২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাদ ও মাসুদকে নিলয়ের স্ত্রী ও শ্যালিকাকে দেখানো হচ্ছে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ব্লগার নীলাদ্রি চ্যাটার্জী নিলয় হত্যাকা-ে ৮ দিনের রিমান্ডে থাকা দুই আসামি সাদ আল নাহিন ও মাসুদ রানাকে নিহতের স্ত্রী আশা মনি ও শ্যালিকা তন্বীকে দেখানো হচ্ছে। হত্যাকা-ে আসামিরা সরাসরি অংশ নিয়েছিল কিনা, তা নিশ্চিত হতেই ডিবি এমন উদ্যোগ নিয়েছে। নিরাপত্তার কারণে অত্যন্ত কৌশলে আসামিদের দেখানো হবে। আসামিরা নিলয়ের স্ত্রী ও শ্যালিকাকে দেখতে বা চিনতেও পারবে না। সরাসরি দেখানোর আগে নিহতের স্ত্রী ও শ্যালিকা আসামিদের ছবি দেখানো হবে। আসামিদের তথ্য মোতাবেক কয়েকজনকে শনাক্ত করে গ্রেফতার অভিযান চালানো হচ্ছে। যদিও অভিযানে ঘটনার দিন নিলয়ের বাসা থেকে খোয়া যাওয়া ল্যাপটপ ও একটি স্মার্টফোন শনিবার রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উদ্ধার হয়নি।

গত ৭ আগস্ট দুপুর দেড়টার দিকে রাজধানীর খিলখাঁও থানাধীন পূর্ব গোড়ানের ৮ নম্বর সড়কের ১৬৭ নম্বর পাঁচতলা বাড়ির পঞ্চম তলার নিজ বাসায় হত্যা করা হয় ব্লগার নিলয়কে। চার হত্যাকারী বাড়ি ভাড়ার ছলে বাসায় ঢুকে নিলয়কে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। হত্যার পর বাড়ি থেকে নিলয়ের স্মার্টফোন ও ল্যাপটপটি নিয়ে যায় বলে নিহতের স্ত্রী আশা মনি মামলার এজাহারে অভিযোগ করেন।

নিলয় হত্যাকা-ে জড়িত অভিযোগে গত ১৩ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে নাহিনকে এবং মিরপুর থেকে রানাকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক শেখ মাহাবুবুর রহমান দুই আসামিকে ৮ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।

তদন্তকারী সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১৪ জানুয়ারি রাজধানীর উত্তরায় ব্লগার আফিস মহিউদ্দিনকে হত্যাচেষ্টায় নাহিন গ্রেফতার হয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছিল। জবানবন্দিতে নাহিন জানিয়েছে, হত্যা মিশনে সেদিন তারা ৬ জন অংশ নেয়। ৪ জন ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকার ওপর নজর রাখছিল। আর নাহিন ও নবীন মহিউদ্দিনের ওপর হামলা চালায়। নাহিনই প্রথম আসিফ মহিউদ্দিনের গলায় চাপাতি দিয়ে কোপ দেয়। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়ে গেলে আফিস মহিউদ্দিনকে হত্যা মিশন ভেস্তে যায়। মহিউদ্দিনকে রাতেই উত্তরার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর নাহিন ডাক্তার সেজে আসিফ মহিউদ্দিন ওই হাসপাতালে যায়। দ্বিতীয় দফায়ও হত্যার মিশন ব্যর্থ হয়। এরপর নাহিন কিভাবে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য হয় তার পুরো বর্ণনা দেয় জবানবন্দীতে। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আধ্যাত্মিক নেতা ধানম-ির হাতিমবাগ মসজিদের সাবেক ইমাম মুফতি জসীমুদ্দিন রাহমানীর বয়ান শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে সে সংগঠনটিতে যোগদান করেন। এরপর নিজেকে বয়ানের বর্ণনা মোতাবেক পরিচালিত করতে থাকে। নাহিন ৬ মাস কারাগারে ছিলেন। নাহিন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুল মতিনের ভাতিজা। নানা কারণেই নাহিন জামিনে মুক্তি পেয়ে যায়। মুক্তির পর আবার আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে যোগ দেয়। জামিনের পর আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অন্যতম নেতা হিসেবে জঙ্গী সংগঠনটির হালও ধরেন।

ডিবির একটি সূত্র বলছে, এখন পর্যন্ত খুন হওয়া প্রত্যেক ব্লগার হত্যার সঙ্গেই নাহিনের কোন না কোনভাবে যোগসূত্র রয়েছে। নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নেড়েছে নাহিন। জঙ্গী সংগঠনগুলোর প্রথম টার্গেট রাজনৈতিক পরিবারের উচ্চ শিক্ষিত সদস্য। যারা খুবই মেধাবী। এমন ছেলেদেরই টার্গেট করে থাকে। দীর্ঘ সময় পেছনে লেগে থেকে তাদের দলের হতে মানসিকভাবে বাধ্য করে।

