২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আইএস ক্যাম্পে অবাধ যৌনাচারের শিকার বিধর্মী নারীরা

  • নিউইয়র্ক টাইমসে রিপোর্ট

নাজনীন আখতার ॥ ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার নামে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে জঙ্গী সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএসের সদস্যরা মেতে উঠেছে বিকৃত যৌনাচারে। বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে অগাধ সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি এখন শিশু-কিশোরী ধর্ষণের মাধ্যমে সংগঠনটির লোলুপ দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট রূপ পেয়েছে। সংগঠনটির ক্যাম্পগুলোতে ধর্মীয় পাঠ চর্চার পরিবর্তে নিয়মিত চলে অপহৃত নারীদের ধর্ষণ। তাদের বিক্রি করে দেয় যৌনদাসী হিসেবে। ভিন্ন ধর্মের নারী শিশুদের ধর্ষণ মানে ‘আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা’ এমন উদ্ভট বিকৃত এক ভয়াবহ মানসিকতা তারা নির্বিকারভাবে ছড়িয়ে তাদের অসুস্থ দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করে চলেছে। ইন্টারন্যাশনাল নিউইয়র্ক টাইমসের শুক্রবারের সংখ্যায় আইএস ক্যাম্পে অবাধ যৌনাচারের শিকার শিশু কিশোরী নিয়ে প্রকাশিত সচিত্র অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ধর্মের দোহাই দিয়ে যৌন দাসত্বের ভয়াল দৃশ্য। ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা ২১ কিশোরী ও নারীর বয়ানে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তাদের ওপর নিত্যদিন চলা নির্যাতনের তথ্য।

পালাতে সক্ষম হওয়া ১২ বছরের একটি কিশোরী ইন্টারন্যাশনাল নিউইয়র্ক টাইমসে দেয়া সাক্ষাতকারে জানিয়েছে, তাকে ধর্ষণ করা ব্যক্তিটি ধর্ষণের আগে পরে প্রার্থনা করত। মেয়েটি এ কষ্ট থেকে তার কাছে মুক্তি চাইলে সে বলত ইসলাম ধর্ম অনুসারে সে ইসলামে অবিশ্বাসী অন্যের ধর্মের মেয়েকে ধর্ষণ করতে পারে। বরং বিধর্মীকে ধর্ষণের মাধ্যমে সে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করছে। ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের মেয়েটি ১১ মাস আগে পালাতে সক্ষম হয়। বর্তমানে সে আন্তর্জাতিক শরণার্থী শিবিরে তার পরিবারের সঙ্গে রয়েছে।

এক বছর আগে আইএসের হাতে অপহরণের শিকার হওয়া ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের ১৫ বছর বয়সী আরেক কিশোরীও একই তথ্য দিয়েছে। তাকে এক ইরাকী যোদ্ধার কাছে যৌনদাসী হিসাবে বিক্রি করে দেয়া হয়। গত এপ্রিলে সে পালাতে সক্ষম হয়। ওই কিশোরী জানায়, তাকে নিয়মিত ধর্ষণ করা হতো। আর প্রত্যেকবারই ওই ব্যক্তি নামাজের ভঙ্গিতে প্রার্থনা করত। লোকটি তাকে বলত এর মাধ্যমে সে ‘ইবাদত’ করছে। মেয়েটি তাকে বলে, ‘তুমি আমার সঙ্গে যা করছ তা অন্যায়। এসব করে তুমি স্রষ্টার নৈকট্য পাবে না।’ জবাবে লোকটি তাকে বলে, ‘এটা স্বীকৃত। হালাল।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, আইএস ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের মেয়েদের দিয়ে প্রথমে আনুষ্ঠানিক যৌন দাসত্বের শুরু করে ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট। ইরাকের উত্তরাঞ্চলে এই ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের বসবাস। ৩৪ মিলিয়ন জনসংখ্যার দেশ ইরাক। মোট জনসংখ্যার মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশ হচ্ছে ইয়াজিদি। আইএস ওই ক্ষুদ্র সম্প্রদায়ের গ্রামগুলো দখল করে নেয়ার পরপরই সম্প্রদায়ের নারী পুরুষদের আলাদা করে ফেলে। নারীদের মধ্যে আবার আলাদা করে নেয়া হয় শিশু-কিশোরী ও অবিবাহিতদের।

