২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মহান নেতার প্রতিকৃতি এবং আজকের প্রজন্ম

  • মারুফ রায়হান

মহান নেতা বঙ্গবন্ধুকে আমি দেখিনি, সে সৌভাগ্য আমার হয়নি। একাত্তরের আগে-পরে আমার মতো যারা ছিলেন বালক বয়সী তাদের এই আফসোস চিরকালের। তবে চর্মচোখে না দেখলেও মনোশ্চক্ষে, অন্তর্নেত্রে তাঁকে দেখেছি; যেমন দেখেছেন আমারই মতো বহুজন। বিশ্বনেতা নেলসন ম্যান্ডেলা কিংবা ইয়াসির আরাফাতকেও তো আমরা অনেকে দেখিনি। না দেখলাম, তবু তাঁরা চিরজাগরূক আমাদের মনে ও মননে। ইতিহাসের মহানায়ককে জানা উত্তরপ্রজন্মের অবশ্য কর্তব্য। তবে এই জানার বিষয়টি, প্রকৃত অনুধাবনের উদ্যোগটি অনেক কারণেই ভ্রান্তিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সেজন্যে সজাগ ও সাবধান থাকা চাই। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় একাত্তরের পরাজিত শক্তির প্রতিনিধিরা মহান নেতাকে হত্যার মাধ্যমে ইতিহাস বদলে দেয়ার দুঃসাহস দেখায়। দুই দশকেরও বেশি চলেছে সেই ইতিহাস বিকৃতির কাল। ফলে একাত্তর-উত্তর, আরও নির্দিষ্টভাবে বললে পঁচাত্তর-উত্তর প্রজন্মের কাছে মহান নেতার প্রকৃত প্রতিকৃতি উপস্থাপনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একাত্তর পর্বে ছিলেন সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর নয়নের মণি। রাজনীতির কবি তিনি। তাঁর সাতই মার্চের ভাষণ কবিতারই মতো স্পষ্ট ও সংকেতময়, দ্রোহ ও দেশপ্র্রেমের রসে সিক্ত। নেতাকে যাঁরা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন তাঁদের অবলোকন তরুণ প্রজন্মকে সাহায্য করতে পারে নেতার প্রতিকৃতি নির্মাণে। কর্মসূত্রে, রাজনৈতিক সূত্রে বা কোন না কোনভাবে বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে এসেছিলেন এমন বহু ব্যক্তিই বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করেছেন। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রচিত সেইসব স্মৃতিকথা অত্যন্ত মূল্যবান। সৃষ্টিশীল রচনার প্রয়োজনে সেইসব লেখা যে মহামূল্যবান উপাদান হয়ে উঠতে পারে সেকথা বলাবাহুল্য। এ ক্ষেত্রে তাজউদ্দিনের ডায়েরির কথা প্রথমেই উল্লেখ করতে চাই। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের ‘প্রথম দর্শনে বঙ্গবন্ধু’ বইটির কথা। আরেকজন সচিব মুহাম্মদ সিরাজুদ্দিন টুকরো টুকরো স্মৃতিকথা লিখেছেন। তিনি পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিগ্রন্থ লিখলে বঙ্গবন্ধু আমলের প্রশাসনিক বহু অজানা কথাই মানুষ জানতে পারবেন। হয়ত অতিরিক্ত নেতিবাচকভাবে প্রচারিত তিয়াত্তর চুয়াত্তরের দিনগুলো প্রকৃত সত্যের তরবারিতে ঝলসিত হয়ে উঠবে। তাতে কাটা পড়বে বহু মিথ্যাচার।

