২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিলুপ্তির পথে এশিয়ার সিংহ

  • অঞ্জন আচার্য

রাজসিক ভঙ্গি, সোনালি কেশর, তার দুলকি চালে রাজার ভঙ্গিতে হেঁটে চলা, শিকার ধরার সময় ক্ষিপ্র ভঙ্গি, এসবই সিংহকে শক্তি, ক্ষমতা ও অহঙ্কারের প্রতীকে পরিণত করেছে সুপ্রাচীনকাল থেকেই। হাল আমলে এর নানাবিধ অবয়ব দেখা যায় গাড়ি, চকলেট বার কিংবা রাগবি’র শার্টে। সুবিশাল চলচ্চিত্র নির্মাণ ও পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান মেট্রো-গোল্ডউইন-মায়ার (এমজিএম) তাদের প্রাতিষ্ঠানিক লগো হিসেবে সিংহের মুখায়বয় ব্যবহার করে আসছে ১৯২৪ সাল থেকে। তবে সিংহকে প্রতীক হিসেবে ব্যবহারের এ প্রচলন প্রাচীন সভ্যতা থেকেই। নানা জাতির অলঙ্কার থেকে শুরু করে মুদ্রাতেও স্থান পেয়েছে সিংহের মুখায়ব। প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের মুদ্রা থেকে শুরু করে আমাদের এশিয়া মহাদেশের পারস্য, মোঘল, রাজপুত ইত্যাদি বিভিন্ন সময়ের শাসকদের পছন্দের প্রতীক হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলা ভাষায়ও ‘সিংহপুরুষ’, ‘সিংহাসন’Ñ এই শব্দগুলো রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয় শক্তিমত্তা ও ক্ষমতার প্রসঙ্গে।

সিংহের জীবনযাপন বৈচিত্র্যময়। এরা নিজেদের মধ্যে দলবদ্ধভাবে থাকে, এমনকি শিকারও করে একসঙ্গে। এক একটা দলে ৩টি পর্যন্ত পুরুষ সদস্য থাকে। কিন্তু শিকার হতে শুরু করে পরিশ্রমের সব কাজ করতে হয় নারী সদস্যদের। তবে পুরো দলের মধ্যে একজন পুরুষ নেতা থাকে, যে সম্পূর্ণ দলটি নিয়ন্ত্রণ করে। শিকারের ক্ষেত্রেও সিংহ দারুণ নৈপুণ্যের পরিচয় দেয়। অনেক সময় দেখা যায়, দলের কিছু নারী সদস্য একটি শিকারকে তাড়া করে কোন একটি নির্দিষ্ট দিকে নিয়ে যায়। যেখানে আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি সদস্যরা শিকারটিকে অতর্কিতে আক্রমণ করতে পারে। শিকারের ঘাড় ধরে ঝাঁকি দিয়ে ভেঙ্গে ফেলে কিংবা দাঁত দিয়ে মেরুদ- ভেঙ্গে দিয়ে শিকারকে কাবু করে এরা। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও দলবদ্ধভাবে বিপদের মোকাবেলা করে সিংহরা, একদম প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিকদের মতো। পারিবারিক সম্পর্ক একটি দলের মধ্যে দারুণ, পরিবারের নারী সদস্যরা মিলিতভাবে সন্তানদের পালন করে এবং দেখাশোনা করে।

প্রাচীনকাল থেকেই এশিয়াটিক লায়ন উপমহাদেশের নানা বৈচিত্র্যময় মাধ্যমে স্থান পেয়েছে। সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে এই প্রজাতির সিংহ প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এমনকি সম্রাট অশোকের আমলে নির্মিত অশোকস্তম্ভতেও এই প্রজাতির চারটি সিংহের প্রতিকৃতি স্থান পেয়েছে। এই অশোকস্তম্ভের প্রতীক ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইতিহাসে সম্রাট অশোকই প্রথম ব্যক্তি যিনি সিংহ সংরক্ষণের ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। শ্রীলঙ্কার জাতীয় পতাকাতেও শোভা পায় সিংহের প্রতীক, যা এই প্রজাতির। সিংহলি কথাটাও এসেছে এই সিংহ থেকেই। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে এশিয়াটিক লায়নের প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন শাসকের রাজত্বকালে।

