১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফ্রিল্যান্সিং ও তরুণদের আগ্রহ

ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান নানা ধরনের কাজ করিয়ে নেয়। নিজ প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কাউকে দিয়ে এসব কাজ করানোকে আউটসোর্সিং বলে। যারা আউটসোর্সিংয়ের কাজ করে তাদের ফ্রিল্যান্সার বলে। এটি একটি মুক্ত বা স্বাধীন পেশা।

আউটসোর্সিংয়ের কাজের খোঁজ থাকে এমন সাইটে যিনি কাজটি করে দেন তাকে বলা হয় কন্ট্রাক্টর, তিনি চুক্তিতে কাজ করেন। আর যিনি কাজ দেন তাকে বলা হয় বায়ার বা এমপ্লয়ার, তিনি চুক্তিতে কাজ দেন। আউটসোর্সিং কাজ প্রাপ্তির স্থান হচ্ছে আউটসোর্সিং সাইট বা অনলাইনে মার্কেট প্লেসে কাজ বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা থাকে। যার মধ্যে ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, সফটওয়ার ডেভেলপমেন্ট, নেটওয়ার্কিং ও ইনফরমেশন সিস্টেম, লেখা ও অনুবাদ, প্রশাসনিক সহায়তা, ডিজাইন, মাল্টিমিডিয়া, গ্রাহকসেবা, বিক্রয় ও বিপণন, ব্যবসাসেবা ইত্যাদি। ওয়েব ডেভেলপমেন্টে রয়েছে ওয়েবসাইট ডিজাইন, ওয়েব প্রোগ্রামিং, ই-কমার্স, ইউজার ইন্টারফেস ডিজাইন, ওয়েবসাইট টেস্টিং প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি। সফটওয়ার ডেভেলপমেন্টের মধ্যে ডেক্সটপ এ্যাপ্লিকেশন, গেম ডেভেলপমেন্ট, স্ক্রিপ ও ইউটিলিটি, সফটওয়ার প্লাগ ইনস, ইন্টারফেস ডিজাইন, সফটওয়ার প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, টেস্টিং ও ভিওআইপি। নেটওয়ার্কিং ও ইনফরমেশন সিস্টেমের মধ্যে রয়েছে নেটওয়ার্ক এ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ডিবিএ ডাটাবেজ এ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সার্ভার এ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ইআরপি/সিআরপি ইত্যাদি। লেখালেখি ও অনুবাদ কাজের জন্যে রয়েছে কারিগরি নিবন্ধন লেখা, কপি অনুবাদ, ক্রিয়েটিভ রাইটিং, আর্টিকেল রাইটিং, ওয়েভসাইট কনটেন্ট, ব্লগ ইত্যাদি।

ডিজাইন ও মাল্টিমিডিয়ার মধ্যে রয়েছেÑ গ্রাফিক্স ডিজাইন, লোগো ডিজাইন, ইলাস্ট্রেশন, প্রিন্ট ডিজাইন, থ্রিডি মডেলিং, ক্যাড, অডিও ও ভিডিও গ্রোডাকশন, ভয়েস ট্যালেন্ট, এ্যানিমিনেশন ইত্যাদি।

