২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্নের বাংলাদেশ

  • তোফায়েল আহমেদ

প্রতিবছর যখন আমাদের জীবনে আগস্ট মাস আসে তখন জাতির জনকের স্মৃতি আমাকে আন্দোলিত করে। হৃদয়ের গভীরে নিবিড়ভাবে দোলা দেয় ঐতিহাসিক সংগ্রামী ছবিগুলো। প্রতিদিন প্রত্যুষে বাড়ির দেয়ালে শোভিত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছবিগুলো দর্শনের মধ্যদিয়ে দিনের কাজ শুরু করি। কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার প্রাক্কালে স্মৃতিমধুর ছবিগুলো দেখে যাই। বঙ্গবন্ধু আমার জীবনে চলার পথের প্রেরণা। যে স্নেহ-ভালোবাসা-আদর আমি বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে পেয়েছি তাতে আমার জীবন ধন্য। পরিচয় হওয়ার পর থেকেই পরমাদরে বঙ্গবন্ধু আমায় কাছে টেনে নিয়েছেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পরম মমতায় নিজের কাছেই রেখেছেন। বিশেষ করে ’৬৯-এ গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে আমরা যখন বঙ্গবন্ধুকে কারাগার থেকে মুক্ত করে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সংবর্ধনা দিয়ে কৃতজ্ঞ জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলাম, সেই দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর পাশে ছিলাম।

’৬৯-এর পর থেকে বঙ্গবন্ধু যত রাজনৈতিক সফর করেছেন আমি তাঁর সফরসঙ্গী হয়েছি। মনে পড়ে ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনের আগে ভোলাসহ দেশের উপকূলীয় অঞ্চল ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়েছিল। লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে বঙ্গবন্ধু ছুটে গিয়েছিলেন। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখে সেদিন বঙ্গবন্ধু ভেঙ্গে পড়েছিলেন। অশ্রুসজল চোখে সেদিন বলেছিলেন, আমাকে এখান থেকে নিয়ে চল্। আমি আর পারি না। ভোলা থেকে ফিরেÑআজকে যেটা বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় তখন ছিল শাহবাগ হোটেল সেখানে প্রায় দুই শতাধিক সাংবাদিকের উপস্থিতিতে দৃঢ় প্রত্যয়ে বলেছিলেন, ‘প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়, আর আমরা এভাবে মরতে চাই না। আমরা বাঙালীরা বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা হতে চাই।’

