২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চাঁদ এলো কোথা থেকে

  • এনামুল হক

আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী যে চাঁদকে আমরা দেখি সে সম্পর্কে আমাদের অনেক কিছুই হয়ত জানা। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছি এই চাঁদ কোত্থেকে এসেছে? ওটা কি পৃথিবী থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাওয়া কোন অংশ? ওটা কি সৌরজগতের বুকে আপন মনে বিচরণ করে বেড়াচ্ছিল এমন সময় পৃথিবী খপ করে ধরে তাকে নিজের কাছে টেনে এনেছে এবং তারপর থেকে ওটা স্থায়ীভাবে পৃথিবীকে ঘুরপাক খেয়ে চলেছে? নাকি চাঁদের জন্মের পেছনে অন্য কোন কারণ কাজ করছে?

আমাদের পূর্বপুরুষরা এই চাঁদের জন্ম নিয়ে কত মাথা ঘামিয়েছেন, কত রকম ব্যাখ্যা হাজির করেছেন। সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে ইতালীয় জ্যোতি ও পদার্থবিজ্ঞানী গ্যালিলিও শক্তিশালী টেলিস্কোপ বানিয়ে তা দিয়ে চাঁদকে ভালভাবে দেখে বলেছিলেন চাঁদের ভৌগোলিক গঠন পৃথিবীর অনুরূপ। চাঁদ ও পৃথিবী কোন না কোনভাবে যে একত্রে গঠিত হয়েছিল এটা ছিল তার প্রথম ইঙ্গিত। উনবিংশ শতকে চার্লস ডারউইনের ছেলে জর্জ এই ধারণা ব্যক্ত করেন যে, নবীন অবস্থায় পৃথিবী অতিদ্রুত অবর্তন করত বা ঘুরপাক খেত। তার ফলে এর একটা অংশ মহাশূন্যে ছিটকে বেরিয়ে গিয়ে চাঁদ গঠিত হয়েছে। এই ছিটকে বেরিয়ে যাওয়ায় চিহ্ন সম্ভবত হলো প্রশান্ত মহাসাগর।

এই ব্যাখ্যাটি খুব বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ব্যাখ্যা হাজির হয়। রসায়নবিদ হ্যারল্ড ইউরে বলেন, চাঁদ আমাদের নীহারিকার অন্য অংশ থেকে এসেছে এবং পৃথিবীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এর মধ্যাকর্ষণের টানে কাছে চলে এসেছে। তবে চাঁদের কক্ষপথকে বিপর্যস্ত না করে পৃথিবী কিভাবে চাঁদকে দখল করতে পারল তার নিশ্চিত ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি। তথাপি ব্যাখ্যাটি কিছু গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। কারণ পৃথিবীর তুলনায় উপগ্রহ হিসেবে চাঁদটা বেশ বড়। অস্বাভাবিক রকমের বড়। তবে এমন উপগ্রহ অন্য কোথাও গঠিত হয়ে থাকলে সেটা মেনে নেয়া যায়। তাছাড়া চাঁদের শুধু একটা দিক পৃথিবীর দিকে মুখ করা। কোন বস্তুকে দখলে নেয়া হলেই শুধু এমনটা ঘটা সম্ভব।

তারপরও বিজ্ঞানীমহলে চাঁদের জন্ম নিয়ে গবেষণা চলতে থাকে। কিছু বিজ্ঞানী মত প্রকাশ করেন যে, পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যে সম্ভবত সংঘর্ষ হয়েছিল। এই ব্যাখ্যাকে রহস্যের সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে ধরা হয়। পৃথিবীর বায়ুম-ল যদি সে সময় যথেষ্ট বিশাল হয়ে থাকে তাহলে সেটা হয়ত এক অতিকায় এয়ারব্যাগ হিসেবে কাজ করেছিল এবং চাঁদের সবেগে আগমন মন্থর করে দিয়েছিল, যার কারণে ওটা মহাকাশেই ফিরে যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু তেমনটা না হওয়ারই বেশি সম্ভাবনা।

বিজ্ঞানীদের প্রয়োজন হয়ে পড়ে এমন একটি তত্ত্বের ঘা বেশকিছু মৌলিক পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষত উপগ্রহ হিসেবে চাঁদ তুলনামূলকভাবে বড়। তাছাড়া এর গতিও বাড়ছে। তার মানে এটি ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে দূরে চলে যাচ্ছে।

এক্ষেত্রে এক্রেশন থিওরি নামে একটি তত্ত্ব হাজির করা হয় যেখানে বলা হয় একটি কৃষ্ণগহ্বরকে ঘিরে থাকা পদার্থরাজির বিশাল বিশাল ঘূর্ণায়মান চাকতি থেকে পৃথিবী ও চাঁদ একসঙ্গে গঠিত হয়েছিল, কিন্তু বেশকিছু প্রশ্নের কোন ব্যাখ্য না থাকায় তত্ত্বটি হালে পানি পায়নি।

