২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্য শোকগাথা

  • রুখসানা কাজল

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ শরীরের আড়ালে, তাঁর কীর্তির মহত্ত্বে, অফুরন্ত প্রাণশক্তির আবেগে দাম্পত্য জীবনে কীর্তিমান স্বামীর অবিরাম অনুপস্থিতির কারণে অনেক সাদাসিধে সাধারণ নারীর মতো স্ত্রী রেণুর ছায়াশরীর হয়েই থাকার কথা ছিল হয়তবা। কিন্তু রেণু ছিলেন একজন অসম্ভব সাহসী মেয়ে। বাংলামায়ের নীরব সাহস, অসীম ধৈর্য এবং সহিষ্ণুতা তাকে অল্প বয়েস থেকেই অন্য রকম একজন মেয়ে হিসেবে গড়ে তুলেছিল। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে পিতৃমাতৃহীন এই মেয়েটি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে জেনেছিলেন, একদিন বাংলামায়ের মতো অসীম ভালবাসায় তাকে সাহস আর আশ্রয়ের কা-ারী হতে হবে এমন একজন ব্যক্তিত্বেও, যার কন্ঠস্বরে কেঁপে উঠবে সারা পৃথিবী। যার ছায়ার তরীতে একটি জাতি খুঁজে পাবে তাদের প্রিয় স্বাধীনতাকে। তিনি ছিলেন শেখ বাড়ির আদরের রেণু আর জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয়তম স্ত্রী আজন্মের অমনিবাস বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্ম হয় গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। তিনি শেখ মুজিবের নিকটাত্মীয় ছিলেন।

নিতান্ত বালিকা বয়সে ১৯৩৮ সালে শেখ মুজিবের সঙ্গে রেণুর বিয়ে হয়। সেই সময়েই মুজিব ছিলেন নিজ গ্রাম এবং আশপাশের অনেকের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। দশ গ্রামের মানুষ শেখ মুজিবকে এক নামে চিনত তার সমাজকল্যাণমূলক কাজের জন্য। বালিকা স্ত্রী রেণুর কাছে তরুণ স্বামীর এই লোকপ্রিয়তা এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিল। তিনি তখনই বুঝেছিলেন, তাঁর স্বামী কেবলমাত্র তার একান্ত নিজের মানুষ হতে জন্মগ্রহণ করেননি। তিনি দেশের আপামর বাঙালী জনগণের নেতা হতে এই পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছেন। ১৯৪৬ সালের ভয়াবহ দাঙ্গায় রাজনৈতিক হাইকমান্ড থেকে শেখ মুজিবকে যখন স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব নিতে নিতে বলা হয়, বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব তখন সন্তানসম্ভবা ছিলেন। শেখ মুজিব সব জানিয়ে চিঠি লিখলেন প্রিয়তমা স্ত্রীকে। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রেণু স্বামীকে কাছে পাওয়ার ইচ্ছা ত্যাগ করে অজগ্র উৎসাহ দিয়ে লিখেছিলেনÑ ‘আপনি শুধু আমার স্বামী হওয়ার জন্য জন্ম নেননি, দেশের কাজ করার জন্যও জন্ম নিয়েছেন। দেশের কাজই আপনার সবচাইতে বড় কাজ। আপনি নিশ্চিন্ত মনে আপনার কাজে যান। আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আল্লাহর উপরে আমার ভার ছেড়ে দিন।’ অর্থাৎ সেই বয়সেই বেগম মুজিব কতটা ধীশক্তির অধিকারী ছিলেন বলে একান্ত স্বাপ্নিক ও আবেগাপ্লুত সময়েও তিনি স্বামীর রাজনৈতিক কর্মের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। তিনি স্বামীর একজন বিশ্বস্ত রাজনৈতিক বন্ধু হিসেবে যেমন ছিলেন তেমনি ছিলেন, একজন আদর্শ মা। বঙ্গবন্ধুর জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে এক জেল থেকে অন্য জেলে। বেগম মুজিব শক্ত হাতে তাদের শিশু সন্তানদের লেখাপড়া, তাদের বড় করে তোলার কাজ একা সামলেছেন। সেই সময় একজন রাজনৈতিক বন্দীর ছেলেমেয়েদের নিয়ে একাকী একজন নারীর লড়াই কম যন্ত্রণাদায়ক নয়। বিশেষত যে শিশুরা তাদের পিতাকে ভাল করে কখনও চোখেই দেখেনি, তাদের সঠিকভাবে শিক্ষাদানের কাজটি একেবারে সহজ ছিল না। পিতাকে কাছে পেতে সন্তানের মনের ভেতর আকাক্সক্ষা থেকেই থাকে। শেখ কামাল একবার শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন, বুবু আমি তোমার আব্বাকে একবার আব্বা বলে ডাকি? এইরকম পিতার স্নেহ বুভক্ষু শিশুসন্তান নিয়ে অত্যন্ত সাধারণভাবে সংসার করেছেন; আবার বন্দী স্বামীর মুক্তির জন্য ছুটে বেড়িয়েছেন। বেগম সাজেদা চৌধুরী শেখ পরিবারের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত এক সভায় তিনি বলেছিলেন, একবার শেখ মুজিবের মামলা পরিচালনার প্রয়োজনে বেগম মুজিব সারাদিন ঘুরে ঘুরে অভুক্ত থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। এরকম কতভাবে কাজ করে যে তিনি বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী থেকে সহযোগী কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন, তার সীমা নেই। স্বামীকে ছাপিয়ে তিনি কখনও নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করেননি। অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনের অধিকারী এই নারী ইচ্ছা করলে শত্রুপক্ষের সঙ্গে আপোস করে কত রকমের সুবিধা নিতে পারতেন বা স্বামীকে লোভের ফাঁদে আনার প্রলোভন দেখাতে পারতেন! কিম্বা বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী হিসেবে আলাদা চ্যানেল করে ক্ষমতালোভী হয়ে উঠতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এখানেই বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের মহত্ত্ব।

