২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুজিবের মুখ ও অন্যান্য কবিতা

  • মুহম্মদ নূরুল হুদা

মুজিবের মুখ

মুজিবের মুখ মানে বাঙালির মুখ

মুজিবের মুখ মানে বাঙালির সুখ

মুজিবের মুখ মানে নদী আঁকাবাঁকা

মুজিবের মুখ মানে প্রগতির চাকা

মুজিবের মুখ মানে নৌকার পাল

মুজিবের মুখ মানে কৃষকের হাল

মুজিবের মুখ মানে জেলেজোলাতাঁতী

মুজিবের মুখ মানে বাঙালির জ্ঞাতি

মুজিবের মুখ মানে হালের লাঙল

দাড়ীমুখে সারিগান পাহাড়িয়া ঢল

মুজিবের মুখ মানে ধান আর পাট

ধনধান্যপুষ্পময় ফসলের মাঠ

মুজিবের মুখ মানে খোলা মতামত

মুজিবের মুখ মানে মুক্তির পথ

মুজিবের মুখ মানে মুদ্রা সচল

মুজিবের মুখ মানে যুক্তির বল

মুজিবের মুখ মানে মেহনতী মুখ

মুজিবের মুখ গণমানুষের মুখ

মুজিবের মুখ মানে জনতার মুখ

মুজিবের মুখ নয় ক্ষমতার মুখ

মুজিবের মুখ মানে নেতার ভাষণ

মুজিবের মুখ মানে পিতার শাসন

মুজিবের মুখ মানে আদর সোহাগ

মুজিবের মুখ মানে সমতার ভাগ

মুজিবের মুখ মানে মমতার দাবি

মুজিবের মুখ মানে সমতার চাবি

মুজিবের মুখ মানে গিরি সমতল

মুজিবের মুখ মানে সমুদ্র অতল

মুজিবের মুখ মানে চাষী আদিবাসী

পাহাড়ে ও সমতলে মানুষের হাসি

মুজিবের মুখজোড়া স্বাধীনতা আাঁকা

মজিবের মুখে সব গোত্র পতাকা

মুজিবের মুখ তাই প্রমিত বাঙালি

বাংলা বাগান আর মুজিব যে মালী।

জাতিপিতা

তোমার আগে মানুষ ছিল, অনেক মানুষ

তোমার পরে থাকবে মানুষ, অনেক মানুষ

তোমার-আমার আগে-পরে অনেক মানুষ

সব মানুষের মধ্যে মানুষ একলা মানুষ

বিশ্বমানুষ দৃশ্যমানুষ সোনার মানুষ

একলা তুমি একলা আমি বেজোড় মানুষ

বেজোড় মানুষ সজোড় হলে আদম-হাওয়া

হাবিল-কাবিল ভাইবেরাদর আসা-যাওয়া

একলা মানুষ একলা তবু যায় না পাওয়া

যেমন তুমি একলা মানুষ শিশুমানুষ

পীর-খাদেমের বংশে আসা বিশ্বমানুষ

বইগার আর মধুমতির যিশুমানুষ

বঙ্গযিশু হরিকেলের মাটি খুঁড়ে

গড়লে ভিটা গঙ্গাপলির ভুবনপুরে

ভিটার পাশে হাজার ভিটা কাছে-দূরে

এক ভিটাতে অনেক ভিটা অনেক বাড়ি

খড়ের বাড়ি শস্যবাড়ি শনের বাড়ি

দালানবাড়ি কোঠাবাড়ি ভুবনবাড়ি

খাড়ির পাশে ছোট্র বাড়ি টঙের বাড়ি

পাটখড়ি আর নাড়ার বেড়া জোড়াবাড়ি

জোড়বেজোড়ের চালচুলোহীন মাটির বাড়ি

(শেষঠিকানা সেই সে চেনা মাটির ঘরে

যখন তোমার দশদিকেই থরেথরে

সোনাদানা হীরের কণা নড়ে চড়ে)

পদ্মাচরে নতুন ঘরে যখন তুমি

রাষ্ট্র হলো পিতা তুমি জনক তুমি

একটি তুমি দুইটি তুমি অনেক তুমি

অনেক তুমি অনেক আমি অনেক জ্ঞাতি

তুমি যখন তোমার জ্ঞাতি আমার জ্ঞাতি

অনেক জ্ঞাতি একমোহনায় একটি জাতি

জ্ঞাতিপ্রিয় তুমি-আমি বদলপ্রিয়

আমার সঙ্গে তোমার সঙ্গে মিলনপ্রিয়

ব্যক্তি তখন ব্যক্তি তো নয় ব্যষ্টিপ্রিয়

মানুষ তখন বদ্লামানুষ শ্যামলা মানুষ

বিলে-ঝিলে ফোটা মানুষ শাপলা মানুষ

তামাটে এক জাতিমানুষ লাঙ্গলমানুষ

শস্যমানুষ বশ্যমানুষ মাটিমানুষ

রৌদ্রে-জলে ধোয়া পরিপাটি মানুষ

গাছের ছায়ায় মাদুর-পাতা শোয়া মানুষ

সেই মানুষের মাতাপিতা গঙ্গাধারা

জলের জটা রৌদ্রছটা শশীতারা

কিষাণপিতা কিষাণ-মাতার নয়নতারা

সেই তারাটির জন্যে ব্যাকুল বঙ্গ-সাগর

চাষীমজুর কিষাণ-শ্রমিক বামুন-ধাঙড়

বিশ্বজোড়া বাঙলিরা ভাইবেরাদর

সেই মানুষটি অগ্রযোদ্ধা মুক্তমানুষ

জীবনজয়ের মুক্তিযুদ্ধে যুক্তমানুষ

শোষণমুক্ত মানবজাতির স্বপ্নমানুষ

মানবতার পক্ষে চির বর্মমানুষ

কর্মধর্মে বিশ্বাসী এক কর্মমানুষ

মানবধর্মে দীক্ষিত এক ধর্মমানুষ

সবার চোখে সবার বুকে সেই সে মানুষ

সহস্র নয় অজস্র নয় একটি মানুষ

বিশালদেহী চওড়া সিনা বজ্রমানুষ

বুকজোড়া তার স্বপ্নশিখা মানুসরতন

শুভ্র শুদ্ধ ক্রশে বিদ্ধ প্রমুক্ত মন

বিশ্বমাতার কোলজোড়া এক অমূল্য ধন

না-হীরা না-মুক্তোদানা না-মাণিক্য

না-জহুরী না-জহরত, কিন্তু বৃক্ষ

বটবৃক্ষ, বঙ্গবৃক্ষ, সাক্ষ্য দিচ্ছে অন্তরীক্ষ

আকাশজোড়া ফোটা সে এক শাপলামানুষ

সাগরজোড়া সাঁতার-কাটা ঊর্মিমানুষ

গিরিচূড়ায় আরোহী এক চূড়ামানুষ

চূড়ামানুষ বিশ্বমানুষ জন্মপিতা

শাপলাদেশে শাপলাজাতির শাপলাপিতা

সার্বভৌম বাংলাদেশর রাষ্ট্রপিতা

পদ্মাপারে বীরবাঙালির জাতিপিতা।

জন্মবন্ধু

বঙ্গভুমির জন্মবন্ধু

মানববরণ ফুলে,

তুমি আমার কিষাণবধূর

শস্যবরণ দুল।

তুমি আমার চৈত্রপলির

তৃষ্ণাবিধুর বুক;

তোমার বুকে গঙ্গাপদ্মা

উত্তাল, উন্মুখ।

তুমি আমার জন্মজাতির

পললভূমির পিতা,

তোমার বুকে লোকবাঙালির

কোরান-পুরাণ-গীতা।

ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-জ্ঞাতি

জাতি-উপজাতি

কৃষক-শ্রমিক-রাজনীতিবিদ

গায়েন-জোলা-তাঁতি

তুমি আমার সকল পেশার

ব্যপ্ত গণমন,

তুমি আমার হালট-জমির

হঠাৎ গুপ্তধন।

তোমার মাঝে মুক্তি মাগে

কূল-উপকূল-ভূমি-

তোমার রূপে মুক্ত আমি,

আমার রূপে তুমি।

৯-১০.৮.৯৯

মুজিবমিনার

অনাদিকালের গভীরতম গভীরতা থেকে

অনাগতকালের শীর্ষতম চূড়ায়

না ছায়াধারী না কায়াধারী

গৌর-অগৌর বর্ণাবর্ণের আলোকহাড়ে গড়া

সুজলাসুফলাশস্য শ্যামলা

বর্শাবল্লমহলসমুদ্যত

এই স্তম্ভ;

