১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঐতিহ্যের তাঁতবস্ত্র

  • আবু সুফিয়ান কবির

বাংলাদেশের তাঁতবস্ত্র নিয়ে বিশ্বে একটা মাতামাতি শুরু হয়ে গেছে। এর প্রধান কারণ হাতে চালিত তাঁতবস্ত্র তৈরি হয় সম্পূর্ণ বিদ্যুত বা জ্বালানি ছাড়া। তাই তা পরিবেশের জন্য কোন খারাপ প্রভাব পড়ে না। আর এ কারণে বিশ্ববাজারে তাঁতবস্ত্র চাহিদা বাড়ছে। ইউরোপ আমেরিকায় পরিবেশবান্ধব এই তাঁত কাপড়ের তৈরি পোশাক ও সামগ্রী বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে। এ কারণে বলা হচ্ছে বাংলার তাঁতবস্ত্র আমাদের অহঙ্কার আর তাঁতীরা আমাদের গর্ব।

রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় এক সময় এ দেশে তাঁত বস্ত্রের চাহিদা কিছুটা কমতে বসেছিল। সেটা স্বাধীনতাপরবর্র্তী সময়ের কথা। ঢাকায় বিদেশের পুরনো কাপড় (সেকেন্ড হ্যান্ড) বিক্রি হতো খুব। দেশে চলে আসত লেটেস্ট ডিজাইনের পোশাক। এসব পোশাক দেখে কিছু ব্যক্তি আধুনিক ডিজাইনের পোশাক তৈরিতে আগ্রহী হলেন। শুরু হলো অনুকরণের পালা। তখনই এলো একজন ক্রেতার জন্য একটি পোশাক তৈরির ধারণা। সেই সঙ্গে এলো ব্রান্ড ইমেজ। পাল্টে গেল মধ্যবিত্তের রুচি। এই জোয়ারে বাজারে এল মেয়েদের জিন্স। আরও এল স্কার্ট- টপর্স, মিডিম্যাক্রি ঘাগরা চেলি, টাইট ট্রাউজার আর টপ। এলো বিদেশী সিনথেটিক কাপড়। মানুষ সেই কাপড় দিয়ে পোশাক তৈরিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ল। এ অবস্থায় তাঁতীরা তাদের বাজার হারাতে শুরু করল। অনেক তাঁতী হলেন দেশান্তরিত। এ অবস্থায় কিছু প্রতিষ্ঠান তাঁত বস্ত্রের বাজার সৃষ্টিতে আগ্রহী হলেন। কারিকা, কুমুদিনীন পর এলো আড়ং আর গ্রামীণ চেক। ক্ষণিকেই পাল্টে গেল আমাদের পোশাকের ভুবন বাঙালী পুরুষ, রমণী, তরুণ, তরুণী সবাই দেশী তাঁতের কাপড়ে দিয়ে তৈরি পোশাকে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করল। সত্যিকারভাবে শুরু হলো এক বিপ্লব। তাঁতীপাড়ায় যে সব তাঁতে মাকুর শব্দ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তা ক্ষণিকের স্পন্দন ফিরে পেল। তাঁতীরা ফিরে পেতে শুরু করল তাদের হারানো গৌরব। এখন তাঁতীরা শুধু বুননে নয়, পরিবর্তন আনল রঙ, ডিজাইন আর কম্বিনেশনে। তাঁত বস্ত্র শুধু দেশে নয় বিদেশেও সমানভাবে সমাদৃত হাতে লাগল। পরিবেশে মানুষের বন্ধু এই সেøাগানকে সামনে রেখে ইউরোপ আমেরিকায় তাঁত বস্ত্রের চাহিদা বেড়ে গেল। কেননা এই বস্ত্র তৈরি হয় হাতে তৈরি কাঠ ও বাঁশের মেশিনে, যার নাম তাঁত। এতে কোন বিদ্যুত বা তেলের ব্যবহার হয় না। তাই পরিবেশে জন্য কোন খারাপ প্রভাব ফেলে না। শুধু তাই নয় এর পোশাকে প্রতিটি সুতার সঙ্গে লেগে তাকে তাঁতীর কোমল হাতের স্পর্শ। এই নিপুন শিল্পিত পেশাজীবী মানুষের নাম তাঁতী। যারা হাত ও পায়ের সাহায্যে তাঁত যন্ত্র চালিয়ে তৈরি করে নানা ধরনের বস্ত্র।

তাঁতীদের অনেকে বলে কারিগর। আসলে তারা কারিগর আর শিল্পের সমন্বয়ে এক ধরনের পেশাজীবী সম্প্রদায়। দৈনন্দিন অপরিহার্য কাপড়ের চাহিদা পূরণের পরিপ্রেক্ষিতে এই সম্প্রদায়ের উদ্ভব। চর্যাপদে তাঁতীদের জীবনপ্রণালী, কাজের গতিপ্রকৃতি, তাদের পেশার শৈল্পিক উপস্থিতি ইত্যাদি বিষয়ে উল্লেখ আছে। কৌটিলের অর্থশাস্ত্রে উল্লেখ আছে প্রাচীনকালে বাংলা সুতিবস্ত্র উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত ছিল। খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকে ঢাকার ‘মসলিন’ রোমে সুখ্যাতি ও কদর লাভ করে। তখন বাংলায় বিভিন্ন ধরনের মসলিন তৈরি হতো। যেমন তনজেব, সারবন্দ, বাদান, খোশ, এলেবেলে, শর্বতি, তারান্দম, কুমিশ, তূর্য, নয়নসুখ, চারখানা, মলমল, জামদানি এবং আদ্দি। জামদানিকে বলা হয় মসলিনের পঞ্চম তনয়া। মসলিন ছাড়াও বাংলায় আরও দুই ধরনের কাপড় বুনন করা হতো, তা হলো শবনম ও রাওয়াঁ। এ সব কাপড় বুনন, সৌন্দর্য, কারুকার্য, নমনীয়তা ও স্থায়িত্ব বিবেচনায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে। বলাই বাহুল্য এ সব কাজের নেপথ্যের কারিগর ছিল তাঁতী সম্প্রদায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁতীরা দৈনন্দিন ব্যবহারোপযোগী যে সব পোশাক তৈরি করে সেগুলোর অধিকাংশই হয় মোটা এবং অপেক্ষাকৃত কমদামি।

অতীত ইতিহাস থেকে জানা যায়, হিন্দু সম্প্রদায়ের কারিগররাই এক সময় তাঁতী পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে পর্যন্ত এই পেশার লোকেরা আশ্বিনী তাঁতী নামে পরিচিত ছিল। তারা অন্যদের চেয়ে জাতে কিছুটা উঁচুতে ছিল। ব্রাহ্মণরা তাদের ছোঁয়া পানি নির্দ্বিধায় গ্রহণ করতেন। পশ্চিমবঙ্গে আশ্বিনী বা আসান তাঁতীরা দাবি করেন যে তারাই আসল তাