১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নানা আয়োজনে শ্রদ্ধা ভালবাসায় জাতির পিতাকে স্মরণ

  • সংস্কৃতি সংবাদ

মনোয়ার হোসেন ॥ একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানবজাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালী হিসেবে যা কিছু বাঙালীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালবাসা, অক্ষয় ভালবাসা, যে ভালবাসা আমার রাজনীতি এবং অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে। এভাবেই অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে নিজেকে উপস্থাপন করেছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালী সত্তার প্রতি আন্দোলিত ও আলোড়িত আপন মনের ভাবনাটি প্রকাশ করেছিলেন জাতির জনক শেখ মুজিব। বাঙালীর রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই মহান স্থপতির ৪০তম শাহাদাতবার্ষিকী ছিল শনিবার। পঁচাত্তরের রক্তস্নাত এই দিনে ঘাতকের বুলেটে নিভে যায় জাতির পিতার প্রাণপ্রদীপ। শত্রুর আক্রোশে থেমে যায় বাঙালীর প্রাণপুরুষের জীবন স্পন্দন। কতিপয় কুচক্রী সেনাসদস্যের চক্রান্তে সপরিবারে শহীদ হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতা ও তাঁর পরিবারের ওপর রক্তগঙ্গা বয়ে যাওয়া অশ্রুভেজা বেদনাময় দিনটি পঞ্জিকার হিসাবে পনেরোই আগস্ট। শোকের আখরে লেখা দিনটি ছিল জাতীয় শোক দিবস। দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীর সংস্কৃতি অঙ্গনে ছিল নানা আয়োজন। কণ্ঠশিল্পীর গানের সুরে, বাকশিল্পীর কবিতার ছন্দে, বক্তার কথায়, শিল্পীর আঁকা চিত্রকর্মে, নৃত্যশিল্পীর অভিব্যক্তির সঙ্গে মুদ্রার প্রকাশে, আলোকচিত্রীর আলোকচিত্রে কিংবা গল্প বলার আয়োজনে স্মরিত হন স্বাধীনতার রূপকার শেখ মুজিবুর রহমান। সকাল থেকে রাত অবধি বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করা প্রিয় পিতাকে।

জাতীয় জাদুঘরের বহুমাত্রিক কর্মসূচী ॥ শ্রাবণের সকালে ‘বঙ্গবন্ধুর গল্প’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। এ আয়োজনে জাতির জনকের জীবন থেকে নেয়া গল্প শুনিয়েছেন তাঁর ঘনিষ্ঠ দুই সহচর। জনককে নিয়ে স্মৃতির অলিন্দ থেকে তুলে আনা গল্প বলেছেন বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব ড. মসিউর রহমান ও ঘনিষ্ঠ সহচর ব্যারিস্টার এম. আমীর-উল ইসলাম। জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে এই দু’জন মানুষ বলেছেন বঙ্গবন্ধুর গল্প। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর সঞ্চালিত আয়োজনটি তন্ময় হয়ে শুনেছেন অগণিত উৎসুক শ্রোতা। কেউ বা বসার জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে থেকেই শুনেছেন প্রাণপ্রিয় পিতার জীবনের অজানা অধ্যায়ের কথা।

জাদুঘরের বহুমাত্রিক অনুষ্ঠানমালার দ্বিতীয় পর্বের সূচনা হয় বিকেল পাঁচটায়। এ পর্বের আয়োজনে দর্শকরা দেখেছে জাতির জনকের শতাধিক দুর্লভ ছবি। সঙ্গে ছিল বঙ্গবন্ধুর ওপর রচিত গ্রন্থ ও ডাকটিকেট প্রদর্শনী। পাশাপাশি জনকের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে অবমুক্ত করা হয় বাংলাদেশ ডাক বিভাগ কর্তৃক মুদ্রিত স্মারক খাম। এছাড়া গত ১০, ১১ ও ১২ আগস্ট স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু’, ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ ও ‘বঙ্গবন্ধু ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ’ বিষয়ের ওপর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ও বিজয়ীদের প্রদান করা হয় পুরস্কার ও সনদপত্র। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সুনিয়া নিশাত আমিন। স্বাগত ভাষণ দেন জাদুঘরের মহাপরিচালক ফয়জুল লতিফ চৌধুরী।

জাদুঘরের বৈকালিক আয়োজনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয়ে বঙ্গবন্ধুর ১৩১টি দুর্লভ ছবি নিয়ে আলোকচিত্র প্রদর্শনীটি। আলো-ছায়ার খেলায় ক্যামেরাবন্দী হওয়া শেখ মুজিবের বর্ণময় জীবনের ছবিগুলো ভীষণভাবে টেনেছে অগণিত দর্শকের। জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনের লবিতে আলোকচিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর আদিবাসী টুঙ্গিপাড়া বসতভিটা থেকে শুরু করে তাঁর কিশোরবেলার ছবি। ১৯৪০ সালের একটি ছবিতে ট্রফি হাতে দেখা যায় কিশোর ফুটবলার মুজিবকে। ১৯৪৭ সালে ধারণকৃত আলোকচিত্রে মহাত্মা গান্ধী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে কলকাতায় ফ্রেমবন্দী হয়েছেন বঙ্গবন্ধু। আরেক ছবিতে ১৯৪৮ সালে সচিবালয়ের সামনে ছাত্রদের অবস্থান ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তরুণ নেতা শেখ মুজিব। ১৯৫৩ সালের এক প্রভাতফেরিতে মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর সঙ্গে ফ্রেমবন্দী হয়েছেন জাতির জনক। উপস্থাপিত হয়েছে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে জয়ের পর মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের কাছে কৃষি, বন ও সমবায় মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন মুজিব। চুয়ান্ন সালে তোলা আরেক ছবিতে বঙ্গবন্ধুকে দেখা যায় ছুটে চলেছেন আপন গ্রামের পথে। পাশের ছবিতে দেখা যায় ১৯৬২ সালে কারাগার থেকে মুক্ত হওয়া স্বাধীনতার মহান স্থপতিকে। এভাবে একের পর এক ছবিতে ১৯৬৬ সালে ঐতিহাসিক ৬ দফার ঘোষণায়, ১৯৬৯ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হওয়া, সত্তরের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্র্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত উপকূলীয় জনপদের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সত্তরের নির্বাচনের সংবাদ সম্মেলনে তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় কিংবা একাত্তরের ঐতিহাসিক সাতই মার্চের ভাষণরত বা বাহাত্তরে স্বদেশে ফেরা বঙ্গবন্ধুকে। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে এই প্রদর্শনী। শনি থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা এবং শুক্রবার বেলা সাড়ে ৩টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক ছুটি।

