমরা দেখতে পাব বার বার আওয়ামী লীগ থেকে নেতা এবং কর্র্র্র্র্মী বেরিয়ে এসে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলোর হাত সৃদঢ় করেছে। রব, মিজান, মোয়াজ্জেম, ইউসুফ আলী, কোরবান আলী সকলের সম্পর্কেই এ কথা কম-বেশি প্রযোজ্য। এখনও আওয়ামী লীগ দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক সংঘটন কিন্তু কিছু করতে পারছে না। তার বিবেক এক ধরনের অপরাধবোধের ভারে জর্জরিত।

আমরা বলেছি ব্যক্তির মৃত্যুর সঙ্গে রাজনৈতিক আদর্শের মৃত্যু ঘটে না। ভবিষ্যতে কি ঘটবে ভবিষ্যতই বলতে পারে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের পর বারো/তেরো বছর সময়ের মধ্যে শেখ মুজিবের বাঙালী জাতীয়তাবাদের আদর্শ বিজয়ী হতে পারেনি। এবং সেই কারণে তার মরদেহের অবশিষ্টাংশ টুঙ্গিপাড়ায় আটকা পড়ে আছে, রাজনীতির কেন্দ্রে আসতে পারেনি। এখানেই শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনীতির সীমাবদ্ধতা। তিনি দেশ এবং জাতিকে জাগিয়েছিলেন বটে, কিন্তু কোনো পরিণতির দিকে দিকনির্দেশ করতে পারেননি। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দলও সে আদর্শটিকে সহস্র-শিখায় জ্বালিয়ে তুলে স্বাধীনতার অঙ্গীকারসমূহ বাংলাদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। এই খানেই শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শের পরাজয়। কেন এই পরাজয়, কি কারণে এই পরাজয়, বিস্তৃত করে বলার অবকাশ এই নিবন্ধে নেই। তথাপি শেখ মুজিবুর রহমান এই জাতির মহান স্থপতি এবং একজন মহান পুরুষ। সমস্ত দোষত্রুটি, রাজনৈতিক প্রমাদ এবং সীমাবদ্ধাতাসহ বিচার করলেও অনন্য। শেখ মুজিবুর রহমানের তুলনা স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমান।

কোনো কোনো মহল শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা- দিবস ১৫ই আগস্টকে জাতির ‘নাজাত’ অর্থাৎ ‘মুক্তিদিবস’ হিসেবে পালন করে থাকে। শেখ মুজিবের হত্যাকারীরা যুক্তি দেখিয়ে বলে থাকে তারা শেখ মুজিবকে হত্যা করে একজন স্বৈরাচারীর হাত থেকে জাতিকে উদ্ধার করেছে। দেশের অনেক বুদ্ধিজীবীও তাতে সমর্থন দিয়ে থাকেন।

এইখানে কার্ল মার্কসের একটা কথা উদ্ধৃত না করে পারছি না। ‘কোনো ডাকাত-সর্দার কোনো সুযোগে রাজাকে হত্যা করে রাণীর শয়নকক্ষে রাত্রিযাপন করতে পারে। তাতে ঐ ডাকাত সর্দারের উপর রাজ্য-শাসনের অধিকার বর্তায় না।’ ১৫ই আগস্টের শেখ মুজিব হত্যাকারীদের যুক্তিও অনেকটা ঐ কথিত ডাকাত-সর্দারের অনুরূপ। শেখ মুজিব যদি জাতির বিরুদ্ধে অপরাধ করতেন জাতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার প্রতিবাদ করত। জাতিকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার অধিকার নিশ্চয়ই সে আততায়ীদের নেই এবং ছিল না। আর একটা মানদ- প্রয়োগ করে আমরা শেখ মুজিব হত্যার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারি। মেনে নিলাম শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে অত্যাচার, অনাচার, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিতে দেশ ছেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পাশাপাশি একথাটিও ভুলে গেলে চলবে না শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারকে যুদ্ধের সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত একটি দেশকে নতুনভাবে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জও গ্রহণ করতে হয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রদর্শনের রূপকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে, জনগণের মধ্যে কোনো উত্থানশক্তি নেই, স্বাধীনতাযুদ্ধের মূল্যবোধগুলো একে একে ধুলোয় গড়াগড়ি যাচ্ছে। জনজীবন এবং সমাজজীবন অপরাধের ভারে জর্জরিত এবং কলুষিত। জাতিকে ধর্মের আলখেল্লা পরিয়ে দিয়ে এমন একটা বিপরীত মেরুতে ঠেলে দেয়া হয়েছে যেখান থেকে উদ্ধারের আশা একেবারেই অসম্ভব না হলেও সুদূরপরাহত হয়ে উঠেছে।

১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিসংগ্রাম পর্যন্ত এই সমস্ত সীমাবদ্ধতা, সমস্ত দুর্বলতা, সমস্ত ভ্রান্তি সত্ত্বেও হৃদয়ের উত্তাপ এবং ভালোবাসার গুণে এই মানুষটি বাঙালী জাতির আত্মবিকাশের সংগ্রামের পথে যে সমস্ত শক্তি বাধা দিয়ে এসেছিল সে সকল শক্তি আজ কাপালিক উল্লাসে এইখানে একটি নতুন পাকিস্তান সৃষ্টি করার আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে। শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা তাদের কাছে মুক্তি-দিবস হতে পারে, কিন্তু বাঙলার মানুষের কাছে নয়। বাংলার হাটের মানুষ, ঘাটের মানুষ, মাঠের মানুষ শেখ মুজিবকে এই জাতির মহান স্রষ্টা হিসেবে জ্ঞান করবে। দিনের পর দিন যাবে জনগণের অন্তর্লালিত এই শ্রদ্ধা ঘনীভূত হয়ে নিকষিত সোনার রূপ ধারণ করবে। হৃদয়ে চেপে বসবে, কেউ ঠেকাতে পারবে না।

আজ থেকে অনেক দিন পরে হয়তো কোনো পিতা তাঁর শিশুপুত্রকে বলবেন, ‘জানো, খোকা! আমাদের দেশে একজন মানুষ জন্ম নিয়েছিলেন, যাঁর দৃঢ়তা ছিল, তেজ ছিল, আর ছিল অসংখ্য দুর্বলতা। কিন্তু মানুষটির হৃদয় ছিল, ভালোবাসতে জানতেন। দিবসের উজ্জ্বল সূর্যালোকে যে বস্তু চিকচিক করে জ্বলে তা হলো মানুষটির সাহস। আর জ্যোৎস্না রাতে রূপালী কিরণধারায় মায়ের স্নেহের মতো যে বস্তু আমাদের অন্তরে শান্তি এবং নিশ্চয়তার রোধ জাগিয়ে তোলে তা হলো তার ভালোবাসা। জানো খোকা তাঁর নাম? শেখ মুজিবুর রহমান।’