যৌন ব্যবসার মাধ্যমে বিপুল অর্থ আয়ের লক্ষ্যে আইএস একটি শক্ত অবকাঠামো তৈরি করেছে। ইয়াজিদি মেয়েদের প্রথমে নেয়া হয় বন্দি শিবিরে। তারপর তাদের নেয়া হয় পরিদর্শন ঘরে। সেখান থেকেই চলে পণ্যের মতো নারীদের বাজারজাতকরণ। গত বছর ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের মোট ৫ হাজার ২৭০ জনকে অপহরণ করা হয়। এদের মধ্যে ৩ হাজার ১৪৪ এখনও বন্দি শিবিরে। আইএস নিজেদের পরিচালিত ইসলামী আদালতের মাধ্যমে মেয়েদের বিক্রয় চুক্তিকে বৈধতা দিয়ে যৌনদাসত্বের ব্যাপারে বিস্তারিত নীতিমালা তৈরি করেছে। আইএসের গবেষণা ও ফতোয়া বিভাগ গত মাসে যৌনদাসত্বের নির্দেশনা বিষয়ক একটি ধর্মীয় নীতিমালা তৈরি করে তা জারি করেছে। বারবারই আইএস নেতারা কোরানের বাণীর একাংশকে তুলে ধরে নিজেদের মতো করে সঙ্কীর্ণ ও অপব্যাখ্যা করে আসছে। তারা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী কোরানের পবিত্র বাণীর নির্ধারিত কিছু অংশ তুলে ধরে তাদের সেসব সহিংসতাকে বৈধতা দিয়েছে নীতিমালার মাধ্যমে। এমনকি তারা যৌন আকাক্সক্ষা চরিতার্থের জন্য এ ধরনের যৌনাচারকে আধ্যাত্মিক লাভ ও পুণ্য অর্জনের অংশ বলে প্রচার চালাচ্ছে। ৩৪ পৃষ্ঠার ওই নীতিমালায় গর্ভবতী ছাড়া ভিন্ন ধর্মের সব বয়সী দাসীদের সঙ্গে যৌনাচারের বৈধতা দেয়া হয়েছে।

১৫ বছরের ওই কিশোরী জানায় কিভাবে তার পরিবার আইএস জঙ্গীদের আক্রমণের শিকার হয়েছিল। সে বলে, ‘পুরো পরিবার নিয়ে আমরা পালানোর চেষ্টা করি। কিন্তু ভারি অস্ত্রে সজ্জিত আইএস যোদ্ধারা আমাদের ঘিরে ফেলে। আমি, আমার মা, ১৪, ৭ ও ৪ বয়সী চার বোন অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকি। প্রথমেই তারা পুরুষ ও নারীদের আলাদা করে ফেলে। আমাকে আমার মা ও বোনদের সঙ্গে প্রথমে একটি ট্রাকে তোলা হয়। মাউন্ট সিনজার শহরের কাছাকাছি আসার পর আমাকে মা ও বোনদের কাছ থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। একজনের কোলে আরেকজনকে গাদাগাদি করে ভরা হয় বাসে। সাদা রঙের বাসের গায়ে লেখা ছিল ‘হাজী’ শব্দটি। প্রতি বছর মক্কায় হজ পালনের জন্য যাওয়া হাজীদের এই বাসে বহন করা হয়। কম বয়সী ও অবিবাহিত মেয়েদের সঙ্গে আমাকে ওই বাসে জোর করে তোলা হয়।’

১৫ বছর বয়সী ওই কিশোরীকে ৬ ঘণ্টা যাত্রার পর প্রথমে মসুলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি মেয়েদের গ্রুপের সঙ্গে তাকে গ্যালাক্সি ওয়েডিং হলে রাখা হয়। অন্য গ্রুপের মেয়েদের নিয়ে তোলা হয় সাদ্দাম হোসেনের শাসন সময়ের বাদুশ জেলখানা, যুব ভবনে। তাছাড়া ইরাকের তাল আফার, সোলাহ, বা’আজ, সিনজার শহরের এলিমেন্টারি স্কুল ও পৌর ভবনেও অনেক মেয়েকে বন্দি করে রাখা হয়। সেইসব স্থানে তাদের কয়েকদিন, কয়েক মাস রাখার পর ছোট ছোট গ্রুপে বাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় সিরিয়া বা ইরাকের ভেতরেই অন্য কোন জায়গায়। এরপর মোটা অর্থের বিনিময়ে যৌনদাসী হিসেবে তাদের বিক্রি করে দেয়া হয়। মেয়েদের নাম, বয়স এবং বিয়ে হয়েছে কি না, বাচ্চা আছে কি না এসব তথ্য একটি নিবন্ধন বইয়ে তুলে নেয়া হতো। ছোট ছোট দলে মেয়েদের নিয়ে যাওয়া হতো অন্য কোথাও। যে মেয়েরা যেতে চাইত না তাদের চুল ধরে টেনে হেঁচেড়ে নিয়ে যাওয়া হতো। কমবয়সী সুন্দর চেহারার মেয়েরা এক সপ্তাহের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যেত। আর বেশি বয়সী বিবাহিত মেয়েদের মাসের পর মাস বিক্রির জন্য সাবায়া মার্কেট বা দাসবাজারে উপযুক্ত ক্রেতার কাছে বিক্রির জন্য নিলামে তোলা হতো।

