১৫ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এই বাঙালী কি বঙ্গবন্ধুকে ডিজার্ভ করত?

  • জাকারিয়া স্বপন

৪০ বছর আগের ঘটনার বিবরণ আমার স্মৃতিতে নেই। তখনও স্কুলে যাই কি যাই না। তবে সকালে ঘরের বারান্দায় মাদুর পেতে আদর্শলিপি পড়তে হতো, আর পাথরের শ্লেটের ওপর চক/পেন্সিল দিয়ে অ, আ লিখতে হতো, সেটুকু মনে আছে। সেই সকালের কথা যেটুকু মনে পড়ে তা হলো- আশপাশের সবাই রেডিও শুনছিল। আর আমাদের বাসার বাইরে যেতে নিষেধ করা হয়েছিল। কেমন একটা আতঙ্কের দিন ছিল সেটা। এর বেশি আর কিছু মনে নেই।

কিন্তু ২০১৫ সালের ১৫ আগস্ট ভিন্ন। আমি কাল রাত থেকে চারদিকে মাইকে গান শুনতে পাচ্ছি- বেশিরভাগ মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গান। তার ফাঁকে ফাঁকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের বিভিন্ন অংশ বাজানো হচ্ছে। গতকাল ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরেছি। দেখতে পেলাম রাস্তার ওপর প্যান্ডেল করা হচ্ছে। মিরপুর শেওড়াপাড়া এলাকায় বিকেলে একটি বিশাল গরু“রাস্তার ওপর জবাই করা হচ্ছে। যদিও সরকার থেকে বলা হয়েছে, উন্মুক্ত জায়গায় আর পশু জবাই করা যাবে না; কিন্তু কে শোনে কার কথা! মূল রাস্তার ওপর প্রকাশ্যে দিবালোকে শত শত মানুষের ভিড়ে গরু“জবাই চলছে। (হঠাৎ করেই মনে হলো, মানুষ এক অদ্ভুত প্রাণী! সে আরেকটি প্রাণীকে বধ করছে প্রকাশ্যে, তার পাশ দিয়েই হেঁটে যাচ্ছে নারী-পুরুষ, দোকানি বেচাকেনা করছে, বাসের হেলপার যাত্রীর জন্য চিৎকার করছে, আর শিশুরা সেই রক্তের ওপর পা ফেলে ক্রিকেটের ব্যাট নিয়ে আড্ডা মারতে মারতে চলে যাচ্ছে। অদ্ভুত বাজার এক!)

ঢাকা শহরের বিভিন্ন রাস্তায় যে পরিমাণ প্যান্ডেল দেখলাম তাতে বুঝতে পারলামÑ আজ সেখানে গরু“জবাই করে গরিব মানুষ খাওয়ানো হবে, যার নাম কাঙালি ভোজ। আমি যখন লিখতে বসেছি, আমি নিশ্চিত অনেক জায়গায় কাঙালি ভোজ শুরু হয়ে গেছে। এই প্রথম ১৫ আগস্টে ঢাকায় আছি তা নয়। বিগত ৩ বছরের প্রতিটি আগস্ট মাসে ঢাকায় ছিলাম। তখনও মাইক বেজেছে। তবে তুলনামূলকভাবে আরেকটু কম। কিন্তু এমন দিনও বাংলাদেশের মাটিতে ছিল যখন মানুষ ১৫ আগস্টে মাইক বাজাতে সাহস করেনি। একই বাংলার মানুষের কতরূপ। নিশ্চয়ই কেউ কেউ বলবেন, মাইক বাজাতে দেয়া হয়নি। আমার প্রশ্নÑ সেটা কি বিদেশীরা দেয়নি? নাকি এই মাটির সন্তানরাই দেয়নি? উত্তরটা আমরা জানি। এই দেশ এখন আর বিদেশীরা শাসন করে না। এখন মোগল নেই, ব্রিটিশ নেই। খাঁটি বাংলার খাঁটি সন্তানরা এই স্বাধীন দেশ শাসন করে আসছে সেই ১৯৭১ সাল থেকে। তারপরেও তো স্বাধীন দেশে স্বাধীনভাবে কাজটি করা যায়নি।