এরপর আসে ’৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচন। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু আমাকে মাত্র ২৭ বছর বয়সে জাতীয় পরিষদে মনোনয়ন দিয়ে নির্বাচিত করেন। উপকূলীয় অঞ্চলে দুর্যোগের কারণে পিছিয়ে দেয়া সময় অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৭ জানুয়ারি ’৭১-এ, আর সারাদেশে ৭ ডিসেম্বর ’৭০-এ। এই পুরো সময়টা সারাবাংলায় ছিল নির্বাচনী উৎসব। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সেদিন ভোটাধিকার প্রয়োগে বাঙালী জাতি উৎসবে মেতেছিল। নির্বাচনী প্রচারাভিযানে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকার আনাচে-কানাচে সফর করেছিলেন। আমি ছিলাম বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী। বাসে-ট্রেনে-স্টিমারে এক সঙ্গে গিয়েছি একই কামরায় থেকেছি। প্রতিটি জনসভায় বঙ্গবন্ধুর আগে বক্তৃতা করেছি। এক জনসভায় বক্তৃতা করে আরেক জনসভায় ছুটেছি। জনসভার শৃঙ্খলা, মঞ্চ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ের দেখভাল ও স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি। পরে বঙ্গবন্ধু এসেছেন, বক্তৃতা করেছেন। একদিনে ৮-১০টি করে জনসভা, পথসভা। দিন শেষে সন্ধ্যা নামলে চারদিক অন্ধকার, এর মধ্যে লোকজন লণ্ঠন হাতে দাঁড়িয়ে থাকত শুধু বঙ্গবন্ধুকে একনজর দেখবে বলে। মনে পড়ে কুড়িগ্রাম গিয়েছি। রাস্তা নেই, পুল নেই, গাড়ি নেই, কিছুই নেই। এমন কি বহু জায়গায় পায়ে চলার পথও নেই। ক্ষেতের আইল দিয়ে হাঁটা পথ। কোথাও হেঁটে, কোথাও বা গরুর গাড়িতে। নাগেশ্বরী, রৌমারী, চিলমারী, ভুরুঙ্গামারী, বুড়িমারীসহ কুড়িগ্রামের প্রতিটি থানায় তিনি জনসভা করেছেন। আমরা হেঁটে আর বঙ্গবন্ধু গরুর গাড়িতে। স্বচক্ষে দেখেছি লাখ মানুষের জনস্রোত। মানুষকে জিজ্ঞাসা করেছি কোথায় যাচ্ছেন? দৃপ্ত কণ্ঠে মানুষজন উত্তর দিয়েছে ‘কেন মিটিংয়ে যাচ্ছি!’ আবার প্রশ্ন করেছি কার মিটিংয়ে? আওয়ামী লীগের? ততোধিক বলিষ্ঠ উত্তর ‘নাহ্’। তবে কার মিটিংয়ে যাচ্ছেন? ‘মুজিবরের মিটিংয়ে যাচ্ছি, শেখ মুজিবের মিটিংয়ে যাচ্ছি।’ বাংলার মানুষের হিমালয় সমান আস্থা আর বিশ্বাস ছিল বঙ্গবন্ধুর প্রতি। বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু দুটো কথা বলতেন। এক, ‘ভায়েরা আমার, আমি যদি আপনাদের জন্য আমার জীবনের যৌবন পাকিস্তানের কারাগারে কাটাতে পারি, আমি যদি ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারি। আমি কী আপনাদের কাছে একটি ভোট চাইতে পারি না।’ এই দুই কথায় মানুষের চোখের পানি পড়ত এবং দু’হাত তুলে সমস্বরে বলত, ‘হ্যাঁ আপনি আমাদের কাছে ভোট চাইতে পারেন।’ ’৭০-এর নির্বাচনে বাংলার মানুষ প্রতিশ্রুতি রেখেছিল। বঙ্গবন্ধু মুজিবকে ভোট দিয়েছিল। নির্বাচনের দিনেও আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলাম। নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে বিদেশী সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনার প্রত্যাশা কী, কয়টি আসনে জয়ী হবেন?’ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন ‘আমি বিস্মিত হবো, যদি আমি দুটো আসনে পরাজিত হই।’ ১৬৯টি আসনের মধ্যে তিনি ১৬৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছিলেন। মাত্র দু’টি আসনে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন। একটি ময়মনসিংহের নান্দাইল নুরুল আমিনের এবং অপরটি পার্বত্য চট্টগ্রাম রাজা ত্রিদিব রায়ের নির্বাচনী এলাকা। ময়মনসিংহের নান্দাইলে আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গিয়েছিলাম। বিশাল জনসভা। মানুষের মনোভাব তিনি হৃদয়ের গভীরতা দিয়ে উপলব্ধি করতেন। সেদিন বক্তৃতা শেষে গাড়িতে উঠেই বলেছিলেন, ‘এই আসন পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই। লোকজন এসেছে শুধু আমাকে দেখতে।’ বঙ্গবন্ধু যখন আইয়ুব খানের গোলটেবিল বৈঠকে গিয়েছিলেন তখন বঙ্গবন্ধুকে নুরুল আমিন সমর্থন দিয়েছিলেন। গোলটেবিল বৈঠক থেকে ফিরে বঙ্গবন্ধু আমাদের বলেছিলেন, ‘দুইজন আমাকে সমর্থন করেছিল। একজন প্রফেসর মুজাফফর আহমেদ এবং অপরজন নুরুল আমিন।’ বঙ্গবন্ধুকে যে রাজনীতির কবি বলা হয়, তা সর্বাংশে সত্যি। তিনি আসলেই ‘রাজনীতির কবি’ ছিলেন। মানুষের মনোভাব তথা জনসাধারণের নাড়ির স্পন্দন তিনি বুঝতেন।