এখানে প্রয়াত কবি আবুল হোসেনের স্মৃতিকথা থেকে অংশবিশেষ উদ্ধৃত করতে চাই কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে। এই লেখাটির প্রথম পাঠক এবং প্রথম প্রকাশকারী ছিলাম আমি। উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, বঙ্গবন্ধুর প্রায় সমবয়সী এই কবির জন্মদিন পনেরোই আগস্ট। কিন্তু পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের পর আর কখনোই তিনি তাঁর নিজের জন্মদিন পালন করেননি। কবি আবুল হোসেন লিখেছেন : ‘প্রতিষ্ঠার দেড়-দু’বছরের মধ্যেই পাকিস্তান সম্পর্কে মোহভঙ্গ ঘটে পূর্ববঙ্গের। বিরোধীরা আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করে সরকারী মুসলিম লীগের বিপরীতে। ভাসানী তার সভাপতি, শেখ মুজিব যুগ্ম সম্পাদক। বিরোধী দলগুলো শেরে বাংলা ফজলুল হক ও শহীদ সোহরাওয়ার্দির নেতৃত্বে সম্মিলিত হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে ১৯৫৪ সালে। প্রাদেশিক সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। পরিষদে গরিষ্ঠ দল যুক্তফ্রন্টের নেতা ফজলুল হক যে মন্ত্রিসভা গঠন করেন তার কনিষ্ঠতম সদস্য ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার যে মন্ত্রিসভাকে ১৫ দিনের বেশি টিকতে দেয়নি। দেশদ্রোহিতার অভিযোগ তুলে তার প্রধান শেরে বাংলাকে বরখাস্ত করে শেখ মুজিবকে পাঠায় জেলে। এর আগেও একাধিকবার তার জেল হয়েছে। পরে যদিও তিনি একবার প্রাদেশিক মন্ত্রী হয়েছেন, বছরখানেকের জন্য, জেল খেটেছেন বহুবার। ষাটের দশকের শুরুতে বিদেশে চাকরি করতে যাওয়ার সময় দেখে যাই তার রাজনৈতিক জীবনের অত্যাশ্চর্য রূপান্তর। জেলের ভাত আর সরকারের তাড়া খেতে খেতে কিভাবে এক তরুণ একগুয়ে ছাত্রনেতা দেড় দশকের মধ্যে তার সমসাময়িক সতীর্থ এবং অনেক সহযাত্রীকে রাজনীতির ময়দানে পেছনে ফেলে, নয়ত মিইয়ে যেতে দিয়ে উঠে এসেছেন এক আপোসহীন চড়াগলার নেতার আসনে। সাড়ে ছ’বছর পরে যখন দেশে ফিরে এলাম তখন তিনি পূর্ব পাকিস্তানের একচ্ছত্র নেতা। সরকারের বিপক্ষে। তার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয় দৈবক্রমে। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের কিছুদিন পরে এক হাসপাতালের কেবিনে। পরিচয় দিয়ে আমিই তার দৃষ্টি আকর্ষণ করি এক সহকর্মীর আসন্ন দুর্ভোগ থেকে রক্ষার প্রচেষ্টায়।’

ব্যক্তিগত গুণাবলী, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং অসামান্য চরিত্রমাধুর্যের সৌরভে অবিস্মরণীয় নেতাদের কাতারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। তাঁর সমগ্র জীবন ছিল ইতিহাসের অতুলনীয় এক মহাকাব্যের মতো। এ মহান ব্যক্তিত্বের জীবন নিয়ে প্রচুর গ্রন্থ রচিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। বঙ্গবন্ধু লিখিত অসমাপ্ত আত্মজীবনীও প্রকাশিত হয়েছে। গ্রন্থটি সম্পর্কে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, দেশের জন্য আত্মত্যাগকে তিনি বড় করে দেখেছেন। রাজনীতি ছাপিয়ে গণমানুষের কথাই বেশি ধ্বনিত হয়েছে তার হৃদয়ে। এই অসামান্য আত্মকথায় তা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। তাই বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থটি একটি ব্যতিক্রমী বই। অসামান্য হৃদয়বত্তার বহির্প্রকাশ ঘটেছে এ বইয়ে। শুধু রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বা বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গই নয়, সাধারণ মানুষের কথাও সমগুরুত্বের সঙ্গে স্থান পেয়েছে বইটিতে।