কিশোরী মেয়েটি জানায়, তাকে দুই মাস পর একটি ছোট গ্রুপের সঙ্গে বাসে করে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে নেমে সে প্রথমে শুনতে পায় কয়েক যোদ্ধা হর্ষধ্বনি দিয়ে তাকে ডাকছে সাবায়া নামে। প্রথমে সে এর অর্থ জানত না। পরে এক আইএস যোদ্ধার কাছে জানতে পারে সাবায়া অর্থ দাসী। ওই যোদ্ধা তাকে জানায়, ইয়াজিদি সম্প্রদায় তাউস মালিকের (ইয়াজিদিদের বিশ্বাস অনুসারে সাত দেবতার একজন) উপাসনা করে। ওই যোদ্ধার মতে, তাউস একজন শয়তান। তাই ওই শয়তানের অনুসারীরা তাদের দাসী। তারা এখন তাদের বিক্রি করতে পারে যা খুশি তাই করতে পারে।

দাসত্বের শিকার ১৯ বছর বয়সী এক তরুণী জানান, তাকে আরও ৫শ অবিবাহিত মেয়ের সঙ্গে একটি ভবনে রাখা হয়েছিল। সেখানে ১১ বছর বয়সী মেয়েও ছিল। যখন ক্রেতা আসত তখন মেয়েদের একজন একজন করে আলাদা রুমে নিয়ে যাওয়া হতো।

ওই তরুণী বলেন, ‘আমির পদধারীর ব্যক্তিরা বসে থাকত। আর আমাদের নাম ধরে ডাকত। আমাদের তাদের দিকে মুখ করে চেয়ারে বসে থাকতে হতো। তাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করা হতো। যখন আমরা রুমে প্রবেশ করতাম, তারা স্কার্ফসহ আমাদের পরিধেয় কাপড় খুলে ফেলত। যখন আমার পালা এলো তারা আমাকে চারবার দাঁড় করালো। তারা আমাকে চারদিকে ঘুরিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল।’

প্রদিবেদনে বলা হয়, অপহৃত মেয়েদের বিব্রতকর প্রশ্নও করা হতো। তাদের শেষ মাসিক কবে হয়েছিল জিজ্ঞেস করা হতো। তারা বুঝতে চাইত মেয়েটি গর্ভবতী কি না। কারণ তারা বুঝতে চাইত যোদ্ধারা মেয়েটির সঙ্গে তাৎক্ষণিক যৌনাচারে যেতে পারবে কি না। সেক্ষেত্রে তাদের তৈরি শরিয়া আইন উল্লেখ করে তারা বলত, গর্ভবতী দাসীর সঙ্গে যৌনাচার করা যায় না। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ২১ জনের মধ্যে একজন ছিলেন যিনি ওই সময়ে গর্ভবতী থাকায় ধর্ষণের শিকার হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন।

অপহৃত মেয়েদের বিক্রি জন্য পণ্যের বিজ্ঞাপনের মত নানা পন্থা নেয়া হয়। মেয়েদের ছবি তোলা হয়। একেকজনকে নাম দেয়া হয় সাবায়া-১, সাবায়া-২.. । এই ব্যবসায় জড়িত ওসমান হাসান আলী নামের এক ব্যক্তি জানিয়েছে, সে ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের বহু মেয়েকে বিক্রি করেছে। প্রত্যেক মেয়ের ছবি বিক্রেতাকে দেখানো হতো। প্রতিবেদনে ওসমান হাসান আলীর কাছ থেকে পাওয়া ছবিগুলোর বর্ণনা তুলে ধরে বলা হয়, তার কাছ থেকে ১২ মেয়ের ছবি পাওয়া গেছে। প্রত্যেকটি ছবিতেই মেয়েদের দেখা গেছে একা একটি রুমে বসে আসে। ক্যামেরার দিকে মুখ করা। কিন্তু সেই মুখে কোন হাসি নেই। শূন্য দৃষ্টিতে তারা শুধু তাকিয়ে আছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেক সময় দীর্ঘসময় ধরে নিয়মিত ধর্ষণ করা মেয়েটিকে তারা মুক্তও করে দেয়। সেসময় তারা এমন ভাব দেখায় যেন তারা মুক্ত করে দিয়ে মেয়েটিকে স্বর্গীয় পুরস্কার দিয়েছে। ২৫ বছর বয়সী এক নারী তার ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছে বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, একদিন তার লিবিয়ান প্রভু আইএস যোদ্ধা তাকে বলল খুব শীঘ্রই তাকে সে মুক্ত করে দেবে। কারণ সে আত্মঘাতী বোমা হামলার বিশেষ প্রশিক্ষণ শেষ করেছে এবং সে খুব দ্রুত হামলার ঘটনা ঘটাতে যাচ্ছে।

৩৪ বছর বয়সী ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের আরেক নারী জানান, সিরিয়ার শাহাদাদি এলাকায় এক সৌদি যোদ্ধার দাসী ছিলেন তিনি। ওই লোক ১২ বছর বয়সী আরেক দাসী কিনে আনার পর তিনি ধর্ষণের হাত থেকে মুক্তি পান। ওই শিশুটি কম বয়সী হওয়ার কারণে ধর্ষণের ফলে ইনফেকশনের শিকার হয়। এরপরও শিশুটি নিস্তার পায়নি। ওই নারীর অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও শিশুটির চিকিৎসা না করে নিয়মিত ধর্ষণ করত লোকটি।