১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শিশুহত্যার সেই কালরাত

  • জাফর ওয়াজেদ

এক কালরাত এসেছিল এই বাংলাদেশের বুকে। পুরো দেশকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল সেই রাত্রি শেষের মুহূর্তে, ঘাতকদের বুলেট। কত প্রাণ হলো বলিদান নির্মম নৃশংসতায়। রেহাই পায়নি শিশুরাও। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল সে রাতে শিশুরাও। অমানবিক, নিষ্ঠুর সেই হত্যার রাত জাতির জীবনে এক কলঙ্কময় অধ্যায়।

ওরা দু’জন স্কুলের একই ক্লাসে পড়ত। সম্পর্কে তারা মামাত-ফুপাত ভাই। দু’বাড়ি থেকে স্কুলে আসত ওরা দু’জন দু’বাড়ির বড়দের সঙ্গে। প্রায়ই রিক্সায় চড়ে স্কুলে যেত। ক্লাসেই দেখা হতো দু’জনের। পড়াশোনায়ও ছিল খুবই মনোযোগী। ভাগাভাগি করে টিফিনও খেত। গল্পে মত্ত হতো। তাদের গল্পের শেষ হতো না। কখনও বিষয় হতো বাড়িতে পোষা কবুতর, বিড়াল, হরিণ, গরু কিংবা কুকুরের গল্প। একজনের কুকুরের নাম ছিল টমি। নিজের খাবার থেকে ভাগ দিত টমিকে। অপরজন কুকুর না পুষলেও পুষি নামে বিড়াল ছিল। গল্পে ফিরে আসত দু’জনের দাদা-নানা বাড়ি। ছুটির সময় গ্রামের সেই বাড়িতে পোষা হাঁস, মুরগি, ছাগলের কথা। গাছ থেকে ফল পেড়ে খাবার ও হৈ-হল্লাও তাদের গল্পের বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়াত। কিংবা বড়দের কাছে শোনা গল্পগুলো তারা আবার নিজেরা বয়ান করত। দু’জনেই ছিল বাবা-মায়ের কনিষ্ঠ পুত্র। সহোদর-সহোদরার চেয়ে বয়সের দূরত্ব তাদের বেশি। বাবা-মায়ের আদরের সন্তান ওরা। ওদের প্রতি বড়দের বিশেষ স্নেহ যেমন, তেমনি সুনজরও ছিল। কিন্তু বাবার সান্নিধ্য পাওয়া ছিল দুষ্কর। দু’জনের বাবাই তখন বাংলার মানুষের মুক্তির লক্ষ্যে রাজনীতির ময়দানে আন্দোলন-সংগ্রামে ব্যস্ত। একজনের বাবাকে তাই প্রায়ই কারাগারে কাটাতে হতো। অপরজন কৃষক নেতা হিসেবে সাংগঠনিক কাজে ব্যস্ত থাকতেন। একজনের মামার গড়া রাজনৈতিক দলটি তখন সারাবাংলায় জনপ্রিয়। অপরজনের বাবা অবশ্য মামার দল থেকে ১৯৫৫ সালে বেরিয়ে গিয়ে ন্যাপ নামক দলে যোগ দেন। অবশ্য ১৯৬৯ সালে আবার মামার দলে ফিরে আসেন। মামার সেজ বোনের স্বামী ফুফা সাংবাদিকতাও করতেন। মানুষের প্রতি তিনিও ছিলেন নিবেদিতজন। দু’বাড়িতেই মামি-ফুফুদের যাতায়াত ছিল। সম্পর্কের গভীরতা ছিল অনেক বেশি। দুই ভাই একজন আরেকজনকে খেলনা উপহার দিত। গলায় গলায় ভাবছিল দু’জনের। একজন শেখ রাসেল, অপরজন আরিফ সেরনিয়াবাত। ১৯৭৫ সালে ছিল ঢাকা ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র দু’জনই। কাকতালীয় যে, রাসেলের বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আরিফের পিতা আবদুর বর সেরনিয়াবাত সম্পর্কে শ্যালক-ভগ্নিপতি এবং দু’জনে একই সঙ্গে কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র এবং বেকার হোস্টেলেও একসঙ্গে থাকতেন। বঙ্গবন্ধুর সেজ বোনের সঙ্গে বিয়ে হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পাস করে বরিশালে আইনজীবী ও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। আরিফ জন্মগ্রহণ করে ১৯৬৪ সালের ২৭ মার্চ। আর বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের জন্ম ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর। বাড়ির ছোট ছেলে হিসেবে ওরা দু’জনেই সবার আদরের। রাজনৈতিক পরিবেশ ও সঙ্কটের মধ্যেও রাসেল চিরসঙ্গী সাইকেল নিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখত। মুক্তিযুদ্ধকালীন দীর্ঘ নয় মাস পিতাকে কাছে না পেয়ে তাকে এমনই ভাবপ্রবন করে রাখে যে, পরে সব সময় পিতার কাছাকাছি থাকতে জেদ করত। বড় দু’বোন ও দু’ভাই তাকে বেশ আদর করত। আরিফও ছিল বাবার আদরের। বড় বোন বেবী সেরনিয়াবাতের সঙ্গে সম্পর্কটা বেশ খুনসুঁটির ছিল। বেবী ১৯৭৫ সালে একই স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্রী ছিল। এই বোনের সঙ্গে আরিফ স্কুলে যাতায়াত করত। ১৪ বছর বয়সী বেবীও ছিল বাবা-মায়ের অতি স্নেহের। আরিফের বড় ভাই হাসনাত আবদুল্লাহর জ্যেষ্ঠ পুত্র সুকান্ত বাবুর বয়স তখন ৪ বছর। বরিশাল থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঢাকায় এসেছিল দাদার বাড়ি বেড়াতে। ১৯৭১ সালের ২২ জুন বরিশালের গৌরনদীতে জন্ম বাবুর প্রতি আরিফের খুবই দরদ ছিল। তাকে বর্ণমালা শেখাত। চাচা-ভাইবোন বেশ মধুর সম্পর্ক যেন।

এই শিশুদের জীবন ছিল অন্যরকম। স্বর্গীয় সুষমায় পূর্ণ; জগতের বিভীষিকা ও কালিমাহীন। কিন্তু নিষ্ঠুর পৃথিবী বোধহয় চায়নি এই শিশুরা বেড়ে উঠুক। কলকাকলী আর কোলাহলময় পৃথিবীতে তারা বেড়ে উঠেছিল আলোকের ঝর্ণাধারায়। তাই নিষ্ঠুরতা, নৃশংসতা, নির্মমতার ভেতর দিয়ে তাদের পাড়ি দিতে হয়েছে মরণসাগরে। অপরাধহীন এসব শিশুর প্রাণ কেন কেড়ে নেয়া হয়েছিল তার কোন জবাব মেলে না।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে সেনাবাহিনীর বিপথগামী সদস্যদের একটি অংশ প্রথমেই হানা দেয় আরিফের বাড়িতে। বাবা-মা, ভাই-বোন,ভাইপোসহ অন্য আত্মীয়দের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে শিশুদের হত্যা করে। বেবীর দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এরপর তারা শেখ রাসেলের বাড়িতে হামলা চালায়। বাবা-মা, ভাই-ভাবী, কাকাকে হত্যার পর জল্লাদরা হত্যা করে রাসেলকে। দাদির কোলে মারা যায় আরিফ। ১৫ আগস্টের সে রাতে নির্মমভাবে নিহত শিশুদের কথা ভোলা যায় না। বার বার চোখে ভাসে তাদের মুখ।