ভাগ্যিস এখন পাকিস্তানীরা নেই কিংবা ব্রিটিশরা। তাহলে সকল দোষ তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে আমরা প্রশান্তির ঢেকুর তুলতাম। সেই সুযোগ নেই বলে আমরা এখন বলছিÑ স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি। কিন্তু তাদের রক্তে তো একই রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে! আরও মজার বিষয়টি হলোÑ এই দেশে সুবিধামতো সময়ে মানুষ কখনও স্বাধীনতারপক্ষের শক্তি হয়ে যায়, আবার কিছু মানুষ কখনও বিপক্ষের শক্তি হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু হত্যার এই ৪০ বছর পরে এসেও আমি খুব নিশ্চিন্তে বলতে পারি, এই বাঙালী এখনও বিশ্বাসঘাতকের রক্ত বহন করে, এই বাঙালী এখনও প্রচ- সুবিধাবাদী, এই বাঙালী এখনও নিজের সামান্য সুবিধার জন্য যে কাউকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে, এই বাঙালী বিনা প্রয়োজনে মিথ্যা বলতে পারে, এই বাঙালী কারণ ছাড়াই কুৎসা রটাতে সিদ্ধহস্ত। আর সেই বাঙালীকে শাসন করা কিংবা গণতান্ত্রিক চর্চায় অভ্যস্ত করানো কি খুব সহজ একটি কাজ? বাঙালী এবং গণতন্ত্রÑ এই দুয়ের মানসিক প্রস্তুতি এখনও কোটি কোটি মাইলের দূরত্ব!

॥ দুই ॥

বাঙালী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। বাঙালী পরাধীনতায় বিশ্বাস করে, বিশৃঙ্খলতায় বিশ্বাস করে। স্বাধীনতায় যারা বিশ্বাস করে তাদের ভেতর একটি দায়িত্ববোধ থাকে। দায়িত্ববোধ ছাড়া সেই বিশ্বাসটি কেবল মুখে বলার মতো বিশ্বাসÑ হৃদয়ের বিশ্বাস নয়। কয়েকটি উদাহরণ দেই।

ঢাকা শহরে যারা চলাফেরা করেন তারা নিশ্চই খেয়াল করে থাকবেন, যে কোন মোড়ে সবসময় বিশাল একটি জ্যাম লেগেই থাকে। তার মূল কারণ আমি দেখেছি সবাই নিজেদের গাড়ি/রিক্সার মাথাটা ঢুকিয়ে দিয়ে কচ্ছপের মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে পছন্দ করে। আমি একটি গাড়ি, রিক্সা কিংবা বাস/ট্রাক দেখিনিÑ যা একটু দূরে অপেক্ষা করবে; তারপর অন্য গাড়িগুলো গেলে নিজে যাবে। আমি অনেক গাড়ি ড্রাইভ করি। একটা দিনের জন্য একটা উদাহরণ নেই। আমি দূরে দাঁড়িয়ে থাকি, অন্যকে যেতে দেই। কিন্তু মানুষ আমাকে বোকা বলে। আমি নাকি ঢাকার জন্য এখনও ‘ফিট’ না!

যে কোন একটা লাইনে দাঁড়াবেন দেখবেন অসংখ্য মানুষ সেই লাইনটি না মেনে (এই লাইনের সবাইকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে) তারা সামনে চলে যাবে। বাংলাদেশে যার ক্ষমতা যত বেশি তার লাইন ভাঙ্গার প্রবণতা তত বেশি। আমার পাশের বাসায় একজন সংসদ সদস্য থাকেন। আমি গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হয়ে মূল রাস্তায় ওঠার জন্য যখন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি তখন তার প্রাডো গাড়িটি লম্বা লাইনকে তোয়াক্কা না করে সবার সামনে গিয়ে নাক ঢুকিয়ে ধাক্কাধাক্কি করতে থাকে। একদিন আমার গাড়ির সামনে নাক ঢুকিয়ে দিয়েছে তার গাড়ি। আমিও আটকে দিলাম। গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে তাকে বললাম, আপনার তাড়া আছে, আর কারও তাড়া নেই?

আরেকটি উদাহরণ দেই। ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দেয়ার দৃশ্য কখনও দেখেছেন? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সেই ধাক্কাধাক্কি করেই ফুল দিতে হয়েছে। তারপর ক্ষান্ত দিয়েছি। বই মেলার গেটটি দেখেছেন তো? বিজয় দিবসে সাভারের স্মৃতিসৌধের ভিড় দেখেছেন আশা করি। অনেকেই হয়ত বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে স্মৃতিস্তম্ভটিতে ফুল দিতে দেখেননি। আমি দেখেছি। পেছন থেকে হাজার হাজার বিশৃঙ্খল কর্মী ধাক্কা দিচ্ছেন, আর সামনের কিছু নেতা সেই ধাক্কা সহ্য করে ছবি তোলার জন্য মুখে হাসি নিয়ে ফুলের তোড়া দিচ্ছেন। এই কর্মীরা তাদের নেতার স্মৃতিসৌধে সম্মান জানাতে এসেছেন। সম্মান, তাই না?

