২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছায়ানটে ফাতেমা তুজ জোহরার গান

গৌতম পাণ্ডে ॥ ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন এমনিতেই অধিকাংশ সময় সঙ্গীতের আবহে বিরাজমান থাকে। খ্যাতিমান সঙ্গীতশিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরার সঙ্গীত পরিবেশনা তার পরও বাড়তি মাত্রা এনে দেয় শুক্রবার। এদিন সন্ধ্যা হতে না হতেই সঙ্গীতপ্রিয় মানুষের উপস্থিতিতে ভবনের রমেশচন্দ্র দত্ত স্মৃতি মিলন কেন্দ্র পরিপূর্ন হয়ে যায়। বাহারি গাছের টব দিয়ে সাজানো হয়েছে মঞ্চকে। স্বল্প পরিসরে সাদামাটা আয়োজনে বিরাজ করছে পুরোপুরি এক সাঙ্গীতিক পরিবেশ। শিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরা কণ্ঠে গান শোনার জন্য উৎসুক হয়ে বসে আছে মিলনায়তন ভর্তি দর্শক। ছায়ানট আয়োজিত এ বছরের প্রথম শ্রোতার আসরে সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন ফাতেমা তুজ জোহরা। তাঁর পরিবেশনার আগে শ্রোতাদের মনোসংযোগ করেন শিল্পী অনিমেষ দাস। শান্ত্রীয় ও নজরুল সঙ্গীতে তিনিও পারদর্শী। ছোটবেলা থেকে সঙ্গীতের প্রতি এক গভীর ভালবাসায় নিজেকে সিক্ত রেখেছেন। শান্ত্রীয় সঙ্গীতে তালিম নিয়েছেন ওস্তাদ অসিত দে’র কাছে। বর্তমানে নজরুল সঙ্গীতে তালিম নিচ্ছেন শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিলের কাছে। পর পর দুটি নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করেন তিনি। তাঁর পরিবেশনায় ছিল খুবই চেনা গান ‘চেয়ো না সুনয়না আর চেয়ো না এ নয়ন পানে’ ও ‘শূন্য এ বুকে পাখি মোর আয় ফিরে আয়’। ছায়ানট রাগ ও একতালে পরিবেশিত শেষ গানটিতে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

মঞ্চে আসেন শিল্পী ফাতেমা তুজ জোহরা। এলো চুল, নীল টিপ আর হালকা নীল শাড়িতে যেন পুরো মঞ্চটা আলো করে বসলেন তিনি। একজন যশশী শিল্পীর বরাবরের মতো শ্রোতাদের প্রতি আনুকূল্য প্রার্থনা করে তিনি বললেন, সবাইকে শ্রাবণের বিদায়ী সন্ধ্যা ও শরতের আগমনী শুভেচ্ছা। আমার মায়ের অসুস্থতার জন্য মন ভাল নেই। সঙ্গীত পরিবেশনের জন্য ভাল প্রস্তুতিও নেই। তবুও ছায়ানটের আমন্ত্রণ উপেক্ষার তো প্রশ্নই ওঠে না, বরং স্বপ্রণোদিত হয়েই এসেছি। কারণ ছায়ানটের সঙ্গে আমার আত্মার টান রয়েছে। আমার স্বামী ছায়ানটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যারা এই প্রতিষ্ঠানটির প্রাণপুরুষ তাদের অনেকেই আমাকে খুব স্নেহ করতেন।