আগরতলা মামলার অন্যতম আসামি জাতীয় সংসদের সাবেক ডেপুটি স্পীকার কর্নেল শওকত আলী সাহেবের কাছে শুনেছি, ক্যান্টনমেন্টে যখন বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচার শুরু হয় সেদিন আরও যারা সেই মামলার আসামি ছিলেন তাদের সঙ্গে প্রিজন ভ্যানে উঠে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার সাথে কণ্ঠ মিলাও।’ এই বলে তিনি প্রিয় মাতৃভূমির উদ্দেশে গাইলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সেই বিখ্যাত গান, ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা, তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা...।’ পরবর্তীতে দেশ স্বাধীনের পর তিনি এই গানটিকে ‘জাতীয় গীত’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। শওকত সাহেব বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, ‘মুজিব ভাই, আমাদের তো ফাঁসি হবে, আপনি কী করবেন।’ তখন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘ঘাবড়াবার কিছু নাই। ওরা আমাদের ফাঁসি দেওয়ার মতো ক্ষমতা রাখে না। এই মামলা আমরা মোকাবেলা করবো। আমাদের বিচার শুরু হবে। দেশের মানুষ এই বিচারের বিরুদ্ধে প্রচ- আন্দোলন করবে। ছাত্র-জনতা জেগে উঠবে। সেই আন্দোলনের মধ্যদিয়ে আমরা মুক্তিলাভ করবো। মুক্তিলাভের পর দেশে একটা নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনে আমরা বিজয়ী হবো। কিন্তু বিজয়ের পর ওরা আমাদের ক্ষমতা দেবে না। ক্ষমতা না দিয়ে ওরা আমাদের ওপর গণহত্যা চালাবে। তখন বাংলার মানুষ সর্বব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বে।’ সেই কবে ’৬৯-এ কারাগারে যাওয়ার প্রাক্কালে তিনি যে কথা বলেছিলেন, পরবর্তীতে বাস্তবে তাই-ই ঘটেছিল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ষড়যন্ত্র করে প্রহসনের বিচার করে তাঁকে ফাঁসিতে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা জাগ্রত ছাত্রসমাজ গণআন্দোলন-গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করে তাঁকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছি। ’৭০-এর নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হয়েছেন কিন্তু পাকিস্তান সামরিক কর্তৃপক্ষ ক্ষমতা হস্তান্তর করে নাই। গণহত্যার নীলনক্সা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অনুযায়ী বাঙালী নিধনে মত্ত হয়েছিল। যে কারণে পাকিস্তানের সমাধি রচনা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।’

অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অধিকারী বঙ্গবন্ধু ছিলেন দূরদর্শী নেতা। ’৭১-এ অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে যখন বঙ্গভবনে ভুট্টোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দেখা হয় তখন তিনি ভুট্টোকে বলেছিলেন, ‘মিস্টার ভুট্টো, পাকিস্তান আর্মি ষড়যন্ত্র করছে ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বে। তুমি পাকিস্তান আর্মিকে বিশ্বাস কোর না। ওরা প্রথমে আমাকে হত্যা করবে, পরে তোমাকে।’ ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানীরা হত্যা করতে পারেনি। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপথগামী উচ্ছৃঙ্খল কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়েছিল। এরপর ঠিকই পাকিস্তান আর্মির জেনারেল জিয়াউল হক ভুট্টোকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে।

’৭১-এ অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে এয়ার ভাইস মার্শাল আসগর খান এসেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। আসগর খান বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এরপর কী হবে?’ বঙ্গবন্ধু উত্তরে বলেছিলেন, ‘এরপর ইয়াহিয়া খান আসবে। ইয়াহিয়া খানকে অনুসরণ করবে এমএম আহম্মদ এবং প্লানিং কমিশনের একটা টিম আসবে। সেই টিমে জেনারেল হামিদ, জেনারেল মিঠ্ঠা এবং অন্য জেনারেলরা থাকবে। সাথে ভুট্টো আসবে। তারপরে একদিন আমার সাথে আলোচনা শুরু করে হঠাৎ বাঙালীদের ওপর আক্রমণ চালাবে। আর সেদিনই পাকিস্তানের সমাধি রচিত হবে।’ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কী নিখুঁত বিশ্লেষণ! পরবর্তী ঘটনাগুলো অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে!

