১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থলে কিছুক্ষণ

  • সাদিয়া তাবাস্সুম বৃষ্টি

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি দেখার ইচ্ছে ছিল বহুদিনের। কিন্তু নানা কারণে তা হয়ে উঠেনি। এবার ঈদের ছুটিতে সুযোগ এসে গেল। মা, ইংল্যান্ড প্রবাসী ছোট মামা, মামাত বোন বিদ্রোহী, মেঝ মামা, মামাত ভাই রাফেল, তাউস ও আমার ভাগ্নে নাহিয়ান মনের তীব্র বাসনা পূরণে ফরিদপুর থেকে বাসে চড়ে বসেছিলাম টুঙ্গিপাড়ার উদ্দেশ্যে। পথে যেতে যেতে যে যার মতো করে যাত্রাপথকে উপভোগ করছিলাম। কখনও গান শুনে, কখনও বাইরের প্রকৃতিকে উপভোগ করে। কানে ভেসে আসছিল সেই সুরÑ ‘যদি রাত পোহালেই শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই, তবে বিশ্ব পেত এক মহান নেতা, আমরা পেতাম ফিরে জাতির পিতা’। ঘণ্টা দুইয়ের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম কাঙ্খিত গন্তব্যে।

গাড়ি থেকে নেমে গেট দিয়ে প্রবেশ করলাম বাড়ির ভেতরে। বাইরে থেকে দেখলে যেমন রাজকীয় মনে হয়, ভেতরে প্রবেশের পর চিত্রটি পুরো ভিন্ন মনে হলো। যেন পুরো ছায়া সুনিবিড় একটি গ্রাম। যেদিকে তাকানো যায় শুধু গাছ আর গাছ। তার পাশে পুকুরের পানি। অসংখ্য গাছপালা ঢেকে রেখেছে পুরো বাড়িটিকে। ভেতরের দিকে যতই প্রবেশ করছি, ততই অবাক হচ্ছি। কিছুদূর এগোনোর পর অনেকটা জলঝিরির মতো একটা ঝর্ণা চোখে পড়ল। চারদিকের সবুজের মাঝে সেই ঝর্ণাটি যেন বাড়ির সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। কী সাধারণ একটি স্থানেই জন্ম নিয়েছিলেন অবিস্মরণীয় কিংবদন্তি মহান নেতা বাঙালীর জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। বাড়িটির প্রতিটি ঘাস, বালুকনা, গাছপালা যেন সেই মহান মানুষের স্মৃতি চিহ্নকে বহন করে চলেছে। পুরো বাড়িটির বাতাসের সঙ্গেই যেন মিশে আছে জাতির পিতার মায়াভরা গন্ধ। তাই হয়তো প্রতিটা মুহুর্তই এক স্নিগ্ধ অনুভূতি মনের ভেতর স্পর্শ করছিল। প্রবেশ করলাম মহান নেতার সমাধিকক্ষে। প্রাচীরঘেরা সমাধিটিকে অনেকটা সময় ধরে দেখলাম। আর মন থেকে বার বার একটি কথাই নীরবে উচ্চারিত হলো, আমি গর্বিত আমি এ দেশের সন্তান, আমি গর্বিত আমি বাঙালী। আমি গর্বিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের জাতির পিতা। অথচ একদল পথভ্রষ্ট নরপিশাচ আমাদের মহান নেতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। হত্যা করেছে বাঙ্গালীর গর্বকে। কিন্তু আসলেই কী জাতির পিতা মৃত। না, তিনি আছেন আমাদের অন্তরে। তাঁর পৈতৃক বাড়িতেই লেখা আছে সে কথাটি।

‘যতদিন রবে পদ্মা, মেঘনা, গৌরি, যমুনা, বহমান’

‘ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান’।

দেখলাম হাতে আঁকা জাতির পিতার একটি ছবি। শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে গেল। গর্বে বুক ভরে ওঠল। তাঁর বাসভবনটিতে ঢোকার কোন সুযোগ না থাকায় বাইরে থেকেই তাঁর জীবনের অনেক ছবি খুব মনোযোগ দিয়ে দেখলাম। সাজানো-গোছানো একটি বাগানের মতো ছিল তাঁর পরিবার। ছবিগুলো দেখে এমনটিই মনে হলো। সকলে মিলে মহান নেতার ছবিটির সামনে দাঁড়িয়ে রইলাম অনেকক্ষণ। সেখানে থেকে সামনের দিকে খানিকটা এগিয়ে চোখে পড়ল একটি নৌকা। প্রায় ঘণ্টাখানেক কেটে গেছে এরই মধ্যে। আমাদের মতো আরো অনেকেই এই বাড়িটিতে এসেছেন জাতির পিতার সমাধি দেখতে। কিন্তু কোথাও কোনও শব্দ নেই। খুব শান্ত, সুনসান পরিবেশ। নেই কোন কোলাহল। আসলে এখানে এলে সবাই শোকে মূহ্যমান হয়ে যায়।

ফিরে যেতে যেতে অনেকবার ফিরে তাকিয়েছি পেছনের দিকে। অল্প বয়সেই আমি অনেক জায়গা ঘুরেছি। তবে দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করতে পারি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর এই শ্যামল ছায়াঘেরা বাড়িতে আছে এক অন্যরকম মায়া। যে মায়া আর কোন স্থান দর্শনের পর আমি অনুভব করিনি। হয়ত এর অন্তরালের কারণটিকে কেবল অনুভব করা যায়, বাক্যে বা কথায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধুর সমাধিস্থল যেন একটুকরো বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।