২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাঙালীর মনোজগত ও জাতির জনক

  • এবিএম খায়রুল হক

১৯০৫ সালে ইংরেজ সরকার যে কারণেই বঙ্গভঙ্গ করে থাকুক না কেন এর ফলে পূর্ব বঙ্গের অধিবাসীগণ এই সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় জীবনে অংশগ্রহণে সামান্য হলেও সুযোগ পায়, বিশেষ করে শিক্ষার প্রসার ঘটার একটা সুযোগ তৈরি হয়। ৬ বছর পর বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও এই নব উন্মেষ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে, বিশেষ করে শিক্ষা, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে হিন্দু ও মুসলমানদের যৌথ উদ্যোগ ব্যর্থ হলে ১৯৪০ সালে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে এক ঐতিহাসিক পটভূমিতে লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপনের মাধ্যমে ভারতবর্ষে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ (ঝঃধঃবং)-এর দাবি ওঠে। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর আবারও দীর্ঘ সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বঞ্চনার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালী জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ও গণস্ফুরণ ঘটে। সেই সংগ্রামের মহানায়ক ছিলেন একজন আপাদমস্তক বাঙালী। তিনি শেখ মুজিবুর রহমান।

সি আর দাশ থেকে শুরু হয়ে সুভাষ বোস পর্যন্ত বাঙালী জাতীয়তাবোধের প্রাথমিক বিকাশ এবং সেই বোধের পরিচর্যা ও লালনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই বাঙালী জাতীয়তাবোধের প্রকৃত উন্মেষ হয়, যার ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা ঘোষণা, নয় মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন। এ সব বিষয় নিয়ে ৭০ দশকে কোন প্রশ্ন ওঠেনি; কিন্তু পরবর্তীকালে বিভিন্ন বিষয়, যেমন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের প্রকৃত তাৎপর্য, ওই ভাষণটি স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল কিনা, ৭ মার্চের ওই ভাষণ এবং ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণা পর্যন্ত তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সাংবিধানিক অবস্থান কি ছিল, এ সব প্রশ্ন মাঝে-মধ্যেই উঠানো হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা ঘোষণার পরবর্তী দশ বছরে এ সকল প্রশ্ন দেখা দেয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে অসৎ উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বিষয়ে অহেতুক নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হতে থাকে।

এ সব প্রশ্নের যথাযথ উত্তরের জন্য ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে পাকিস্তান সৃষ্টির অধ্যায়ের দিকে দৃষ্টি ফেরানো প্রয়োজন।

ভারত ও পাকিস্তান সৃষ্টির প্রায় ৪০ বছর পূর্ব হতে ভারতীয়গণের মূল ২টি রাজনৈতিক মুখপাত্র কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ স্বরাজ ও স্বায়ত্তশাসন দাবি করে আসছিল। এড়াবৎহসবহঃ ড়ভ ওহফরধ অপঃ, ১৯৩৫-এর মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার কিছু পরিমাণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করে এবং এই আইনের আওতায় ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এগুলো ছিল ধর্মভিত্তিক স্বতন্ত্র নির্বাচন।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শুরু হতেই কংগ্রেস দেশজুড়ে ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’-এর সূচনা করে। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ তারিখে লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের সর্বভারতীয় বার্ষিক অধিবেশনে বাংলার তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমির প্রয়োজনে ভারতের অভ্যন্তরে একাধিক পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্রের (ঝঃধঃবং) দাবি উত্থাপন করেন। এই দাবিটি মুসলিম লীগের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্্্র ভারতে হিন্দু ও মুসলমান দুই পৃথক জাতির বাস তথা দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতেই করা হয়েছিল। মূলত এই দ্বি-জাতিতত্ত্বই ছিল মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমির দাবির একমাত্র যৌক্তিক ভিত্তি। এই প্রস্তাব এবং পাকিস্তান পরিকল্পনায় ধারণা ছিল যে, পূর্বাঞ্চলে বাংলাসহ ভারতে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে স্বতন্ত্র, স্বাধীন ও সার্বভৌম একাধিক রাষ্ট্র গঠিত হবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন অত্যন্ত বেগবান হয় এবং তার প্রেক্ষিতে ব্রিটিশ সরকার স্বাধীনতার বিষয়টি বিবেচনা করতে নীতিগতভাবে বাধ্য হয়। সমস্যা ছিল একটিই- অখ- ভারত স্বাধীনতা পাবে, নাকি দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে হিন্দু ও মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টি করে স্বাধীনতা প্রদান করা হবে।

