২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উদ্বিগ্ন নাগরিকদের হাইপারটেনশন

  • জাফর ওয়াজেদ

আমাদের কালেই আমরা দেখে আসছি, ব্যর্থকাম মানুষ অনেক সময় অনর্থ ঘটিয়ে থাকেন। সফলতা তারা নিজেদের কর্মে বিন্দুমাত্র খুঁজে না পেয়ে অন্যের সাফল্যে এত বেশি রুখুসুখু যে, পরশ্রীকাতরতায় আক্রান্ত হয়ে অপরের নিন্দা-মন্দ চালিয়ে যান। আর এসব করতে গিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন আগু-পিছু কোনকিছু না ভেবে। তারা নিজেদের দেশের কাজে উৎসর্গ করতে চান পড়ন্ত বেলায়- তাই দেশ ভাবনায় তাদের ঘুমও আসে না বোধহয়! কিন্তু তারা জানেন না, দেশের কাজে আনন্দ আছে, আরাম নেই। কিন্তু তারা তো চান আরাম-আয়েশ। যে আয়েশ তারা তাদের কর্মজীবনে কাটিয়ে এসে এখন পড়ন্ত বেলায় রক্তচাপের আধিক্যে ক্লান্ত প্রায়। এটা সত্য যে, মন ছোট হয়ে গেলে দেশ ছোট হয়ে যায়। দেশ যে কত বিরাট, তা গোলটেবিলে বসেও আভাস মিলবে, তা নয়। হলে ভাল হতো। কিন্তু গোলটেবিলের চারপাশের মানুষগুলো ছোট হতে হতে যদি ডোয়ার্ফে পরিণত না হবে, তবে কেন তারা মধ্যরাতে পাড়াজুড়ে হল্লা করার মতো গলা উঁচিয়ে দেশোদ্ধার করার জন্য হাঁকডাঁক দেবেন? দেশের সাফল্য কেন তাদের গাত্রদাহের কারণ হবে? দেশের মর্ম তারা কতটা বোঝেন, তা তাদের অসার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়। মূলত দেশের মর্ম বুঝেছিলেন তাঁরাই, যাঁরা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলেছিলেন, স্বার্থচিন্তা লেশমাত্র তাঁদের স্পর্শ করেনি। কিন্তু এই নব্য নববাবুরা স্বার্থের বাইরে এক পা এগোতে রাজি নন। দেশ সেবায় যে দৃষ্টান্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কর্ম দিয়ে প্রতিমুহূর্তে জাতিকে উপহার দিচ্ছেন, তা একুশ শতকের বাঙালী জাতির জন্য এক বিশাল অর্জন বৈকি। আর এই অর্জনকে বির্সজন দিতে না পারা পর্যন্ত ‘উদ্বিগ্ন’ নামধারী ত্রয়োদশ নববাবুদের ঘুম হারাম হচ্ছে। এমনিতেই বয়সের কারণে তাদের ঘুম পাতলা হয়ে আছে। তাই রাতভর কেউ কেউ পায়চারী করতে করতে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরানোর পরিকল্পনা আঁটেন। কিন্তু তাদের বজ্রআঁটুনির গেরো যে ফস্্কা হয়ে আছে, সেটা টের পায় না। ওদের সমস্ত উদ্বেগের কারণ শুধু একজনÑ শেখ হাসিনা। এ রকম ‘উদ্বিগ্ন’দের দেখা মিলেছিল ১৯৭২-৭৫-এ। শিল্প কারখানা জাতীয়করণ করা, সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক কর্মসূচী নিয়ে বঙ্গবন্ধু সরকারের পথ চলাকে মেনে নিতে পারেননি সে সময়ের ‘উদ্বিগ্ন’রা। এরা নিজেদের চরমপন্থী, কট্টর বামপন্থী কিংবা সমাজতন্ত্রী হিসেবে জাহির করতে নানা অপকর্ম করে বেড়িয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর হাত দিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, এটা তাঁরা কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা ভাবতেন, তাঁরাই সমাজতন্ত্রের