২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বঙ্গবন্ধুর কন্যা, এ আমার অহঙ্কার...

  • -শেখ রেহানা

একটি ফল, খাদ্যপ্রাণসমৃদ্ধ মৌমাত-করা ঘ্রাণযুক্ত ফল। আরবি শব্দ ‘রেহানা’র অর্থ এ রকমই। শেখ রেহানা, তাঁর একটি পরিচয়ই যথেষ্ট ছিল, তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট মেয়ে। হয়ত এই পরিচয়েই নিভৃতে নিস্তরঙ্গভাবে আনন্দে-সুখে সারাটা জীবন পার করতেন, যদি পঁচাত্তরের নির্মম-নৃশংস ঘটনা না ঘটত। সেই ১৫ আগস্ট চিরদিনের জন্য উলটেপালটে দিয়েছিল তাঁর ও তাঁর আপা শেখ হাসিনার জীবন। সে এক মহাবৈরী সময়। পাথরসম। যেন সেই পাষাণের ভার আর নামবে না কোনদিন। বলা যায়, ভস্ম থেকে ফিনিক্স পাখির মতো তাঁরা ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন নতুন সংগ্রামে। তারপরের ঘটনার পরিক্রমা হার মানায় অতি কল্পঋদ্ধ উপন্যাসকেও। পনেরো আগস্টের পর তাঁদের পিছু নিয়েছিল ‘অযোগ্যের উপহাস’। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেনÑ ‘নক্ষত্র খসিল দেখি দীপ মরে হেসে।/বলে, এত ধুমধাম, এই হলো শেষে!/রাত্রি বলে, হেসে নাও, বলে নাও সুখে,/যতক্ষণ তেলটুকু নাহি যায় চুকে।’

অযোগ্যদের ষড়যন্ত্রকারীদের সেই তেল এখন তলানিতে। তারপরও নিত্যনতুন ষড়যন্ত্র ডানা মেলার চেষ্টা করে তাঁদের ঘিরে। এসব ষড়যন্ত্র কিভাবে মোকাবেলা করেন তাঁরা? কোথা থেকে শক্তি পান জীবন-সংগ্রামের? দুঃসময়ের দুর্বিষহ যন্ত্রণার মধ্যে কিভাবে একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তাঁরা? কী তাঁদের জীবনদর্শন?

পিতার হত্যার পর রাজনৈতিক আশ্রয়ে লন্ডনেই বসবাস শুরু করেন শেখ রেহানা। অতীব কষ্টে কালাতিপাত করেছেন, যদিও তাঁর সম্পর্কে রটনা কম নয়। সাদাসিধে ছোট একটি আড়ম্বরহীন ফ্ল্যাটে বসবাস করেন; বাসে, টিউব-রেলেই চলাফেরা করেন, পার্টটাইম চাকরি করেন। তিন সন্তান-রেদওয়ান সিদ্দিক ববি, টিউলিপ সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তী। টিউলিপ সিদ্দিক কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন লন্ডনের ক্যামডেন কাউন্সিলের লেবার পার্টির পক্ষ থেকে। বর্তমানে তিনি পার্লামেন্টারি সিলেক্ট কমিটির সদস্য।

১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৫৫ সালে জন্ম নেয়া বঙ্গবন্ধুর এই নিভৃতচারী কনিষ্ঠা কন্যার জীবন সংগ্রামের টুকরো টুকরো ঘটনা উঠে এসেছে এই আলাপচারিতায়। জীবন-ঘনিষ্ঠ একান্ত সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করেছেন পাক্ষিক অনন্যার সম্পাদক ও প্রকাশক এবং দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেনÑ

তাসমিমা হোসেন : তোমার মেয়ে টিউলিপ ব্রিটিশ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেÑ তুমি কি চেয়েছিলে যে তোমার মেয়ে পলিটিকসে আসুক? তুমি কি চেয়েছিলে যে, বঙ্গবন্ধুর নাতনি হিসেবে বাংলাদেশে না হোক, বিদেশেই থাকুক না কেনÑ রাজনীতিতে যুক্ত হোক?

শেখ রেহানা : আমার ছেলেমেয়ে পলিটিকসে যাক তা আমি কখনই চাইনি। এত ভাল স্টুডেন্ট, পড়াশোনায় এত ভালÑ নাটক করে, পিয়ানো বাজায়, আমি সব সময় ভাবতামÑ টিউলিপ টিচার হিসেবে খুব ভাল করবে। সে তো টিচারই ছিল; টিউশনি করত। আমি ভাবতামÑ ও উন্নতি করবেই। কিন্তু পলিটিকসে কোনদিন জড়াবে নিজেকেÑ এটা ভাবিনি।

তাসমিমা হোসেন : তুমি স্থায়ীভাবে ব্রিটেনে বসবাস শুরু করলেÑ এটা কি বাচ্চাদের নিরাপত্তার জন্য, নাকি লেখাপড়ার জন্য?

শেখ রেহানা : কিছুটা পারিবারিক, কিছুটা বাচ্চাদের লেখাপড়ার জন্য। ওরা ওই দেশের (ব্রিটেনের) নাগরিক। ওখানে পড়াশোনার এত সুযোগ-সুবিধা! মানুষ জমি-বাড়িঘর বিক্রি করে ছেলেমেয়েকে বিদেশে পড়াশোনা করাতে পাঠায়। আমি ভাবলাম, এই সুযোগ থেকে ওদের বঞ্চিত করব কেন? আমি নিজে লন্ডনে থেকেও টাকা-পয়সার কারণে পড়াশোনার সুযোগ পাইনিÑ ওটাও একটা কারণ। আর নিরাপত্তা তো ছিলই। কারণ এখানে (বাংলাদেশে) নানাধরনের হুমকি-টুমকি পেতাম। সেজন্য ভাবলাম ওদের ওখানেই পড়াই।

তাসমিমা হোসেন : আজকাল যাদের সামর্থ্য আছে তারা বাচ্চাদের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ায়। তাদের বাচ্চারা বাংলাটা ভিন্নরকম এ্যাকসেন্টে বলে। তোমার বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বললে মনে হয়Ñ এই সমস্যাটা তাদের নেই।

শেখ রেহানা : ওদের সঙ্গে আমার প্রথম কথাই ছিলÑ তোমরা বাড়িতে বাংলা বলবে। বাংলা পড়তে হবে। কারণ তোমরা বঙ্গবন্ধুর নাতি। আমার সঙ্গে গ্রামগঞ্জে যেতে হবে। সেখানে আত্মীয়স্বজন সবাই ইংরেজী পারে নাÑ একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যাবে। তো, তারা অন্য বন্ধুদের সঙ্গে ইংরেজীতে কথা বলত, কিন্তু বাড়িতে বলত বাংলা। কোন এ্যাকসেন্ট দিয়ে ওরা বাংলা বলে না, স্পষ্ট বাংলা বলে। বাসায় ওদের আমি প্রচুর বাংলা বই পড়াতাম। প্রথম ভাষাটাই ওরা বাংলা শিখে।

তাসমিমা হোসেন : যখন তুমি ওদের বাংলা বই পড়াতে সেখানে নিশ্চয়ই রবীন্দ্রনাথ, নজরুল আর আমাদের মুক্তি সংগ্রামের বইও থাকত?

শেখ রেহানা : হ্যাঁ, নজরুল-রবীন্দ্রনাথ আর নেতাজী সুভাষের বই বেশি পড়াতাম। কবিতা পড়াতাম। জীবনানন্দ দাশ ও সুকান্তের কবিতা পড়াতাম। বেগম রোকেয়ার বই আমি পড়ে পড়ে শোনাতাম। টিউলিপের মাস্টার্সের যে ডিসার্টেশনÑ সেটা রবীন্দ্রনাথের ওপরে লেখা। যদিও সেটা ইংরেজীতে। রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ পড়ে আমার মেয়ে পাগল হয়ে গিয়েছিল। আমি বাংলায় পড়তাম। ও সেটা ইংরেজী করত এবং টিউলিপের যখন বিয়ে হয়Ñ রেজিস্ট্রেশনের সময় প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে আমি ‘আলো আমার আলো’ কবিতাটি পড়াই।

(২১ পৃষ্ঠার পর)

তাসমিমা হোসেন : আমরা যতদূর জানি, বঙ্গবন্ধু কবিতা আবৃত্তি করতেন। সাহিত্য, সংস্কৃতির প্রতি বঙ্গবন্ধুর গভীর আগ্রহ ছিল। সাহিত্যের প্রতি এই ভালবাসা তুমি কি বাবার কাছ থেকে পেয়েছ? নাকি মায়ের কাছ থেকে? কিংবা দু’জনেরই প্রভাব রয়েছে?

শেখ রেহানা : মা প্রচুর বই পড়তেন। আর আব্বার কাছ থেকে তো অবশ্যই। আর আমি তো এ্যাডভান্স বাংলার ছাত্রী ছিলাম কলেজে। আপনি জানেন না বোধহয়, ছোটবেলায় ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসরেরও সদস্য ছিলাম। মাঝে মধ্যে একটা-দু’টা লেখাও ছাপা হতো।

তাসমিমা হোসেন : বেবী মওদুদ যখন বেঁচেছিলেন তোমার একটা-দু’টা লেখা পত্রিকায় আমরা দেখতে পেতাম। তোমার নিশ্চয়ই লিখতে ইচ্ছে করে, কিন্তু এত কম লেখা দেখতে পাই কেন?

শেখ রেহানা : হ্যাঁ, আমি লিখি। কিন্তু ছাপানোর ইচ্ছাটা কম।

তাসমিমা হোসেন : তোমার আত্মজীবনী লিখতে ইচ্ছে করে না?

শেখ রেহানা : বঙ্গবন্ধুর কন্যা ছাড়া আমার তো জীবনীর আর কী আছে?

তাসমিমা হোসেন : কিন্তু তোমার দেখা পরিবারের যে ঘটনাগুলোÑ সেটা তো আমাদের ইতিহাস। এর একটা বিরাট মূল্য আছে। সেদিক থেকে তোমার আত্মজীবনীও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

শেখ রেহানা : অনেক ঘটনা আমি অল্প-অল্প করে লিখে রাখি। আর বেবী (মওদুদ) আপা জোর করে বসে থেকে লিখিয়ে নিত। বলত, আমি উঠব না। আর অনেক সময় ঘটনা যখন দেখি মানুষ পেপারে মিথ্যা কথা লেখে, তখন আপাকে (শেখ হাসিনা) বলিÑ ‘আপা, এটা তো ডাহা মিথ্যা কথা।’ উনি বলেন, ‘তুমি লেখ না কেন?’ আমি তখন লিখে রাখিÑ ঘটনা এটা না, ওটা। আমি তখন ছোট হলেও অনেক ঘটনার সাক্ষী। আর বঙ্গবন্ধুর কোন গুণ না পেলেও স্মরণশক্তিটা এই বয়সে এসেও আল্লাহর রহমতে খুব ভাল আছে। একবার যেটা দেখি বা শুনি সেটা আর ভুলি না।

তাসমিমা হোসেন : হ্যাঁ, যাঁরা প্রত্যক্ষদর্শী, সেই তোমাদের কাছ থেকেই তো আমাদের জানতে হবে। রাজনীতি এমন একটা জিনিস, সেটার ইতিহাস সবসময় বিকৃত করার ষড়যন্ত্র হয়।

শেখ রেহানা : পলিটিক্যালি অনেক কথা হয়ত জানি না। কারণ আমরা এত ছোট ছিলাম যে, আমাদের সঙ্গে আলোচনা করা হতো না।

কিন্তু অনেক জিনিস চোখের দেখাÑ এখন মনে পড়েÑ ওই যে সাতই মার্চের ভাষণÑ আমি, আপা, দুলাভাই, আমরা তো সামনে দাঁড়ানো ছিলাম। আব্বা তো কখনও ‘জয় পাকিস্তান’ বলে নাই। আব্বা নেমে যাওয়ার পরে আমরা বের হয়ে শহীদ মিনারের কাছে চলে আসলাম। স্পষ্ট মনে আছে। মানুষ যখন এই কথাগুলো বলে, সবাই না, কিছু লোক, তখন মনে হয় এই লোক এমন মিথ্যা কেন বলে? আব্বা বেঁচে নেই। যেই লোকটা বেঁচে নেই তার সম্পর্কে কেন মিথ্যা কথা বলছে?

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময়Ñ ছোট হলেও জানতাম, কিভাবে কি ঘটনা ঘটছে, জানতাম। অনেক সময় মা আলোচনা করতেন। তারপর ৬ দফার সময় খুব ছোট ছিলাম। বাড়িতে তো একটা রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল। তারপর তাজউদ্দীন চাচাকে নিয়ে কত ধরনের কথা, সত্য মিথ্যা মিশিয়ে। আব্বা আর তাজউদ্দীন চাচার মধ্যে যে একটা সম্পর্ক ছিলÑ যে যাই লিখুক তাদের সম্পর্ক আপন ভাইয়ের চেয়েও বেশি ছিল। আব্বা জেলে কেন? এই প্রশ্নটা মনে আসত। দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করে, মানুষকে ভালবাসেÑ মায়ের মুখে দাদির কথা শুনতাম। শুনতাম, কিন্তু মুখ বন্ধ রাখতে হবে। কারণ বাড়ির সামনে সব সময় আইবি’র লোক।

তাসমিমা হোসেন : রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠাও তো রাজনৈতিক ট্রেনিংয়ের মতো।

শেখ রেহানা : হ্যাঁ, আমিও আমার বাচ্চাদের রাজা-রানীর গল্পের পাশাপাশি রাজনীতির কথা এবং বাংলাদেশের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, মায়ের মুখে যা শুনেছিÑ সেগুলো বলতাম। ওরা তখন অনেক ছোট, ওরা তো বুঝবে না যে কিভাবে ঘটেছে পঁচাত্তরের নৃশংস ঘটনা, ওরা তো গুলি বুঝত না। এটাকে অন্যভাবে বলতাম, বড় হয়ে তো ওরা নিজেরাই বুঝতে পারবে। আমরাও মায়ের কাছ থেকে এভাবেই শিখেছি। মা-দাদির কাছ থেকেই বেশি শেখা। নানা ধরনের লোকজন আসত। এসবির লোকজন বাড়ির সামনে পেছনে নানা জায়গায় থাকত। মা বলত, কেউ কিছু দিলে হাতে নেবে না, বাড়ির কোন কথা কাউকে বলবে না। আমরা দুই ভাইবোন স্ট্যাম্প কালেক্ট করতাম। যখন মিরপুর রোডে আবাহনী বা সোবহানবাগে খেলতে যেতাম, কেউ প্রশ্ন করলে আমরা চুপ করে থাকতাম, বলতাম না। জিজ্ঞেস করত, বাড়িতে কে কে? কে আসে না আসে। যার জন্য একেক জনের বিশেষ কোড নাম ছিল। এ ইটওয়ালা, ও সিমেন্টওয়ালা, ও বালিওয়ালা।

তাসমিমা হোসেন : আমি সব সময় দেখেছি যে, তোমার কথার মধ্যে দারুণ সেন্স অব হিউমার প্রকাশ পায়। তুমি কোন ঘটনা এমনভাবে বর্ণনা কর, ওটা যদি কষ্টেরও হয়, তার মধ্যেও একটা হিউমার থাকে।

শেখ রেহানা : হ্যাঁ, এভাবে নিজেকে আমি হাল্কা রাখি।

তাসমিমা হোসেন : তোমাদের তখন এত কষ্ট এত সংগ্রামের মধ্যেও কিন্তু মা তোমাদের। ভাইবোনদের মানুষ করেছেন। এখনকার দিনে দেখা যায়, পাঁচটা বাচ্চা থাকলে অনেক সময় তিনটাই বখে যায়। আবার বাবা-মা যখন বিখ্যাত হন তখন অনেক বাচ্চার মাথা ঘুরে যায়। কিন্তু তোমরা একদম মাটির সঙ্গে মিশে বড় হয়েছ। এই যে তোমার বাচ্চারা বিদেশে লেখাপড়া করে, তাদের নিয়েও মাটির সঙ্গে গ্রামের সঙ্গে একটা সংযোগ তৈরি করেছ। এই বৈশিষ্ট্য কি তুমি মা-বাবার কাছ থেকে পেয়েছ? নাকি ভেতর থেকেইÑ বাংলার মাটি, বাংলার প্রতি ভালবাসা থেকে পেয়েছ?

শেখ রেহানা : ভেতর থেকে তো অবশ্যই। দাদির কাছ থেকে অনেক কিছু শেখা। আর আমার মায়ের কাছ থেকে। আমার মায়ের জীবনে এত কষ্ট, এত সংগ্রাম! ভাল স্কুলে পড়ানোর জন্য মাকে কত কথা শুনতে হয়েছে। কিন্ডারগার্টেন, শাহীন স্কুল, আদমজী ক্যান্টনমেন্টে পড়ানো, নাচ শেখানো, বুলবুল একাডেমিতে ভর্তি করানোÑ সবই মায়ের উৎসাহে। অনেকে বলতেনÑ হ্যাঁ, মেয়েকে নাচাবা নাকি। মা বলতেনÑ না, শিখুক সবকিছু, কখন কী দরকার হয়। মা সবসময় একটা কথা বলতেন, ওই কার্পেট, ওই ঝাড়বাতিÑ এগুলো কিন্তু কিছু না। তোমার নিজস্ব যেটুকু, সেটুকুই তোমার। আমার বাচ্চাদেরও ঠিক সেভাবেই গড়েছি। যেদিন আপা (শেখ হাসিনা) পাওয়ারে আসলেন, আমরা গণভবনে গেলাম। আমার বাচ্চাগুলো তখন ছোট ছোট। ববি ছোট, টিউলিপ ছোট, রূপন্তী তো একেবারেই ছোট। আমি বললাম যে, এইগুলো কিন্তু নাট্যমঞ্চ, আসল না। আমার ছেলেকে বললাম, অনেক বয়স্ক লোক তোমাকে স্যার বলে সালাম দেবেন, তুমি কিন্তু নিচের দিকে তাকিয়ে সম্মান করবা। তুমি ববি, তুমি কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নাতি- এ কথাটা তোমাকে মনে রাখতে হবে। এই দামী গাড়ি, এই চাকচিক্যÑ এগুলো কিছুই না। ওরা এখন পর্যন্ত সেই রকমই আছে। এটুকুই আমাদের জীবনের সার্থকতা। আর টাকা-পয়সা হিসাব করে চলার বিষয়টিও ছিল। দোকানে গেলে বেশি না, একটা মাত্র ভাল জিনিস কেনোÑ হয় চকোলেট, আইসক্রিম বা অন্যকিছু। কিন্তু একটার বেশি নয়। এখন পর্যন্ত এটা ওরা ধরে রেখেছে। এখন তো ওরা নিজেরাই উপার্জন করে। কিন্তু এখনও বলি, একদিনে বেশি খুশি হয়ো না, কালকের জন্য রাখ। আজকে আইসক্রিম খাবে তো কেক হবে না।

তাসমিমা হোসেন : দারুণ ব্যাপার। এই সংযমটা আজকাল বাচ্চারা পারে না। শুধু বলেÑ দাও দাও। আর মায়েরা খুশি করার জন্য দিয়েও দেয়, সংযম শেখানোর কষ্টটা মায়েরা নিতে চায় না।

শেখ রেহানা : নতুন কিছু হাতে দেখলে প্রশ্ন করতাম, এটা কোথায় পেলে? ওরাও আমার কাছে নতুন কিছু দেখলে প্রশ্ন করে, মা এটা কোথায় পেলে? আমার মাও তাই করতেন। আমাদের সময় গল্পের বই আর গানের রেকর্ডÑ উপহারের মধ্যে তো এই দুটোই ছিল। এখন তো কত ধরনের উপহার!

তাসমিমা হোসেন : বঙ্গবন্ধুকে যখন নির্মমভাবে হত্যা করা হলো, সেই নৃশংসতার মধ্যেও কিছু মানুষ কুৎসা রটালÑ ওই বাড়িতে অনেক সোনা-দানা, সোনার মুকুট। কিন্তু যখন বাড়ি সার্চ করা হলোÑ তখন এসব কুৎসা মিথ্যা প্রমাণিত হলো। কোথাও ব্যাংক এ্যাকাউন্টের কাগজপত্রÑ কিছুই দেখাতে পারল না। বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িটি ছাড়া আর কোথাও কিছু দেখাতে পারেনি ষড়যন্ত্রকারীরা। সেটা নিয়ে কেউ কিছু বলেও না। তোমরা বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে তখন দেশেও আসতে পারতে না। এই যে বলে, বাক্সভর্তি টাকা এসেছে। লন্ডনে রেহানার বিপুল অর্থ সম্পদ! এই যে একেবারে বানোয়াট কথাÑ এসব শুনলে তোমার কেমন লাগে? কতটা রাগ লাগে? আর তোমার বাচ্চাদের যে এত সুন্দর করে মানুষ করলে, সেটা দেখলেও আমাদের দেশের অনেকে ভাবেÑ এসব অর্জন বুঝি বাংলাদেশে যেমন একে-ওকে ফোন করে পাওয়া যায়, তেমনি করে পাওয়া। বাংলাদেশে যেভাবে নমিনেশনও পেয়ে যায়, ভোটও পেয়ে যায়Ñ ব্রিটেনে তো সেটা সম্ভব নয়। তাই, এসব মিথ্যা কথা তুমি কী করে সহ্য কর?

শেখ রেহানা : আগে খুব কষ্ট হতো, অভিমান হতো। আমরা এত কষ্ট করলামÑ আব্বা প্রধানমন্ত্রী থাকার পরও আমি বকশীবাজারে রিক্সা করে যেতাম। ...

তাসমিমা হোসেন : তোমরা যখন লন্ডনে গেলে, ওই সময়? চেনা মানুষরাও তোমাদের পাশ দিয়ে যেত, তাকাত না। কিন্তু তুমি চাকরি করেছ, পাবলিক বাসে যাতায়াত করেছÑ

শেখ রেহানা : হ্যাঁ, আমি এখনও বাসে চড়ি, আমার একটুও লজ্জা করে না। আমার চাচা, আব্বার কাজিন, উনি বলতেন, মা আমি তোকে ট্যাক্সি করে দেই। আমি বলেছি, না আমি চলে যাব। ওই তো স্টপেজ। বলেছি, চাচা আব্বা যদি টাকা চুরি করে রেখে যেত এত জোরে কথা বলতে পারতাম? আমার বুকটা এত বড় হয়ে যায়। মাঝে মাঝে মনে হতোÑ বাচ্চাদের জন্য এটা-ওটা করতে পারছি না! আব্বা বলতেন, ‘দেখো, অন্য লোকদের দেখোÑ তারা কত কষ্টে আছে। তোমরা তো তাও দুইবেলা ভাত পাচ্ছ।’ ওই সব কথা চিন্তা করি, মায়ের কথা, দাদির কথা চিন্তা করি। আমার তো বাচ্চার দুধের টিনের জন্য লাইন দিতে হচ্ছে না। আমি ওদের মুখে তাও তো কিছু দিতে পারছি। দাম কম হলেও একটা খেলনা তো কিনে দিতে পারছি, অন্যরা তো পারেও না। আমরা তো মাটির পুতুল বা বিদেশ থেকে একটা উপহার আনলে ওটা শোকেসে রেখে দিতাম।

তাসমিমা হোসেন : এই যে তুমি কথাগুলো বললে, এই উপলব্ধিই তো মানুষের হয় না। ভুলে যায় মানুষ। অতীতের সবকিছু ভুলে বর্তমানের সুখটাকেই সারাজীবনের জন্য ধরে রাখতে চায়। তুমি এত কষ্টের পরও হাসিমুখে কথাগুলো বলছ! এটা আমাদের দেশের মেয়েদের জন্য অনেক বড় আত্মশিক্ষা! তুমি কেমন করে পার? কোথা থেকে পাও আত্মশক্তি?

শেখ রেহানা : আমার মা, আমার দাদির কাছ থেকে পাই। আর আমার আব্বা। আমি কার মেয়েÑ সব সময় এটা মনে রাখি। আব্বার ডায়েরি পড়ার পর থেকে তো আমি আরও অবাক হয়ে গেছি। এই যে জেলখানায় এত কষ্ট তারপরও হাসিমুখে দেখেছি আব্বাকে, আর সবসময় মানুষের কথা চিন্তা করতেন। পাকিস্তানের তরফে তাঁকে তো কত রকম অফার দেয়া হয়েছিলÑ আমাদের পাকিস্তানে নিয়ে আরাম-আয়েসে রাখার...। আব্বা কম্প্রোমাইস করতে পারতেন। করেননি তো। আমার দাদার তো গোলাভরা ধান ছিল। পেট ভরে খেতে পারতাম। আমদের প্রাচুর্য ছিল না, কিন্তু যা ছিল তা ভালমতো বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট। আর আমি মনে করি দান করলে কখনও কমে না। আমার ছেলেমেয়ে এখনও একটা জিনিস যদি কাউকে দিয়ে দেয়, যদি আমিই জিজ্ঞেস করিÑ ‘কেন দিয়ে দিলে?’ বলে, মা তুমিই তো বলেছÑ ‘দিলে কমে না। নানা, তোমার দাদি কাউকে ফিরায়নি। এক মুঠো চাল হলেও লুকিয়ে দিয়ে দিতেন।’ এখন যখন খুশির কিছু হয় তখন ইচ্ছে করে দৌড় দিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে সব বলি। আপা (শেখ হাসিনা) যে এত কাজ করতে পারেন, মায়ের তো ধারণা ছিল আপা খুব আরামপ্রিয়।

তাসমিমা হোসেন : বড় সন্তান বলে?

শেখ রেহানা : হ্যাঁ, ইউনিভার্সিটিতে যাবে, কাপড়টাও মা রেডি করে দিতেন। আপা এসে তো গল্পের বই আর অনুরোধের আসর নিয়ে বসতেন।

তাসমিমা হোসেন : তোমার মুখে শুনেছিÑ বই পড়া সিনেমা দেখাÑ আপার খুব শখ ছিল।

শেখ রেহানা : হ্যাঁ, মাঝে মাঝে পুরনো গান পুরনো সিনেমা ছেড়ে দেই। লন্ডনে যখন ফোন করে, গান ছেড়ে দিয়ে বলি, এই গানটা মনে পড়ে? আপা অবাক হয়ে বলে এটা কোথায় পেলি? আমার তো গানের অনেক কালেকশন। টিউলিপ যেদিন ওখানে (ব্রিটেনে) অনেক ভোটের ব্যবধানে জিতে এমপি হয়, আমার একটাই আপসোসের কথা আপাকে বলি, আপা আমি যদি দৌড় দিয়ে মায়ের কাছে গিয়ে বলতে পারতাম! যখন খুব অস্থির হয়ে যাই, তখনই হঠাৎ করে আমার মায়ের কথা মনে হয়। মাইক্রোওয়েভে আমরা খাবার গরম করি, ৫ মিনিট সহ্য হয় না। আমি তখন চিন্তা করি, আমরা পাঁচটা ভাই-বোন। ন্যাপি তো দূরের কথা, মায়ের কাঁথা ধুতে ধুতেই তো জান শেষ হয়ে যেত। মা কেমন করে পারত? তাহলে আমি পারব না কেন? তারপর রান্নায় গ্যাস জ্বালিয়ে দেই, বাজারে সব রেডি, আর মা লাকড়ির চুলায় ফুঁ দিয়ে দিয়েÑ গাল দুটো লাল টকটকে হয়ে যেত। পরিবারের লোকজন, পলিটিক্যাল লোকজন, পুরা গোষ্ঠীর রান্না। মা কেমন করে পারতেন? বর্ষাকাল আসলে মায়ের সে কী চিন্তা ! তখন তো গ্যাস ছিল না। আমাদের লাকড়ির চুলা আর একটা কয়লার চুলা ছিল। আমারও অবশ্য ডিসপজেবল ন্যাপি বাচ্চাদের পড়ানোর সৌভাগ্য হয়নি। আমি বাথটবের মধ্যে বসে বসে কাপড় কাচতাম। আপা একবার দেখে আমাকে একটা ওয়াশিং মেশিন কিনে দিয়ে আসে। কারণ আমার তখন আপারেশন হয়েছিল, খুব কষ্ট হতো।

তাসমিমা হোসেন : মা-দাদির জীবন সংগ্রামের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে দেখা?

শেখ রেহানা : হ্যাঁ, এই সব জিনিস চিন্তা করি, আর ভাবি আমি কত ভাল আছি! আর আমার থেকে কত কষ্টে আছে কত মানুষ। এই যে ইয়াং মেয়েরা, যাদের সচ্ছলতা নেই, যারা বস্তিতে থাকে, জীবনে আনন্দ কী জিনিস জানে না। কর্মজীবী মেয়েদের কত সমস্যা, কত বাধা থাকে। তখন চিন্তা করি, আমরা কত লাকি। একটা সাজের জিনিস, একটা লিপিস্টিক পেলে আমার মেয়ে কত খুশি হয়! ঠিক রূপন্তীর বয়সী আরেকটা মেয়ে তারাও পেলে খুশি হয় নিশ্চয়ই, কিন্তু পায় না। আমার বাসায় আমাকে যারা হেল্প করে, আমি যখন কারও জন্য কিছু কিনি ওদের জন্যও কিছু নিয়ে আসি। সেটা হতে পারে একটা লিপিস্টিক, ক্রিম, লোশন, সাজার জিনিস, ভাল সাবান, সবার জন্য তো আনা সম্ভব না। যতটুকু পারি। মানুষের একটা সময় থাকে যখন পছন্দের জিনিস দেখলে বেহুঁশ হয়ে যেতে হয়Ñ এটা লাগবেই, কিনতেই হবে! কিন্তু এখন যত বয়স বাড়ছে, ততই মনে হয়, এটা লাগবেই কেন? না কিনলে কী হয়?

তাসমিমা হোসেন : তোমাকে কখনও দেখিনি দামী শাড়ি পরতে। হীরার দামী কিছু পরতে।

শেখ রেহানা : আসলে, আমার এসবে লজ্জা লাগে। মনে হয়, কী দরকার। আর আমার হীরা-জহরত সোনাদানা না, জিনিসটা সুন্দর হলেই আমি খুশি, সেটা ইমিটেশন বা রূপার হোক, আর শাড়ি সুতি বা বেনারসি যাই হোক না কেনÑ একটু আরাম আর সুন্দর হতে হবে, তা হলেই আমি খুশি। আমি সুন্দরের পূজারি। (হেসে) দেখেন না আপনারে আমি কত পছন্দ করি।

তাসমিমা হোসেন : তোমার মেয়েদের দেখলেও মনে হয় সুন্দরের পূজারি। আমার তো মনে হয় টিউলিপ খুব রোমান্টিক।

শেখ রেহানা : হ্যাঁ।

তাসমিমা হোসেন : ও এত সুন্দর একটা মানুষকে বিয়ে করল। মনে হয় ওর স্বামী ওর ব্যাপারে খুব টেক কেয়ারিং।

শেখ রেহানা : ও টিউলিপকে এত সহযোগিতা করে। চাকরি থেকে পাঁচটা মাস ছুটি নিয়ে দিন নাই রাত নাই ২৪ ঘণ্টা টিউলিপকে সাহায্য করেছেÑ

তাসমিমা হোসেন : আচ্ছা, টিউলিপ প্রথম যখন বলল, আমি ব্রিটিশ পলিটিকসে যেতে চাইÑ তখন তোমার ভেতরে কেমন প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?