১৯৪৫ সালের নবেম্বর হতে সমগ্র ভারতবর্ষে প্রাদেশিক নির্বাচন আরম্ভ হয় এবং মুসলিম লীগ ঐ নির্বাচনকে পাকিস্তান দাবির প্রতি গণভোট হিসেবে গ্রহণ করে। অবিভক্ত ভারতে বাংলা ছিল সর্বাপেক্ষা বৃহৎ একক মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশ। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের নেতৃত্বে এক বিশাল কর্মীবাহিনী বাংলার প্রতিটি গ্রামে-গঞ্জে মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবির সপক্ষে প্রবলভাবে প্রচারণা চালাতে থাকে। বিশেষ করে মুসলিম ছাত্রলীগ ও সকল স্তরের ছাত্র-জনতা এই প্রচারণায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। বাংলার কৃষক জনগোষ্ঠীর মনে এক আশা জন্মে যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রে তারা হাজার বছরের বঞ্চনার হাত হতে রেহাই পাবে, রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের কথা বলবে। ফলশ্রুতিতে মুসলিম লীগ বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। অখ- বাংলা প্রদেশে মুসলিম লীগ বাংলার মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ১২১টি আসনের মধ্যে ১১৪টি আসন লাভ করে। সমগ্র উপমহাদেশে মুসলিম লীগ আর কোথাও এমন বিপুলসংখ্যক আসন পায়নি। ভারতবর্ষের অন্যান্য প্রদেশসহ পাঞ্জাব, উত্তর-পশ্চিম ফ্রন্টিয়ার প্রদেশ ও বেলুচিস্তানেও মুসলিম লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করতে পারেনি। কেবল সিন্ধু প্রদেশে অতি সামান্য ভোটের ব্যবধানে মুসলিম লীগ কষ্টার্জিত জয়লাভ করে। বাংলায় মুসলিম লীগের এরূপ ভূমিধস বিজয় জিন্নাহ্্র পাকিস্তান সৃষ্টির দাবি ব্রিটিশ রাজের ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এই উপমহাদেশে পাকিস্তান সৃষ্টিতে বাঙালী মুসলমানদেরই মুখ্য অবদান ছিল। এই নির্বাচনের পর সোহরাওয়ার্দী বাংলায় ১৯৪৬ সালের ৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

স্মর্তব্য, ১৯৪৭ সালের পূর্ববর্তী বছরগুলোতে যুবক শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতায় অধ্যয়নরত অবস্থায় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সোহরাওয়ার্দীর একজন বিশ্বস্ত অনুসারী এবং তাঁর নেতৃত্বে পাকিস্তান দাবির সমর্থনে ১৯৪৫-৪৬-এর নির্বাচনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।

এ সময়ে ১৯৪৬ সালের ৯ এপ্রিল দিল্লীতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের ব্যবস্থাপক সভার সদস্যদের সম্মেলনে জিন্নাহ্্র পরামর্শে সোহরাওয়ার্দী একক পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ওই সভায় বাংলার মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ ব্যতিরেকে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের মুসলিম লীগের সকল নেতাই একক পাকিস্তানের পক্ষে মতামত প্রদান করেন এবং এরই ধারাবাহিকতায় একক পাকিস্তানের প্রস্তাব গৃহীত হয়। যদিও দিল্লী সভার প্রস্তাব সর্বভারতীয় লাহোর প্রস্তাবের ওপর প্রাধান্য পাবে কিনা সেই প্রশ্নও বাঙালী নেতৃবৃন্দের পক্ষ হতে উত্থাপন করা হয়; কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত টেকানো সম্ভব হয়নি।

১৯৪৭ সালের প্রথম দিকে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ তাদের ভুল বুঝতে পারেন এবং সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। জিন্নাহ্্ কিছুটা মৌন সম্মতি দিলেও কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের বিরোধিতার মুখে এই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ওহফরধহ ওহফবঢ়বহফবহপব অপঃ, ১৯৪৭-এর মাধ্যমে পাকিস্তান ও ভারত স্বাধীন করার জন্য ইম্পিরিয়াল পার্লামেন্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট স্বাধীন হলেও জিন্নাহ্্ ১১ আগস্ট গণপরিষদে প্রদত্ত প্রথম নীতিনির্ধারণী বক্তৃতায় পেছনের কথা ভুলে গিয়ে সকলে মিলেমিশে সমানভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন যে, ভবিষ্যতে ধর্মীয়ভাবে নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে ‘ঐরহফঁং ড়িঁষফ পবধংব ঃড় নব ঐরহফঁং ধহফ গঁংষরসং ড়িঁষফ পবধংব ঃড় নব গঁংষরসং’। এতে মনে হয় যে, নতুন রাষ্ট্রে তিনি হয়ত দ্বি-জাতিতত্ত্বের পরিবর্তে জাতিধর্ম নির্বিশেষে একটি আধুনিক রাষ্ট্র গড়ার কথা চিন্তা করেছিলেন।