নজরুলের ‘কে গো আমার সাঁঝ গগনে গোধূলীর রং ছড়ালে’ গানটি দিয়েই শুরু হয় তার পরিবেশনা। গজল আঙ্গিকের এ গানটিতে সুরের যে দ্যোতনা তিনি তুলে ধরেন, তাতে সবাই এক প্রকার মহিত হয়ে যান। নিঃস্তব্ধতায় অধীর আগ্রহ ছিল পরের গানটির প্রতি। পরের গানটি গাওয়ার আগে তিনি বলেন, ছোট বেলা থেকে বিখ্যাত সব শিল্পীর রেকর্ড শুনে নিজে যেমন তৃপ্তি পেয়েছি, সে গানগুলো গেয়েও আনন্দ পেয়েছি। তারই একটি গান ‘তুমি লহো প্রভু আমার সংসারেরই ভার’ পরিবেশন করলেন। নজরুলের ভক্তিরসের এ গানটিতে মানুষকে পুলকিত করার যে জাদু, তার কোনটাই যেন অপূরণ রাখলেন না তিনি। এরপরের পরিবেশনায় ছিল দ্বিজেন্দ্রলালের গান ‘আজি তোমার কাছে ভাসিয়া যায় অন্তর আমার’। কিছু কথা কিছু গান দিয়ে একের পর এক তিনি পরিবেশন করলেন পঞ্চ কবির গান। অবশ্য তাঁর বেশিরভাগ পরিবেশনায় ছিল নজরুল সঙ্গীত। কেননা আমাদের দেশে যে কয়জন নজরুল সঙ্গীতের প্রতিভাবান শিল্পী রয়েছেন তাদের মধ্যে ফাতেমা তুজ জোহরা অন্যতম। নজরুলের গানকে কণ্ঠে ও হৃদয়ে এবং নিজের জীবনে বিনিসুতার মালার মতো গেঁথে রেখেছেন তিনি। আবারও নজরুলের গজল ‘আসিয়াছি ভুলে তোমার কুসুম বনে আজ’। এ গানটির পর পরিবেশন করেন ‘চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়’, ‘নাচের নেশায় ঘোর লেগেছে নয়ন পড়ে ন্যূয়ে’ ও ‘মোর স্বপ্নে যেন বাজিয়ে দিলে করুণ রাগিনী’। শেষ গানটি অপ্রচলিত হলেও গায়নভঙ্গি যেন মনে করিয়ে দেয় খুব চেনা। সবাই করতালী দিয়ে শিল্পীকে অভিনন্দন জানায়। এর পরের পরিবেশনা ছিল রজনীকান্তের ‘যদি মরমে লুকায়ে রবে হৃদয়ে শুকায়ে যাবে’ ও অতুল প্রসাদের ‘শ্রাবণ ঝুলাতে বাদল রাতে তোরা আয়গো কে ঝুলিবি আয়’ পরপর দুটি গান। আবারও নজরুল সঙ্গীত। তিনি পরিবেশন করেন ‘শাওন আসিল ফিরে সে ফিরে এলো না বরষা ফুরায়ে গেল আশা তব গেল না।’ গান আর কথায় কাটতে থাকে সময়, শ্রোতার আগ্রহ কিন্তু কমে না। সবাই নিমগ্ন চিত্তে একের পর এক গান শুনছে। একটি গান শেষ হলে অপেক্ষা করছে পরবর্তী গানের জন্য। ‘মেঘের মাদল বাজে সুদূর গগনে, দুরু দুরু কাঁপে হিয়া সজল পবনে’ গানটি পরিবেশনের আগে তিনি বলেন, এ গানটির শিল্পী ছিলেন নিগর সুলতানা। কিন্তু গানটি কে লিখেছেন আমি সেটা জানি না। ফাতেমা তুজ জোহরার শেষ পরিবেশনায় ছিল রবীন্দ্রসঙ্গীত। গানটি পরিবেশনার আগে তিনি সবার উদ্দেশে বলেন, গান গাওয়ার জন্য অসাধারণ এক পরিবেশ পেলাম। আমার সঙ্গে তবলায় এনামুল হক ওমর, এসরাজে একরাম হোসেন ও মন্দিরায় প্রদীপ কুমার রায় সঙ্গত করেছে, এদের সবাইকে আমার অন্তরের ভালবাসা ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। সবাই স্থির চিত্তে আমার গান শুনেছেন, তার জন্য আমি আনন্দিত। কিন্তু আমার মনের মতো করে গান পরিবেশন করতে পারলাম না বলে আশা অপূরণ থেকে গেল। আগামীতে যদি আমন্ত্রণ পাই এখানে গান গাওয়ার তখন পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে আসব। শিল্পীর কণ্ঠে ‘এই মনিহার আমায় নাহি সাজে’ রবীন্দ্রসঙ্গীতের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শ্রোতার আসর।