শেখ রেহানা : আমি বললাম, মা! আবার সেই পলিটিক্স! আমি সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে বিদেশে এসেছি, যাতে পলিটিকসের ছায়া আমার ওপর না থাকে। রাজনীতির সঙ্গে যে একেবারেই ছিলাম না, তা নয়। ধানম-ি স্কুলে ছাত্রলীগের কমিটি করতে কামাল ভাই পাঠালে আমি ওখানে সেক্রেটারি ছিলাম। কাগজটা আজও আমার কাছে আছে। কলেজে অতটা জড়িত ছিলাম না। কারণ আব্বা তখন ক্ষমতায়। রাজনীতি থেকে একটু দূরে সরে থাকতাম। পঁচাত্তরের পরেÑ এটা পলিটিকস না, আমার নিজের চ্যালেঞ্জ ছিল যে, ওরা কী মনে করে? আমার তিন-তিনটা ভাইকে ওরা শেষ করে দিল, আমাদের দুই বোনকে হিসেবের মধ্যে ধরে না! সুইডেনে প্রথম প্রতিবাদটা আমিই করি। আপাকে (শেখ হাসিনা) চিঠি লিখলামÑ আপা, একটা সুযোগ চলে আসছে মিনিস্ট্রিতে গিয়ে প্রতিবাদ করার। এই প্রথম প্রতিবাদটা আমিই করি।

তাসমিমা হোসেন : এটা কত সালে?

শেখ রেহানা : ১৯৭৮ বা ’৭৯ সালে। তারপর লন্ডনে মালেক উকিল সাহেব ও কামাল হোসেন সাহেবকে নিয়ে আমি প্রেস কনফারেন্স করি। এরপর স্যার উইলিয়ামের কথা মনে ছিলÑ উনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কাজ করেছিলেন; আমি, শফিক চাচা, খোকা চাচা তাঁকে খুঁজে বের করে হাউস অব কমন্সে গিয়ে স্যার হেরল্ড উইলসনের সঙ্গে দেখা করি। তিনি আমাদের বুদ্ধি দিলেনÑ তোমরা এনকোয়েরি কমিটি কর, আমি সহযোগিতা করব। তখন হাউস অব কমন্সে প্রবেশের পাস পেতেই আমার এক বছর লেগে যায়। এখন তো আমার মেয়ের কারণে যখন-তখন ঢুকতে পারি। ওই হাউস অব কমন্সে তিনি বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল স্পিচ দিলেন। শন ম্যাগগ্রা, মাইকেল ওয়ান্স, স্যার টমাস উইলিয়াম ছিলেন। মতিন সাহেবের (আবদুল মতিন) বই ‘ট্রিবিউট টু বঙ্গবন্ধু’Ñএ উনাদের সব বক্তব্য আছে। এভাবে আস্তে আস্তে করে আগালাম। এটা তো পলিটিকস। আপা যখন ঢাকা আসলেন, তখন বাচ্চাদের দায়িত্ব আমি নিলাম। প্রথম প্রথম কেউ এসে যদি আমাকে পলিটিকসের কথা বলতÑ খুব রাগ করতাম, বাড়ি থেকে বের করে দিতাম। বলতামÑ আবারও পলিটিকস, সব শেষ করেও তোমাদের হলো না? তারপর একসময় আপাকে বললাম, ‘না, আপা পলিটিকসে যেতে হবে। তুমি যেহেতু বড়, তুমি পলিটিকস কর, আমি তোমার বাচ্চাদের দেখি।’ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে পলিটিকসের সঙ্গে ছিলাম। কিন্তু আমার ছেলেমেয়ে পলিটিকস করবেÑ তা ভাবিনি। সব সময় বলতামÑ পলিটিকস থেকে শত হাত দূরে থাকবে। পলিটিকস ছাড়াও তো মানুষের সেবা করা যায়। মাদার তেরেসাকে দেখ। এদের উদাহরণ দিতাম। এখন মেয়ে পলিটিকসে, এটা হয়ত জেনেটিকস আর ভাগ্য।

তাসমিমা হোসেন : তোমার যে ছোট মেয়েটা, রূপন্তী, ওকে দেখলে আমার মনে হয়Ñ ওর মধ্যে একটা অদ্ভুত শক্তি আছে।

শেখ রেহানা : হ্যাঁ, ও শক্ত মেয়ে। অল্প বয়স থেকেই ও বুঝেশুনে চলে। ওর জীবনটা অত সহজ ছিল না। ওর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ায় এক বছর বয়স থেকে আমার কোলে-কোলে সাতটা বছর ওকে হাসপাতালেই কাটাতে হলো। ওদের বাবার অসুখের সময় টিউলিপের নয় বছর আর ববির ১১ বছর। ওরা তো রাতারাতি আমার গার্ডিয়ান হয়ে গেল। এই দুটো বাচ্চাই তো রূপন্তীকে বড় করল। আমি তো ওদের সঙ্গে আলাপ করতামÑ কী করব এখন? ওরাই আমাকে বুদ্ধি দিত, মা এটা কর, ওটা করলে ভাল হবে। ওদের সঙ্গে আলাপ করেই সিদ্ধান্ত নিতাম।

তাসমিমা হোসেন : তোমার স্বামীর অসুখের পরে তোমার পরিবারটা বিপদ থেকে আরও শক্তি অর্জন করল, শক্ত হলো। ওই বিপদটাকে তোমরা সবাই মিলে মোকাবেলা করলে, তাই না?