ইতোপূর্বে নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সদস্য হিসেবে গ্রেফতার হয় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খানের ছেলে রিসাদ কামাল খান। দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের অনেক নেতার পরিবারের সদস্যদের নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠনগুলো তাদের দলে ভেড়াতে সক্ষম হয়েছে। জঙ্গী সংগঠনগুলোর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা, নানা কাজে প্রভাব বিস্তার করাসহ আর্থিক সুবিধা পেতেই এমন পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে জঙ্গী সংগঠনগুলো।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, রানা ও নাহিনের কাছ থেকে প্রকৃত তথ্য বের করা সম্ভব হলে ব্লগার নিলয় ছাড়াও লেখক অভিজিত রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, ব্লগার রাজীব ও সিলেটের অনন্ত বিজয় দাশ হত্যার অনেক কিছুই খোলাসা হয়ে যাবে। বিশেষ করে হত্যার নেপথ্যে কলকাঠি কারা নাড়ছে সে সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

বিশেষ করে রাজীব হত্যার চার্জশীট দাখিলকারী ও আফিস মহিউদ্দিন হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক নিবারণ চন্দ্র বর্মণ জনকণ্ঠকে বলেন, রাজীব হত্যার চার্জশীটভুক্ত ৮ আসামির মধ্যে ফেনী জেলার দাগনভূঁইয়া উপজেলার জয়লস্কর গ্রামের বাসিন্দা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রেদোয়ানুল আজাদ রানা (৩০) পলাতক। সেই রানাই নিলয় হত্যার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত রানা কিনা সে বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান চলছে। কারণ জঙ্গীরা গ্রেফতারের পর সাধারণত নিজেদের আসল নাম প্রকাশ করে। নানা ধরনের মিথ্যা তথ্য দিয়ে তদন্তকারী সংস্থাকে বিভ্রান্ত করে থাকে। এটি তাদের কৌশল।

নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যেই ব্লগার হত্যাকারীদের অনেকেই গোয়েন্দাদের জালের মধ্যে রয়েছে। গোয়েন্দা জালে থাকাদের মধ্যে অভিজিত হত্যার আসামিদের থাকা বিচিত্র নয়।

এ ব্যাপারে ডিএমপির মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার মুনতাসিরুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, রানা ও নাহিন নিলয় হত্যায় জড়িত ছিল কিনা তা নানাভাবে যাচাই-বাছাই চলছে। নিলয়ের স্ত্রী ও শ্যালিকাকে প্রথমে আসামিদের ছবি দেখানো হবে। এরপর প্রয়োজন হলে কৌশলে নিলয়ের স্ত্রী ও শ্যালিকাকে কৌশলে আসামিদেরও দেখানো হতে পারে।

প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্লগার প্রকৌশলী আহমেদ রাজীব হায়দার শোভনকে পল্লবীর নিজ বাড়ির সামনে কুপিয়ে ও গলা কেটে, চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি লেখক অভিজিত রায়কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে দুইজনে কুপিয়ে, গত ৩০ মার্চ রাজধানীর রমনার বেগুনবাড়িতে ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে হত্যার পর পালানোর সময় দুইজন এবং পরে আরও একজন গ্রেফতার হয় ও সিলেটের গত ১২ মে অনন্ত বিজয় দাশকে এবং গত বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শফিউল ইসলামকে একই কায়দায় হত্যা করা হয়। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আদলের বিভিন্ন নামে হত্যার দায় স্বীকার করা হয়।

যদিও আজও ২০০৪ সালের ২৭ ফেরুয়ারি বইমেলা থেকে ফেরার সময় টিএসসিতে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে লেখক হুমায়ুন আজাদ আহত করার পর মৃত্যু, ২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর ওয়ারী থানাধীন রামকৃষ্ণ (আর কে) মিশন রোডের বাড়িতে জবাই করে ইমাম মাহদীর প্রধান সেনাপতি ও বিশ্বত্রাণ কর্তা দাবিদার লুৎফোর রহমান ফারুক (৫৫) ও তার ছেলে সানোয়ারুল ইসলাম মনিরসহ (৩০) ৬ জনকে ও গত বছরের ২৭ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁওয়ের নিজবাসায় চ্যানেল আইয়ের শান্তির পথে ও কাফেলা নামক ইসলামী অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মাওলানা নুুরুল ইসলাম ফারুকীকে একই কায়দায় হত্যার দায় কেউ স্বীকার করেনি।