২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রশ্নটির উত্তর দিতে পারিনি

  • সেলিনা হোসেন

মৃত্যু যেভাবেই হোক না কেন তিনি মৃত্যুকে বরণ করেছিলেন অমিত সাহসে। এই সাহস দিয়ে তিনি তৈরি করেছেন ইতিহাসের পৃষ্ঠা। তাই মৃত্যুর মতো কঠিন সত্য ম্লান হয়ে গেছে এই সাহসের কাছে। গুলি পিঠে নেননি, বুকে নিয়েছিলেন। তিনি রক্তের ধারা গড়াতে দিয়েছেন। জলের স্রোত যেমন গড়ায় তেমন। উর্বর ভূমি জল শস্যবতী করে। আর তাঁর রক্ত শস্যবতী করবে বাঙালীর মানসভূমিকে। তৈরি হবে আগামীদিনের বাংলাদেশ চেতনার মর্যাদা ও শাণিত বোধে। জ্ঞানে ও গরিমায়। সে জন্যই ১৫ আগস্ট আমাদের জন্য শুধু স্মরণের দিন নয়, গভীরতর চেতনাবোধের দিন। যে চেতনা দিয়ে একটি জাতি আন্তর্জাতিক বিশ্বে নিজের গৌরবের জায়গা নির্মাণ করে। বঙ্গবন্ধু আমাদের মানস চেতনার নক্ষত্র। স্বাধীনতার চল্লিশ বছরেও আমরা তাঁর রাজনৈতিক জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে বুঝতে পারিনি। বাঙালীর আত্মআবিষ্কারের দিকনির্দেশনাগুলো তাঁর চিন্তা-চেতনা-মননের শাণিত দীপ্রতায় ছড়িয়ে আছে। সেই জায়গাটিকে অক্ষয় করে রাখার জন্য এই স্মরণ দিনকে শোক থেকে শক্তিতে রূপান্তর করে এগিয়ে গেলে তবে তাঁকে আমরা প্রকৃত মর্যাদা দিতে পারব।

আমি ২০০০ সালের মে মাসে এক মাসের জন্য সানফ্রান্সিসকোতে ছিলাম। আমার মেয়ে মুনার প্রথম বাচ্চা হবে, সে উপলক্ষে যাওয়া। ও হাসপাতালে ভর্তি হলে আমি প্রতিদিন ট্যাক্সি করে যেতাম। একেকদিন একেকজন ড্রাইভার। কেউ কথা বলত, কেউ বলত না। হাসপাতালের গেটে নেমে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দ্রুত লিফটে উঠে পৌঁছে যেতাম মুনার কাছে।

বিশাল হাসপাতাল। নাম ইউনিভার্সিটি অব কালিফোর্নিয়া, সানফ্রান্সিসকো, সংক্ষেপে টঈঝ; হাসপাতালের ষোলো তলা শিশুদের এলাকা। চব্বিশ ঘণ্টা খোলা থাকে। আমার লেখার বিষয় একটি বাচ্চার জন্মের কথা নয়। যে বাচ্চাটির বাবা কানাডিয়ান, মা বাংলাদেশী এবং শিশুটি জন্মসূত্রে আমেরিকান। আমি দেখতে পাচ্ছি আমার পরিবারে ঘটতে যাচ্ছে মানব সংস্কৃতির মিলন বন্ধন। আমি দেশের সীমানার বাইরে এক অখন্ড পৃথিবীর মানুষ হিসেবে নিজেকে ভাবতে চেষ্টা করি। কিন্তু এমন একটি বন্ধনের বাস্তব সূত্র দেখার অভিজ্ঞতা যে আমার হবে তা আমি ভাবতে পারিনি।

একদিন হাসপাতালে যাব বলে ট্যাক্সির জন্য ফোন করি। বয়স্ক এক লোক ট্যাক্সি নিয়ে আসেন। তাঁর বুকে কফ জমে গলা ঘড়ঘড় করছিল। বুঝতে পারছিলাম যে লোকটি বড় ধরনের ঠা-ায় আক্রান্ত। খুব কাশছিলেন। তাঁর হাঁচি-কাশিতে বিব্রত হয়ে ট্যাক্সিতে উঠব কি উঠব না ভাবছিলাম। ট্যাক্সিচালক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বললেন, কি হলো, উঠুন। আমি তাড়াতাড়ি উঠে পড়ি। ফোন করে ডেকে এনে ট্যাক্সিতে উঠব না, এটা কি করে হয়। এই অজানা, অচেনা নতুন শহর আমাকে ভীত করে ফেলে।

গাড়ি চলতে শুরু করেছে। গাড়িচালক অনবরত হাঁচি দিচ্ছে আর কাশছে। বিরক্তই হই। তারপরও বিরক্তি সামলে তিনি হাঁচি দিলে, ‘ব্লেস ইউ’ বলি। তিনি মুখ ফেরালেন। আশ্চর্য সুন্দর হাসি তাঁর মুখজুড়ে। তাঁকে উইশ করলে তিনি যে এতটা খুশি হবেন ভাবতে পারিনি। মনে হলো একজন আন্তরিক মানুষের কাছে আছি। অচেনা শহর হলেও আমার ভয় নেই।

তিনি এবার ঘাড় না ঘুরিয়েই জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি ইন্ডিয়া থেকে এসেছেন?