ফ্রিল্যান্সিং কাজে প্রথমদিকে সফলতা না পেলেও লেগে থাকতে হবে। তাহলেই কেবল সফলতা পাওয়া সম্ভব। ফ্রিল্যান্সিংয়ের পূর্বশর্ত হচ্ছে মোটামুটি ইংরেজী জানা আর রাত জেগে কাজ করার মনমানসিকতা। অধিকাংশ কাজগুলোই থাকে দেশের বাইরের। তাই কাজের জন্য প্রস্তাব পাঠানো, কাজের জন্য নিজের যোগ্যতা প্রমাণ, কাজ পাওয়ার পর নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণসহ বিভিন্ন কাজের জন্য রাতের বেলাটাই বেছে নেয় বেশিরভাগ ফ্রিল্যান্সার। আর তাই যাদের রাত জেগে কাজ করার অভ্যাস আছে তারা ফ্রিল্যান্সিংয়ে সফল হওয়ার সুযোগটাও বেশি। আউটসোর্সিংয়ের কাজ করতে ইংরেজীতে পারদর্শী হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত প্রজেক্টের চাহিদা বোঝা এবং সে অনুযায়ী ক্লায়েন্টের সঙ্গে সাবলীলভাবে যোগাযোগ করার ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। প্রথম কাজ পেতে কয়েক সপ্তাহ থেকে শুরু করে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে, তাই হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধরে বিড করে যেতে হবে। প্রথম দিকে যত কম মূল্যে বিড করা হবে কাজ পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি হবে। সম্পূর্ণ কাজকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করুন এবং প্রতিটি ধাপ শেষ হওয়ার পর পর ক্লায়েন্টকে দেখান। ডেডলাইন শেষ হওয়ার পূর্বেই সম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করুন এবং ক্লায়েন্টের কাছে পাঠিয়ে দিন। সব সময় চেষ্টা করবেন যাতে কাজ শেষে সর্বোচ্চ রেটিং পাওয়া যায়। ভাল রেটিং পেলে পরবর্তী কাজগুলো খুব সহজেই পাওয়া যায়। ভাল রেটিং পাওয়ার উপায় হচ্ছেÑ সঠিকভাবে কাজটি করা, সময়মতো কাজটি শেষ করা, ক্লায়েন্টের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। কাজে এবং কথাবার্তায় সবসময় সৎ থাকতে হবে। কখনও ভুল তথ্য প্রদান করা যাবে না। কোন কারণে কাজ করতে না পারলে বিষয়টি ক্লায়েন্টকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিন, বেশিভাগ ক্ষেত্রেই ক্লায়েন্টের কাছ থেকে যথাযথ সহায়তা পাওয়া যায়। কিন্তু ভুলেও ওই সকল সাইটে একাধিক আইডি করা যাবে না। এতে করে সবগুলো আইডি ব্লক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দেশে বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ নিবন্ধিত মুক্তপেশাজীবী বা ফ্রিল্যান্সার রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৪ লাখই ওডেস্কে নিবন্ধিত। আর একটু বেশি নজর দিলে দেখা যায় ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে বেশির ভাগই তরুণ। এছাড়া গুরুডটকমসহ কয়েকটি মার্কেট প্লেসেও ফ্রিল্যান্সাররা ভিড় জমাতে শুরু করেছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে ছয় লাখ নিবন্ধিত ফ্রিল্যান্সার থাকলেও এদের মধ্যে সক্রিয় রয়েছে প্রায় দুই লাখ। বাকিরা নিয়মিত কাজ করেন না। এর কারণ সম্পর্কে একাধিক ফ্রিল্যান্সার জানান, বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কিংবা সদ্য উত্তীর্ণ অনেক তরুণ-তরুণী এ ফ্রিল্যান্সিংকে আপদকালের সময়ের জন্য গ্রহণ করেন। ভাল চাকরি পেলে তারা ফ্রিল্যান্সিং ছেড়ে দেন। কেননা অধিকাংশ ক্ষেত্রে আগ্রহ থেকে নয় বরং ব্যক্তিগত আর্থিক সংকটকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলা কিংবা হাত খরচ যোগাতে অনেকে এ পেশায় যুক্ত হন। আগ্রহী এবং নিজের জ্ঞান প্রয়োগ করার ভাল সুযোগ যারা পান তারা সাধারণত ফ্রিল্যান্সিং ছাড়েন না। ফ্রিল্যান্সদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ্বজুড়েই ফ্রিল্যান্সিং জনপ্রিয় হচ্ছে। কেননা আর্থিক ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অনেক বড় প্রতিষ্ঠান কিছু কাজ নিজেরা না করে, আউটসোর্সিং করতেই পছন্দ করেন। বিশ্বব্যাপী মুক্তপেশার বাজার বড় হচ্ছে। এ কাজে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পড়ুয়া তরুণরা এগিয়ে আসছে। ব্যক্তি ও বেসরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারী উদ্যোগেও ফ্রিল্যান্সার তৈরি হচ্ছে। এ কাজে বর্তমানে তরুণরা সবচেয়ে বেশি আগ্রহী হওয়ায় এ সেক্টরের বিকাশ ও বৈদেশিক মুদ্রার সম্ভাবনা উজ্জ্বলতর হচ্ছে। ২০১৩ সালে ওডেক্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের পরিমাণ ২১ মিলিয়ন ডলার যা ২০১৫ সালে ৩০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। সবমিলিয়ে ২০১৩ সালে ওডেক্স সক্রিয় ফিল্যান্সরদের কয়েকটি দল জানায় সবমিলিয়ে ২০১৩ সালে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ফ্রিল্যান্সরদের আয় ৪০ মিলিয়ন ডলার বা ৩১০ কোটি টাকা যা ২০১৪ সালে ৫৫ মিলিয়ন ডলার বা ৪২৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৩ সালে বিশ্বে মুক্ত পেশাজীবীদের আয় আউটসোর্সিং হতে ছিল ৭৩০ মলিয়ন ডলার, ২০১৪ সালে দাঁড়ায় ৯৩০ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২০ সালে হবে ১০ বিলিয়ন ডলার। ইল্যান্স ওডেক্স সূচকেও ফ্রিল্যান্সারের সংখ্যা ও উপার্জন এবং শহর বিবেচনায় বাংলাদেশের ঢাকা শহর তৃতীয় স্থানে অবস্থান করেছে। এছাড়াও প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারতের চন্ডিগড় ও মোহালি এবং চতুর্থ স্থানে রয়েছে ফিলিপাইনের কুইন্স সিটি। দেশ হিসেবে প্রথম স্থানে রয়েছে ভারত, দ্বিতীয় ফিলিপাইন, তৃতীয় যুক্তরাষ্ট্র এবং চতুর্থ অবস্থানে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এখন অনলাইন আউটসোর্সিং নির্ভর ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার গঠনে আগ্রহী। আন্তর্জাতিক পরিম-লে ফ্রিল্যান্সিং আউটসোর্সিংয়ের বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। দেশের প্রযুক্তি বিশারদদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তথা শক্তিশালী ইন্টারনেট অবকাঠামো গড়ে তুলতে না পারলে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বাজারে নিজেদের অবস্থান গড়ে তোলা সম্ভব নয়। স্বল্পমূল্যে দ্রুতগতিসম্পন্ন ইন্টারনেট সেবা প্রদানের নিশ্চয়তা না থাকলে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অপার সুযোগ রয়েছে।বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের ভূমিকাই এখন দৃশ্যমান। কিন্তু আউটসোর্সিং মাধ্যমে তরুণেরা অর্থনীতিতে আরও দৃশ্যমান ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে, যার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।