২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গুণীজনদের সম্মান জানাতেন বঙ্গবন্ধু

স্টাফ রিপোর্টার ॥ আয়োজনটি ছিল জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের বর্ণময় জীবনের গল্প নিয়ে। জাতীয় শোক দিবসের নানা আনুষ্ঠানিকতার মাঝে ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে জাতীয় জাদুঘরের আয়োজনটি। শনিবার ঘড়ির কাঁটায় তখন দশটা। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালীর জীবন কথা শুনতে জাদুঘরের মূল মিলনায়তন তখনই উৎসুক শ্রোতায় পরিপূর্ণ। বসার জায়গা না পেয়ে অনেকেই দাঁড়িয়ে থেকেই শুনলেন মোহাবিষ্ট করে রাখা গল্প বলার আয়োজনটি। নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ ছুটে এসেছেন বঙ্গবন্ধুর গল্প শোনার জন্য। কারণ, যে দু’জন মানুষ বঙ্গবন্ধুর গল্প বলবেন তাঁরা জাতির পিতাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, মিশেছেন ও সহচর হিসেবে কাজ করেছেন। একজন বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব ড. মসিউর রহমান আর অন্যজন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ব্যারিস্টার এম. আমীর-উল ইসলাম। বঙ্গবন্ধুর ৪০তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘বঙ্গবন্ধুর গল্প’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। কথার শুরুতেই সঞ্চালক দুইজন কথককে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এমন কিছু বলার অনুরোধ জানান যা অনেকেরই অজানা।

স্বাধীনতার মহান স্থপতিকে নিয়ে গল্পের সূচনায় ড. মসিউর রহমান বলেন, বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব হিসেবে আমি চাকরি করেছি তিন বছর। আমার বলার শুরুতেই বঙ্গবন্ধুর দেয়া একটি আদেশনামার কথা দিয়ে শুরু করতে চাই। বঙ্গবন্ধু একদিন বললেন, এই আদেশনামা লিখে নিয়ে আসো। সেখানে লেখা ছিল পাবলিক সেক্টরে যে সকল নিয়োগ হবে তাতে ১০ শতাংশ মেয়েদের নিয়োগ থাকবে। এই বাক্যটির অর্থ দাঁড়ায় নারীদের ক্ষমতায়নে বঙ্গবন্ধু বলে গেছেন অনেক আগে। তিনি সমাজকে বুঝতে পারতেন। তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রশাসনিক দূরদৃষ্টি ছিল। বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু মিশতেন একেবারেই অন্যভাবে। কয়েকটি উদাহরণ দেই। একবার এক সফরে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যারা যাবেন তাদের একটি নথি দেখে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কফিলউদ্দিন সাহেব বললেন, এত লোক না গেলে চলে না। বঙ্গবন্ধু তাকে কিছু বললেন না। মাহমুদ সাহেব নামের তালিকা কাটতে শুরু করলেন। অর্থাৎ ভয় পেয়ে কাউকে দায়িত্ব পালন করতে হতো না। জহুরুল হক নামের একজন কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তা দেখা করতে আসলেই বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে যেতেন। বিষয়টি নিয়ে সবার কৌতূহল ছিল। একদিন বঙ্গবন্ধু নিজেই আমাদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা জহুর ভাইকে চেন? পরে আমরা জানতে পারি জহুর ভাই হলেন সেই ব্যক্তি যিনি ইংরেজীতে কিছু লিখলে সেটা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও কখনও কাটতেন না। এভাবেই গুণীজনদের সম্মান জানাতেন বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধুর মানবতার গল্প শোনাতে গিয়ে ড. মসিউর রহমান বলেন, রাজিয়া ফয়েজ দীর্ঘদিন ধরে জেলে ছিলেন। আমরা জানতাম তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু রাজিয়া ফয়েজকে জেল থেকে ছাড়ানোর আদেশপত্র তৈরি করতে বললেন। আমরা এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বললেন, রাজিয়ার একটা সন্তান হয়েছে। রাজিয়া ফয়েজের দোষ আছে, কিন্তু ঐ শিশুর কি দোষ? তাকেও কি তোমরা জেলে রাখতে চাও? গল্পচ্ছলে তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর খাবার আসত তার বাসা থেকে। একজন নয় সেখানে প্রায় ৪-৫ জনের খাবার দেয়া হতো। মেন্যুতে থাকত কৈ মাছ, মাছের মাথা এমনি সব আইটেম। দুপুুরবেলা অনেক সময় তাঁর কক্ষে গেলে সঙ্গে বসে খেতে বলতেন। আর ঐ মাছের মাথা খেতে দিতেন আমাদের। বঙ্গবন্ধু মাঝে মধ্যেই তার ব্যস্ততার কারণে পরিবারের অযতœ হয়েছে বলে মন্তব্য করতেন। বেগম মুজিবকে তিনি রেণু নামে ঢাকতেন। প্রায়শই আমাদের বলতেন সন্তানগুলোকে মানুষ করেছে রেণুই।

শেখ কামালের এক সুপারিশ বঙ্গবন্ধু অনুমোদন না করার কাহিনী বলতে গিয়ে ড. মসিউর বলেন, শেখ কামাল আমার কাছে এসেছিলেন একবারই। আবাহনী ক্রীড়া চক্র কলকাতায় ম্যাচ খেলতে যাবে। শিক্ষা ও ক্রীড়ামন্ত্রী ইউসুফ সাহেব মাথাপিছু ১৫ ডলার সুপারিশ করেছেন। শেখ কামাল নিজে বঙ্গবন্ধুকে না বলে আমাকে দিয়ে বলালেন যেন ওই সুপারিশটা বদলানো না হয়। আমি নথি নিয়ে গেলাম। কিন্তু বঙ্গবন্ধু অনুমোদন করলেন না।

ব্যারিস্টার এম. আমীর-উল ইসলাম জাতির জনককে নিয়ে তাঁর গল্প-কথনে বলেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৪৪ সালে। তখন আমি স্কুলের ছাত্র। কুষ্টিয়ায় একটি অনুষ্ঠানে তিনি এসেছিলেন। এরপর ঢাকা, কলকাতা, লন্ডনে নানা জায়গায় তাঁর সঙ্গে রাজনৈতিক নানা আয়োজনে, সংগ্রামে একসঙ্গে ছিলাম আমরা। ১৯৬৬ সালে তিনি ৬ দফা ঘোষণার পর সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে মিটিং করেছেন ও বক্তব্য রেখেছেন। এই ছয় দফার কারণে কারাবরণও করেছেন। জেল থেকে ফিরছেন তো আবার মাঠে ময়দানে হাজির হয়েছেন। ৬ দফা নিয়ে তাঁর শেষ মিটিংটা ছিল নারায়ণগঞ্জের বালুর মাঠে। তিনি ৬টা কবুতরও উড়িয়ে দিলেন। বক্তৃতা করলেন। মিটিং শেষে আমি ওনাকে বললাম, আপনাকে মনে হয় আজও গ্রেফতার করতে পারে। তিনি বললেন, কিভাবে বুঝলে? আমি বললাম, পুলিশের একটি জিপ আপনাকে অনুসরণ করছে। ঘটনাও ঠিক তাই হলো।

আমীর-উল ইসলাম আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু কখনও কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পিছ পা হতেন না। এবং তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনেও সেই চর্চা করে গেছেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কটি ছিল অনেকটা গুরু-শিষ্যের মতো। কিন্তু তিনি সেখানেও কোন অন্যায় কিছু থাকলে তা তুলে ধরতেন। আমাদেরও বলতেন সেই একই চর্চা করতে। এভাবেই বঙ্গবন্ধুর জীবনের নানা অজানা বিষয় উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ‘বঙ্গবন্ধুর গল্প’ শীর্ষক আয়োজনটি