ট্রেনের টিকেট কাটবেন, পাসপোর্টের লাইনে দাঁড়াবেন, কাঙালি ভোজের লাইনে বসবেন, ফিতরার লাইনে যাবেন, মিলাদের তবারকের লাইনে দাঁড়াবেন, ঈদের কোলাকুলির লাইনে দাঁড়াবেন, স্কুল/কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইনে দাঁড়াবেনÑ এই বাঙালী কোথাও কি নিয়মটি মেনে চলে? সর্বত্র নিজের নাকটি ঢুকিয়ে দিয়ে অন্যকে আন্ডারমাইন করে নিজের সুবিধাটুকু নিয়ে নেয়ার নামই কি বাঙালী নয়?

আমরা সবাই নাক ঢুকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করব। শটকাট মারার জন্য রাস্তার উল্টোদিক দিয়ে নিজে চলে যাব, আর অন্য কেউ গেলে তাকে দেখিয়ে বলবÑ দেখ দেখ কী করছে! এটাই কি আমাদের জাতীয় চরিত্র নয়? আমরা কি নিজেদের এতটুকু পরিবর্তন করতে পেরেছি? আমাদের স্বাধীনতা দিলে আমরা কি সেটা রক্ষা করতে শিখেছি? আমরা কি এখনও একটি অরাজক বিশৃঙ্খল জাতি নই? কোথাও কি দেখেছেন বাঙালীরা সুন্দর সুশৃঙ্খলভাবে সবাই মিলে একটি কাজ করছে?

আছে, একটি মাত্র জায়গা। যেই মাত্র ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে প্রবেশ করবেন দেখতে পাবেন সকল গাড়ি কত সুন্দর নিয়ম মেনে চলছে, লালবাতি জ্বলার আগেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, ডানে-বাঁয়ে সিগনাল দিচ্ছে এবং পথচারীরা জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছে, কেউ কোথাও নাক ঢুকিয়ে দিয়ে জ্যাম লাগিয়ে বসে নেই।

॥ তিন ॥

২০১৫ সালের ১৫ আগস্টে নতুন আরেকটি বিষয় চোখে পড়ল।

বঙ্গবন্ধু হত্যার ৪০ বছর উপলক্ষে অনেক অনুষ্ঠানের ভেতর টুঙ্গিপাড়ায় গিয়েছিলেন অনেক নেতাকর্মী। ফেসবুকের কল্যাণে তাদের অনেক ছবি আমাদের দেখতে হয়েছে। সেই ছবি দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবেনÑ ওটা কি শোক দিবস পালনের জন্য ছিল, নাকি পিকনিক করার জন্য যাওয়া ছিল? বেশিরভাগ মানুষই বলবেন, ওটা ছিল নেহাতই এক ধরনের পিকনিক পার্টি। একপাটি দাঁত বের করে আমরা সেলফি তুলেছি এবং সেগুলো পুরো দেশের মানুষকে দেখতে দিয়েছি। এটা কিন্তু একজন-দু’জন নয়, অসংখ্য মানুষ এই কাজ করেছেন। তারা ইচ্ছে করে এটা করেছেন সেটা বলব না। এটা আমাদের রক্তে রয়ে গেছে। শোকের মুহূর্তে শোক প্রকাশ না করে ঈদের মুহূর্ত বানিয়ে ফেলা। আবার লোক দেখানোর জন্য যখন কান্নার প্রয়োজন হবে তখন চোখের পানিরও অভাব হবে না।