মনে পড়ে মুজিববাহিনীর অন্যতম কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে ১৮ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসি। ২২ ডিসেম্বর মুজিবনগর সরকার দেশে প্রত্যাবর্তন করে। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং ১৪ জানুয়ারি আমাকে মাত্র ২৯ বছর বয়সে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তাঁর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার প্রথম বিদেশ সফর ছিল ৬ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিম বাংলায়। কলকাতায় স্মরণকালের সর্ববৃহৎ সেই জনসভায় ২০ লক্ষাধিক মানুষের উদ্দেশে বক্তৃতার শেষে কৃতজ্ঞচিত্তে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘রিক্ত আমি নিঃস্ব আমি দেবার কিছু নাই, আছে শুধু ভালোবাসা দিয়ে গেলাম তাই।’ এরপর রাজভবনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে বঙ্গবন্ধুর বৈঠক হয়। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল সেই বৈঠকে উপস্থিত থাকার। কাছে থেকে দেখেছি গভীর আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে স্বাক্ষরিত হয়েছিল পঁচিশ বছর মেয়াদী ঐতিহাসিক ‘বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি।’ আলোচনা বৈঠকের শেষে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমার জন্মদিনে আপনাকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’ আন্তরিকভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন। বঙ্গবন্ধু পুনরায় অনুরোধ করে বললেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার সফরের আগেই আমি চাই ভারতের সেনাবাহিনী আপনি ফিরিয়ে আনুন।’ ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘আপনি যা চাইবেন আমি তাই-ই করবো।’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কথা রেখেছিলেন। তিনি ’৭২-এর ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে স্বাধীন বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন এবং প্রতিশ্রুতি মোতাবেক একই বছরের ১২ মার্চ বিদায়ী কুচ্কাওয়াজের মধ্যদিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতের সেনাবাহিনী ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।

স্বাধীনতার পর পর অল্প সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বিচক্ষণ ও দক্ষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় ১১৬টি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। সুচারুরূপে দেশ পরিচালনায় দলীয় ঐক্য এবং জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন বদ্ধপরিকর। সেজন্য সমমনা দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের লক্ষ্যে তিনি গঠন করেছিলেন ত্রি-দলীয় ঐক্যজোট। ’৭৪-এর ১৮ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিলে দলীয় নীতি-আদর্শ সমুন্নত রাখতে দলের নেতা-কর্মীদের জনসম্পৃক্ততা বজায় রাখতে সকলের উদ্দেশে কর্তব্য-কর্ম নির্দেশ করে বলেছিলেন, ‘আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি চাই।’ ‘রাষ্ট্রের চারটি আদর্শ-গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র এবং একই সাথে দলের চারটি আদর্শ-নেতৃত্ব, মেনিফ্যাস্টো, নিঃস্বার্থ কর্মী ও সংগঠন’ সমুন্নত রাখতে বলেছিলেন, ‘দল শক্তিশালী করতে দল থেকে আবর্জনা দূর করতে হবে।’ ‘সামনে এগুতে হলে স্বচ্ছ-পরিষ্কার পন্থা অবলম্বন করতে হবে।’ ‘বিরোধী দলের সাথে কৌশলী হতে হবে।’ ‘দলীয় কর্মসূচী যখন জনসাধারণ গ্রহণ করে তখন তা আর দলীয় থাকে না জাতীয় সম্পদে রূপান্তরিত হয়।’ ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম করে আমরা স্বাধীন হয়েছি, এখন আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করতে হবে।’ ‘দল বা মানুষ মরতে পারে কিন্তু নীতি আদর্শ মরে না কোনদিন।’ ‘যারা নীতি আদর্শ পরিপন্থী কাজ করে তাদের চিহ্নিত করতে হবে, তাদের জন্য রাস্তা খোলা আছে।’ ‘কিছু লোক আছে যারা মধু-মক্ষিকার গন্ধে আওয়ামী লীগে ভিড় জমায়।’ ‘ন্যায় নীতি ও আদর্শ সামনে রেখে কাজ করতে হবে।’ ‘তিনটি জিনিস ভীতিকর-কুমির, সাপ ও মোনাফেক।’ ‘গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগ করে অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপ বরদাস্ত করা যাবে না।’ ‘আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কর্তব্য, বাংলার মানুষকে সুখী করতে হবে; দুর্নীতি উৎখাত করতে হবে; অর্থনৈতিক মুক্তি আনতে হবে; বাংলার দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হবে।’ ‘রাজনীতিতে যারা সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করে তাদের অন্তর ছোট, তারা নিচ হীন। যে মানুষকে ভালোবাসে সে কখনও সাম্প্রদায়িক হতে পারে না।’ ‘আত্মসম্মান বিকিয়ে কারও কাছ থেকে বন্ধুত্ব নয়।’ ‘দেশকে এগিয়ে নিতে পজিটিভ রাজনীতি করতে হবে এবং জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করতে হবে।’ দলকে জনসম্পৃক্ত রেখে রাষ্ট্র পরিচালনায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশাবলী আজও আমাদের পাথেয়।