ধারক ও বাহক এবং তাঁরাই তা প্রতিষ্ঠা করবেন। আর এই স্বপ্ন দেখতে দেখতে নিজেরা নানা দল, উপদল, গ্রুপ, উপগ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁরা গণতন্ত্র, গণতন্ত্র বলেও হৈ-হল্লা করতেন। এ কালে শেখ হাসিনা গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশে যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন তা সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে তাদের জন্য। তাই দেশ যখন শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালিত হচ্ছে, মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হচ্ছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, তখন ‘আনলকি থার্টিন’-এর মাঝে বৃত্তাবদ্ধরা গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে আবারও আকস্মিক আবির্ভূত হয়েছেন ময়দানে। এদের কায়-কারবার দেখে ‘শেষের কবিতা’র অমিট রে-এর ভাষ্য মনে আসে। বলেছিলেন, ‘ডেমোক্রেসি আজ যেখানে সেখানে যত টুকরো এ্যারিস্টোক্রেসির পুজো বসিয়েছেÑ খুদে খুদে এ্যারিস্টোক্রেটে পৃথিবী ছেয়ে গেলÑ তাদের কারও গাম্ভীর্য নেই, কেননা তাদের নিজেদের ‘পরে বিশ্বাস নেই।’ অনেকে এটা বলেনও, পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস তাঁদের নিজেদের মধ্যেও নেই। সুবিধাবাদ তাদের এক করেছে। এমনটা মনে হওয়াই সঙ্গত। এদের যদি শুধু মতই থাকত, তাহলে অনায়াসেই বলা যেত যত মত, তত পথ। কিন্তু তাদের মত যখন মতবাদ হয়ে ওঠে, তখনই শঙ্কা জাগে। তত্ত্ব ও মতবাদের আড়ালে যে মতলববাজ কাজ করছে, তা ঘরপোড়া গরুর মতোই আতঙ্কগ্রস্ত করে।

এই যে ত্রয়োদশ ব্যক্তির সমন্বিত ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ গরমকালে শীতের ওয়াজের মতো পূর্ণ গণতন্ত্রের জন্য ক্ষমতায় নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য আনতে চায়। আর এই দাবিতে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করতে চায়। ভাবখানা, নিজেরা সংবিধান বিশেষজ্ঞ। কিন্তু আদৌ সংবিধানের কোন অধ্যায় খুলে দেখেছে কিনা সন্দেহ। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কিভাবে রাষ্ট্রপতিকে দেয়া যায় তা নিয়ে উদি¦গ্নরা তত্ত্ব হাজির করছেন। সংসদীয় রাজনীতিতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব সংবিধানেই নির্ধারিত। কিন্তু তাদের লক্ষ্য অনির্ধারিত ব্যক্তিদের ক্ষমতায় নিয়ে আসা। এটাই ওদের এজেন্ডা। আর তা হলে তারা নিজেরা এবং তাদের অনুসারীরা এই সরকারে কর্তৃত্ব পাবেন, এমন স্বপ্নে উচ্চরক্তচাপ হতেই পারে। এদের কথাবার্তা এমন ধারণা দেয় যে, এরা ঘোঁট পাকিয়ে দেশে একটা সঙ্কট তৈরি করতে চায়। তারা যতটা না নাগরিক ততটাই উদ্বিগ্ন এবং এটা তাদের স্বরচিত। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও?/ তারই রথ নিত্যই উধাও।’ কালের যাত্রাধ্বনি শুনতে পায় না উদ্বিগ্ন নাগরিক নামক হাইপারটেনশনে ভোগা জনেরা। এরা আবার বিশিষ্ট হিসেবে সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার লড়াই চালিয়ে ক্লান্ত প্রায়। কালের যাত্রা পথে এরা যদি নুড়ি পাথর কুড়াতেন, তবে তাতে ঝোলাপূর্ণ করতে পারতেন। নিজেদের অপূর্ণতা আড়াল করতে অন্যপথ ধরতেন। অর্ধশতের বেশি বয়স পেরিয়ে যাওয়া মানুষগুলো তুমুল তোলপাড় সৃষ্টি করতে চায় বলে আপাত মনে হলেও নেপথ্যে তার দাবার ঘুঁটির চালে আছে সূক্ষ্ম নীলনক্সা। অবশ্য দিন গড়ালে এসব আরও ফকফকা হবে। লক্ষ্য করার বিষয় যে, উদ্বিগ্নদের গতিবিধি, ক্রিয়াকলাপ সমস্তই অতিমাত্রায় সশব্দ। আস্তে, ধীরে আলগোছে তারা কিছু করছে না। জলস্রোতের মধ্যে যেমন একটা কলকল রব, উদ্বিগ্ন নাগরিকদের অবয়বেও দেখা মেলে সর্বক্ষণ তেমনি একটা কলকণ্ঠ কলরব।

সংবিধান বদলাতে হবে, ক্ষমতায় ভারসাম্য আনতে হবে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলছেন। কিন্তু এই যে জনগণ তথা সাধারণ মানুষ, তাদের এ নিয়ে কোন আগ্রহ দেখা যায় না। এই উদ্বেগ জনতার ভেতর ক্রিয়া করে না। তারা জানে দু’বেলা দু’মুঠো খাবার নিশ্চিত করা, সন্তানদের শিক্ষাদান ও কর্মসংস্থানই তাদের প্রাথমিক আরাধ্য। বরং জনগণ উদ্বিগ্ন এই কারণে যে, এই নাগরিক সমাজ তাদের ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে জঙ্গীপনাকে আড়াল করার ফন্দিফিকির চালাচ্ছে কিনা। জঙ্গীরা যখন মুক্তমনাদের নির্মমভাবে হত্যা করে, তখন তারা উদ্বিগ্ন হন, তা নয়। বরং সেই উদ্বেগ থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যত্র সরাতে এই নয়া মতবাদ হাজির করেছেন, বলা যায়। এই উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ নামক জীবদের লম্ফঝম্ফ, তাজ্জব কর্মকা- ও বাক্যবাণ শুনে জনগণ হাসে। যে জনগণের সঙ্গে তাদের কোন যোগও নেই। মূলত তারা ড্রইংরুমের বা সেমিনার কক্ষের আড্ডায় বসে দেশ ও জাতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশকে জনসম্মুখে নিয়ে এসে যে উদ্বিগ্নতার ভান করছেন, তার সঙ্গে সাধারণের যোগসূত্র না থাকলেও রয়েছে বিএনপি-জামায়াত জোট ও তাদের অর্থায়নকারীদের। এদের হাতে সুবুদ্ধির কাজ দুর্বুদ্ধিতে বহুবার নষ্ট হয়েছে। খালেদা-জামায়াতের শক্তিমদে মত্ত হয়ে এরা মাঠে নেমেছে। মনে হয় তাদের সব ক’টি রিপু দিনে দিনে অতিমাত্রায় উগ্র হয়ে উঠেছে। তাই নাগরিক হিসেবে নাগরিকোচিত ব্যবহার ভুলে যাচ্ছে। দেখে শুনে মনে হয় বাংলাদেশের প্রাণিজগতের শ্রেষ্ঠ জীব সুশীলরা এখন ঠিক প্রকৃতস্থ অবস্থায় নেই। এরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন নিজেদের নিয়ে। দিশেহারা হয়ে তারা এখন জঙ্গী ও সন্ত্রাসীদের অপকর্ম চাপা দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করে জঙ্গীবাদের বিস্তার ঘটানোর প্রক্রিয়ায় নেমেছেন এমনটা ভাবা অস্বাভাবিক নয়।