শহীদ মিনারে গিয়েও দেখবেন একই চিত্র। পুলিশ পাহারায় ফুল দিয়ে চলে যাওয়ার পর পাল্টে যায় শহীদ মিনার। ওটা এক ধরনের প্রায় ধর্ষণ ক্ষেত্রে পরিণত হয়। শোকটা তখন কোথায় চলে যায় বলতে পারেন? একটিবারের জন্যও কি আমরা ভাবি, কিছু বোকা লোক এই ভাষার জন্য তাদের জীবন দিয়েছিল? আর আমরা অতি চালাকরা ওই বেদির ওপর দাঁড়িয়ে নারীদের লাঞ্ছিত করি। আমি বিশ্বাস করি, পাকিস্তানীরা বাঙালী নারীদের ওপর যে পরিমাণ নির্যাতন করেছে এই বাঙালী স্বাধীনতার পর এই পর্যন্ত তার থেকে কম কিছু করেনি। এই বাঙালী নিজের মানুষের ওপর নিজেরাই নির্যাতন করেছে, করছে এবং করতে থাকবে।

১৫ আগস্ট উপলক্ষে অনেক নেতা/পাতিনেতা বিভিন্ন রকমের পোস্টার ছাপিয়ে শহরের বিভিন্ন জায়গায় লাগিয়েছেন। সেখানে তাদের হাস্যোজ্জ্বল ছবি শহরকে মহিমান্বিত করেছে। মাননীয় নেতা, আজকে কিন্তু একটা শোকের দিন, ঈদের দিন নয়।

আমরা শোক আর সাকির পার্থক্য বুঝি না, আমরা নদী আর নর্দমার পার্থক্য করতে পারি না। যে জাতির রক্তে বইছে বিশৃঙ্খলা সেই জাতিকে শাসন করা কি কোন ভদ্রলোকের পক্ষে সম্ভব?

॥ চার ॥

আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষে প্রায়ই একটা পরীক্ষা চালাই। ছাত্রছাত্রীদের জিজ্ঞেস করি, এই ক্লাসে প্রতিদিন মিথ্যা কথা বলতে হয় না এমন কেউ কি আছ? কেউ হাত তোলে না। আমি সবাইকে ভাল করে চিন্তা করতে বললাম। কারও কি এমন একটি দিন যায়, যেদিন তাকে একটি মিথ্যা কথা বলতে হয়নি?

নাহ্, কাউকে পেলাম না। এই প্রশ্ন আমি একটি ক্লাসে করিনি, সময় সুযোগ পেলেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়ার ফাঁকে এই প্রশ্নটি করি। খুব কদাচিৎ কেউ হাত তোলে। আমি ছেলেমেয়েগুলোর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকি। এরাই কিছুদিন পর এই দেশের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু এরা কেউ সত্যি কথা বলতে পারে না। সিস্টেম তাদের সত্য বলতে দেয় না।

সবসময় কি সিস্টেমের ওপর দোষটি চাপিয়ে দেয়া যাবে? আমি তাদের আবারও জিজ্ঞেস করি, তোমরা কি বিনা কারণেও মিথ্যা বল? ধর মা-বাবার সঙ্গে, বন্ধুদের সঙ্গে, ভাই-বোনের সঙ্গে, শিক্ষকদের সঙ্গে? হাতেগোনা দু’একজন ছাড়া সবাই বলে, জি স্যার। তাদের সাধারণ উত্তর, ঝামেলা এড়ানোর জন্য টুকিটাকি মিথ্যা তারা বলে থাকে। আমি কিছু উদাহরণ জোগাড় করেছি। যেমন, মা জিজ্ঞেস করল, জসিমকে খবরটা দেয়া হয়েছে। ছেলে উত্তর দিল, জি মা দিয়েছি। কিন্তু আসলে তখনও দেয়া হয়নি। এটা জানলে মা ক্ষেপে যাবেন। আপাতত মিথ্যা দিয়ে ঝামেলা সামাল দেয়া। তারপর জসিমকে সংবাদটি পরে জানিয়ে দেয়া। কিন্তু ছেলেটি তার মাকে বলতে পারে না, মা ভুলে গিয়েছিলাম, কাল জানিয়ে দেব।

একটি মেয়ে ফেসবুক ব্যবহার করে। মিথ্যা আইডি এবং নাম নিয়ে। তাকে বললাম, সঠিক নাম ব্যবহার করলে সমস্যাটা কী? উত্তর, বাসায় সমস্যা করবে। একটি ছেলে তার বান্ধবীকে নিয়ে পিজা খেতে যাবে। বন্ধু তাকে বলল, কিরে কই যাস? মিথ্যা কিছু একটা বলে দিয়ে পালিয়ে বেঁচে গেল ছেলেটি। সে মেরুদ- সোজা করে বলতে পারে না, আমি নীলাকে নিয়ে পিজা খেতে যাচ্ছি।