অতি সাধারণ নারী ছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা, যাকে দেখলে মা বলে ডাকতে সাধ হয়। এই মহীয়সী নারী ছিলেন সচ্ছল পরিবারের সন্তান। কতবার তিনি গোপনে বঙ্গবন্ধুর হাতে টাকা তুলে দিয়েছেন। অথচ এই টাকা দিয়ে তিনি দামী শাড়ি কিনতে পারতেন, গয়না বা অন্যভাবে খরচ করতে পারতেন। কিন্তু না, তিনি ভোগের পথে যাননি। একটু একটু করে টাকা জমিয়ে রাখতেন। কারণ, তিনি জানতেন তার স্বামী জনগণের কল্যাণে মুক্তহস্তের পথে নেমেছেন। মনে মনে তিনিও ছিলেন স্বামীর অনুগামী।

রাশভারি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শেখ মুজিবকে বলেছিলেন, গঁলরন, ংযব রং ধ াবৎু ঢ়ৎবপরড়ঁং মরভঃ ঃড় ুড়ঁ ভৎড়স এড়ফ. উড়হ’ঃ হবমষবপঃ যবৎ ঢ়ষবধংব. বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনীতে বার বার স্ত্রীর মহত্ত্বের কথা, ঋণের কথা, একাকী জীবনের কষ্টকে ভুলে স্বামীর আদর্শে বিশ্বাস রেখে অভিযোগহীনভাবে অনলস কাজ করে যাওয়াতে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। একজন শেখ ফজিলাতুন্নেছা রেণু মানেই বঙ্গবন্ধুর অটুট আশ্রয়। তিনি রাজনীতিতেও প্রাজ্ঞ ধীবুদ্ধির অধিকারী ছিলেন। ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জন বাঙালী নৌ এবং সেনাবাহিনীর সদস্যসহ উচ্চপদস্থ অফিসারদের বিরুদ্ধে আগরতলা যড়যন্ত্র মামলা নামে একটি দেশদ্রোহী মামলা হয়। এ মামলার গতি প্রকৃতি তীক্ষèভাবে লক্ষ্য করে তিনি শেখ মুজিবকে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে লাহোরে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিতে জোর বারণ করেন। কেননা শেখ মুজিবসহ অন্যান্যদের মুক্তির দাবিতে দেশ তখন উত্তাল। তিনি বুঝেছিলেন, জনগণের দাবির মুখে পাকিস্তানী সামরিক সরকার এই মিথ্যা মামলা তুলে নিয়ে তাদের নিঃশর্ত মুক্তি দিতে বাধ্য হবে। বেগম মুজিবের এই দূরদৃষ্টির সাফল্য অচিরেই ফল লাভ করে। প্রবল গণঅভ্যুত্থানের চাপে শেখ মুজিবসহ অন্যরা মুক্ত হন এবং বঙ্গবন্ধু উপাধি পেয়ে শেখ মুজিব বাংলার জনগণের নয়নের মণিতে পরিণত হন।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় অজানা জায়গায়। তিনি বেঁচে আছেন কিনাÑ সে খবর তখন কেউ জানে না। দুই পুত্রসন্তান শেখ কামাল এবং শেখ জামাল মুক্তিযুদ্ধে। বেগম মুজিব অন্তঃসত্ত্বা বড় মেয়ে শেখ হাসিনা এবং ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে ছিলেন শত্রুর মুখে । নানারকম মানসিক নির্যাতন সহ্য করেছেন যুদ্ধের দিনগুলোতে। তবুও তিনি ধৈর্যহারা হননি। অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে এসব কঠিন অনিশ্চিত দিন পার করেছেন। স্বাধীন দেশে একজন ক্ষমতাশীল ব্যক্তির স্ত্রী হয়েও বেগম মুজিব খুব সাধারণ মানুষের মতোই জীবন কাটিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বেগম মুজিবের সহজ সরল ব্যবহার এবং স্বামীর প্রতি অপরিসীম যতœ ও খেয়াল দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সংসার সমুদ্রে তিনি ছিলেন ছেলেমেয়েদের সহায় । একটু একটু করে তিনি টাকা জমিয়েছিলেন ছেলেমেয়েদের বিয়ের জন্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে অতিপরিচিতজনদের হাতে এই মহীয়সী নারী স্বামী, পুত্র, পুত্রবধূদের সঙ্গে নিহত হন। মৃত্যুর মুখে তিনি তাঁর স্বামীকে একা ছেড়ে দেননি। সেদিন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালীর রক্তের সঙ্গে অতি সাধারণ অথচ বিচক্ষণ এই নারীর রক্তেও রঞ্জিত হয়েছিল সোনার বাংলা।

বেগম ফজিলাতুন্নেছা রেণু মুজিবকে তাই সমগ্র বাঙালী জাতির পক্ষ থেকে ধন্যবাদ দিতেই হবে। এই নারীর সহিষ্ণুতার ফলে আমরা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালীকে পেয়েছি। কেবল তাই নয়, তিনি একজন রতœগর্ভা মা। বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ বেগম ফজিলাতুন্নেছার জ্যেষ্ঠ কন্যা। মায়ের সহিষ্ণুতা, বিচক্ষণতা এবং পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা গ্রহণের তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা, পিতার অদম্য সাহস, অতুলনীয় যুক্তিসম্পন্ন সরস বাগ্মীতার গুণ সংমিশ্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে বিশ্বের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের নজর কেড়েছেন। আকাশচুম্বী যড়যন্ত্রের শিকার হয়ে পিতামাতার মৃত্যুযন্ত্রণাকে বুকে নিয়ে অত্যন্ত ধৈর্য এবং সাহসের সঙ্গে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। কিছুদিন আগে আফ্রিকা সফরে গিয়ে বিশ্বের সর্বাধিক শক্তিধর ক্ষমতাসীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা উন্নয়নের মডেল হিসেবে বাংলাদেশের উদাহরণ তুলে ধরেছেন। বেগম ফজিলাতুন্নেছার তৃতীয় প্রজন্মও শিক্ষা, গবেষণা, রাজনীতিতে দেশে-বিদেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করে চলেছে।

আগস্ট মাস বাঙালীর ইতিহাসে এক শোকের মাস। এই মাসে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিষ্ঠুর হত্যাকা-ের মাধ্যমে বিশ্বাসঘাতকদের চেহারা উন্মোচিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর আজন্মের সাথী রেণু প্রাণের চেয়ে অধিক প্রিয় স্বামীকে বিশ্বাস ঘাতকদের হাতে একা মৃত্যুবরণ করতে দেননি। তিনিও গুলির সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন। স্বামী, তিন পুত্র, দুই পুত্রবধূসহ আগস্টের ১৫ তারিখে বেগম ফজিলাতুন্নেছা রেণু মুজিব খুন হয়েছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে রইলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা রেণু মুজিব। তিনি বাঙালীর মনের অঙ্গনে এক সর্বংসহা মাতৃমূর্তি, আশ্রয়ের অভয়স্থল আর প্রেরণাদাত্রী নারী হিসেবে চির স্মরণে থাকবেন। ৮৫তম জন্মদিন আর অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু দিনে আমরা বঙ্গমাতাকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।