এই স্তম্ভ

বাঙালির উৎস

বাঙালির বিকাশ,

এই স্তম্ভ

বাঙালির ঐক্য,

বাঙালির জয়,

জয় বাংলার জয়;

এই স্তম্ভ

বঙ্গজনকের হাত থেকে চিরউড্ডীন জোড়া পায়রা,

বঙ্গমাতার গরাদ-আঁচলে রক্তরং গঙ্গাপাড়,

বঙ্গকন্যার হাতে প্রজ্বলিত হোমশিখা

বঙ্গপুত্রের অবিনাশী বজ্রহুঙ্কার

এই স্তম্ভ

বাঙালির বুকে বুকে মানসমিনার

জনকের তর্জনী, মুজিবমিনার।

১১.৩.৯৭

মুজিববরণ

বাংলা নামের বাগান জোড়া হাজার বরণ ফুল

সব বরণ আজ একক বরণ, মুজিববরণ ফুল ॥

যে ফুল ফোটে সে ফুল ঝরে

এই দুনিয়ার রীতি,

আজকে যে ফুল গন্ধমাতাল

কালকে সে ফুল স্মৃতি,

মুজিববরণ ফুটতে জানে, ঝরতে জানে না-

আবহমান বাংলা মায়ের এ ফুল কানের দুল ॥

পদ্মাপারের মানববোঁটায় এ ফুল ফুটেছে

আকাশপানে দলগুলো সব ডানা মেলেছে।

দিনের পরে দিন চলে যায়

সুবাস বাড়ে তার,

এই কুসুমে গাঁথা মালা

জাতির গলার হায়,

মুজিববরণ জিততে জানে, হারতে জানে না-

বাঙালি আজ মুজিববরণ, মুজিব জাতির মূল।

ইতিহাসের বদলা

তোমার বুকে

ছুড়লো গুলি যারা

জানলো না, হায়, তারা

ইতিহাসকে হত্যা করা

যায় না সহজে,

ইতিহাসও বদলা নেবে

আপন গরজে।

তোমার বিশাল মুখটা এখন

ইতিহাসের মুখ,

পদ্ম পলাশ শাপলা শালুক

সেই মুখে উন্মুখ।

ব্যাপ্ত তোমার বুকটাও আজ

লালসবুজের দেশ,

দুচোখ তোমার উদার আকাশ

হৃদয় বাংলাদেশ।

রূপবদলের এমন খেলা

জানে না তো খুনী

জানে কেবল সত্যদ্রষ্টা

যিসাস, শাক্যমুনি।

খুনী যাবে আস্তাকুঁড়ে

এইতো ইতিহাস,

পিতা, তোমার স্বদেশ জুড়ে

আসছে মধুমাস।

রক্তে তোমার উঠছে ফুঁসে

বঙ্গোপসাগর,

ঘূর্ণিস্রোতে উঠলো গড়ে

পদ্মপলির চর।

তোমার পথেই হাসছে এবার

দিনবদলের পালা

পিতার গলায় সন্তানেরা

পরায় বিজয় মালা।

মুজিব

সাযযাদ কাদির

তখন তো একাত্তর

রক্তে ও অশ্রুতে ভাসা

ছুড়ে ফেলে সব কিছু

তর্কে-তত্ত্বে ঠাসা

আমাদের সকলের সে সময়

এক দেশ এক ভাষা

আর তুমি একমাত্র

আলো আর আশা।

আমরা এগিয়ে যাই ভালবাসা-প্রেম নিয়ে

ফেলে যাই দ্বন্দ্ব-বিভাজন

তোমার প্রজ্ঞা, শক্তি-তোমার সে নির্দেশ

জাগরুক থাকে প্রতিক্ষণ

তাই কি স্বতঃস্ফূর্ততায় হয়ে ওঠে

ঘর মানে দুর্গ, হাত মানে হাতিয়ার

আর বাংলা মানে রণাঙ্গন

একাত্তরে সে সময়

উদ্যত সঙ্গীনের নিচে জীবন

কখন কি হয়!

