১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নিলয় হত্যাকাণ্ডে জড়িত নাহিন ও রানা ৮ দিনের রিমান্ডে

  • খুলতে পারে অভিজিত হত্যার জট

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ব্লগার নিলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয় হত্যাকা-ে জড়িত সন্দেহে আটক সাদ আল নাহিন ও মাসুদ রানাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আট দিনের পুলিশী হেফাজতে পাঠিয়েছে আদালত। মাসুদ রানা ব্লগার রাজীব হত্যা মামলার একমাত্র পলাতক আসামি রেদোয়ানুল আজাদ রানা নয় বলে ডিবি সূত্রে জানা গেছে।

রানা ও নাহিন গ্রেফতারের পর ব্লগার নিলয় ছাড়াও লেখক অভিজিত রায় হত্যার রহস্য খুলে যেতে পারে। ব্লগার হত্যাকারীদের গ্রেফতারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিটি ইউনিট কাজ করছে। বেশকিছু খুনী গোয়েন্দাদের জালে রয়েছে। এর মধ্যে অভিজিত রায়ের হত্যাকারীও রয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

গত ৭ আগস্ট দুপুর দেড়টার দিকে রাজধানীর খিলগাঁও থানাধীন পূর্ব গোড়ানের ৮ নম্বর সড়কের ১৬৭ নম্বর পাঁচতলা বাড়ির পঞ্চম তলার নিজ বাসায় হত্যা করা হয় ব্লগার নিলয়কে। চার হত্যাকারী বাড়ি ভাড়ার ছলে বাসায় ঢুকে নিলয়কে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে হত্যা করে।

বৃহস্পতিবার রাতে উত্তরা থেকে নাহিনকে এবং মিরপুর থেকে রানাকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক শেখ মাহাবুবুর রহমান দুই আসামিকে আদালতে সোপর্দ করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। আমাদের কোর্ট রিপোর্টার জানান, ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মোল্লা সাইফুল ইসলাম আসামিদের ৮ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড আবেদনের শুনানিতে পুলিশ জানায়, নিলয় হত্যাকা-ে নাহিন ও রানার সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। অপর আসামিদের গ্রেফতারের জন্য নাহিন ও রানার রিমান্ড প্রয়োজন। নাহিন ও রানার পক্ষে শুনানিতে কোন আইনজীবী ছিলেন না। ফলে স্বাভাবিক কারণেই তাদের জামিনেরও কোন আবেদন আদালতে জমা পড়েনি। বিচারক আসামিদের কাছে তাদের কিছু বলার আছে কিনা জানতে চায়। আসামিরা ‘বলার কিছ্ইু নেই’ বলে আদালতকে জানায়।

নাহিন শ্র্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব) আব্দুল মতিনের ভাতিজা বলে নাহিনের পিতা নজরুল হক নান্নু জনকণ্ঠের কাছে দাবি করেন।

নিলয় হত্যার তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রিমান্ডে আসামিরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে। তাদের তথ্য মোতাবেক অপর আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। ব্লগার হত্যাকারীদের গ্রেফতারে মাঠে নেমেছে সব গোয়েন্দা সংস্থা। নাহিন সদ্য নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। ২০১৩ সালের ১৪ জানুয়ারি রাজধানীর উত্তরায় ব্লগার আফিস মহিউদ্দিনকে হত্যাচেষ্টায় নাহিন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছিল। ৬ মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে ছিল।