তারা জঙ্গীবাদের নেত্রী খালেদার বিএনপির সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মধ্যেও ভারসাম্য আনতে চাচ্ছেন। দেশজুড়ে সশস্ত্র জঙ্গীদের আনাগোনা, তৎপরতা, খুন-খারাবি দেখে সন্ত্রস্ত সকলেই। গুপ্ত পথে যে অস্ত্র আসে, সে অস্ত্রের ব্যবহার করে জঙ্গীরা। স্বর্ণ, রৌপ্য, মাদকদ্রব্যের চোরাকারবারের পাশাপাশি দেশে বোমা কারখানা চালু করেছে। শিক্ষিতরা জঙ্গীতে রূপান্তরিত হচ্ছেÑ এসব নিয়ে এই নাগরিকদের ন্যূনতম উদ্বিগ্ন হতে দেখা যায় না। যখন পেট্রোলবোমা ছুড়ে বাসযাত্রীদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হচ্ছিল। হরতাল অবরোধের নামে সম্পদ ও প্রাণহানি ঘটিয়ে অরাজকতা তৈরি করা হচ্ছিল; যখন দেশবাসী সন্ত্রস্ত এবং উদ্বিগ্ন তখন এই নাগরিকরা জনগণের দৃষ্টি সেখান থেকে ফেরাতে এবং জঙ্গীনেত্রীর অপকর্ম আড়াল করতে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রেসক্লাবে বসে ১৩ সদস্য বিশিষ্ট ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ গঠন করেন। মানুষ হত্যা বন্ধ করার জন্য তারা জঙ্গীনেত্রী খালেদা ও তার জামায়াত জোটের ওপর চাপ প্রয়োগ দূরে থাক, বরং নয়া নির্বাচন করার জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। তারা শেখ হাসিনাকে জঙ্গী খালেদার সঙ্গে বৈঠক করার জজবা তোলেন, এ জন্য তারা রাষ্ট্রপতিকেও চিঠি দেন। এই চিঠির অনুলিপি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই শীর্ষ নেতার কাছেই দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত করার জন্য দেনদরবার করেও সুবিধা হয়নি। ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় অনেকটা আশাহত হয়ে পর্দার অন্তরালে চলে যান তারা। আবার গত ১০ মে আবির্ভূত হন তারা।

দু’নেত্রীর সংলাপ চাই বলে গলা বাড়িয়ে উচ্চারণ করার পর নিশ্চুপ হয়ে যান। দিনকয়েক আগে তারা হঠাৎ মাটির গর্ত ফুঁড়ে বেরিয়ে আসেন ভুঁইফোড়ের মতো। এই যে সরকার জঙ্গীপনা, সন্ত্রাস, বোমাবাজি বন্ধ করে শান্তি ও স্বস্তির পথে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, তা তাদের ভাল্লাগছে না। আর তা লাগবেই বা কেন? অরাজকতা দেশে বহাল করা গেলে, ‘তৃতীয় শক্তি’ নামক অগণতান্ত্রিক পরিবেশও তৈরি করা যাবে এবং জল ঘোলা করে তাতে মৎস্য শিকারের মাধ্যমে রুই-কাতলা বনে যাওয়া কঠিন নয়। অনির্বাচিত সরকার চালু করে তাতে নিজেরা আসীন হয়ে জবাবদিহিহীন কর্মকা- চালিয়ে যাবেন। যাতে ইয়াজদ্দিন নামক খালেদা নির্মিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান এবং তার হরেক কিসিমের উপদেষ্টাদের হরেক ধাঁচের কুকীর্তি অনুসরণ করতে পারেন সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি তিন মাসের স্থলে টানা দু’বছর সংবিধানকে গুরুত্ব না দিয়ে বরং সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতা আঁকড়ে রেখে অগণতান্ত্রিক সব কর্মকা- চালিয়ে গেছে। নিজেদের ক্ষমতা পোক্ত করতে নানা পথ ও পন্থা বেছে নিয়েছিল। তখন আজকের ‘উদ্বিগ্ন’ নামক কতিপয় নিজগুণে চিহ্নিতরা