তখন তো আশা তুমি, ভরসা তুমি,

সূর্য তুমি একমাত্র

তাই তো বিদীর্ণ করে কাল অমারাত্র

এসেছ তুমি উদার অভ্যুদয়

তুমি বাংলা, তুমি জয়।

১১.০৮.২০১৫

বাংলার প্রমিথিউস

রুবি রহমান

ও প্রিয় প্রমিথিউস, একবার দেখে যাও তুমি

ঘরময় বাক্স প্যাটরা তল্পিতল্পা হুলস্থূল করে বসে আছি।

এ শহরে কোনো গৃহে দুয়ারে প্রস্তুত নেই গাড়ি

আজীবন অপ্রস্তুত বসে আছি অনন্ত সময়

অনাদি অনন্তকাল জানি না গন্তব্য কোন্ দিকে

দিকচিহ্নহীন দেশে হুলস্থূল হয়ে বসে আছি।

জানলায় ওড়ে না নীল পর্দা, ঘরে পুষ্পাধার নেই

ল-ভ- হয়ে যাচ্ছে স্বপ্ন শোভা লাবণ্য প্রতিভা।

ও প্রিয় প্রমিথিউস, একবার বলে যাও তুমি

যে অগ্নি ছিনিয়ে তুমি এনেছিলে এই বন্দি দেশে

তার একটি স্ফুলিঙ্গও ঘোচাবে না এই দুঃশাসন?

যৌবনকালের মতো পুষ্পিত স্বাধীনতাকাল

নিষ্ফলা বয়ে যাচ্ছে বড় দীর্ঘ দিন

মানুষেরা তন্ত্র মানে, মন্ত্রগুপ্তি জানে

আলোকের পেছনে যে-আধুনিক অন্ধকার তার

মন্ত্রতন্ত্র মানুষের জেনে রাখা ভালো।

হে মুগ্ধ প্রমিথিউস, তুমি তার কিছু বোঝ নাই

তুমি শুধু ভালোবাসা নিয়ে ছিলে

সবুজ সারল্য নিয়ে ছিলে;

মানুষের সমাজের ষড়যন্ত্র মেনে

শিশু ও অগ্নির নিরাপত্তা তুমি রক্ষা করো নাই।

ও প্রমিথিউস, তবু বলে দাও তুমি

এই যে ভিটেমাটি স্বাধীনতা

সব ছত্রখান হয়ে হুলস্থূল হয়ে বসে আছি

কেন আছি? কেন ল-ভ- বসে আছি?

যে অগ্নি একদিন তুমি ছিনিয়ে এনেছো।

প্রতিটি স্ফুলিঙ্গে তার জ্বলে উঠবার গূঢ় মন্ত্রগুপ্তি দাও;

কৃপণ হৃদয় নিয়ে ঘাড় গুঁজে বসে আছে বামন সময়

তোমার মতন তাকে দীর্ঘকায় করো,

তাকে হৃদয়বত্তার উত্তরাধিকার দাও।

তুমি শুধু বঙ্গবন্ধু নও

মিনার মনসুর

একজন কৃষকের চালচুলোহীন অন্ধকার

ঘরে তোমার একটি নিরাপস ছবি সারাক্ষণ

আশ্বাসের পিদিমের মতো ধিকিধিকি জ্বলছিলো;

ভূমিহীন অন্নহীন উদ্বাস্তু জীবনে তার শুধু

এই একটি আশ্রুয় ছিলো;

ছিলো ভালোবাসার সে-এক অনন্ত উর্বর ভূমিÑ ‘বঙ্গবন্ধু’।

রাত্রির ঘাতক অন্ধকারে উন্মাতাল সাগরের বুক চিরে

ক্ষিপ্র ছুটে চলা জেলেদের মাঝিদের ভাঙা নায়ে

তুমি ছিলে মৃত্যুঞ্জয়ী অবিনাশী পাল, চেতনায়

সঞ্জীবনী ভাটিয়ালী গান; কর্মচ্যুত শ্রমিকের

বেদনায়-ব্যর্থতায় ক্ষয়ে আসা হাড়ে, প্রতীক্ষায়

নুয়ে আসা বিদীর্ণ পাঁজরে তুমি ছিলে সর্বজয়ী

বিশাল সাহস; ছিলে বিপ্লবের হিরন্ময় মহান সাধক।

মালিকের রক্তচোখ পুড়ে যেতো তোমার আগুনে;

