২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘মোরা এক ঘাটেতে রাঁধি বাড়ি মোরা আরেক ঘাটে খাই...’

‘মোরা এক ঘাটেতে রাঁধি বাড়ি মোরা আরেক ঘাটে খাই...’
  • বিচিত্র বেদে জীবন

মীর আব্দুল আলীম

মোরা এক ঘাটেতে রাঁধি বাড়ি, মোরা আরেক ঘাটে খাই। মোদের সুখের সীমা নাই...

ওরা বেদে। ওরা যাযাবর। বিচিত্র ওদের জীবন। ভেসে বেড়ায় নদীতে। আজ এখানে তো কাল ওখানে। তাই ওদের জগতটাই আলাদা। গ্রাম-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে সাপ বানরের খেলা দেখানো আর গাছগাছড়ার শেকড়, তাবিজ কবচ বিক্রি করাই ওদের প্রধান কাজ। অট্টালিকায় রাত কাটানোর স্বপ্ন ওরা কখনই দেখে না। ওরা শুধু পেট ভরে দু’মুঠো ভাত আর মোটা কাপড় পেলেই খুশি। পুঁথিগত শিক্ষার ধার ধারে না ওরা। সরকারের ‘সবার জন্য শিক্ষা’ কিংবা ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচী’ ওদের জীবনে কোনই কাজে আসে না। ওদের কথা ঃ গতর খাইট্টা খামু, লেহাপড়া শিখ্যা কি অইব।’

বেদেরা অন্য দশ জনের মতো এ দেশেরই নাগরিক। অথচ এক চিলতে জমি ওদের নেই- অধিকাংশেরই নৌকাতে কাটে জীবন। ওরা এক আলাদা জগতের মানুষ। ডিঙ্গি নৌকায়ই ওদের ঘর সংসার চলে। নদীর পাড়ে কিংবা কোন মাঠের ধারে ছোট ছোট ডেরা তৈরি করে দলবদ্ধভাবে ওরা থাকে। বেদেরা এক জায়গায় কখনও স্থায়ীভাবে বসবাস করে না। প্রতিটি দলে একজন করে সর্দার বা দলপতি থাকে। কেউ সর্দারের কথা অমান্য করে না। সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিকভাবেই চলে ওদের জীবন। সর্দার যা বলবে সেটাই আইন। এমনকি সর্দারের অনুমতি ছাড়া ছেলে-মেয়ের নাম রাখা, বিয়ে-শাদি এবং থাকার স্থান নির্ধারণ কল্পনাই করা যায় না। বিচার আচারে সর্দারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। এটিই তাদের আদালত। ঝগড়া ঝাটি মারা মারি হলে কখনই তারা থানা পুলিশের শরণাপন্ন হয় না। অর্থাৎ প্রত্যেক বেদে বহরে সর্দারের আদেশ প্রতিপালিত হয় অক্ষরে অক্ষরে। এত কিছুর পরও একজন সর্দার বসে দিন কাটায় না। অন্য বেদেদের মতো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। শুধু সর্দার হিসেবে মর্যাদা বা সম্মান এটাই তাঁর বাড়তি পাওনা।

বেদেরা আত্মবিশ্বাসী এবং কর্মঠ। নারী-পুরুষ সম্মিলিতভাবে কাজ করে সংসার চালায়। তবে এ সম্প্রদায়ের ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বেশি কর্মঠ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়েরা উপার্জন করে। আর ছেলেরা ঘর সামলায় এবং আনন্দ ফুর্তি করে বেড়ায়। শিশুকে বুকে নিয়ে সারাদিন মনোহারি দ্রব্য, সাপ ও বানরের ঝাঁপি নিয়ে বের হয় বেদে মেয়েরা। দিন শেষে কর্মক্লান্ত দেহ নিয়ে ফিরে ঘরে। স্বামীরা হাটবাজারে বা বাড়িতে গিয়ে সাপের খেলা দেখায়, বানর নাচায় এবং গাছ-গাছড়ার শিকড় ও তাবিজ বিক্রি করে।

বেদেদের সুখ-দুঃক্ষ ও জীবনপ্রবাহ ইত্যাদি বিষয়ে এই সম্প্রদায়ের বেশ ক’জনের সঙ্গে সম্প্রতি এ প্রতিনিধির কথা হয়। শীতলক্ষ্যা নদীর ডেমরা ঘাট সংলগ্ন এলাকায় ডিঙ্গি নৌকায় বসবাসকারী জমসেদ জানালেন ‘সরকার যায় সরকার আসে আমাগো কতা কেউ ভাবে না। হুনছি ভূমিহীনগো সরকার জমি দেয় কিন্তু আমাগো বাগ্যে জমি জোটে না।’ ওদের চেহারা বাহ্যিক সাজগোজ, পোশাক-আশাক ও বসবাসের স্থান দেখলে প্রথমেই মনে হবে ওরা বুঝি খুব গরিব-দুঃখী। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। ওরা অত্যন্ত কর্মঠ হওয়ায় উপার্জন ওদের ভালই। সোনারগাঁও মোরগাপাড়া বাজার সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদীতে বসবাসরত জিলানী জানালেন ‘আমরা বেশ আছি; খোদা খাইয়ে পরিয়ে ভালই রেখেছেন।’ এ কথায় বুঝা যায় অল্পতেই তারা বেশ তুষ্ট হয়।

রূপগঞ্জের তারাব বেদে পল্লীতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক স্থানের বেদেদের সঙ্গে অন্য স্থানের বেদেদের সামাজিক যোগাযোগ হয়। সম্পর্ক গড়ে ওঠে। হয় বিয়ে-শাদিও। বেদেদের জীবনযাত্রা অত্যন্ত সাদামাটা। বাহুল্য খরচ ওদের পছন্দ নয়। তবে আনন্দ-উল্লাসের কোন কমতি নেই ওদের মাঝে। ওরা যখন যেখানে থাকে আনন্দ-উল্লাস করে জীবন কাটায়। নতুন কোন স্থান ওদের কখনও আড়ষ্ট করে না। শীতকালীন অতিথি পাখির মতো দলবদ্ধ হয়ে জীবিকার সন্ধানে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে যায়। সর্দারের হুকুম হলেই আবার উধাও হয়ে যায়।