২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অবশেষে আলোর মুখ দেখছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

অবশেষে আলোর মুখ দেখছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে
  • প্রথম ধাপে আজ মূল অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শুরু ্ররাজধানীর যোগাযোগে আমূল পরিবর্তন আসবে;###;বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী যেতে সর্বোচ্চ সময় লাগবে ২ মিনিট

রাজন ভট্টাচার্য ॥ অনিশ্চয়তা কাটিয়ে রাজধানীর যানজট নিরসনে বহুল প্রতীক্ষিত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের (উড়াল সড়ক) নির্মাণ কাজ শুরু হচ্ছে। প্রায় চারবছর পর আবারও প্রকল্পটি নতুন করে আলোর মুখ দেখল। আজ রবিবার প্রথম ধাপে মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হবে। কাওলা, এয়ারপোর্ট রোড (হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিপরীতে) কাজের উদ্বোধন করবেন সড়ক পরিবহন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। সংযোগ সড়কসহ ৪৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি। যা শেষ হবে ২০১৬ সালে। বিলম্বিত কারণে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের মূল অবকাঠামো নির্মাণ হলে নগরীর উত্তর-দক্ষিণে যানবাহন চলাচলে বিকল্প সড়ক সৃষ্টি হবে। ফলে নগরবাসীর ভ্রমণ সময় কমবে। ভোগ্যপণ্য বাধাহীনভাবে চলাচল করতে পারবে। অর্থাৎ নগরীর যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আসবে। বিমানবন্দর থেকে কুতুবখালী যেতে সর্বোচ্চ সময় লাগবে ২০ মিনিট। তবে টোল ছাড়া নতুন এই উড়াল সড়ক ব্যবহার করা যাবে না।

প্রকল্পের আওতায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মহাখালী হয়ে তেজগাঁও-মগবাজার-কমলাপুর-কুতুবখালী পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার মূল উড়াল সড়ক নির্মিত হবে। রাজধানীর কুড়িল, মহাখালী, মানিক মিয়া এ্যাভিনিউ, পলাশী ও মগবাজারে বাইলাইন নামবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে উত্তরাঞ্চলের প্রায় ২১ জেলার যাত্রী থেকে শুরু করে বৃহত্তর ময়মনসিংহের সড়কপথে আসা যাত্রীরা দ্রুত সময়ের মধ্যে কুতুবখালী পৌঁছতে পারবেন। এর মধ্যে বৃহত্তর চট্টগ্রাম থেকে শুরু করে পূর্বাঞ্চলের যাত্রীদের ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। যদিও প্রথম ধাপে সংযোগ সড়ক ছাড়াই ২৬ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের কথা ছিল।

তিন ধাপে হবে নির্মাণ কাজ ॥ সরকারী-বেসরকারী অংশীদারিত্বের এই প্রকল্প তিন ধাপে বাস্তবায়ন হবে। প্রথম ধাপ বিমানবন্দর থেকে শুরু হয়ে বনানী পর্যন্ত ৭ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার। দ্বিতীয় পর্যায়ে বনানী থেকে মগবাজার পর্যন্ত ৫ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার এবং শেষ পর্যায়ে মগবাজার থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী পর্যন্ত ৬ দশমিক ৪৩ কিলোমিটার উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হবে। ২০১১ সালের ১৯ জানুয়ারি এ প্রকল্পের প্রথম চুক্তি হয়। একই বছর ৪ এপ্রিল ভিত্তিস্থাপন করা হয়। তবে নক্সা পরিবর্তন ও মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায়। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ইতাল থাই ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির সঙ্গে নতুনভাবে চুক্তি করে সরকারের সেতু বিভাগ। ২০১২ সালের ৩০ অক্টোবর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেছিলেন ওবায়দুল কাদের।

সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণের কারণে মোট ১৫৭ জন তাদের ব্যক্তিগত জমি হারিয়েছেন। পদ্মাসেতু প্রকল্পের আদলে এই উড়াল সেতুর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের পুনর্বাসন করা হবে। এ জন্য ইতোমধ্যে ৪০ একর জমির সংস্থান করা হয়েছে। জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এই প্রকল্পে এরই মধ্যে ১৩৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে।

নানা অনিশ্চয়তার মুখে ছিল পুরো প্রকল্পটি ॥ রাজধানীর যানজট নিরসনই শুধু নয় সরকারের মেগা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে অন্যতম। প্রকল্প নির্মাণে ২০১১ সালের ১৯ জানুয়ারি একটি বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে সরকার। ওই বছরের ৩০ এপ্রিল ঘটা করে প্রকল্প শুরুর কাজের উদ্বোধনও করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল সাড়ে তিন বছরের মধ্যে। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে প্রথম প্রতিবন্ধকতা শুরু হয় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে। জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে স্থানীয় লোকজন অনেকেই জমি ছাড়তে নারাজ ছিলেন। অনেকেই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন জমি রক্ষায়। নানা কারণে কাজ শুরু না হওয়ায় নতুন করে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে সরকার। এতে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ে। তবে প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী এএইচএমএস আকতার বলেন, ২০১১ সালের তুলনায় নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। সঙ্গত কারণেই প্রকল্প ব্যয়ও বেড়েছে কিছুটা।