রক্তচোষা মহাজন-জোতদার নিত্য আতঙ্কে কাটাতো নিশি;

তোমার সাম্যের হাতে তার মৃত্যু লেখা ছিলো; তাই

তুমি শুধু বঙ্গবন্ধু নওÑ কারো কারো শত্রুও ছিলে!

তোমার মৃত্যুতে কার কতোখানি ক্ষতি হলো? আর

কারা লাভবান হলো? সোনার তরিতে চেপে কারা

গেলো তড়িঘড়ি আলোঝলমল রাজার মহলে?

কারা জয়ী হলো? নিঃস্ব হলো কারা? আর কারা হলো

অরক্ষিত বনের হরিণ? মাঝিহীন বিধ্বস্ত সাম্পানে চড়ে

কারা আজ দিশেহারাÑ ঝড়ে-পাওয়া বিপন্ন মানুষ?

আজ তার উন্মোচন হোকÑ তুমি কার বন্ধু ছিলে?

স্মারকলিপি

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ

শ্রাবণের মেঘমন্দ্রীত কণ্ঠে একটি উচ্চারণ, বঙ্গবন্ধু, আমরা ভালো নেই। আমরা ভালো নেই কেউ, ভালো নেই তোমার সোনার বাংলায়! না বৃক্ষ, না নদী, না পাখি...কেউ ভালো নেই। সমস্বরে বলি, আমরা আসলেই কেউ ভালো নেই বঙ্গবন্ধু।

তুমি তো জানো না বঙ্গবন্ধু যখন তুমি অন্তরে গুনগুন করে সুর ভাঁজছিলে, ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি, ভাঙলো ঝড়ে’... ঠিক তখুনি সরীসৃপহিংস্র বুলেটে তোমার বুক ঝাঁজরা হয়ে যাবার কিছু পরে তোমারি বাংলায় রাসেল নামের এক নিষ্পাপ কিশোর তার পিতার সাথে, একটি অকলুষ কিশোর তার মাতার সাথে গুলিতে স্তব্ধ হয়ে গেছে ১৫ আগস্টের শেষ যামিনীতে ।

হায়, ও আর কোনো দিন ফিরবে না ।

তুমি তো জানো না এখন দেশজুড়ে এমন অসংখ্য শিশু... এমন অসংখ্য কিশোর আগুনে, গুলিতে, চাকুতে লাঠির আঘাতে আঘাতে মরছে আর মরছে। কী প্রাণের আকুতি লাশের! ওরা নদী ফুঁড়ে জেগে ওঠে ডাকে দিগন্ত বলয়ে, ‘আমাকে কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা লোকেরা খুন করে গেছে।’

তোমার কি মনে আছে বঙ্গবন্ধু সেই একাত্তরে পাকিস্তানে তোমার জেলখানার বাইরে... তোমার শোবার ঘরের কিছুটা দূরে দানবীয় অতল অন্ধকার কবরটির কথা? নিশ্চয়ই যাওনি ভুলে।

জানো, অমোন কবরের ছাপচিত্র এখন আমাদের প্রতিদিনের স্বপ্নে, আমাদের বাসস্থানের পাশে নিয়ত ওঁৎ পেতে মহা আহ্লাদে হাসে।

আমরা ভালো নেই বঙ্গবন্ধু। হে বাঙালি মহাবীর, আমরা ভালো নেই।

তবে আমাদের কারো কারো অনেক সুখ। তাহাদের গোলাভরা ডলার। তাহাদের গোলাভরা মস্ত গাড়ি, আকাশ ছোঁয়া উঁচু উঁচু বাড়ি। আর আমাদের সন্তানদের পকেটের সেলফোনে বিকলাঙ্গ দিনলিপি বিষাক্ত পুঁজমাখা ঘায়ে জড়াজড়ি করে শুয়ে। আর আমাদের মুক্তকথাগুলো ধারালো ছুরির আঘাতে ফালাফালা। ভয়াবহ ক্ষতবিক্ষত হয়ে সেসব অচেনা হয়ে গেছে। চেনাই যায় না তাদের। চেনাই যায় না।

ও আমার জাতির পিতা, জানো এমন অচেনা জীবনের বাঁকে খুব চেনা লাগে... খুব খুব কানে ভেসে আসে তোমার বজ্রকণ্ঠখানি...খুব মন চায় তোমাকে প্রাণপণে ডাকি সব বায়ু বুকে করে সঞ্চার, ‘একবার বঙ্গবন্ধু, আবারো একবার এইখানে... এই শ্যামল দেশে ভরা শ্রাবণের রাতে এসে ডাক দিয়ে যাও...’ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

টুঙ্গিপাড়া

মারুফ রায়হান

কখনো গিয়েছ তুমি টুঙ্গিপাড়া, ছবির মতন সেই গ্রামে?

পাখিদের গানের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে ভোর-ফোটা সেই গ্রাম

জ্যোৎস্নার আঁচলে মাথা রেখে ঘুম-যাওয়া সেই গ্রাম

সবুজে সবুজে মোড়া, ছায়ায় মায়ায় স্নিগ্ধ অপরূপ তার মুখ

যাবে না আলাদা করা তাকে বাংলার হাজারটা গ্রাম থেকে

তবু তার নামের ওপরে চুমু খায় বাংলার মাটি

বন্দনাসঙ্গীত গায় বাংলার বায়ু, আর

শ্রদ্ধায় কুর্নিশ করে দেখ আজ রাষ্ট্রের মাথারা

আর এই রাষ্ট্র একদিন তোমার ছিল না

তোমার আকাশ

তোমার স্বদেশ

তোমার ছিল না

তোমার পতাকা ব’লে মানচিত্র ব’লে কিছুই ছিল না

টুঙ্গিপাড়ার গর্ভ থেকে উঠে আসা একজন মহান বাঙালী

তোমাদের দিয়েছেন এইসব উপহার

সে এক সময় ছিলÑ তাঁর বজ্র আহ্বানে

জেগে উঠেছিল সাড়ে সাত কোটি বাঙালী

তুমি তাঁকে চেনো? কখনো দেখনি তাঁকে?

পঁচাত্তর-উত্তর প্রজন্ম তুমি

সুকান্ত-কথিত আঠারোর আগুনে দাঁড়ানো মৃৃত্যুঞ্জয়ী সাহসী সন্তান

বাঙালীর তীর্থভূমি টুঙ্গিপাড়া যাও, বাংলার নাড়ি ছুঁয়ে আসো

অভিবাদন জানাও তাঁকে, পিতাকে; দাঁড়াও বুক টান ক’রে

পিতৃহননের বদলা নেবে না?