শিল্পপকলা একাডেমির আয়োজন ॥ শিল্পকলা একাডেমি জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের শেষ দিন ছিল শনিবার। একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় এদিনের সান্ধ্যকালীন আয়োজনটি সাজানো নৃত্য-গীত, কবিতা আবৃত্তি ও কথনে।

প্রথমেই ছিল বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত আলোচনাসভা। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন খাদ্যমন্ত্রী এ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে আলোচনায় অংশ নেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব বেগম আকতারী মমতাজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক নাসরিন আহমাদ ও কবি নির্মলেন্দু গুণ। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। অতিথির বক্তা হিসেবে আলোচনার পরিবর্তে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত নিজের কবিতা আবৃত্তি করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ।

সাংস্কৃতিক পর্বের সূচনা হয় একাডেমির শিশু শিক্ষার্থী শিল্পীদের সমবেত সঙ্গীত ‘ধন্য মুজিব ধন্য’ গানটি পরিবেশনের মাধ্যমে। এরপর ‘যতদিন রবে প™§া মেঘনা’ গানের সঙ্গে দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্যম। সুরেলা শব্দধ্বনি ছড়িয়ে একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন ফকির আলমগীর, সাজেদ আকবার, শিবু রায়, সুবর্ণা, জমশের আলী দেওয়ান, সালমা চৌধুরী, আশরাফ উধাশ, সাধনা মিত্র, শারমিন সুলতানা ইয়াসমীন আলী প্রমুখ। দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে ঢাকা সাংস্কৃৃতিক দল। কবিতার দোলায়িত ছন্দে একক কণ্ঠে আবৃত্তি পরিবেশন করেন কৃষ্টি হেফাজ, ঝর্ণা সরকার। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে একাডেমির রেপার্টরি নৃত্যদল। কণ্ঠশিল্পীদের পরিবেশিত গানগুলোর শিরোনাম ছিল ‘তুমি নেই আজ একথা ভাবতে পারি না’, ‘যার মাথায় ইতিহাসের জ্যোর্তিবলয়’, ‘সাড়ে সাত কোটি’, ‘আমি হিমালয়ের মতো বিশাল হৃদয় দেখেছি’সহ বেশকিছু শোকগাথামাখা সঙ্গীত।

এছাড়াও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায় চলছে বঙ্গবন্ধুকে আশ্রিত চিত্রকর্ম ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে এই প্রদর্শনী।

শিশু একাডেমি ॥ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে ছিল একাডেমি প্রকাশিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনভিত্তিক ২৫টি বই নিয়ে আলোচনা, পুরস্কার বিতরণ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ক সঙ্গীতানুষ্ঠান। প্রধান অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। বিশেষ অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসিমা বেগম। সম্মানিত অতিথির বক্তব্য রাখেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশু-গ্রন্থমালা সম্পাদনা পরিষদের সভাপতি চিত্রশিল্পী হাশেম খান এবং সদস্য ড. মুনতাসীর মামুন, সুব্রত বড়ুয়া ও শাহজাহান কিবরিয়া। সভাপতিত্ব করেন একাডেমির চেয়ারম্যান কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন।

কচি-কাঁচার মেলা ॥ স্মরণসভা ও শোক সঙ্গীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে সাজানো হয় কঁচি-কাচার মেলার জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠান। বঙ্গবন্ধু, শিশু রাসেল ও অন্যান্য শহীদদের স্মরণ করে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ নুজহাত চৌধুরী, বঙ্গবন্ধু ট্রাস্টের সদস্য কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন, মেলার সহ-সভাপতি রুবী রহমান, দিল মনোয়ারা মনু, রাশিদুল ইসলাম জুনায়েদ ও শিশু মুনিয়া। সভাপতিত্ব করেন মেলার সভাপতি খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ। অনুষ্ঠানের শেষাংশে কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা পরিচালিত কথাবিতান ও সুরবিতানের শিশু শিল্পীরা বঙ্গবন্ধুর জীবনীভিত্তিক সাংস্কৃৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করে।

‘চিত্রগাঁথায় শোকগাথা’ ॥ ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার খোলা আয়োজন করা ‘চিত্রগাঁথায় শোকগাথা’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য জীবনভিত্তিক বেশ কিছু অদেখা ছবি দিয়ে সাজানো তিন দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীর শেষ ছিল শনিবার। বাকি দু’দিনের মতোই সমাপনী দিনেও বিশাল আকৃতির ফ্রেমবন্দী জাতির জনকের ছবি দেখতে দিনভর এখানে ভিড় জমেছিল দর্শনার্থীদের।