শেখ রেহানা : ওই বয়সে একটা মনের মতো জায়গায় সকল সুযোগ-সুবিধা হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়া, চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে ফিরে আসা, এত খরচের ধাক্কাÑ

তাসমিমা হোসেন : তখন বাচ্চাদের পড়াশোনায়ও তো একটা ধাক্কা লাগল।

শেখ রেহানা : হ্যাঁ, পড়াশোনায় কিছুটা ধাক্কা তো লাগলই। তার মধ্যেও তখন আমি হাসপাতালে এক চাইনিজ মহিলার কাছে ছেলেমেয়ের অঙ্ক-ইংরেজীটা পড়ানোর ব্যবস্থা করেছিলাম। ওই মহিলার সঙ্গে আমার বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তিনি ওদের পড়াতে কোন পয়সা নিতেন না। ছেলেমেয়েদেরও সান্ত¡না দিতাম, বলতাম, ধৈর্য ধর, স্কুল-কলেজে পড়াশোনাÑ সবই হবে, আস্তে আস্তে হবে। আব্বার উদাহরণ দিতাম। আব্বা চোখের অপারেশনের কারণে চার-পাঁচ বছর পড়তে পারেননি। আব্বা জেলে থাকার সময় আমারও স্কুল বন্ধ ছিল। আমি শাহীন স্কুলে ছিলাম। কামাল ভাই পাস করে ঢাকা কলেজে চলে আসল। জামাল ভাই রেসিডেন্সিয়াল মডেলে গেল। মা বেতন বাড়াতে পারেনি বলে আমাদের গাড়ির ড্রাইভার চলে গেল। মা একা আমাকে এতদূর যেতে দেবেন না বলে আমি এক বছর স্কুলেই যেতে পারি নাই। আমি নিজে একা একা আজিমপুর স্কুলে গিয়ে ক্লাস ফোরে ভর্তি হয়ে আসলাম। স্টেট বাসে করে যেতাম। ছয় মাস পর ধানম-ি স্কুলে ফাইভে ভর্তি হলাম।

তাসমিমা হোসেন : তোমার বাবা তোমার মায়ের রান্না ছাড়া খেতেন না। খাওয়ার সময় একটা স্ত্রী তাঁর স্বামীর পাশে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছেন, তারপর বাচ্চাদের খাওয়ানোÑ এই যে, একটা দেশের জাতির পিতার বাড়িটা একটা সাধারণ বাড়ি, ছোট একটা ডাইনিং টেবিলে পাঁচ-সাতজন খাচ্ছেÑ

শেখ রেহানা : এই সুখ, এই শান্তি রাজপ্রাসাদেও পাওয়া যেত না। মা-বাবা, ভাইবোন সবাই একসঙ্গে বসে খাওয়া। আমাদের নিয়ম ছিল- দাদা-দাদি যখন একসঙ্গে খেতে বসতেন, আমাদের পালা করে তাদের কাছে থাকতে হতো হাতে তালপাখা নিয়ে। আমি থাকলে আমি, আপা থাকলে আপা। দাদা-দাদি খেতেন।

তাসমিমা হোসেন : এখন তোমার নিজেরই নাতি আছে। নাতিদের জান দিয়ে ভালবাসতে ইচ্ছে করে, তাই না?

শেখ রেহানা : উহ, এত সুখ বোধহয় পৃথিবীতে আর কোন কিছুতেই নেই। আমি কখনও কল্পনাই করিনি যে, বেঁচে থাকবÑ নাতি-নাতনি নিয়ে আমার মায়ের বড় শখ ছিল।

তাসমিমা হোসেন : বাবার সংগ্রামের সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক সংগ্রাম, তারপর তোমার সংগ্রাম। তোমাদের জীবনটাই সংগ্রামে ভরা। এই সংগ্রাম মোকাবেলার শক্তি আল্লাহতায়ালা বাচ্চাদের ভেতর দিয়ে তোমাকেও দিলেন।

শেখ রেহানা : আমাদের নবী করিমের (স) কথা চিন্তা করি। তাঁর জীবনটাও সহজ ছিল না। ওখান থেকেও আমি শক্তি পাই। আমি বাসায় কাজ করি, রান্না, কাপড় ধোয়া, বাজার করা, মাঝে মাঝে টায়ার্ড হয়ে যাই। তখন ভাবি, নবীজী তো তাঁর মেয়েকে বলতেন, আলহামদুলিল্লাহ পড়। আর আমার মায়ের কথা চিন্তা করি। আমাদের কাজ করতে দেখলে আব্বা খুব খুশি হতেন। এভাবে নিজের ভেতরে শক্তি আনি।

তাসমিমা হোসেন : তোমার কি মনে হয়Ñ এই সংগ্রাম সহজে শেষ হওয়ার নয়? আপার (শেখ হাসিনা) সংগ্রাম তো শেষ হয়নি। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এখনও যে কনস্টান্ট ষড়যন্ত্র হয়, সেটাকে প্রতিনিয়ত ওনাকে মোকাবেলা করতে হয়। এই সংগ্রামে তোমার কি ভয় লাগে, আবার একটা ভয়ঙ্কর অবস্থার মুখোমুখি হতে হয় যদি? তোমার বাচ্চারা তো দেশে আসে, দেশকে ভালবাসে। দেশের জন্য কিছু করতে চায়।

শেখ রেহানা : ভয় তো থাকেই। আল্লাহকে ডাকি। আর ওই বিশ্বাস, আল্লাহর হুকুম যেটা হবে হবেই। সেটা ঘরের ভেতরে থাকলেও হবে, বাইরে থাকলেও হবে। আল্লাহর হুকুম ছাড়া তো গাছের পাতাও নড়ে না। আল্লাহর ওপর সবকিছু ছেড়ে দিয়েছি। তাঁর কাছে সারেন্ডার যেÑ আল্লাহ তুমি রক্ষা কর।

অনন্যার সৌজন্যে