২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মত প্রকাশ ও মনন

সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। মানুষেরই বিবেক ও বিচার-বিবেচনা বোধ রয়েছে। মননের চর্চা তাকে সত্যে উপনীত হতে বরাবরই সাহায্য করেছে। বিদ্যাপীঠে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের উপদেশ দিতে গিয়ে বলেনÑ সৃজনশীল বই মানুষের মেধা ও মননের বিকাশ ঘটায়। কিন্তু সৃজনশীল বই তো আকাশ থেকে পড়ে না, তা লিখিত হয়ে থাকে। আর সেটি রচনা করেন মানুষই। মানুষের চিন্তা ও মনন যদি রুদ্ধ হয় তবে তার সৃষ্টিশীলতাও মুক্ত থাকতে পারে না।

মাতৃগর্ভ থেকে মানবসন্তান মুক্ত মানুষ হয়েই জন্মগ্রহণ করে, যদিও তার পদে পদে থাকে বাধা। সীমাবদ্ধতা, প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার ভেতর মানুষের মুক্ত সত্তা চির উন্নত রাখা একটা চ্যালেঞ্জ বটে। তবু মুক্তচিন্তাকে যুগে যুগে ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন শিল্পী, কবি, দার্শনিক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা। যদি তা না হতো তাহলে সমাজের বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যেত, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা স্থবির হয়ে পড়ত, সভ্যতা নির্বাসিত হতো আঁস্তাকুড়ে। আর প্রকৃতির সেরা সৃষ্টি হিসেবে আমাদের গৌরবের জায়গাটিও অবশিষ্ট থাকত না। মুক্তচিন্তার পথ অনেকটাই সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে কূপম-ূক সমাজে। অথচ এমন পশ্চাৎপদ কা-জ্ঞানশূন্য সমাজেই বেশি করে প্রয়োজন মুক্তচিন্তার মানুষ। চিন্তাকে মুক্তি দিতে অসমর্থ হলে আমরাও পাকিস্তান নামক একটি অসভ্য রাষ্ট্রের অংশ হয়েই থাকতাম। স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা অর্জন তাই বৃহত্তর অর্থে মুক্তচিন্তারই সুন্দরতম ফসল।

‘বাদে বাদে জায়তে তত্ত্ববোধ’Ñ বাদ-প্রতিবাদের মাধ্যমেই মানুষের ভেতর তত্ত্বের বোধ জন্মে, মানুষ সত্যে উপনীত হয়। প্রাচীন ন্যায়শাস্ত্রের এই বক্তব্যকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। সুপ্রাচীনকাল থেকেই মানুষ এই পদ্ধতিতে সত্যে পৌঁছার প্রয়াস পেয়েছে। সে প্রয়াসে সার্থকও হয়েছে। আবার স্মরণাতীতকাল থেকেই সমাজের উচ্চমঞ্চের বাতায়নের পাশে অবস্থানরত বিভিন্ন গোষ্ঠীভুক্ত কিছু মানুষ নিজের গোষ্ঠীর কথাকেই একমাত্র সত্য কথা বলে গ্রহণ ও প্রচার করেছে, অন্য পক্ষের কথাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চেয়েছে। অনেক মানুষ পরস্পর বিপরীত দুই পক্ষের এক পক্ষের কথায় কান দিয়েছে, অন্য পক্ষের কথাকে কানে ঢুকতে দেয়নি। এ রকম কোন মানুষ কোন দিনই সত্যের সমীপবর্তী হতে পারেনি, মিথ্যার আবর্তেই তাকে ঘুরপাক খেতে হয়েছে। তবে সবাই সেই আবর্তে পড়ে যায়নি। যারা পড়ে গেছে, তারাও সবাই সেখানে আটকে থাকেনি; অনেকেই কান খাড়া করে সব মহলের কথা শুনেছে, সেসব কথার বিচার-বিশ্লেষণ করেছে, ত্যাজ্যকে ত্যাগ ও গ্রাহ্যকে গ্রহণ করে সত্যের কিরণে স্নাত হয়েছে।

যে কোন সমাজের সংস্কৃতি ও সভ্যতার উৎকর্ষের জন্য মননচর্চার বিকল্প নেই। মত প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তি নিজেকে সঙ্কুচিত ও নিয়ন্ত্রিত না ভাবলে তাতে যে সমাজ তথা মানব সভ্যতারই লাভÑ সে কথা বলাই বাহুল্য। রোগশোক থেকে রক্ষার জন্য অতিসতর্ক থেকে যদি ঘরের দরোজা-জানালা বন্ধ রাখি, তবে প্রাণধারণের বাতাস ও রোদ্দুর প্রবেশাধিকার পাবে না। সেক্ষেত্রে প্রাণ কি সচল থাকবে? থাকবে না। রবীন্দ্রনাথের শরণ নিয়ে তাই বলতেই হয়Ñ ‘দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি, সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?’