কিন্তু অবাঙালী ও উর্দুভাষীদের গণপরিষদে পূর্ব বঙ্গের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করার মাধ্যমে পূর্ব বঙ্গের ওপর বঞ্চনা শুরু হলো। ফলে গণপরিষদে বাঙালী সদস্য সংখ্যা হ্রাস পায়। পরে জিন্নাহ্্ ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ঢাকার তদানীন্তন রেসকোর্স ও কার্জন হলে অনুষ্ঠিত দুটি পৃথক সভায় উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করেন। এর ফলে স্বাধীনতার ৭ মাসের মাথায় বাঙালীদের মননে একটি ধাক্কা লাগে এবং আশাভঙ্গের সূচনা হয়। ধীরে ধীরে পূর্ব বঙ্গ শুধু পূর্ব পাকিস্তানই হলো না, প্রকৃতপক্ষে পাঞ্জাবের কলোনিতে পরিণত হলো। শুরু হলো ২৩ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং প্রদেশগুলোতে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে প্রথমে ছয় দফা দাবি উত্থাপন করে সমগ্র পাকিস্তানজুড়ে প্রচারণা পরিচালনা করেন। জনগণের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা এবং ছয় দফার গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় শাসকগোষ্ঠী শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর দলের ওপর মিথ্যা ষড়যন্ত্র মামলাসহ কারা নির্যাতন চাপিয়ে দমন-পীড়নের নীতি গ্রহণ করে। ফলে দেশের জনগণের কাছে তিনি আরও বেশি গ্রহণযোগ্য হন এবং জনগণ তীব্র আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সহকর্মীদের কারামুক্ত করে তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করে। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলে সামরিক জান্তা আইয়ুব খান, যাকে এশিয়ার লৌহমানব বলা হতো, তিনি পদত্যাগে বাধ্য হলেন। পরবর্তী সামরিক জান্তা প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানও বাধ্য হলেন খবমধষ ঋৎধসবড়িৎশ ঙৎফবৎ (খঋঙ), ১৯৭০ মারফত আওয়ামী লীগ কর্তৃক দাবিকৃত সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করতে। আওয়ামী লীগ সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পাকিস্তানের এই প্রথম সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ধারাবাহিক সংগ্রামের মাধ্যমে জনগণের একক আস্থাভাজন নেতা হিসেবে তাঁকে পাকিস্তানের একমাত্র অবিসংবাদিত নেতা ও আওয়ামী লীগকে পাকিস্তানের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচিত করে তোলেন।

(২১ পৃষ্ঠার পর)

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংগ্রামের এক মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাঁদরেল সামরিক জান্তা জেনারেল ইয়াহিয়া খানও নির্বাচনের পরে শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্বোধন করেন।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খানের জাতীয় সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ নানা ক্ষোভ, দ্বিধাদ্বন্দ্ব সত্ত্বেও নিজেদের পাকিস্তানীই মনে করত, কারণ বাঙালীরাই তাদের ভোটের জোরে পাকিস্তান এনেছিল। কিন্তু ১ মার্চ অনির্দিষ্টকালের জন্য অধিবেশন স্থগিত ঘোষণায় পাকিস্তানী শাসকদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার একগুঁয়ে মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতিটি বাঙালীর একটি মাত্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় যে- আর নয়, আর পাকিস্তান নয়, এবার এক দফা, বাংলার স্বাধীনতা। বাঙালীর মনোজগতে এই স্বয়ংক্রিয় প্রতিক্রিয়ার স্র্রষ্টা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এই লক্ষ্যেই তিনি পূর্ববর্তী বছরগুলোতে ক্রমাগত আন্দোলন করে গিয়েছিলেন।