সেতু বিভাগের তথ্যমতে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েটি নির্মাণে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যয় হবে আট হাজার ৯৪০ কোটি ১৮ লাখ টাকা। আর সরকারের ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৪১৩ কোটি টাকা। এছাড়া এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ তদারকিতে স্বাধীন পরামর্শক নিয়োগে ব্যয় হচ্ছে ৫২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এটিও সরকারের তহবিল থেকে বহন করা হবে। প্রকল্পে মোট ব্যয়ের ৭৩ শতাংশ বিনিয়োগকারী ও ২৭ শতাংশ সরকারের বহন করার কথা ছিল। অথচ উদ্বোধনের পরও দীর্ঘ সময় প্রকল্পের কাজ শুরু সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সেতু বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বক্তব্য, চুক্তির পর এক্সপ্রেসওয়েটির এ্যালাইনমেন্ট ও নক্সায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। ২০১২ সালের ১৭ মে সড়কের নক্সায় কিছুটা পরিবর্তন এনে দৈর্ঘ্য কমানো হয় চার কিলোমিটার। ওঠানামার র‌্যাম্পের অবস্থানের কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। এজন্য বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ফের চুক্তি করা হয়েছে। এসব কারণে বিলম্ব।

প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে যোগাযোগমন্ত্রী বলেন, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্পটি সরকারের একটি অগ্রাধিকারযুক্ত প্রকল্প। এ প্রকল্পের গুরুত্ব বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পটি ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত প্রকল্প হিসেবে নিয়েছেন। আমরা আশা করছি সব বাধা পেরিয়ে প্রকল্পটি সফলতার মুখ দেখবে। ঢাকার যানজট নিরসনে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।

বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের আপত্তির মুখে নক্সা কিছুটা পরিবর্তন হয় সাম্প্রতিক সময়ে। তাদের পক্ষ থেকে কুতুবখালী পর্যন্ত নির্মাণ কাজ শেষ করার প্রস্তাব করে প্রতিষ্ঠানটি। বিভিন্ন দিক যাচাই-বাছাই করে নতুন আরেকটি নক্সা অনুমোদন করে সরকার। সংশোধিত নক্সায় ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বিমানবন্দর সড়ক থেকে শুরু হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত বিদ্যমান রেললাইনের ওপর দিয়ে এবং কমলাপুর থেকে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (সওজ) অতীশ দীপঙ্কর সড়কের ওপর দিয়ে সায়েদাবাদ পর্যন্ত এবং পরের অংশটি গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার অংশের ওপর দিয়ে যাত্রাবাড়ী অতিক্রম করে কুতুবখালী পর্যন্ত যাবে।

নক্সার পাশাপাশি মহাখালী ও মালিবাগের র‌্যাম্পের অবস্থানেও পরিবর্তন করা হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পটির কাঠামোগত ধরনেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। ব্যয় কমানোর জন্য এক্সপ্রেসওয়েটি বক্স গ্রিডারের বদলে আই গ্রিডারে নির্মাণ করা হবে। এছাড়া এক্সপ্রেসওয়েটি তিন অংশে ভাগ করে নির্মাণ কাজ পরিচালনা করা হবে। এক্ষেত্রে একটি অংশ শেষ হওয়ার পরই তা চালু করা যাবে। পরিবর্তিত বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতেই বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন করে চুক্তি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা।

২০০৯ সালের ১৭ জুন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের বৈঠকে উড়াল সড়ক নির্মাণের দরপত্র আহ্বানের নির্দেশ দেয়া হয়। ২০১০ সালের ৪ মার্চ দেশী-বিদেশী ৯টি প্রতিষ্ঠান উড়াল সড়ক নির্মাণের আগ্রহ প্রকাশ করে প্রাথমিক প্রস্তাব জমা দেয়। এসব প্রস্তাব যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রকৌশলী অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটি চারটি প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য বিবেচনা করে আর্থিক এবং কারিগরি প্রস্তাব আহ্বান করে। একই বছরের ২৩ আগস্ট উড়াল সড়ক নির্মাণ রুট অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা। সরকারী-বেসরকারী যৌথ বিনিয়োগে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগ।

দেশীয় ইনফ্র্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন সেন্টার (আইআইএফসি) এবং বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল প্রতিকিলোমিটার উড়াল সড়ক নির্মাণে ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করলেও বিদেশী বিশেষজ্ঞরা প্রতি কিলোমিটার নির্মাণে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় নির্ধারণ করেছিল। প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুরে এ ধরনের প্রকল্পের ব্যয় বিবেচনা করে দেশীয় বিশেষজ্ঞরা প্রতি কিলোমিটারের ব্যয় নির্ধারণ করেন। তখন বিশেষজ্ঞদের তরফ থেকে জানানো হয় বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটার উড়াল সড়ক নির্মাণের ব্যয় এর চেয়ে বেশি হবে না।

টোল আদায় ॥ যানজট এড়াতে হলে টোল পরিশোধ করে ব্যবহার করতে হবে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ২১ বছর পর্যন্ত উড়াল সড়কের টোল আদায় করার কথা থাকলেও নতুন চুক্তি অনুযায়ী সময় বেড়েছে বলে জানা গেছে। ২০ কিলোমিটার রাস্তার জন্য প্রাইভেটকারকে প্রতিবারের জন্য টোল দিতে হবে ১২৫ টাকা। যাত্রীবাহী বাসের জন্য টোল দিতে হবে ২৫০ টাকা। ৬ চাকার ট্রাককে দিতে হবে ৫০০ টাকা এবং ছয়ের বেশি চাকার ট্রাককে দিতে হবে সাড়ে ৭০০ টাকা। এর মধ্যে ২৫ ভাগ টোল পাবে সরকার। প্রতিদিন কমপক্ষে ১৩ হাজার ৫০০ যানবাহন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচল করবে বলে প্রাথমিক সমীক্ষায় ধরা হয়। পর্যায়ক্রমে এ সংখ্যা ৮০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।