সিংহের প্রসঙ্গ এলেই আমাদের চিন্তায় চলে আসে আফ্রিকার বিস্তৃত বন অঞ্চলের ছবি, সাফারি আর বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো সিংহের পরিবারের দৃশ্য। তবে সিংহের প্রজাতির উৎপত্তির সঙ্গে আফ্রিকার নিবিড় সম্পর্ক থাকলেও আমাদের উপমহাদেশেই আছে একটি প্রজাতি যা প্রায় এক লাখ বছর আগে তার পূর্বপুরুষদের থেকে আলাদা হয়ে বসবাস শুরু করে এই অঞ্চলে। ‘এশিয়াটিক লায়ন’-এর এই প্রজাতিটি বর্তমানে সিংহের সব থেকে দুর্লভ একটি প্রজাতি। এককালের প্রবল প্রতাপে বনের গহীনে রাজত্ব করে চলা এই প্রজাতিটির হাতেগোনা কিছুসংখ্যক সদস্য এখন জীবিত আছে। বিলুপ্তপ্রায় এই প্রজাতিকে নিয়েই একটু জানার চেষ্টা এখানে। অনেকেই ভেবে থাকে সিংহ প্রজাতির একমাত্র বিচরণক্ষেত্র হচ্ছে আফ্রিকা। এর কারণ আর কিছুই নয়, শিকারের নেশায় মানুষ বিপুলসংখ্যক সিংহ হত্যা করেছে বহুকাল ধরে। এর ফলে আফ্রিকা ছাড়া আর প্রায় সব মহাদেশেই এরা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আর যাও অবশিষ্ট আছে তারাও বিলুপ্তির পথে। এ কারণে উপমহাদেশে সিংহের প্রজাতি সম্পর্কে সাধারণ ধারণা কম। এশিয়ার সিংহের প্রজাতিটি আফ্রিকান সিংহের একটি উপ-প্রজাতি। আফ্রিকান পূর্বপুরুষদের থেকে আলাদা হয়ে এটি ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া মাইনর, আরব অঞ্চল বিশেষ করে পারস্য, ইরান, ভারত ও আশেপাশে। অতীতে এই প্রজাতির সদস্য সংখ্যা যথেষ্ট থাকলেও নানাবিধ কারণে অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিলুপ্ত হতে হতে এখন শুধুমাত্র ভারতের গুজরাট প্রদেশে অবস্থিত ‘গির অভয়ারণ্যে’টিকে আছে মাত্র ৪১১টি প্রাণী। ১ হাজার ৪৫০ বর্গকিলোমিটারের এই অভয়ারণ্যটিকে পৃথিবীর অন্যতম স্পর্শকাতর অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেছে জাতিসংঘ এবং অন্যান্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্রগুলো।

আফ্রিকান সিংহের সঙ্গে এশিয়াটিক লায়নের পার্থক্য সীমিত। দৈহিক গড়নে এশিয়াটিক লায়ন কিছুটা ছোট, কেশরও কিছুটা কম। এছাড়াও এদের জীবনযাপনের ধরনে কিছু পার্থক্য বিদ্যমান। এশিয়াটিক লায়ন উচ্চতায় ৯০ সে.মি. এবং দৈর্ঘ্যে ২০০-২৮০ সে.মি-র মতো হয়ে থাকে। এদের ওজনও আফ্রিকান প্রজাতির থেকে কম, ২০০-২৭৫ কেজির মধ্যে। জীবনযাপনের ক্ষেত্রে সিংহ সবসময়ই দলবদ্ধভাবে থাকতে পছন্দ করে। এদের এক একটি দলকে বলা হয় ‘প্রাইড’। আফ্রিকান সিংহের প্রজাতিতে এক একটি প্রাইডে ৪ থেকে ৬ জন স্ত্রী সদস্য এবং সঙ্গে তাদের সন্তানরা থাকে। তবে এশিয়ার সিংহের প্রাইড কিছুটা কম সদস্য বিশিষ্ট হয়। এতে সর্বোচ্চ দু’জন নারী সদস্য থাকে আর সঙ্গে তাদের সন্তানরা। পুরুষ সদস্যের সংখ্যা ২ থেকে ৩টি। আফ্রিকান প্রজাতির পুরুষ সিংহের মতো এদেরও কেশর আছে, তবে পরিমাণে কম। কিন্তু এশিয়াটিক লায়নের শরীরে লোমের পরিমাণ বেশি এবং ঘন। তবে ঘন রঙের কেশর খুব অল্পসংখ্যক পুরুষ সিংহের থাকে। ধারণা করা হয়, এটি প্রজাতির মধ্যে আভিজাত্যের প্রতীক এবং নারী সিংহরাও প্রজননের সময় এ ধরনের সিংহকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। এছাড়াও তাদের লেজের শেষে লোমের দৈর্ঘ্যও বেশি। এছাড়া খাদ্যাভাস এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্য প্রায় একই।