উল্লেখ্য যে, আওয়ামী লীগ ৬ দফার ভিত্তিতে সমগ্র পাকিস্তানের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে ১৯৭০ সালে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। ধারণা করা যায় যে, বঙ্গবন্ধুর মতো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ৬ দফার ওপর ভিত্তি করে আপাতত স্বায়ত্তশাসন অর্জনের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ধারাবাহিক পথপরিক্রমায় বাঙালীর স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছিলেন।

কিন্তু ১ মার্চ থেকে সমগ্র দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যেতে থাকে। সেই অপসৃয়মান প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যগণের তৎকালীন বিরাজমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এ কারণে যদিও ১ মার্চ হতে বাঙালীদের দাবি ৬ দফার পরিবর্তে ১ দফা তথা স্বাধীনতার দাবিতে পরিণত হয়; কিন্তু নির্বাচিত নেতৃবৃন্দকে তাদের নির্বাচনের সধহফধঃব এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি মাথায় রেখে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। বিশেষ করে ঐ সময় বায়াফ্রার স্বাধীনতা যুদ্ধ কোনভাবেই আন্তর্জাতিক সমর্থন পাচ্ছিল না, বরং বিচ্ছিন্নবাদীদের তৎপরতা হিসেবেই গণ্য হচ্ছিল। মনে হয় যে, এ সব জটিল আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সমস্যাগুলো মাথায় রেখেই বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ বলেছিলেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ - যা স্বাধীনতার ঘোষণা বোঝায় না, বরং একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে শাসকদের নিকট স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেয়। আরও ধারণা করা যায় যে, বঙ্গবন্ধু সম্ভবত আন্তর্জাতিক পরিম-লে এ বার্তাই দিতে চাচ্ছিলেন যে, পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ স্বায়ত্তশাসন চাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুসারেও তাদের জন্মগত অধিকার; কিন্তু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অস্ত্রের আসুরিক শক্তি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক আইন বহির্ভূতভাবে তাদের নিষ্পেষিত করে রাখতে চায়। এই প্রেক্ষাপটেই হয়ত তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন এবং সেই চরম দুর্যোগময় মুহূর্তে যখন পাকিস্তানের সামরিক শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ওপর নগ্নভাবে হত্যালীলা শুরু করতে যাচ্ছে তখন তাদের অত্যাচারের দায়ভার তাদের ওপরই চাপিয়ে দিয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরই ফলস্বরূপ আমরা দেখি যে, সারা বিশ্বের জনগণ বাংলাদেশের নিষ্পেষিত জনগণের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করতে থাকে। এই কৌশলটিই ছিল বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক এবং এ কারণেই তাঁকে ২৬ মার্চের শেষ সময় পর্যন্ত অসীম ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র কিংবা এর পশ্চিম ও পূর্ব অঞ্চল অবশ্যই বিদ্যমান ছিল। জাতিসংঘ সনদের আওতায় প্রত্যেক জাতি ও মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। ১ মার্চ পশ্চিম অঞ্চলে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বাধীন একটি সরকার কার্যকর থাকলেও পূর্ব অঞ্চল বা পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সরকারের কর্তৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে ১ মার্চের পর থেকে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ অকার্যকর হতে থাকে।

১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের মোট ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসন লাভ করে। এই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বঙ্গবন্ধুকে বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ১ মার্চ অপরাহ্ণে জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত বাঙালী সদস্যগণ এবং প্রাদেশিক সদস্যগণ তাদের সকলের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার সকল ক্ষমতা বঙ্গবন্ধুকে অর্পণ করেন। বঙ্গবন্ধুর ওপর এইরূপ আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা অর্পণের মাধ্যমে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের আপামর জনগণের পক্ষে তাঁর বক্তব্য প্রদান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের নৈতিক এবং আইনগত ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়।

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানে একটি নীতিনির্ধারণী ও বাঙালীর ভবিষ্যত কর্মপন্থা সম্পর্কে স্পষ্ট বক্তব্য রাখেন। তাঁর নির্দেশনা অনুসারে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সকল সরকারী অফিস- আদালত, বাণিজ্যিক সংস্থা, ব্যাংক, বীমাসহ সকল ধরনের অফিস পরিচালিত হতে থাকে। এমনকি কাঁচাবাজারের মালিকগণও সেনাবাহিনীকে খাদ্যসহ কাঁচামাল সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। দেশের সকল সাধারণ কার্যক্রম তাঁর নির্দেশ অনুসারে চলতে থাকে। চট্টগ্রামের ডক শ্রমিকগণ জাহাজ হতে অস্ত্র খালাস করা থেকে বিরত থাকে। দেশরক্ষা বিভাগে চাকরিরত বেসামরিক কর্মচারিগণও অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করে। ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে কেবল ক্যান্টনমেন্টগুলোতে পাকিস্তানের পতাকা উড্ডীয়মান হলেও সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়তে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৫ মার্চ ঢাকায় আগমন এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা আরম্ভ করেন।