বিদেশে আমি সব সময় শাড়িই পরি। এমন প্রশ্নের উত্তর আমাকে বেশ কয়েকটা দেশেই শুনতে হয়েছে। তাই এখন আর অবাক হই না। হেসে বললাম, আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি।

তিনি চেঁচিয়ে বললেন, ওহ্ বাংলাদেশ! বাংলাদেশ! বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা আমার মনে আছে।

আমি চমকে উঠি। গাড়িচালকের উত্তেজনার টান অনুভব করি। উত্তেজনায় দুর্ঘটনা ঘটাবে না তো? আবার আশঙ্কা হয়। একজন বিদেশী এখন থেকে ঊনত্রিশ বছর আগে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা মনে রেখেছেন। ভারি অদ্ভুত তো!

রাস্তার ট্র্যাফিক সিগন্যালে গাড়ি থামলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি আপনাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য কন্ট্রিবিউট করেছিলাম।

কীভাবে? আমি খুব অভিভূত হয়ে জিজ্ঞেস করি।

গাড়ি তখন চলতে শুরু করেছে। তিনি বলতে থাকেন, ১৯৭১ সালে আমি নিউইয়র্কে ছিলাম। তখন আমার বয়স সাতাশ। সে সময় গায়ক জর্জ হ্যারিসন ও প-িত রবিশঙ্কর নিউইয়র্কের মেডিসন স্কয়ারে কনসার্টের আয়োজন করেছিল। আমি টিকেট কেটে সে কনসার্ট শুনেছিলাম। কনসার্ট থেকে পাওয়া অর্থ তারা তোমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য পাঠিয়েছিল। আমি বিশ্বাস করি, এভাবেই আমি তোমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে কন্ট্রিবিউট করেছিলাম। এজন্য আমি গর্ব অনুভব করি। স্বাধীনতা প্রতিটি মানুষের স্বপ্ন। স্বাধীনতা না থাকলে একটি জাতির অনেক কিছু হারিয়ে যায়। তাই স্বাধীনতার স্বপ্নকে ফুটিয়ে তুলতে সহযোগিতা দিতে হয়।

গাড়িচালক আমার চোখের সামনে একজন বিশাল মানুষ হয়ে যায়। আমি ঘোরের মধ্যে তার মাথাকে আকাশ ছুঁতে দেখি। তার হাঁচি-কাশি আমাকে আর স্পর্শ করে না। আমাদের স্বাধীনতার ঊনত্রিশ বছর ধরে একটি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্নে একটুখানি জল দেয়ার গৌরব তিনি তাঁর মধ্যে ধরে রেখেছেন। এভাবেই মানুষ তার নিজের দেশের সীমানা পার হয়ে অন্য দেশে ঢোকে। এই মুহূর্তে গাড়িচালক নিজেকে আমার প্রিয় বাংলাদেশের একজন মনে করছে। আমার দু’চোখে সানফ্রান্সিসকোর প্রকৃতির সঙ্গে নিজ দেশের প্রকৃতি এক হয়ে যায়।

গাড়ি হাসপাতালের গেটে ঢোকার আগে গাড়িচালক গলা ঝেড়ে কেশে গম্ভীর স্বরে বলে, হাউ কুড ইউ কিল শেখ মুজিব?

ওর প্রশ্ন শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। মনে হয় নড়তেও ভুলে গেছি। মুখে কথা সরে না। কোন কোন প্রশ্নের জবাব দেয়া যে কত কঠিন এই প্রথম অনুভব করি। আমি ব্যাগের চেন খুলে ডলার খুঁজি গাড়িভাড়া মেটানোর জন্য। গাড়ি ততোক্ষণে হাসপাতাল চত্বরে ঢুকেছে। ওর দিকে গাড়িভাড়া এগিয়ে দিলে ভয় হয়, লোকটি যদি প্রশ্নটি আমাকে আবার করে তাহলে আমি কি উত্তর দেব? কিন্তু লোকটি ডলার নিয়ে আমার বিপন্ন-বিব্রত চোখে চোখ রেখে বলে, হি ওয়াজ এ্যা গ্রেট লিডার।

আমি দৃষ্টি নত করি। আমার পা কাঁপে থরথর করে। গাড়িটি চলে যায়। আমি এক পা এক পা করে হাসপাতালের ভেতরে ঢুকতে থাকি। ক্রমাগত শীতল হতে থাকি। কেন আমি গাড়িচালকের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলাম না। আমি কি জানতাম না কিছুই যে, কেন তাঁকে পরিবারসহ খুন করা হয়েছিল। আসলে একজন বিদেশীর কাছে নিজেদের অকৃতজ্ঞতার বিবরণ দেয়াকে আমি সম্মানজনক মনে করিনি। তা জাতি হিসেবে আমার গৌরব বাড়ায় না।