এদিকে নিলয় হত্যার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত মাসুদ রানাকে নিয়ে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। মাসুদ রানাই ব্লগার রাজীব হত্যা মামলার একমাত্র পলাতক আসামি রেদোয়ানুল আজাদ রানা কিনা সে বিষয়ে সন্দিহান তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্লগার ইঞ্জিনিয়ার আহমেদ রাজীব হায়দার শোভনকে রাজধানীর পল্লবীর পলাশনগরের নিজ বাড়ির সামনে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। ওই মামলায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ ছাত্র ও নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আধ্যাত্মিক নেতা মুফতি জসীমুদ্দিন রাহমানীকে আসামি করে আদালতে চার্জশীট দেয় ডিবি পুলিশ। চার্জশীট দাখিলকারী ডিবির পরিদর্শক নিবারণ চন্দ্র বর্মণ জনকণ্ঠকে বলেন, চার্জশীটভ’ক্ত আসামিদের মধ্যে ফেনী জেলার দাগনভূঁইয়া উপজেলার জয়লস্কর গ্রামের বাসিন্দা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রেদোয়ানুল আজাদ রানা (৩০) পলাতক। নিলয় হত্যা মামলায় গ্রেফতারকৃত রানা পলাতক রেদোয়ানুল আজাদ রানা নয়। তারপরও মাসুদ রানাই রেদোয়ানুল আজাদ রানা কিনা সে বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে।

গোয়েন্দা সংস্থার একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, রানা ও নাহিন গ্রেফতারের পর ব্লগার নিলয় ও অভিজিত রায় হত্যার জট খুলে যেতে পারে। নিলয় হত্যার সঙ্গে রানার জড়িত থাকার যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। তারা রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। সেই তথ্য মোতাবেক অভিযান চলছে। অচিরেই নিলয় ও অভিজিত রায় হত্যা রহস্যের জট খুলে যেতে পারে। প্রতিটি গোয়েন্দা সংস্থা ব্লগারদের হত্যাকারীদের গ্রেফতারে অভিযান চালাচ্ছে। ইতোমধ্যেই ব্লগার হত্যাকারীদের অনেকেই গোয়েন্দাদের জালের মধ্যে রয়েছে। গোয়েন্দা জালে থাকাদের মধ্যে অভিজিত হত্যার আসামিরাও রয়েছে বলে সূত্রটি বলছে।

এ ব্যাপারে ডিবির পূর্ব বিভাগের উপ-কমিশনার মাহবুবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, রানা ও নাহিনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। সেই তথ্য মোতাবেক অন্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে। রানা ও নাহিনকে জিজ্ঞাসাবাদে অনেক ব্লগার হত্যার রহস্যই উদঘাটিত হতে পারে বলেও তিনি জানান।

চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে লেখক অভিজিত রায়কে (৪০) দুই হত্যাকারী কুপিয়ে হত্যা করে। অভিজিত হত্যায় সহায়তা করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই)।

এছাড়া চলতি বছরের ৩০ মার্চ রাজধানীর রমনা মডেল থানাধীন হাতিরঝিল বেগুনবাড়িতে দিনের বেলায় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে কুপিয়ে হত্যা করে পালানোর সময় দুই মাদ্রাসার ছাত্র আরিফুল ইসলাম ও জিরুল্লাহ এবং পরে সাইফুল ইসলাম নামে আরেকজন গ্রেফতার হয়। আরও দুইজন পলাতক। গত ১২ মে সিলেটের সুবিদবাজারে চার মুখোশধারী ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশকে, গত বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শফিউল ইসলামকে একই কায়দায় হত্যা করা হয়। এ সব হত্যার দায় স্বীকার করে বিভিন্ন সংগঠন।

২০০৪ সালের ২৭ ফেরুয়ারি বইমেলা থেকে বের হওয়ার পথে টিএসসিতে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে লেখক হুমায়ুন আজাদ আহত করার পর মৃত্যু, ২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর ওয়ারী থানাধীন রামকৃষ্ণ (আর কে) মিশন রোডের বাড়িতে জবাই করে ইমাম মাহদীর প্রধান সেনাপতি ও বিশ্বত্রাণকর্তা দাবিদার লুৎফর রহমান ফারুক (৫৫) ও তার ছেলে সানোয়ারুল ইসলাম মনিরসহ (৩০) ৬ জনকে ও গত বছরের ২৭ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানাধীন পূর্ব রাজাবাজারের নিজ বাড়িতে বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল আই-এর শান্তির পথে ও কাফেলা নামক ইসলামী অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মাওলানা নুুরুল ইসলাম ফারুকীকে জবাই করে হত্যার ঘটনায় আজও কেউ দায় স্বীকার করেনি। কেউ গ্রেফতারও হয়নি।