বঙ্গবন্ধুর ছিল অগাধ দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম। তিনি মন-প্রাণ দিয়ে বাঙালী জাতিকে ভালোবাসতেন। তিনি ভালোবাসতেন বাংলার দুখী মানুষকে। প্রতিটি বক্তৃতায় বাংলার মানুষকে তিনি দুখী মানুষ বলে সম্বোধন করতেন। সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন হৃদয়ের গভীর থেকে তিনি ডাক দিতেন ‘ভায়েরা আমার’ বলে তখন জনসমুদ্রের সেই উত্তাল তরঙ্গ মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে যেত। তন্ময় হয়ে মানুষ শুনত তাদের প্রিয় নেতার বক্তৃতা। সারা বাংলাদেশের মানুষকে তিনি আপন করে নিয়েছিলেন, দেশের মানুষও তাঁকে আপন মনে করত। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর চেতনাকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি। আজও বাংলার মানুষ তাদের প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুকে হৃদয়ের মণিকোঠায় সযতনে লালন করছে।

বঙ্গবন্ধু যখন প্রধানমন্ত্রী আমি অত্যন্ত কাছ থেকে নিবিড়ভাবে দেখেছি তাঁর সমগ্র চিন্তা জুড়েই ছিল দেশ ও দেশের মানুষ। ’৭১-এ ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তিনি আমাদের স্বাধীন দেশ, জাতীয় পতাকা, গণতান্ত্রিক সংবিধান ও নির্বাচিত সার্বভৌম সংসদ দিয়ে সদ্যস্বাধীন দেশ গঠনে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। অর্থনৈতিক মুক্তির কাজ শুরু করেছিলেন। স্বাধীনতার পর দেশে কিছুই ছিল না। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ। গোলাঘরে চাল ছিল না। ব্যাংকে টাকা ছিল না। বৈদেশিক মুদ্রা ছিল না। রাস্তা-ঘাট ধ্বংস করে দিয়েছিল পাকবাহিনী। ব্রিজ-কালভার্ট উড়িয়ে দিয়েছিল বোমা মেরে। ভৈরব ব্রিজ, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ধ্বংসপ্রাপ্ত। রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়েছিল। একটা প্লেন ছিল না, রেল ছিল না, বাস ছিল না, ট্রাক ছিল না, স্টিমার ছিল না। পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা তছনছ করে দিয়েছিল। অর্থনীতি ছিল পুরোপুরি ধ্বংসপ্রায়। মাত্র ৩ বছর ৭ মাস উদয়াস্ত পরিশ্রম করে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশটাকে আমরা স্বাভাবিক করেছিলাম। ভৈরব ব্রিজ, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ যেদিন উদ্বোধন করা হয় সেদিন আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলাম। ’৭৪-এ বাংলাদেশে যে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল সেটা ছিল মানুষের তৈরি। খাদ্যশস্য থাকা সত্ত্বে¡ও বন্যার কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত থাকায় আমরা মানুষের কাছে খাদ্যদ্রব্য সঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারিনি। এছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি মোতাবেক ২ লাখ টন খাদ্যসামগ্রী মাঝপথ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল। এতসব কিছুর পরেও বঙ্গবন্ধু দেশটাকে স্বাভাবিক করেছিলেন। যেদিন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়, সেদিন গোলাঘরে চাল, ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রা আছে এবং দেশে স্বাভাবিকতা বিরাজ করছে।

নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু ছিলেন ইস্পাত কঠিন। তাঁর সঙ্কল্পবোধ ছিল দৃঢ়। সুদৃঢ় সঙ্কল্পবোধ নিয়েই তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ গঠনে অগ্রসর হয়েছিলেন। কিন্তু জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে খুনীচক্র তাঁকে দেশের অভ্যন্তরে সপরিবারে হত্যা করেছিল। জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা করেই খুনীচক্র ক্ষান্ত হয়নি। একই বছরের ৩ নবেম্বর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে যারা নেতৃত্ব দিতেন বা বারংবার নেতৃত্ব দিয়েছেন দলের এবং সরকারের ঐতিহাসিক মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, কামারুজ্জামান সাহেবÑআওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য তাঁদের কারাভ্যন্তরে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকা-ের আসল উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব শূন্যতা তৈরি করা। কিন্তু ঘাতকচক্রের ধ্বংসাত্মক ষাড়যান্ত্রিক প্রয়াসকে আমরা সফল হতে দেইনি। বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে ধারণ করেই ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের লক্ষ্যের দিকে এগিয়েছি। চরম প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে সাংগঠনিক তৎপরতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করে মূল দলসহ সহযোগী সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করে নিজদের ভেদাভেদ ভুলে কেবল দলকেই ধ্যান-জ্ঞান করে, দলীয় ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতে আওয়ামী লীগের পতাকা তুলে দিয়েছি। সকল প্রতিকূলতা অতিক্রম করে সাফল্যের সাথে দলকে নেতৃত্ব দিয়ে আজ তিনি জাতিকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

আজকে ভাবতে ভালো লাগে বঙ্গবন্ধুর অনুসৃত নীতি অনুযায়ী দেশ এগিয়ে যাচ্ছে তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। অতীতে ৭ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত বাংলাদেশে মানুষের খাদ্যাভাব ছিল, আজ ১৬ কোটি মানুষের দেশে আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এক সময় দেশে বৈদেশিক মুদ্রা ছিল না, আজ ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। রেমিটেন্স ছিল না আজকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি আমাদের রেমিটেন্স। এক্সপোর্ট ছিল মাত্র ৩০০ মিলিয়ন ডলার আজ তা ৩১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। শুরুতে বাজেট ছিল মাত্র ৭৮৭ কোটি টাকা আজ তা ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এখন আন্তর্জাতিক বিশ্ব বাংলাদেশ সম্পর্কে বলে ‘বিস্ময়কর উত্থান বাংলাদেশের।’ মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস্ ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, ‘পরবর্তীকালে যে ১১টি দেশ অর্থনৈতিকভাবে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ তার অন্যতম।’ আরেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান জেপি মরগ্যান, ‘বাংলাদেশ উদীয়মান দ্রুতগতির অর্থনীতি’ বলে অভিহিত করেছে। ইতোমধ্যে আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে নি¤œ-মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০তম বর্ষপূর্তিতে আমরা বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত করতে সক্ষম হবো। বঙ্গবন্ধুর যেমন দু’টি লক্ষ্য ছিল-এক, দেশ স্বাধীন করা এবং দুই, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা। তিনি গর্ব করে বলতেন, ‘আমার বাংলা রূপসী বাংলা, আমার বাংলা সোনার বাংলা।’ তিনি বলতেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলব, আমি বাঙালী, বাংলা আমার ভাষা, বাংলা আমার দেশ।’ একইভাবে ২০০৮-এর নির্বাচনের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধু কন্যাও বাংলাদেশের মানুষের জন্য দু’টি লক্ষ্য স্থির করেছেন-এক, ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা এবং দুই, বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশে রূপান্তরিত করা। ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন আর স্বপ্ন নয়। ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে মোবাইল ও তথ্যপ্রযুক্তির সেবায় দেশের মানুষ ইতোমধ্যে তার সুফল ভোগ করতে শুরু করেছে। অপরদিকে বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মতে বাংলাদেশ নি¤œ মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে এবং ২০২১-এ আমরা পরিপূর্ণভাবে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে রয়েছি। বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলেন, আজ তাঁর কন্যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেই পথেই এগিয়ে চলেছে এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তব রূপলাভ করতে চলেছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে পরিচালিত হয়ে বাংলাদেশ আগামীতে উন্নত দেশে রূপান্তরিত হবে এবং সমগ্র বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা, বাণিজ্যমন্ত্রী,

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

tofailahmed69@gmail.com