এর ফলে ইউরের চন্দ্র দখলের তত্ত্বটি ১৯৬০-এর গোটা দশকজুড়ে প্রাধান্য বজায় রাখে। কিন্তু ইউরের তত্ত্বটি ঠিক হলে চাঁদের রাসায়নিক গঠন পৃথিবী থেকে ভিন্ন রমক হওয়ার কথা। কিন্তু ওই দশকেই মার্কিন নভোচারীরা প্রথমবারের মতো চাদে যান এবং সেখান থেকে নমুনা হিসেবে যেসব পাথর নিয়ে আসেন তাতে প্রচলিত সমস্ত তত্ত্ব অসার প্রমাণিত হয়। ওগুলোর বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায় চাঁদের বয়স প্রশান্ত মহাসাগরের বয়সের চেয়ে অনেক বেশি। সুতারাং প্রশান্ত মহাসাগরের অংশটা ছিটকে বেরিয়ে চাঁদ তৈরি হওয়ার ব্যাখ্যাটা ঠিক নয়। ভূতত্ত্বের সবচেয়ে বাইরের দিকের স্তরটির বয়স মাত্র ২০ কোটি বছর।

চাঁদের পাথর ও মাটির রাসায়নিক বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, চাঁদ ও পৃথিবীর রাসায়নিক গঠন অভিন্ন তাই পরস্পর থেকে অনেক দূরে থেকে তাদের জন্ম হয়েছে এমনটা না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

১৯৭৫ সালে এক নতুন তত্ত্ব হাজির করা হয়, যা বেশ নাটকীয়। এটা হলো অভিঘাত তত্ত্ব। এই তত্ত্বের জনক দুই আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানীÑ ইউনিয়াম হার্টম্যান ও ডোনাল্ড ডেভিস। এই তত্ত্ব অনুযায়ী এক মস্ত অভিঘাতে পৃথিবীর বহিঃস্তরের একাংশ ছিটকে বেরিয়ে প্রথমে এক বিশাল গলিত বলে এবং পরে তা জমে গিয়ে চাঁদে পরিণত হয়।

তাঁরা বলেন, সাড়ে চার শ’ কোটি বছর আগে যখন সৌরজগত গঠিত হচ্ছিল সে সময় সব ধরনের শিলা বা পাথর শোঁ শোঁ করে চারদিকে ছুটে বেড়াচ্ছিল। এগুলোর একটি পৃথিবীতে আঘাত হেনেছিল। নিঃসন্দেহে সেটা ছিল এক বিশাল পাথর। প্রায় মঙ্গলগ্রহের সমান, যে মঙ্গলগ্রহের ভর পৃথিবীর ১০ ভাগের একভাগ। ওই পাথরটা এক কল্পিত গ্রহ, যার নাম তারা দিয়েছেন থেইয়া। এই গ্রহটি পৃথিবীর পাশ দিয়ে ছুটে খাওয়ার সময় এর গা ঘেঁষে বিশাল আঘাত হানে। এতে পৃথিবীর বাইরের স্তরের একাংশ ছিঠকে বেরিয়ে বিশাল গলিত গোলকে পরিণত হয়। ওটা পৃথিবীর আকাশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে উজ্জ্বল হয়ে জ্বলেছিল। পরে ধীরে ধীরে তা ঠা-া হয়ে জমে যায় এবং দূরে সরে যায়।

এই তত্ত্ব থেকে ব্যাখ্যা মিলতে পারে কেন চাঁদের লৌহকেন্দ্রের সাইজ পৃথিবীর লৌহকেন্দ্রের প্রায় অর্ধেক। থেইয়ার লৌহকেন্দ্র পৃথিবীর লৌহকেন্দ্রের ভেতরে মিশে গিয়েছিল। কাজেই চাঁদ খুব বেশি পায়নি। চাঁদে কেন এত কমসংখ্যক ‘উদ্বায়ু পদার্থ’ আছে যা সহজেই গ্যাসের আকারে উবে যেতে পারে তারও ব্যাখ্যা এই তত্ত্বে পাওয়া যাবে। ব্যাখ্যাটা হলো এই যে, সংঘর্ষের কারণে সৃষ্ট উত্তাপে অনেক উদ্বায়ু পদার্থ মহাশূন্যে উৎক্ষিপ্ত হয়েচিল। আরও একটা ব্যাখ্যা এ তত্ত্বে পাওয়া যাবে। সেটা হলো পৃথিবী ও থেইয়ার আপেক্ষিক আকার চাঁদের কক্ষ প্রদক্ষিণের গতির জন্য দায়ী হতে পারে।

সূত্র : সায়েন্স ডেইলি