ভারতীয় উপমহাদেশে এক সময় সিংহের বিচরণক্ষেত্র ছিল উত্তর ভারত থেকে শুরু করে পূর্বে বিহার পর্যন্ত নর্মদা নদীর তীর ঘেঁষে। কালক্রমে এই অঞ্চলগুলো থেকে সিংহের প্রজাতিটি বিলুপ্ত হতে হতে সব শেষে বর্তমানের গুজরাট প্রদেশে কিছুসংখ্যক টিকে থাকে।

আর এশিয়াটিক লায়নের বিলুপ্তির অন্যতম কারণ হচ্ছে লাগামছাড়া শিকার। বিপুলসংখ্যক সিংহ এভাবে হত্যা করা হয়। এছাড়াও খাদ্যাভাব আরও বড় একটি কারণ। খাদ্যের অভাবে এবং বিচরণক্ষেত্রের অপ্রতুলতার জন্য খুব দ্রুত বংশহ্রাস ঘটে এই প্রজাতির। তবে ১৯৩৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২৮৭টি সিংহের সংখ্যা নথিবদ্ধ করা হয়। ১৯৬৫ সাল থেকে গির বনাঞ্চলকে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে সিংহের বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিকে রক্ষা করতে উদ্যোগী হয় প্রশাসন। ১৯৬৮ সালের ১৭৭টি সিংহের থেকে ২০০৫ সালে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫৯টি। বর্তমানে দুর্লভ এই প্রজাতিটির সদস্য সংখ্যা প্রায় ৪১১। এশিয়াটিক লায়নের এই প্রজাতিটিকে কৃত্রিমভাবে বংশবিস্তারের চেষ্টা সফল হয়নি এখনও। এছাড়াও খুবই অল্পসংখ্যক সদস্যের মধ্যেই প্রজননের প্রচলন থাকায় এবং প্রজননের বিশুদ্ধতা রক্ষা করায় এদের সঙ্গে অন্য প্রজাতির প্রজননের ক্ষেত্রে কোন সফলতা এখনও আসেনি। তাই পৃথিবীর দুর্লভ প্রাণীদের মধ্যে এশিয়াটিক লায়ন অন্যতম।

বর্তমানে এশিয়াটিক লায়নের দুর্লভ এই প্রজাতিটির কৃত্রিমভাবে বংশবিস্তারের চেষ্টা চলছে। এছাড়াও গির অঞ্চলে স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় অন্য আরেকটি অভয়ারণ্যে কিছুসংখ্যক সিংহ স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। বিলুপ্তপ্রায় সিংহের এই প্রজাতিটি মানুষের নৃশংসতা এবং নানা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে আছে কোনমতে। অতি প্রাচীন একটি দুর্লভ প্রজাতির প্রাণী সংরক্ষণ করা মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের এই অঞ্চলগুলো থেকে নানা প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং যাচ্ছে পর্যাপ্ত সংরক্ষণের অভাবে এবং গুপ্ত চোরাচালানি ও শিকারীদের দৌরাত্ম্যে। বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের সংরক্ষণের মাধ্যমে এদের বংশবিস্তার নিশ্চিত করে এদের টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন। প্রয়োজন অভয়ারণ্য এবং উন্নত পদ্ধতির লালন-পালনের ব্যবস্থা। নয়তো এভাবেই একদিন পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাবে এরা। বনের রাজা সিংহ শুধু শিশুদের গল্পের বইয়ের পাতাতেই নয়, রাজত্ব করুক অরণ্যে গহীনে দাপটের সঙ্গে।

বিবিসি অবলম্বনে