এ প্রসঙ্গে সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে ১ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থান পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের জন্য এক তথাকথিত গণতন্ত্র সৃষ্টি করে একটি সংবিধান প্রণয়ন করেন। জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে উক্ত সংবিধান বাতিল করে সামরিক আইন জারি করেন। পরবর্তীকালে পাকিস্তান সুপ্রীমকোর্ট সামরিক আইন ও জেনারেল ইয়াহিয়া খানের শাসনকাল উভয়কেই অবৈধ ঘোষণা করে।

প্রত্যেকটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার জাতিসংঘ কর্র্তৃক স্বীকৃত। খঋঙ-এর আইনগত অবস্থান যাই হোক না কেন, পাকিস্তানে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে একটি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করায় দেশ সম্বন্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধিগণের শুধু নৈতিক নয়, বরং আইনগত অধিকারও জন্মায়, যা জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত হওয়ার দাবিও রাখে বটে। এরকম প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু তদানীন্তন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দলের নেতা ও বাঙালী জাতির নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে জেনারেল ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।

এবার আন্তর্জাতিক আইনের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি পর্যালোচনা করা যেতে পারে। এটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যে, দেশের জনগণ সাধারণভাবে দেশের মালিক। বিষয়টি তাত্ত্বিকভাবেও সঠিক। তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য প্রয়োজন হলো-‘সংশ্লিষ্ট সময়ে কোন্ শক্তির হাতে রাষ্ট্রটির কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ (বভভবপঃরাব পড়হঃৎড়ষ)’ বিদ্যমান ছিল তা নিরূপণ করা।

১৯৭১ সালের ১ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সময়কালে নিঃসন্দেহে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তথা বাংলাদেশের জনগণ তাদের প্রতিনিধিগণের মাধ্যমে দেশের দৈনন্দিন সাধারণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও জনপ্রতিনিধিগণ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের সকল প্রকার প্রশাসনিক কার্যক্রমের কার্যকরী নিয়ন্ত্রণে (বভভবপঃরাব পড়হঃৎড়ষ) ছিলেন তা বলা যায় না। জেনারেল ইয়াহিয়া খান ও তার সামরিক কর্তৃত্ব সত্যিকার অর্থে অবৈধ হলেও প্রকৃতপক্ষে তারাই পূর্ব পাকিস্তানের এই অঞ্চলসহ সমগ্র পাকিস্তানের কার্যকর নিয়ন্ত্রক ছিল। যার প্রকাশ ঘটে ২৫ মার্চের দিবাগত রাতে পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্মম ও পৈশাচিক প্রকাশে এবং সমাপ্তি ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর অপরাহ্ণে ঢাকায় মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে। ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে যে বাঙালী জাতিসত্তার বোধন, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। এরপর নয় মাসব্যাপী সশস্ত্র সংগ্রাম। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে বাঙালী জাতিসত্তা কার্যকরিতা লাভ করেছিল, তা সশস্ত্র সংগ্রামে বাঙালীকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যা পূর্ণতা পায় ১৬ ডিসেম্বরে। বাঙালী জাতি বাংলাদেশের ফব ভধপঃড় ও ফব লঁৎব মালিক হয়।

১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের প্রথম বার্ষিকীতে বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হয়। এই সংবিধান মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় লিখিত। এর ৪টি মূলনীতির একটি ধর্মনিরপেক্ষতা। সংবিধানে এই মূলনীতি গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে দ্বি-জাতিতত্ত্বের আনুষ্ঠানিক মৃত্যু ঘটে। কিন্তু ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর পাকিস্তানী ধারা ফিরিয়ে আনা হয়। যা ছিল একাত্তরের পরাজিত শক্তির ঘুরে দাঁড়ানোর অপতৎপরতা। কিন্তু নিহত মুজিব জীবিত মুজিবের চেয়ে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছেন। বিশ্বজুড়ে তাঁর নাম আজও চিরজাগরূক।

লেখক : সাবেক প্রধান বিচারপতি, বর্তমানে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান