২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বেতন স্কেল নিয়ে বাড়ছে শিক্ষক অসন্তোষ

  • বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কর্মবিরতি ও অবস্থান ধর্মঘট ;###;আরও কঠোর কর্মসূচীর হুঁশিয়ারি

বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার ॥ নতুন জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্র্ভুক্ত না করা আর স্কেলের মাধ্যমে মর্যাদাহানীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ বাড়ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারী স্কুল- কলেজে। সঙ্কটের সুরাহা না হওয়ায় নতুন স্কেল প্রত্যাখ্যান করে পৃথক বেতন স্কেলের দাবিতে আন্দোলনে মেনেছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। দাবি আদায়ে রবিবার ক্লাস বন্ধ রেখে কর্মবিরতি ও অবস্থান ধর্মঘট পালন করেছেন সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। কর্মসূচী থেকে শিক্ষকরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর কর্মসূচী দিতে তারা বাধ্য হবেন। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশনের ডাকে সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত এই কর্মসূচী চলে। এদিকে কালবিলম্ব না করে এমপিওভুক্ত বেসরকারী স্কুল, কলেজের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন স্কেলে অন্তর্র্ভুক্তির দাবিতে অবস্থান কর্মসূচী পালন করেছে জাতীয় শিক্ষক-কর্মচারী ফ্রন্ট।

জানা গেছে, স্কেল প্রত্যাখ্যান করে পৃথক বেতন স্কেলের দাবিতে বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করে ক্ষোভের কথা তারা আগেই জানিয়েছেন। ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকেও। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, এটি সরকারবিরোধী কোন কর্মসূচী নয়, কিংবা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলনও নয়। এই কর্মসূচী শুধু শিক্ষকদের ন্যায্য সম্মান ও স্বতন্ত্র বেতন স্কেল আদায়ের জন্য। শিক্ষকদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যবর্তী সময়ে ঘোষিত বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করে সকল বৈষম্য দূর করে সিলেকশন গ্রেড অধ্যাপকদের বেতন-ভাতা সিনিয়র সচিবের সমতুল্য করা, অধ্যাপকদের বেতন-ভাতা পদায়িত সচিবের সমতুল্য করা, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষকদের বেতন কাঠামো ক্রমানুসারে নির্ধারণ করাসহ শিক্ষকদের যৌক্তিক বেতন স্কেল ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। গত প্রায় এক মাস ধরে নানা কর্মসূচী পালন করলেও এখন পর্যন্ত দাবি পূরণে উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষকদের। বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ ক্রমশই বাড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের মাঝে। ইতোমধ্যেই এ ইস্যুতে প্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় ধরনের আন্দোলনের আশঙ্কার কথা শিক্ষা মন্ত্রীকে জানিয়েছেন উপাচার্যরা। এরই ধারাবাহিকতায় রবিবার কর্মবিরতি ও অবস্থান ধর্মঘট পালন করেছেন দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা এই কর্মসূচী চলে। এ সময় শিক্ষকরা সমাবেশ, স্বাক্ষর সংগ্রহসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করা হয়।

কর্মসূচীতে শিক্ষকরা বলেছেন, সপ্তম বেতন স্কেলে সচিব, সিলেকশন গ্রেডের অধ্যাপক ও মেজর জেনারেল পদের কর্মকর্তাদের এক নম্বর গ্রেডে রাখা হলেও প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোতে সিলেকশন গ্রেডের অধ্যাপক ও অধ্যাপকদের বেতন আগের তুলনায় তিন থেকে চার ধাপ নেমে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পূর্বঘোষণা অনুযায়ী রবিবার সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা ক্লাস নেয়া থেকে বিরত থাকেন। তবে পরীক্ষাসমূহ এই কর্মসূচীর আওতার বাইরে ছিল। সকালে শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে জড়ো হন। চার দফা দাবিতে সেখানে স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচীও চলে। এতে সই করেন ৮০০ এর বেশি শিক্ষক। পরে সেখানেই একটি সমাবেশে যোগ দেন তারা। এই সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয়টির আওয়ামী লীগপন্থী নীল দল, বিএনপি-জামায়াতপন্থী সাদা দলসহ প্রায় সব দল-মতের শিক্ষকরাই উপস্থিত ছিলেন।

সমাবেশে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আজ ৩৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে যুগপৎ আমাদের এই কর্মসূচী চলছে। আমাদের দাবি যদি মেনে না নেয়া হয়, তাহলে আরও কঠোর কর্মসূচী দিতে আমরা বাধ্য হব। তিনি আরও জানান, আগামী রবিবারও তারা একই কর্মসূচী পালন করবেন। শিক্ষকদের স্বাক্ষর সংবলিত দাবি সরকারের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে।

সংগঠনের মহাসচিব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, আমরা দাবি আদায়ে সুচিন্তিতভাবে আন্দোলন করে যাচ্ছি শুধু আমাদের মর্যাদা আদায়ের জন্য। তবে শিক্ষার্থীদের কোন প্রকার ক্ষতি হোক, সেটা আমরা চাই না। প্রয়োজনে শুক্র ও শনিবার ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের ঘাটতি পূরণ করা হবে। উচ্চশিক্ষার পথকে আরও সুগম ও জাতি গড়ার কারিগর হিসেবে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেই যাব। আজ ও আগামীকাল (মঙ্গলবার) স্বাক্ষর কর্মসূচী অব্যাহত থাকবে। দাবির পক্ষে সংগৃহীত সবার স্বাক্ষর পরে সরকারের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে। দাবি আদায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পরিষদের সঙ্গে চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে যৌথ সভার আয়োজন করা হবেও বলে জানান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মেজবাহ কামাল বলেন, আমাদের অস্তিত্ব ও মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে এখন আমরা দল-মতের উর্ধে উঠে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। দেশের আমলা শ্রেণীরা এত বেশি প্রভাব খাটান যে তারা প্রধানমন্ত্রীকেও প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন।

সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ কে এম নুর-উন-নবী বলেন, শিক্ষকদের দাবির সঙ্গে একমত প্রকাশ করছি। তবে এই দাবি আদায়ে আন্দোলন করতে হবে। সরল কিংবা কঠোর বা কি ধরনের আন্দোলন হবে এটি আলোচনা সাপেক্ষ। তবে শিক্ষকদের ন্যায্য দাবির জন্য আন্দোলন করতেই হবে। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক এজে এম শফিউল আলম ভূঁইয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি সাদা দলের সমর্থক অধ্যাপক আখতার হোসেন খান, অধ্যাপক নাজমা শাহীন, অধ্যাপক ড. শফিক উজ জামান, অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক নিজামুল হক ভূইয়া, অধ্যাপক ড. এ কে এম গোলাম রব্বানী প্রমুখ।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ॥ শিক্ষকদের অবস্থান ধর্মঘট ও কর্মবিরতির জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও তিন ঘণ্টা ক্লাস হয়নি। রবিবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভাবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচী পালন করে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষকরা। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা সাংবাদিকদের বলেন, যদি আমাদের দাবি না মানা হয়, তাহলে এটা (কর্মসূচী) আর তিন ঘণ্টা থাকবে না, লাগাতার ধর্মঘটে পরিণত হবে। আমরা ক্লাস-পরীক্ষা বাদ দিয়ে ধর্মঘট চালিয়ে সেশনজট বাড়াতে চাই না। কিন্তু আমাদের বাধ্য করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবি দ্রুত মেনে নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, আগামীকাল (আজ) মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে আমাদের এই বেতন কাঠামো নিয়ে যদি কোন সুরাহা না হয়, তাহলে আগামী ২৩ অগাস্ট রবিবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণ দিবস কর্মবিরতি পালন করা হবে। এ সময় অন্যদের মধ্যে শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শাতিল সিরাজ, ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ জাহিদুল ইসলাম, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ হাবীবুর রহমান বক্তব্য রাখেন। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও এই কর্মসূচী পালন করেন। নিজেদের দাবির প্রতি সমর্থন ও যুক্তি তুলে ধরে এতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক আওয়াল কবির জয়, ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা বক্তব্য রাখেন।

এদিকে নতুন জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত না করায় আন্দোলনে নেমেছে বেসরকারী স্কুল কলেজের শিক্ষকরা। তারা সরকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে একই সময় পে-স্কেলে অন্তর্র্ভুক্তির দাবি জানিয়েছেন। দাবি আদায়ে রবিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচী পালন করে শিক্ষক কর্মচারী ফ্রন্ট। কর্মসূচীতে বক্তব্য রাখেন জাতীয় শিক্ষক কর্মচারী ফ্রন্টের প্রধান সমন্বয়কারী, অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম, বাংলাদেশ কলেজ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আসাদুল হক, বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির মহাসচিব এস এম এ জলিল, বাংলাদেশ বেসরকারী অধ্যক্ষ সমিতির আহ্বায়ক অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরী প্রমুখ। জানা গেছে, বেতন কমিশনের প্রস্তাবের পর থেকেই সারাদেশের বেসরকারী শিক্ষক-কর্মচারীরা আন্দোলন শুরু করেছেন। কেন্দ্রীয় কর্মসূচী হিসেবে ঢাকায় চলছে সভা, প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন। শিক্ষক নেতারা বলছেন, প্রথম দিকে বলা হয়, বেসরকারী শিক্ষক-কর্মচারীরা নতুন স্কেল পাবেন অন্যদের তুলনায় ছয় মাস পর। সর্বশেষ তথ্য হচ্ছে বেসরকারী শিক্ষক-কর্মচারীরা আদৌ স্কেল পাবেন কিনা তাই পরিষ্কার নয়। এ বিষয়ে সরকারের দিক থেকে কোন পরিষ্কার তথ্য না আসায় অসন্তোষ আরও বাড়ছে।