মৃত্যুতে হয় না শেষ

ফারুক মাহমুদ

পুড়ে পুড়ে উড়ে যায় শতবর্ষী কয়লা-সময়

পাখি যায় পুষ্প যায় পাথরের সর্ব অঙ্গে ক্ষয়

যে-ছিল সবুজ ঘ্রাণে স্বর্ণসুখে দীর্ঘ প্রকরণ

প্রকৃতির পৃষ্ঠাজুড়ে লেখা আছে শুভ জন্মক্ষণ

কোনো এক দুঃখদিনে দগ্ধরেখা হয়েছে প্রকট

মুছে গেছে মরুচিহ্ন বালিয়াড়ি গিরিগাত্রতট

সময় বয়স্ক হলে পড়ে থাকে ব্যর্থ সমর্পণ

মৃত্যুতে হয় না শেষ কোনো কোনো প্রখর জীবন

আঙুল

আশিক সালাম

একটি আঙুল ছিঁড়ে আনে দীপ্র সূর্যের মহিমা

একটি আঙুল রাত্রিপথে অনির্বাণ বাতিস্তম্ভ

অস্থির জাহাজে নীল মাস্তুলের তুমুল উত্থান

গহিন সমুদ্রে রেডিয়মজ্বলা কম্পাসের কাঁটা

উত্তর-আকাশে ফিনকি দেয়া নক্ষত্রের লাল চোখ

উত্তোলিত উলঙ্গ আঙুল

ধ্রুপদী মুদ্রায় নাচে ভোরের শালিক

রাত্রির জানালা খোলে সুতীক্ষè টঙ্কারে

কাঁটাতার কার্ফ্যু ব্যারিকেড নুয়ে পড়ে

আনড় আঙুলে

দুর্বৃত্ত আঁধার চিরে শৈল্পিক আঙুল

এঁকে দেয় মানচিত্রÑনিজস্ব নীলিমাÑ

প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকার ফুঁড়ে জেগে ওঠা চর

রোদেলা হলুদ সর্ষেমাঠ আমাদের

স্বপ্নময় উজ্জ্বল ঠিকানা

একটি আঙুল তিমির-হননে লাল সিগন্যাল

একটি আঙুল অনিদ্র সত্তার বাক্সময় অক্ষর

একটি আঙুল তুখোড় তারুণ্যে সুতীব্র সুন্দর

স্পর্ধিত লাবণ্যে ঊর্ধ্বমুখী পান্থপাদপের চুড়ো

মুক্তির লড়াইয়ে গেরিলার হাতে উদ্যত সঙিন

মেঘের জংশনে জ্বলে ওঠা হিরণ্ময় বিদ্যুলতা

জ্যোতির্ময় দ্যোতনায় দৃপ্ত সেই তুরীয় আঙুল

ঘাতকের ফাঁসি

মহিবুর রহমান মিহির

ধবল জোছনা রাতের গভীরে নিঝুম স্তব্ধতা

ভেঙে কৃতঘœ পাষ- তুমি সীমারের মতন তটস্থ পায়ে

পালাচ্ছো কোথায়? শ্রাবণের নির্মেঘ আকাশে সহসাই

একঝাঁক কালো দাঁড়কাক ডেকে ওঠে কর্কশ স্বরে

তোমার বিকট পদভারে ভয়ানক ঢেউ তোলে অন্ধকার

সমুদ্রেরা ঘুমে থাকা শহর ঢাকায়।

জামার আস্তিনখানি কী বিশুদ্ধ রক্তে ভিজিয়ে

নাৎসি বাহিনীর মতো কপট উল্লাসে কোথায় যাচ্ছো

ঘাতক? আঁতুর ঘরে ধুপ-গন্ধ আর কাঠের অঙ্গার

পোড়া ছাই বেমালুম ভুলে? মদিরা-বেহুঁশ

পড়ে থেকে কিছুকাল পোষা কুকুরের মতো করেছো চামুন্ডাগিরি।

অবশেষে পড়ে গেছো ধরা। প্রবল আক্রোশে ক্ষুব্ধ জনতা, বিক্ষুব্ধ প্রবাসী

ট্রাইব্যুনালের রায়, পিতৃ হন্তা ঘাতকের

মৃত্যুর পরওয়ানা।

আগস্টের এক রাত

রবীন্দ্রনাথ অধিকারী

আগস্টের এক রাত

সে রাতে অন্ধকার ঢেকেছিল একাদশী চাঁদ

সে রাতে সারাক্ষণ শোক-সাহারা

আকাশের সিঁড়ি ভেঙে নেমেছিলো শ্রাবণের ধারা

সে রাত নজরবন্দি অন্ধকার রাত

ছিল না পাখিদের কলকাকলি, শুধু নিঃশব্দ রক্ত প্রপাত

বিষণœ বিহ্বলতায় আকাশে ও সমতলে

দেশ ভেসেছিলো রক্তের নোনা জলে,

পথের পাথরে ফেলে বিষ কালনাগ

কাল রাতের ভোর অবিচল বিছিয়ে দেয় রক্তের দাগ

আকাশের নীল গালে মুখ ঘষে একাদশী চাঁদ

অন্ধকার রাত নামে আগস্টের রাতÑ

সে রাতে নির্মমতা পৈশাচিক

জাতির ভরা বুকে হাঁটে দিগি¦দিক

স্বপ্ন বৃক্ষের চারা মাটির গভীরে মাথা ঠোকে

অপ্রসন্ন বাঙালি কণ্ঠে কাল শোকে মহাশোকে!