১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সে রাতের কথা মনে হলে এখনও আঁতকে উঠি

  • প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা

খোকন আহম্মেদ হীরা, বরিশাল ॥ ১৯৭৫ সালের ভয়াল ১৫ আগস্ট রাতে ঘাতকদের বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েও বরিশালের ‘ক্রিডেন্স ব্যান্ড’ দলের সদস্য ডা. খ. ম জিল্লুর রহমান এখনও সে রাতের কথা মনে হলে ভয়ে আঁতকে ওঠেন। সেইদিনের বিভীষিকাময় ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বার বার প্রিয় নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

সেই রাতের ভয়াল ও লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ঘাতকেরা এতই পাষাণ ছিল যে, তারা জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ছোট্ট শিশু সন্তান শেখ রাসেল ও আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর শিশুপুত্র সুকান্ত বাবু সেরনিয়াবাতকেও বাঁচতে দেয়নি। নির্মমভাবে তাদেরকে হত্যা করেছে। ডা. জিল্লুর বলেন, বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতার দীর্ঘ বছর পরে হলেও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের ফাঁসির রায় কার্যকর করেছেন। এটা যেমন আমার কাছে ভাল লেগেছে, তার চেয়ে বেশি বেদনাদায়ক হচ্ছে- যে বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে এ দেশ স্বাধীন হতো না, আমরা বাংলাদেশ পেতাম না। সেই স্বাধীনতার স্থপতির খুনীদের বিচারে কেন এত বিলম্ব হয়েছে। একান্ত আলাপনে তিনি বলেন, তৎকালীন মন্ত্রী কামরুজ্জামান বরিশালে আসার পর ‘ক্রিডেন্স ব্যান্ড’ দলের পক্ষ থেকে আমরা তাকে সংবর্ধনা দেই। মন্ত্রী কামরুজ্জামান আমাদের ব্যান্ড দলের গানে মুগ্ধ হয়ে পুরো দলকে ঢাকায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান এবং শিল্পীদের বেতারে গান গাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়ার আশ্বাস দেন। মন্ত্রীর আশ্বাসে আমরা ক্রিডেন্স ব্যান্ড দলের ১০ সদস্য ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুর বোনজামাতা মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাতের মিল্টো রোডের বাসায় উঠি। আমাদের দলের নেতৃত্বে ছিলেন, বরিশাল অপসোনিনের বর্তমান পরিচালক আবদুর রউফ খান নান্টু। তার নেতৃত্বে আমরা ব্যান্ড দলের সদস্যরা ১৪ আগস্ট বিকেলে আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসায় মিলাদেও অংশগ্রহণ করি। ওইখানে আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে মিলাদের তবারক তুলে দিয়েছিলাম। জিল্লুর রহমান আরও বলেন, রাতে মন্ত্রী কামরুজ্জামানের বাসায় একটি শিশুর জন্মদিনে আমরা ব্যান্ডদল অংশগ্রহণ করি। ওই অনুষ্ঠানে আমাদের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই তখন পুরস্কৃত করেছিলেন। আমরা ক্রিডেন্স ব্যান্ডদলের সদস্যরা সেখান থেকে চলে এসে আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাসার নিচতলার ফ্লোরে ঘুমানোর আয়োজন করি। ১৫ আগস্ট ভোরে হঠাৎ গুলির শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। কিছুক্ষণ পরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসেন রব সেরনিয়াবাতের জ্যেষ্ঠপুত্র আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। তিনি সবাইকে ভিতরের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে চুপচাপ থাকতে বলে দোতলায় চলে যান। আমিসহ সকলে তখন ভয়ে কাতর হয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বাইরে ঘাতক সেনা সদস্যরা অস্ত্র হাতে বাড়ি ঘিরে রেখেছে। অল্প সময়ের ব্যবধানেই নরপশু ঘাতকরা আমরা যে রুমে প্রথম ঘুমিয়েছিলাম, সেই রুমের কাঁচের দরজা ভেঙ্গে ভিতরে প্রবেশ করে ফাঁকা গুলি ছুড়ছে। ঘাতকরা অনেকেই উর্দুতে গালিগালাজ করে আমাদের রুমের দরজা খুলতে নির্দেশ দেয়। কিছু সময় পর আমি দরজা খুলে দিলে একজন সৈনিক ভিতরে প্রবেশ করে। তখন আমাদের সঙ্গী সৈয়দ গোলাম মাহমুদ ওই সৈনিকের পা জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘স্যার আমরা এই বাসার কেউ নই, আমরা এখানে গান গাইতে এসেছি।’ তখন ওই সৈনিক আমাদের সকলকে ‘ফরোয়ার্ড’ বলে সামনের দিকে নিয়ে যায়। এ সময় দেখতে পাই দোতলা থেকে আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ঘাতকরা নিচে নিয়ে আসছে।