সমস্যাটি কেবলমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেই নেই। কাজের বুয়া থেকে শুরু করে বাসার দারওয়ান, ড্রাইভার, রিক্সাওয়ালা, রাস্তার সবজিওয়ালা হয়ে বড় দোকানি, চেইন স্টোর, খাবারের ভেজাল মেশানো ব্যবসায়ী, নির্মাতা, কর্পোরেট থেকে সরকারের পিয়ন/চাপরাশি এবং উঁচুস্তরের কর্মকর্তা পর্যন্ত সবাই মিথ্যা বলেন, মিথ্যা নিয়ে বসবাস করেন। কেউ কাজে, কেউ অকাজে এমনি এমনি। এই জাতির পুরো শরীর মিথ্যার সাগরে ডুবে আছে।

আমরা সবাই মিথ্যার ভেতর আছি, মিথ্যা নিয়েই আছি। যেই জাতির বেশিরভাগ মানুষ উঠতে-বসতে মিথ্যা বলে তাদের হ্যান্ডেল করা কি সহজ?

॥ পাঁচ ॥

বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের অপরাজনীতি নিয়ে আমি এখন আর গালিগালাজ করি না। তরুণ বয়সে করতাম। এখন করি না, কারণ যারা ক্ষমতার চারপাশে বলয় করে আছেন তারা তাদের যোগ্যতা মতোই কাজ করছেন। সেদিন একজন বলছিলেন, দেখেছেন সিঙ্গাপুরের মন্ত্রীদের যোগ্যতা! আর আমাদের দেশের মন্ত্রীদের যোগ্যতা? সিঙ্গাপুরে বেশিরভাগই পিএইচডি করা। আমি তাকে বললাম, আপনি তো রাজনীতিতে যাননি, তাহলে আপনাকে কেন মন্ত্রী করা হবে? কে আপনাকে মন্ত্রী বানাবে? আপনি থাকবেন এসি রুমে, তারপর একদিন আশায় আশায় থাকবেন মন্ত্রী হয়ে দেশের পরিবর্তন করবেন। আমাদের শিক্ষিত মানুষের একটি বড় অংশ রাজনীতিবিমুখ। তাই যারা মাঠ খালি পেয়েছে তারা খেলতে শুরু“করেছে। তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আর আপনার কেন মনে হলোÑ আপনার মতো একজন পিএইচডি করা মানুষ এই বিশৃঙ্খল বাঙালীকে নিয়মে আনতে পারবে?

গুরুজনরা বলে গেছেন, মারের ওপর ওষুধ নেই। (ইংরেজীতে এমন একটা প্রবাদ আছে, শুনিনি।) গুরুজনরা এমনি এমনি এটা বলে যাননি। ভদ্রতা, সৌজন্যতা, লজ্জাÑ এগুলো বাঙালীর জন্য নয়। বঙ্গবন্ধু ছিলেন নরম মনের মানুষ। পুরো দেশের মানুষকে নিজের সন্তান মনে করতেন। তাঁর ডায়েরি পড়লে সেটা বোঝা যায়। তিনি বাঙালীকে ‘মাইর’ দিতে পারেননি। বাঙালীকে নিয়মের মধ্যে আনতে প্রয়োজন কঠিন ‘মাইর’।

বঙ্গবন্ধু আসলেই একজন ভদ্র মানুষ ছিলেন। আদর করে সবাইকে তুই করে সম্বোধন করতেন। তিনি যদি এই ‘তুই’ শব্দটাই কঠিন স্বরে ব্যবহার করতে পারতেন তাহলে হয়ত এই জাতি কিছুটা লাইনে আসত। ভালবাসা নয়, বাঙালীর দরকার কঠিন শাসন। অনেক কঠিন। অন্তত আরও কয়েক জেনারেশন।

পুনশ্চ :

আমি নিজেও একজন বাঙালী। এর সবকিছু আমার নিজের ওপরও প্রযোজ্য। তবে আমি ঠিক করেছি, রাস্তায় গাড়ির মাথাটা ঢুকিয়ে দিয়ে জ্যাম তৈরি করব না, কাউকে অযাচিত ওভারটেক করব না (রূপক অর্থে)। শুরু“হোক পরিবর্তন।

ঢাকা/১৫ আগস্ট ২০১৫

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং সম্পাদক, প্রিয়.কম

ুং@ঢ়ৎরুড়.পড়স