১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পুরনো ডাকটিকেট খাম পোস্টকার্ড থেকে খুঁজে নেয়া বঙ্গবন্ধু

পুরনো ডাকটিকেট খাম পোস্টকার্ড থেকে খুঁজে নেয়া বঙ্গবন্ধু
  • দুর্লভ সংগ্রহ জাতীয় জাদুঘরে

মোরসালিন মিজান

ইতিহাস চেতনার দিক থেকে যথেষ্ট পিছিয়ে বাঙালী। এই চর্চার মধ্য দিয়ে খুব একটা যাওয়া হয় না। ইতিহাস সংরক্ষণের ব্যাপারে আরও বেশি উদাসীন। এ জন্য কিছু ক্ষতি তো হয়েছেই। তবে ব্যতিক্রমও আছে। নাওয়া খাওয়া ভুলে কেউ কেউ ইতিহাসের স্মারক খুঁজে বেড়ান। অর্থ ও সময় ব্যয় করেন। লেগে থাকেন। তাঁদের কয়েকজনের দুর্লভ সংগ্রহ নিয়ে জাতীয় জাদুঘরে শুরু হয়েছে চমৎকার প্রদর্শনী। এতে স্থান পেয়েছে বহুকাল আগের পুরনো ডাকটিকেট, ব্যবহৃত খাম, বিশেষ খাম, উদ্বোধনী খাম, পোস্টকার্ড, এ্যারোগ্রামসহ নানা কিছু। অমূল্য স্মারক থেকে খুঁজে নেয়া হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। প্রদর্শনীর যৌথ আয়োজক- জাতীয় জাদুঘর ও ফিলাটেলিস্টস এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ।

শনিবার বিকেলে জাতীয় জাদুঘরের তৃতীয় তলার ২৬ নম্বর গ্যালারিতে প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এখানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পুরনো ডাকটিকেট। বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ২১টি ডাকটিকেট প্রদর্শিত হচ্ছে। সবগুলোতেই বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকেট। সংখ্যায় ৮টি। বিশেষভাবে বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত দুর্লভ ডাকটিকেটটি দেখে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। ৫ টাকা মূল্যমানের এই টিকেট বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশকে বহন করে নিয়ে গেছে! এর পর দীর্ঘকাল বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি সংবলিত ডাকটিকেটের দেখা মেলে না। শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৬ সালের ১৫ আগস্ট একটি স্ট্যাম্প প্রকাশ করা হয়। এই স্ট্যাম্পে ফের খুঁজে পাওয়া যায় বাঙালীর মহান নেতাকে। পরবর্তীতে অনিয়মিত হলেও তাঁকে পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর, ১৭ মার্চ ও ১৫ আগস্ট তারিখে প্রকাশিত হয়েছে স্মারক ডাকটিকেট। এসব টিকেটে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। ১৯৯৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ২৫ বছর পূর্তি করে বাংলাদেশ। এ উপলক্ষে প্রকাশিত বিশেষ ডাকটিকেটেও ভেসে উঠছে প্রিয় পিতার মুখ। টিকেটগুলো সংগ্রহ করেছেন শামসুল আলম। পাশেই ডাকটিকেটের ফুলশীট। এগুলো সংগ্রহ করেছেন ইকবাল মজিদ। প্রদর্শনীতে কিছু সুভিন্যের শীট রাখা হয়েছে।

আছে ব্যবহৃত খাম। উদ্বোধনী খাম আছে। বিশেষভাবে বলতে হয় বঙ্গবন্ধুকে লেখা চিঠির খামের কথা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসব চিঠি লেখা হয়েছিল। বিদেশ থেকে এসেছে কিছু। গেড়ুয়া রঙের খামের বাম পাশে প্রেরকের নাম ঠিকানা লেখা। একেক সময় একেক নাম। তবে প্রাপক একজনইÑ বঙ্গবন্ধু। কখনও গণভবনের ঠিকানায় তাঁকে খোঁজা হয়েছে। কখনও ধানম-ির বাসভবনের ঠিকানায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের পুরো ঠিকানা কয়জন আর জানেন? তাতে কী? মুজিব লিখতেই চলে এসেছে চিঠি! রাজবাড়ীর প্রভারানী সরকার তো প্রাপকের স্থানে ‘হইতে’ লিখে দিয়েছেন। নিচে লিখেছেনÑ ‘মোঃ শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ, ঢাকা।’ এইটুকুন ভুলে কি আর পিতার কাছে লেখা চিঠি আটকে থাকে? চিঠিটি আজ তাই ইতিহাসের স্মারক। এমন আরও কিছু চিঠির খাম রাখা হয়েছে প্রদর্শনীতে। মজার ব্যাপার হলো, স্বাধীন দেশে লেখা চিঠির খামে ‘পাকিস্তান’ লেখা ডাকটিকেট লাগানো! কেন? জানতে চাইলে সংগ্রাহক গোলাম আবেদ বলেন, তখনও চাহিদা অনুযায়ী ডাকটিকেট ছাপার সামর্থ্য হয়নি বাংলাদেশ ডাক বিভাগের। ফলে পাকিস্তান আমলের টিকেট দিয়ে কাজ চালিয়ে নেয়া হতো। পারভেজ আলী আনোয়ারের সংগ্রহেও রয়েছে বেশ কিছু চিঠি। সেগুলো খুঁটিয়ে দেখলে অনেক মজার মজার তথ্য পাওয়া যায়।

বঙ্গবন্ধুর ছবি সংবলিত স্ট্যাম্প ব্যবহার করে যেসব চিঠি লেখা হয়েছে সেগুলোরও একটি সংগ্রহ রয়েছে প্রদর্শনীতে। সরকারী বিভিন্ন দফতর ব্যাংক বীমার বড় কর্তাদের উদ্দেশে এসব চিঠি লেখা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি যুক্ত হওয়ায় খামগুলো নিজ উদ্যোগে সংগ্রহ করেছেন শৌখিন সংগ্রাহক সাইফুল ইসলাম।

প্রদর্শনীতে বহু পুরনো পোস্টকার্ডে দৃশ্যমান হয়েছেন বঙ্গবন্ধু। সংগ্রহ করেছেন লস্কর ইফতেখার হোসাইন। হাল্কা হলুদ রঙের পোস্টকার্ডের এক কোনে ছোট্ট করে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি। কে.জি মোস্তফার ডিজাইন। পোস্টকার্ড খুব অল্প খরচে চিঠি লেখার মাধ্যম। তাই হয়ত ১৯৭৩ সালের একটি পোস্টকার্ডের গায়ে মূল্যমান লেখা রয়েছে ১০ পয়সা।

পোস্টকার্ডের কথা অনেকেই মনে রেখেছেন। কিন্তু প্রদর্শনীতে দেখা গেল দুর্লভ এ্যারোগ্রাম। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে চালু হয়েছিল। ওই বছরই শেষ। অথচ স্মৃতিচিহ্ন ঠিকই বাঁচিয়ে রেখেছেন এস এম শরিফুল ইসলাম। তাঁর সংগ্রহ থেকে বেশ কয়েকটি এ্যারোগ্রাম প্রদর্শিত হচ্ছে। খুব পাতলা খামের মতো দেখতে। ভেতর অংশে টিঠি লেখা হতো। এ্যারোগ্রামের গায়েও খুঁজে পাওয়া যায় বঙ্গবন্ধুকে। প্রদর্শনীতে আছে বেশ কিছু পুরনো টাকার নোট। এসব নোট থেকেও খুঁজে নেয়া হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে।

জাতির জনকের পাশাপাশি প্রদর্শনীর ছোট্ট পরিসরে তুলে ধরা হয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস। ডাকটিকেটের ভাষায় ইতিহাসটি বর্ণনা করেছেন এটিএম আনোয়ারুল কাদের। তার ডাকটিকেটে নবাব সিরাজউদ্দৌলা, সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম, একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাসহ আরও অনেকে। এভাবে বাঙালীর স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। পত্রিকার কাটিং থেকেও বর্ণিত হয়েছে কিছু ইতিহাস।

সব মিলিয়ে ব্যতিক্রমী আয়োজন। চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।