পূর্ণ গণতন্ত্রের জন্য ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য খুঁজতে সংবিধান সংশোধন চায়নি। দেশে যখন জনগণের মাঝে সংবিধান, নির্বাচন, আন্দোলন নিয়ে কোন আলোচনা নেই, বরং জঙ্গীদের জঙ্গীপনা বাড়ছে, হুমকি দিচ্ছে হত্যার এবং তা তালিকা ঘোষণা করে, তখন এই হাইপারটেনশন, হাই ক্যালরি আর ডায়াবেটিসের প্রকোপে উদ্বিগ্নদের আহ্লাদ জেগেছে সংবিধান সংশোধন করা এবং অনির্বাচিত সরকার গঠন করে তাতে সমাসীন হওয়া। যারা একদা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে তেমন সফলতা দেখাতে পারেননি, একজন ছিলেন এনএসএফের নেতা; একাত্তরে হানাদার সরকারের অধীনে কর্মজীবী, আরেকজন ’৭১ সালে চট্টগ্রাম বেতার হতে রাত দশটায় স্থানীয় সংবাদ পড়তেন, তাদের সংবিধান সংশোধনের দাবি সন্দেহের মাত্রা বাড়ায়। কেন তারা এটা চায়, হঠাৎ করে কেন এসব সামনে আনা, তার একটা মাজেজা অবশ্য রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের বক্তব্যের জবাব দিয়ে উদ্বিগ্নদের অতীতের স্বরূপ আংশিক তুলে ধরেছেন। জঙ্গী খালেদা-জামায়াতকে অন্ধকার জগত থেকে আলোর সামনে নিয়ে আসা তাদের প্রধান লক্ষ্য। আর সমগ্র দেশের শুভাশুভ নিতান্তই গৌন, এই হচ্ছে সুশীলদের ‘উদ্বিগ্ন সমাজ’। সত্য বলতে কী, দেশের এই উদ্বিগ্ন সম্প্রদায়ই আজ দেশের অন্যতম সমস্যা। কেননা এরাই সর্বত্র নানা বিভেদের সৃষ্টি করছেন। একাত্তরের পরাজিত শক্তি তাদের পরোক্ষ, প্রত্যক্ষ মদদ এবং আস্কারা পেয়ে আসছে। যুদ্ধাপরাধীদের রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হতে এদের অবদান কিছু কম নয়। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যারা দেশে গণতন্ত্র নেই বলছেন, তাদের অনেকেই উর্দিপরা সামরিক শাসকদের পরামর্শক ছিলেন, সামরিক শাসনের সুবিধাভোগীরা এখন দেশে গণতন্ত্রের শিক্ষা দিচ্ছেন।

রাজনীতিতে নষ্টভ্রষ্ট লোকদের অনুপ্রবেশের পাশাপাশি সুশীল সমাজে ভুঁইফোড়, মোসাহেব ও চাটুকারদের ভিড় বেড়েছে। তারা জানে না, রাজনীতির একটা গঠনমূলক ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের অভাব সম্পদের নয়, শক্তির নয়, সামর্থ্যরে নয়। অভাব মস্তিষ্কবান, হৃদয়বান ও চরিত্রবান মানুষের। দেশে আজ দেশবরেণ্য কোন ব্যক্তিত্বও নেই। সুশীল সমাজের ‘ইনটেলেক্টের’ শোচনীয় অবক্ষয় চলছে বলা যায়। দেশবাসীর কথিত সুখ-শান্তির জন্য সুশীলরা (!) এমন মারাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন যে, তাতে দেশবাসীর মনুষ্যজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠারই লক্ষণ ফুটে উঠছে। সাধারণ মানুষ আর্তনাদ করে বলছে, আমরা সুখ চাই না, চাই সোয়াস্তি। এই বাংলাদেশে আগেও বিভীষণ ছিল, এখনও আছে। তবে বাইরের শত্রুরা পরাজিত হয়েছে। তেমনি ভেতরের বিভীষণরা পর্যুদস্ত হবে। দেশবাসীর উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই, তাতে বরং উদ্বিগ্নদের পরিত্যাজ্য করাই বাঞ্ছনীয়।