২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিদেশী সহায়তার অর্থ ছাড়ের লক্ষ্য পূরণ

  • সর্বোচ্চ ছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক;###;প্রকল্প বাস্তবায়নে মনিটরিং জোরদার

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ বৈদেশিক সহায়তার লক্ষ্য অর্জন করেছে সরকার। সদ্য সমাপ্ত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দাতাদের কাছ থেকে বৈদেশিক প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে সামান্য কম হলেও অর্থ ছাড়ের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। এ সময়ে সবচেয়ে বেশি অর্থছাড় করেছে বিশ্বব্যাংক। অন্যদিকে কিছুটা কমেছে দাতাদের ঋণ পরিশোধের পরিমাণ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এ অবস্থাকে সরকারের অন্যতম সাফল্য এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশেষ নজরদারির ফল হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।

এক বছরে দাতাদের কাছ থেকে অর্থছাড়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০০ কোটি মাকিন ডলার। কিন্তু এর বিপরীতে ছাড় হয়েছে কিছুটা বেশি। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ১২ মাসে (জুলাই-জুন) দাতারা অর্থ ছাড় করেছে ৩০০ কোটি ৮৯ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ঋণ হচ্ছে ২৪৪ কোটি ৩৬ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার এবং অনুদান ৫৬ কোটি ৫৩ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার। যা তার আগের অর্থবছর ছাড় হয়েছিল ৩০০ কোটি ৮৬ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ঋণ ২২৮ কোটি ৫০ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার এবং অনুদান ৭২ কোটি ৩৬ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার। এ বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের লীড ইকনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, গত তিন বছর ধরে প্রতিবছর বিশ্বব্যাংকের ডিসবাসমেন্ট তার আগের বছরের চেয়ে বেশি হয়েছে। এক্ষেত্রে যেটি হয়েছে সেটি হচ্ছে চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ওপর মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। ডোনার এবং সরকার উভয় পর্যায়েই এটি করা হয়েছে। যেমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রকল্পগুলোতে একাধিক দাতা যুক্ত ছিল। এক্ষেত্রে একটি দাতা বেশি অর্থছাড় করলেতো হবে না। সবার অর্থছাড় থাকতে হবে। এজন্য যেসব প্রকল্পের অর্থছাড়ে সমস্যা ছিল সেগুলো বিষয়ে প্রতিমাসে ডোনার ও সরকারী পর্যায়ে টেকনিক্যাল লোকজন প্রথমে বৈঠক করতেন। সেখানে সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানে করণীয় নির্ধারণ করা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তাকে চিহ্নিত করা হতো। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের একটি এ্যাকশন প্ল্যান করা হতো। পরের মসের মিটিং-এ আবার এগুলোর ফলোআপ করা হতো। যদি দেখা যেত সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না। তখন প্রতি তিন মাসে উচ্চ পর্যায়ের (সচিব) একটি বৈঠক করা হতো। সেখানে প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে আমন্ত্রণ করা হতো। এভাবে সমস্যা সমাধান করা হতো। তিনি আরও বলেন, আগে বৈঠক ডাকলে মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের কেউ আসতেন না। ওই সময় সমস্যা চিহ্নিত হলেও ওই পর্যন্তই থাকত। সমাধান হতো না। কিন্তু এখন সমস্যা সমাধানে সবার আন্তরিকতা ও গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার ফলেই বৈদেশিক অর্থছাড় বাড়ছে।

ইআরডির হিসাব অনুযায়ী সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে মোট প্রতিশ্রুতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার। কিছু দাতার কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করা গেছে কিছুটা কম। এটিকে লক্ষ্য পূরণ হিসেবেই মনে করছে ইআরডি। এ সময়ে মোট প্রতিশ্রুতি এসেছে ৫২১ কোটি ৯ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ঋণ ৪৭৫ কোটি ৫১ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার এবং অনুদান ৪৫ কোটি ৫৭ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন ডলার। তার আগের অর্থবছর মোট প্রতিশ্রুতি এসেছিল ৫৮৪ কোটি ৫১ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ঋণ ৫৩৪ কোটি ৪৮ লাখ মার্কিন ডলার এবং অনুদান ৫০ কোটি ৩ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলার।

এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কাজী শফিকুল আজম জনকণ্ঠকে বলেন, বিশ্বব্যাংক সর্বোচ্চ অর্থ ছাড় করেছে। এটি গত কয়েক বছর ধরেই হচ্ছে। আমি আশা করছি চলতি অর্থবছরেও প্রতিশ্রুতি পূরণ হবে।

অন্যদিকে সদ্য সমাপ্ত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ঋণ পরিশোধ করেছে ১১০ কোটি ৫৯ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে সুদ ১৮ কোটি ২৪ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার এবং আসল ৯২ কোটি ৩৪ লাখ মার্কিন ডলার। তার আগের অর্থবছর মোট পরিশোধ করেছিল ১২৯ কোটি ৩৭ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার। এর মধ্যে আসল ১০৮ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার এবং সুদ ২০ কোটি ৬০ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম বৈদেশিক সহায়তার ক্ষেত্রে সরকার সফল বলে উল্লেখ করে জনকণ্ঠকে বলেন, গত কয়েক বছরে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল ছিল, তারই ফল হচ্ছে এই বৈদেশিক সহায়তা বৃদ্ধি পাওয়া। এক্ষেত্রে মুডিস-এর যে ক্রেডিড রেটিং তাতেও বলা হয়েছে বাংলাদেশের সামষ্টি অর্থনীতি ভাল। গত তিন বছর ধরে তাদের রেটিং এ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার চিত্র ফুটে উঠছে। এ অবস্থা ধরে রাখা গেলে আগামী বছরগুলোতে বৈদেশিক সহায়তা আরও বৃদ্ধি পাবে। তিনি আরও বলেন, সরকারের দায়িত্বশীলদের তৎপরতা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সফল নেগোশিয়েশনের ফলেই উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড় বাড়ছে।

উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে সর্বোচ্চ বিশ্বব্যাংক ছাড় করেছে ঋণ ৮৮ কোটি ২১ লাখ ২০ হাজার ডলার এবং অনুদান ১৩ কোটি ১২ লাখ ৭০ হাজার অনুদান। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ছাড় করেছে ঋণ ৭০ কোটি ৫৭ লাখ ডলার এবং অনুদান ৫ লাখ ৮৯ হাজার মার্কিন ডলার। জাইকা ছাড় করেছে ঋণ ২৮ কোটি ২২ লাখ ৪০ হাজার ডলার এবং অনুদান ১ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার। ভারত ঋণ ছাড় করেছে ৪ কোটি ৩৮ লাখ ৮০ হাজার এবং অনুদান ৫ কোটি মার্কিন ডলার। ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ঋণ ১২ কোটি ৭২ লাখ মার্কিন ডলার এবং চীন ছাড় করেছে ১৪ কোটি ৮০ হাজার মার্কিন ডলার।