ওইসময় আবদুর রব সেরনিয়াবাতের কন্যা বেবী সেরনিয়াবাতকে এক মেজরের সঙ্গে ঝগড়া করতে দেখেছি। বেবীকে বলতে শুনেছি, আপনারা কারা? কেন আপনারা এ বাসায় এসেছেন। আপনারা জানেন, এ বাসা বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতির বাসা। এরপরও সৈনিকরা সবাইকে নিচতলার ড্রয়িং রুমে নিয়ে আসে। ড্রয়িং রুমে আমরা ক্রিডেন্স ব্যান্ডদলের দশসহ মোট ৩০/৩২ জন শুনতে পাই বাইরে প্রচ- গুলি হচ্ছে। এ সময় এক ঘাতক সৈনিক ড্রয়িং রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে আমাদের লক্ষ্য করে ব্রাশ ফায়ার করে। একে একে অনেককেই লুটিয়ে পড়তে দেখে আমিও বাঁচার জন্য প্রাণপণে আল্লাহকে ডাকি। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার শরীরের নিচের অংশে অনেক গুলি লাগে (পরে জানতে পারি আমার শরীরে ১৩টি গুলি লেগেছিল)। এরপর আমি নিচে লুটিয়ে পড়ি। তখনও আমার জ্ঞান ছিল। সবকিছু দেখতে পাচ্ছি। ওই সৈনিক একাই পরপর তিনটি অস্ত্র দিয়ে রুমের মধ্যে ব্রাশ ফায়ার করে। সবাই লুটিয়ে পড়ার পর অন্য এক সৈনিক রিভলবার নিয়ে রুমের মধ্যে প্রবেশ করে অনেকের মাথায় ঠেকিয়ে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। আমার ডান হাতে ২টি ও বাম হাতে ২টি গুলি করে। আজ আমি ১৭টি গুলির ক্ষতচিহ্ন নিয়ে বেঁচে আছি। ওই সৈনিকরা রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর কে যেন আমাকে টেনে হিঁচড়ে ড্রয়িং রুমের সোফার নিচে ঢুকিয়ে রাখে। যাদের গায়ে গুলি লাগেনি তারা ঘাতকরা চলে যাওয়ার পর পালিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ আমাদের রুমে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তার স্ত্রীর গায়েও গুলি লেগেছিল। এ সময় আমি হাসানাত ভাইকে চলে যেতে অনুরোধ করি। তখন তিনি ওই বাড়ি থেকে চলে যান। পরের দিন সকালে তৎকালীন রমনা থানার ওসি এসে সবাইকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান।

জিল্লুর রহমান আরও বলেন, সেই ভয়াল কালরাতে পানিসম্পদমন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের মিল্টো রোডের বাড়িতে বরিশালের ছয় নারী-পুরুষ নির্মম হত্যার শিকার হয়েছিলেন। তারা হলেন- সাবেক মন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি কৃষক নেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ভাইয়ের ছেলে সাংবাদিক শহিদ সেরনিয়াবাত, মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, ছেলে আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু সেরনিয়াবাত, ক্রিডেন্স শিল্পগোষ্ঠীর সদস্য আবদুর নঈম খান রিন্টু। আহত হয়েছিলাম আমিসহ নয়জন। তারা হলেন- বেগম আবদুর রব সেরনিয়াবাত, শাহানারা আব্দুল্লাহ, বিউটি সেরনিয়াবাত, হেনা সেরনিয়াবাত, আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ, রফিকুল ইসলাম, ললিত দাস ও সৈয়দ মাহমুদ। তিনি বলেন, সেই ভয়াল রাতের কথা আজও মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে। রাতে মাঝেমধ্যে এখনও আঁতকে উঠি। বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন, নগরীর বগুড়া রোডের বাসিন্দা ডা. খ. ম জিল্লুর রহমান।