তারপরও প্রশ্ন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল কারা এবং কেন! যারা বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশকে নিজেদের দখলে নিতে চেয়েছিল তাদের উদ্দেশ্য ছিল দীর্ঘমেয়াদী। বঙ্গবন্ধু ছিলেন তাদের পথের কাঁটা। তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধূলিস্যাত করে স্বাধীনতার বিরোধী শক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করা। তারই ফল স্বাধীনতাবিরোধী শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসানো। গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে আনা, সংবিধান সংশোধন করে ধর্মনিরপেক্ষতা উড়িয়ে দেয়া এবং রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা। সেই সঙ্গে মৌলবাদের উত্থান প্রশস্ত হলো। তাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়ল। তাদের দোসররা সন্ত্রাসী রাজত্ব কায়েম করল। বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশে খুব সহজে এসব করা তাদের পক্ষে সহজ হলো। এখন তো স্বাধীনতাবিরোধীদের তা-ব চলছে দেশজুড়ে।

যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল একাত্তর সালের লড়াকু মানুষ, বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশে তারা হয়ে গেলো সংখ্যাগরিষ্ঠ। যে নারীরা স্বাধীনতার জন্য পাকসেনাদের ধর্ষণের শিকার হয়েছিল তাদের ঠেলে দেয়া হলো অন্ধকারে। তাদের প্রাপ্য ছিল রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, প্রাপ্য ছিল গৌরবের জীবন। বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে সবকিছু থেকে বঞ্চিত করে শুধুই ধর্ষিত নারীর অভিধায় সমাজের চৌকির নিচে ঠেসে রাখা হয়েছে তাদের।

আজকের বাংলাদেশের সরকার পরিচালনা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা দেখলেই বোঝা যায়, কেন বঙ্গন্ধুকে হত্যা করা অনিবার্য ছিল! তাদের আচরণসমূহ একটি রাষ্ট্রের চরিত্রকে আমূল বদলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। এসব উপাদান একটি রাষ্ট্রকে বর্বর রাষ্ট্রে পরিণত করে, যেখানে মানুষের মূল্য শূন্যের কোঠায় নেমে যায়। আমরা এই নিয়তি ঘাড়ে নিয়ে বর্তমান বাংলাদেশে মুখ থুবড়ে পড়ে আছি। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর জন্য এটাই শেষ কথা নয়। না খেতে পাওয়া মানুষও জাদুর মতো অবিশ্বাস্য শক্তি অর্জন করে প্রয়োজনে, সংগ্রামে।

আমি জানি না সানফ্রান্সিসকোর সেই গাড়িচালক এখন কেমন আছেন, কোথায় আছেন। তাঁকে পেলে তাঁর সেদিনের প্রশ্নের উত্তরটি আমি আজও বলতে পারতাম না মনে হয়। কেমন করে বলব যে আমরা একটি লড়াকু জাতি এখন শত্রু পরিবেষ্টিত! আমি তো শুধু সাহসী মানুষ বঙ্গবন্ধুর কথা বলতে শিখেছি। আমি তো নিজেদের অহঙ্কারের কথা বলতে শিখেছি। গৌরবের গল্প ছাড়া আমাদের কাছে কোন গল্প নেই।

শুধু গাড়িচালককে আমি বলতে পারতাম: তারা বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলেছিল জাতির অসাম্প্রদায়িক, মানবিক, মুক্ত চেতনার অসাধারণত্ব খুবলে নিয়ে হাড়সর্বস্ব দেহের ওপর তা-ব উল্লাস প্রকাশ করবে বলে।

কিন্তু ওরা জানে না, শেষ পর্যন্ত ওদের গলিত লাশ শকুনে খাবে। আর একটি যুদ্ধের জন্য লড়াকু মানুষরা রুখে দাঁড়াতে প্রস্তুত।

বলছিলাম বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশের কথা। তাঁকে মুছে ফেলার জন্য সব শক্তি নিয়োগ করেও তারা দানবই থেকে গেছে। নিজেদের মানুষের পর্যায়ে টেনে তুলতে পারেনি। তাই কতিপয় দানবের বাংলাদেশে এখনও তিনি আছেন অনুপ্রেরণায় Ñঅনাগত দিনের স্বপ্নের দিগন্ত বিস্তারিত শস্যক্ষেতে ফসল-প্রাচুর্য মানবিকবোধের উৎসে। মানুষকে তো দাঁড়াতেই হবে তার পায়ের গতিতে বেগ নিয়ে।

এই বেগের মধ্যে বঙ্গবন্ধু অন্তহীন প্রাণ।

লেখক : কথাসাহিত্যিক