১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্যারিসের পথে পথে-২

  • ফকির আলমগীর

এবার প্যারিসে আমি শিল্পীদের স্বর্গ বলে খ্যাত মমার্ত এর কাছেই ছিলাম। গানের শূটিং করা থেকে শুরু করে বারবার ছুটে গেছি সেখানে, হাজারও পর্যটকদের ভিড়ে মিশে যেতে ভাল লেগেছে। ঐতিহাসিক মমার্ত পর্যটকদের কাছে ভীষণ আকর্ষণীয়, পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত মমার্তের ওপরে, সামনে, সিঁড়িতে অসংখ্য পর্র্যটকের ভিড় এখানে সব সময়ই দেখেছি, ছবি তুলেছি। এখান থেকে শহরের অনেকটা চোখে পড়ে। অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মমার্তকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

প্যারিসে ‘মমার্ত’ আর প্লাস পিগাল্ এর মাঝখানে যতসব ‘নাইটক্লাব’, পিপ শো লাইভ শো, সেক্স শপ গড়ে উঠেছে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য। এরকম এলাকা লন্ডন, হামবুর্গ, আমস্টারডামসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় শহরে রয়েছে। তবে প্যারিসে ঘুরে একটা শিক্ষা হলো। ওই সব পিপ শো, লাইভ শোতে কিন্তু সবাই দলে দলে ছুটে যায় না। যতটা বিশ্ববিখ্যাত ‘মোলারোস’ শোতে দীর্ঘ লাইন দিয়ে প্রতিদিন শিল্পসম্মত শো দেখতে পর্যটকরা ভিড় করেন। এর চেয়ে বেশি কফি শপে ভিড় আর প্যারিসের যে কোন আর্ট গ্যালারির সামনে প্রতিদিনই লম্বা লাইন থাকে। সবখানে ফরাসী ভাষার প্রচলন, খাওয়া দাওয়ার ক্ষেত্রেও ইউরোপীয় রেসিপি বেশি চলে। সালাদের চাহিদা বেশি। ফরাসীরা বাঙালীর মতোই আড্ডাবাজ, রসিক। বাগেত রুটি ছাড়াও সেখানে নানা ধরনের রুটি পাওয়া যায়। ফরাসীদের জনপ্রিয় ডিশ হলো রোস্টকরা বিফ, যার নাম স্টেক এবং ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। প্যারিসের রুটিরও একটি মিউজিয়াম আছে।

প্যারিসের দর্শনীয় স্থান গুনে শেষ করা যাবে না। সিন নদীর তীরে রয়েছে নোটরডেম ক্যাথিড্র্যাল, যা প্যারিসের প্রধান আকর্ষণ। রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত আইফেল টাওয়ার, নেপোলিয়ানের তৈরি আর্ক-দে ট্রায়াস্ফদে এল এতোইলি নামের বিখ্যাত বিজয় তোরণ, রয়েছে লুক্সেমবার্গ প্রসাদ, তলেরিস প্রসাদের উদ্যান, ল্যুভর মিউজিয়াম, মমার্তের মতো শিল্পীদের আড্ডাস্থল পথের পাশে অসংখ্য কাফে, লং চ্যাম্প কোর্সের মতো বিখ্যাত ঘোড়দৌড়ের মাঠ।

সেইন নদীতে প্রমোদতরী করে বেড়ানো আর দু’পাশের প্যারিসের নান্দনিক সৌন্দর্য দেখার ইচ্ছে ছিল বহুকালের। দেশ থেকে পৃথিবীর অনেক জার্নালে এই ভ্রমণের কথা জেনেছি। আশা করছি ভবিষ্যতে প্যারিস সফরে অবশ্যই প্রমোদতরীতে ঘুরে বেড়াব। যারা প্যারিস থেকে দূরে থাকেন তারা নিজেদের গাড়ি করেই সপরিবারে চলে যান পিকনিকে। সবাইকেই রান্না করে অথবা রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার নিয়ে যেতে হয়। তবে সব আয়োজনেই থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আকর্ষণ। হৈচৈ, আড্ডা, গান-বাজনা, খেলাধুলা প্রতিযোগিতা, পুরস্কারের মধ্যে দিয়ে ফিরে পেতে চান সোনালী অতীতকে। প্যারিসে প্রচুর বিদেশী শ্রমিক রয়েছেন, এদের মধ্যে কালো ও আরবরা প্রধান। আরেকটি মজার ব্যাপার হচ্ছেÑ প্যারিসের রাস্তায় সবাই সবার কাছ থেকে সিগারেট চেয়ে খায়। প্যারিসের রাতের জগতের জন্য বিখ্যাত হচ্ছে ১৮নং আরোদিসাস অঞ্চল। এখানে রয়েছে অসংখ্য সিনে ক্লাব। ইউরোপে সাইক্লিং করা যেমন নিরাপদ, তেমনি মজার। ফরাসীরা সাইক্লিং খুবই পছন্দ করে। সাইক্লিংয়ের উৎপত্তি হয়েছে ফ্রান্স থেকেই। প্যারিসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে পাতাল রেল। এতে না চড়লে প্যারিস ভ্রমনই বৃথা। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত পাতাল রেলের যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে জাপান ও প্যারিসে। বড় বড় অট্টালিকা আর স্থাপত্য শিল্প প্যারিসকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সে কারণেই প্যারিসে অবস্থান করছে বিভিন্ন দেশের নামী-দামী কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরা। এ যেন মহাগুণীদের মিলনকেন্দ্র। প্যারিসের আঞ্চলিক নাম প্যারি। আজ থেকে ২০০০ বছর আগের কথাÑ খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকের মাঝামাঝি উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের ওই অঞ্চলে প্যারিসি নামের গণউপজাতীদের একটি ছোট্ট গ্রাম গড়ে ওঠে। তারও দু’শতক পর রোমানদের অধিকারে আসে এ অঞ্চল। সম্রাট জুলিয়াস সিজারের আদেশানুযায়ী এখানে গড়ে ওঠে নিউটেশিয়া নামের একটি রোমান উপনিবেশ। শহরটি জার্মান আক্রমণকারীদের হাতে ধ্বংস হয় তৃতীয় খ্রিস্টাব্দের গোড়ায়; কিন্তু আবার মানুষ ফিরে আসতে থাকে। নিউটেশিয়ার নাম পরিবর্তিত হয়ে পারিসি নামানুসারে নাম হয় প্যারিস। সেই প্যারিসই আজ সারা পৃথিবীর শিল্পীদের তীর্থ। এত পর্যটক সারা দুনিয়া থেকে এখানে এসে ভিড় করেন আলাদা এক আকর্ষণে।

নভেরা নেভার নয়, তিনি শিল্পে প্রজ্বলিত থাকবেন চিরকাল। তিনি ছিলেন বাঙালী জাতির অহঙ্কার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অন্যতম রূপকার। প্রায় সাড়ে চার দশক তিনি ছিলেন স্বেচ্ছা নির্বাসনে। এক ধরনের রহস্যের আবরণে তিনি নিজেকে লুকিয়ে ছিলেন, শিল্পচর্চা ত্যাগ করেননি। গেল ৬ মে তার মৃত্যু সংবাদ প্যারিস থেকে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ার পর তার ভক্ত অনুরাগী সবাই যে কথাটি বললেন, তা হচ্ছে নভেরা মরিয়া প্রমাণ করলেন যে, তিনি এতদিন জীবিত ছিলেন। একজন ভক্ত হিসেবে তাই এবার প্যারিস সফরের পরিকল্পনা ছিল নভেরার স্মৃতিবিজড়িত গ্রামটি প্যারিসে এসেই নভেরার স্মৃতিবিজড়িত শন পামেল গ্রামে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করে সাংবাদিক ওয়াহিদুল, শিল্পী শাহাবুদ্দিন, তার স্ত্রী আনা ইসলাম, মূকাভিনেতা পার্থ প্রতিম মজুমদারের সঙ্গে কথা হয়। অবশেষে ১১ জুন দুপরে বন্ধু কাজী এনায়েত উল্লাহ, কামাল, দ্বীপসহ প্যারিস থেকে ৬৭ কি.মি দূরে শন পামেল গ্রামে নভেরার বাড়ির উদ্দেশে রওনা হই। বাড়ির কাছেই করবস্থান। প্রথমেই কবরে পূষ্পার্ঘ অর্পন করে, সাংবাদিক দ্বীপের ক্যামেরায় ড. তপন বাগচীর লেখা আমার সুরে নভেরার স্মরণে একটি গানের চিত্রায়ন করি। ফেরার পথে জঙ্গল আচ্ছাদিত নভেরার বহু বছরের স্মৃতি ঘেরা বাড়িটি পরিদর্শন করি। কলিং বেল বাজাতেই নভেরার স্বামী গ্রেগোয়া দ্য ব্রন্স আমাদের স্বাগত জানান। সুদূর বাংলাদেশ থেকে এসে শিল্পী সমাজের পক্ষ থেকে তার কবরে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর জন্য আমাদের ধন্যবাদ জানান। খুশি হয়ে আমাকে নভেরার একটি ক্যাটালগ দিয়ে তাতে লিখে দিলেন, ঞড় ঋধশরৎ অষধসমরৎ, ঞযধহশ ুড়ঁ ভড়ৎ ঃযব ভষড়বিৎং ভড়ৎ ঃযব ভষড়বিৎং ভড়ৎ ঘড়াবৎধ. আমিও গ্রেগোয়াকে আমার লেখা বই উপহার দেই, একত্রে ছবি তুলি। তারপর প্যারিসের অভিমুখে যাত্রা।

পেছনে পড়ে থাকল আমাদের বাঙালীর অহঙ্কার, চির অভিমানী ভাস্কর নভেরার স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি আর পাহাড়, সবুজে ঘেরা কবরস্থান। নির্জন ছোট্ট শহর পেরিয়ে আমরা যখন প্যারিসের পথে ফিরছিলাম তখন বার বার মনে পড়ছিল তপন বাগচীর গানের সেই চরণ, ‘নভেরা মানেই প্রিয় ভাস্কর সার্থক নির্মাতা, নভেরা মানেই শিল্পকলার আধুনিক উদ্গাতা, নভেরা মানেই জাতীয় শহীদ মিনারের রূপকার, নভেরা মানেই বিশ্ব বাঙালীর সবার অহঙ্কার, নভেরা মানেই চোখের সামনে শিল্পের প্রিয় খাতা’ নভেরা মানেই অভিমানী মেয়ে প্রবাসে লুকিয়ে থাকা, নভেরা মানেই শান্ত সুবোধ মায়ের আদর মাখা, নভেরা মানেই প্যারিসের পথে বাঙালী মাথার ছাতা।’ আমি অনুভব করছিলাম শিল্পের দূত নভেরার, অভিমান ত্যাগ, আমাদের কাছে নব গৌরবগাথা হয়ে থাকবে। তার রহস্যের কারণ উদ্ঘাটন করা গেলেও বলা যায় ভাষা শহীদের স্মরণে গড়া শহীদ মিনারের অন্যতম রূপকার হয়েও নভেরা আহমেদ স্বাধীনতা পূর্বকালে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। আপন কীর্তির এই অস্বীকৃতি তাকে করে তুলেছিল তীব্র অভিমানী। জীবদ্দশায় কিংবদন্তি হয়ে উঠতে পারেন কয়জন। তাকে নিয়ে জীবনী, গল্প, উপন্যাস রচিত হয়েছে। নির্মিত হয়েছে প্রামাণ্যচিত্র। শিল্পী জীবনের উন্মেষপর্বে ১৯৬১ সালে ভাস্কর হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন তিনি। পরে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। নভেরার প্রথম একক ভাস্কর প্রদর্শনী হয়েছিল ১৯৬০ সালে, কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে। ‘ইনার গেজ’ শিরোনামের ওই প্রদর্শনীটি কেবল নভেরারই, তৎকালীন সমগ্র পাকিস্তানেই ছিল কোন ভাস্করের প্রথম একক প্রদর্শনী। শিল্পস্রষ্টা হিসেবে নিঃসন্দেহে তিনি ছিলেন তার সময়ের থেকে অগ্রবর্র্র্তী।

পঞ্চাশ-ষাটের দশকের বাংলাদেশে একজন নারীর শিল্পী হয়ে ওঠা ছিল কঠিন ও সাহসী এক যাত্রা। সে সময়টায় নভেরা বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় এনে দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক মান। একে বিপ্লব বলাই সঙ্গত হবে। আমি লেখক নই, নভেরার একজন ভক্ত অনুরাগী হিসেবেই তার মৃত্যুর পর তাকে শ্রদ্ধা জানানোর তাগিদ থেকেই তার স্মৃতিবিজড়িত শন পামেল গ্রাম, বাড়ি পরিদর্শন করেছি। কবরে ফুলের শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করেছি। নির্বাচিত নিবন্ধ গ্রন্থটি তার স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করেছি। তাকে নিবেদন করে গান গেয়েছি। আমরা কেউ তাকে না চিনলেও শিল্পের অন্তমিল আমাকে তাঁর কাছে টেনে নিয়েছে। সবশেষে অসাধারণ ভাস্করের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা। (চলবে)