ব্যক্তির মূল্যায়নের জন্য আত্মজীবনী গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। এটিকে ভিত্তি করে বড় মাপের সাহিত্য রচনার সম্ভাবনা থাকে। এই দুখিনী বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের এক শিশু কালে কালে কী বিপুল সঙ্কট ও সংগ্রাম পেরিয়ে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন কোটি মানুষের অন্তরের মণিকোঠায়। হয়ে উঠেছিলেন ইতিহাসের মহানায়ক। গ্রিক ট্র্যাজেডির মতো করুণ এক মৃত্যুর শিকার হন অবশেষে। ইতিহাসের এই মহানায়ককে নিয়ে খুব বড় মাপের সাহিত্য রচনার সুযোগটি এখনও রয়ে গেছে। আগেও একটি রচনায় উল্লেখ করেছিÑ আংশিক বা খ-িত জীবন নয়, বঙ্গবন্ধুর পূর্ণাঙ্গ জীবন নিয়েই সৃষ্টি হতে পারে অত্যন্ত উন্নত স্তরের সাহিত্য, বিশেষ করে বড় ক্যানভাসের ক্ল্যাসিক উপন্যাস। যা কেবল বাংলাদেশের সাহিত্যেরই অনন্য দৃষ্টান্ত হবে না, হয়ে উঠবে বিশ্বসাহিত্যের ভা-ারে এক কালজয়ী ধ্রুপদী সাহিত্য। এভাবেই আন্তর্জাতিক বিশ্বে নতুন করে আলোচনায় উঠে আসতে পারে বাংলাদেশ। বর্গমাইলের হিসাবে আয়তনে ছোট হলেও এই দেশ যে খুব বড় একটি সম্ভাবনার দেশ এবং যার রয়েছে শ্রদ্ধাজাগানিয়া এক গৌরবময় ইতিহাস সেটি বিশ্ববাসী নতুন করে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে। একমাত্র সাহিত্যেরই রয়েছে সেই ব্যাপক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ শক্তি। তরুণ প্রজন্মের ভেতর উল্লেখযোগ্য অংশ এখন কম্পিউটার ব্যবহার করছে। ইন্টারনেট হয়ে উঠেছে নিত্যদিনের চারণক্ষেত্র। মহান নেতার জীবন ও কর্ম সম্পর্কে বিশদ তথ্য ও রচনা এবং আলোকচিত্রমালা আকর্ষণীয়ভাবে অনলাইনে উপস্থাপনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের ভবিষ্যত কর্ণধারদের কাছে জাতির পিতাকে পূর্ণাঙ্গ রূপে তুলে ধরা আজ সময়েরই দাবি।

আজকের তরুণদের ভেতর রাজনীতিবিমুখতা প্রত্যক্ষ করে কখনও কখনও হতাশ হতে হয়। অপরাজনীতি এবং সত্যিকারের জনকল্যাণমূলক রাজনীতি দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত বিষয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর অপরাজনীতির উল্লম্ফন ও বিচিত্র বিকাশ দেখে তরুণদের মনে রাজনীতি সম্পর্কেই অনীহা তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে কাজ করতেই হবে এমন নয়, রাজনীতি সচেতনতাই জরুরী। সেক্ষেত্রে আমাদের স্বাধীন দেশের স্থপতির প্রতি যথাযোগ্য সম্মান জানানো আবশ্যিক কর্তব্য। যদিও বেপথু অনেক তরুণ জাতীয় শোক দিবসে একজন নেত্রীর সাড়ম্বরে ‘জন্মদিন’ পালন করা থেকে উৎসাহিত হয়ে সত্য ইতিহাস থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাদের বলি নিচের কবিতাটি পড়তে।

প্রতি শোক দিবসে

কার মনে লাগে রঙ!

ওই মেহগনিটার দিকে রাখো চোখ

তারও রয়েছে অফুরান শোক

অর্ধনমিত সে পতাকারই মতো

আর শ্রাবণধারায় এসে মেশে যতো

অশ্রুসজলতা, হৃদয়ের ক্ষত...

প্রতি শোক দিবসে

কার মনে লাগে রঙ!

কারা মাতে উৎসবে রসেবশে?

এদেশে জন্মেছে! বাঙালীরই সন্তান তারা?

শাপলা দোয়েল লালসবুজ নয়Ñ বরং

হৃদয়জুড়ে তাদের চানতারা।

প্রকৃত ইতিহাস পাঠ, হত্যার মতো বর্বরতার বিরুদ্ধে দৃঢ় ভূমিকা গ্রহণ, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, সমাজ-সজ্ঞানতা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি মমত্ববোধÑ এসব শিরোধার্য করে আজকের তরুণ স্বদেশপ্রেম এবং জাতির জনকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জাগরূক রাখবে, আজকের শোক দিবসে এটাই পরম প্রত্যাশা।