১৬ আগস্ট ২০১৫

ট্রেনের সঙ্গে পুলিশের পিকআপের সংঘর্ষ নিয়ে ৩ জিডি ॥ দুই তদন্ত কমিটি

স্টাফ রিপোর্টার, নীলফামারী ॥ নীলফামারীর সৈয়দপুরে শুক্রবার রাতে ঢেলাপীর রেলক্রসিংয়ে আন্তঃনগর নীলসাগর ট্রেনের সঙ্গে পুলিশের পিকআপ ভ্যানের সংঘর্ষ নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের করা জিডিতে ওই দুর্ঘটনায় চার পুলিশ সদস্য নিহত ও সাতজন আহতের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ট্রেনের চালক ও গার্ড এ ধরনের দুর্ঘটনার কথা অস্বীকার করায় এ নিয়েও জিডি করা হয়। ফলে ঘটনা নিয়ে রহস্য দানা বাঁধছে। সব মিলে তিনটি জিডি হয়েছে বলে জানান সৈয়দপুর জিআরপি থানার ওসি লুৎফর রহমান। এদিকে পশ্চিমাঞ্চল রেল কর্তৃপক্ষের গঠিত চার সদস্যের তদন্ত টিম রবিবার থেকে কাজ শুরু করেছে। এই তদন্ত টিমটি তিন কার্যদিবসে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দাখিল করবে। এছাড়া রবিবার সকালে নীলফামারী জেলা পুলিশের পক্ষে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিম সাতদিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে।

শনিবার রাত ১০টার দিকে সৈয়দপুর থানার এসআই রেজাউল ইসলাম সৈয়দপুর জিআরপি থানায় একটি জিডি করেন। ওই দুর্ঘটনায় তিনি সামান্য আহত হন। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, ১৪ আগস্ট রাতে জরুরী অভিযানে ওসি ইসমাইল হোসেনসহ পুলিশ সদস্যরা পিকআপ ভ্যানে বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের যাচ্ছিল। ঢেলাপীর রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় রাত ১১টা ২৫ মিনিটে ঢাকাগামী আন্তঃনগর নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি কোন হুইসেল না বাজিয়ে বেপরোয়া গতিতে এসে পুলিশের পিকআপ ভ্যানকে ধাক্কা দেয়। এতে চার পুলিশ সদস্য নিহত এবং ওসিসহ সাত পুলিশ সদস্য আহত হন। এই দুর্ঘটনার জন্য ট্রেনটিকে দোষারোপ করা হয়েছে জিডিতে।

এদিকে পুলিশের পক্ষে জিডি করার আগেই সৈয়দপুর রেলস্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার একেএম সফিকুল ইসলাম শনিবার সকাল সাড়ে সাতটায় সৈয়দপুর জিআরপি থানায় একটি জিডি করেন। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন ঢাকাগামী আন্তঃনগর ট্রেনটি চিলাহাটি থেকে ছেড়ে নীলফামারী হয়ে রাত সাড়ে ১১টায় সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনে এসে স্বাভাবিক নিয়মে এসে থামে। এখানে পাঁচ মিনিট ট্রেনটি দাঁড়ায়। যাত্রী ওঠানামা করার পর রাত ১১টা ৩০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। কিন্তু ট্রেনটি সৈয়দপুর রেলস্টেশনে পৌঁছানোর আগে মোবাইল ফোনে ঢেলাপীর রেলক্রসিংয়ে পুলিশের পিকআপের সঙ্গে ট্রেনটির সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়েছিল। এই খবরের সূত্র ধরে ট্রেনের চালক মিজানুর রহমান ও ট্রেনের পরিচালক (গার্ড) পিকেআরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা এ ধরনের কোন দুর্ঘটনার কথা অস্বীকার করেন। ট্রেনের চালক মিজানুর রহমানের বরাত দিয়ে ওই জিডিতে আরও বলা হয়, ট্রেনের ইঞ্জিনের সঙ্গে কোন গাড়ির ধাক্কা বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি।

অপরদিকে সৈয়দপুর সহকারী স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে পিডব্লিউওয়ের সৈয়দপুর রেলওয়ের সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মতিন একই দিন পৃথক আরেকটি জিডি করেন সৈয়দপুর জিআরপি থানায়। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন ১৪ আগস্ট রাত ১১টা ৩০ মিনিটে খয়রাতনগর রেলস্টেশনের ৩৮৮/১-২ কিলোমিটার রেলপথের ঢেলাপীরে অরক্ষিত গেট ই/১২৮-এ পুলিশের পিকআপ ভ্যানের সঙ্গে পারাপারের সময় ট্রেন নম্বর ৭৬৬ ডাউন আন্তঃনগর নীলসাগর ট্রেনের ধাক্কা লেগে পুলিশের ভ্যানটি লাইন থেকে ৪৫ ফিট দূরে পড়ে আছে জানা গেলেও ঘটনাস্থল পরিদর্শনে রেললাইনের বা রেলক্রসিংটির কোন ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

এ ব্যাপারে সেদিনের ঘটনা নিয়ে আন্তঃনগর নীলসাগর ট্রেনের চালক মিজানুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয় রবিবার বিকেলে। তিনি জানান, ‘সেদিন গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। এ কারণে জানালা বন্ধ ছিল। ওইস্থানে কোন ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে কিনা সেটা আমার উপলব্ধিতে আসেনি। আমি সৈয়দপুর স্টেশন ছেড়ে পার্বতীপুরে পৌঁছি। এ সময় উর্ধতন কর্তৃপক্ষের মোবাইল ফোনে দুর্ঘটনার কথা জানতে পারি। এরপর আমার ইঞ্জিনের সম্মুখভাগ পরীক্ষা করে দুর্ঘটনার কোন চিহ্ন পাইনি। এ থেকে আমার ধারণা সেখানে ট্রেনের সঙ্গে কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি।’

তিনি বলেন, নীলফামারী থেকে সৈয়দপুর স্টেশনে পৌঁছার নির্ধারিত সময় ৩০ মিনিট। ৭৬৬ ডাউন নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি শুক্রবার নীলফামারী স্টেশনে রাত ১১টায় ছেড়ে সৈয়দপুর স্টেশনে রাত সাড়ে ১১টায় নির্ধারিত সময়ে পৌঁছে। সেক্ষেত্রে দ্রুতগতির কোন বিষয় ছিল না। বিষয়টি উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি।

এদিকে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের গঠিত চার সদস্যের দল সৈয়দপুরে সেই ঘটনাস্থলে তদন্ত কাজ শুরু করেছে। ওই তদন্ত দলে রয়েছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (পাকশী) শওকত জামিল মহসী, বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ আসাদুল হক, বিভাগীয় যান্ত্রিক কর্মকর্তা (লোকো) কামরুজ্জামান, বিভাগীয় চিকিৎসা কর্মকর্তা (পাকশী) মুসলেম উদ্দীন। রবিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলছেন তারা। এই তদন্ত টিমটি তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে।

জানা গেছে, পশ্চিমাঞ্চল রেলের তদন্ত টিমের কাছে প্রত্যক্ষদর্শী পথচারী রাশেদুল ইসলাম জানান, ট্রেন আসতে দেখে তিনি রেলক্রসিং পারাপারে পুলিশের গাড়িটিকে হাত উঠিয়ে নিষেধ করেছিলেন। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির কারণে পুলিশের গাড়ির জানালা বন্ধ ছিল। ফলে তার চিৎকার গাড়ির কেউ শুনতে পারেনি।