১৩ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

৫০ বছর ধরে গায়ে ‘মুজিব কোট’

এইচএম এরশাদ, কক্সবাজার ॥ মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম। আটাত্তর বছর বয়সের এ মানুষটি মুজিব কোট গায়ে দিয়ে পার করে দিয়েছেন টানা ৫০ বছর। কি গরম-কি ঠা-া মুজিব কোট তার গায়ে থাকেই। এমনকি ঈদ-কোরবানের পোশাকের সঙ্গেও থাকে। বঙ্গবন্ধুর কক্সবাজার আগমন উপলক্ষে ১৯৬৪ সালে প্রথম মুজিব কোট তিনি সেলাই করেছিলেন। সেই মুজিব কোট গায়ে দিয়ে যখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মঞ্চে উঠলেন তখন বঙ্গবন্ধু নাকি মুচকি হেসে বলেছিলেন তোকে বেশ মানিয়েছে, সব সময় পরবি কিন্তু...। সেই থেকে দীর্ঘ ৫০ বছর মুজিব কোট আর ছাড়া হয়নি। আপাদমস্তক আওয়ামী লীগার নুরুল ইসলাম বললেন, মৃত্যুর সময়ও যাতে এটি আমার গায়ে থাকে-এটাই আমার কাম্য।

নুরুল ইসলাম কক্সবাজার জেলা শহরের বহুল প্রচারিত দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক হলেও তিনি আওয়ামী লীগার হিসেবেই বেশি পরিচিত। কেননা তিনি আওয়ামী লীগের ক্রান্তিকালেও একমুহূর্তের জন্যও মুজিব কোট খেলেননি। মুজিব কোটের সঙ্গে আপোসও করেননি কোন দিন। মুজিব কোট নিয়ে বিব্রত নন তিনি, গর্ব করেন তিনি। বলেন, মুজিব কোট নিয়ে আমি জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকা সময় তাদের ডাকে দেখা করতে গিয়ে বার বার বাধার সম্মুখীন হয়েছি। তবুও আমি মুজিব কোট খুলিনি। নিজের প্রথম পুত্র সন্তান জন্মের সময় তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর পাশে। পুত্র সন্তান জন্মের খবরটি তিনি প্রথম জানান প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে। সুখবরটি শুনে নুরুল ইসলামের প্রথম সন্তানের নাম রাখেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নিজেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজের নামের এবং নুরুল ইসলামের নামের সঙ্গে মিল রেখে তার ছেলের নাম দেন মুজিবুল ইসলাম। তিনি বর্তমানে দৈনিক কক্সবাজারের পরিচালনা সম্পাদক।

কক্সবাজার আওয়ামী লীগে বঙ্গবন্ধুর পরীক্ষিত সৈনিক নুরুল ইসলাম কক্সবাজার প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকাকালে কক্সবাজার সফরে এসে সার্কিট হাউসে প্রেসক্লাব সভাপতিকে ডেকে পাঠান। তিনি গেলেন। কিন্তু সেখানে বিধি বাম। নুরুল ইসলামের গায়ে মুজিব কোট দেখে রাষ্ট্রপতির সফর সঙ্গীরা হতবাক। রাষ্ট্রপতির দেহরক্ষীরা এগিয়ে এসে সার্কিট হাউসের ফটকে নুরুল ইসলামকে থামিয়ে দেয়। দেহরক্ষীরা তাকে বলে মুজিব কোট খুলে যেন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বসেন। তিনি রাজি হলেন না। অগত্যা মুজিব কোট গায়ে তাকে ঢোকার অনুমতি দেয়া হলো। পুরো অনুষ্ঠানে কেবল তিনি একাই ছিলেন মুজিব কোট গায়ে। ফলে সবারই দৃষ্টি ছিল তার ওপর। মুজিব কোট দেখে জিয়াউর রহমানও বার বার তাকান তার দিকে। এক সময় নুরুল ইসলামকে রাষ্ট্রপতি জিয়া কাছে নিয়ে বললেন, আসুন আমার সঙ্গে দল করি। জবাবে নুরুল ইসলাম সেদিন বলেছিলেন, আমার গায়ে মুজিব কোট-আমি দল করি বঙ্গবন্ধু মুজিবের। নুরুল ইসলাম জানালেন, রাজধানী ঢাকায় গণভবনে ডাক পড়েছিল। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। সেবার দৈনিক কক্সবাজার সম্পাদক হিসেবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পালা ছিল। জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে তাদের গাড়িতে তুলে নেয়ার সময় আপত্তি ঊঠল তার গায়ে মুজিব কোট নিয়ে। সংশ্লিষ্টরা তাকে অনুরোধ করলেন, গায়ের মুজিব কোটটি খুলে গাড়িতে রেখে দিতে। তিনি বলেছিলেন- তাহলে আপনারা আমাকে নামিয়ে দিন। শেষ পর্যন্ত তাকে মুজিব কোট গায়ে সেই অনুষ্ঠানেও যাবার অনুমতি দেয়া হয়।

সদালাপি নুরুল ইসলাম ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগের কক্সবাজার মহকুমা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি। প্রয়াত ফণি ভূষণ মজুমদার যখন কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তখন নুরুল ইসলাম দলের পলিট ব্যুরোর সদস্য। তিনি জানান, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ট্র্যাজেডির সময়ও আমি ছিলাম রাজধানী ঢাকায়। ওই বিয়োগান্তক ঘটনার পর অনেকেই মুজিব কোট খুলে লুকিয়ে রেখেছিলেন। আমার সঙ্গী দলীয় নেতাদেরও ক’জন আমাকে মুজিব কোট খুলতে বলেছিলেন। এমনকি তারা আমার সঙ্গ নিরাপদ মনে না করে অনেকেই আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। অথচ আমি সেই ক্রান্তিলগ্নেও গায়ের মুজিব কোট নিয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজার এসেছি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যে মুজিব কোট গায়ে দিতেন, সেটি আমিও দিই।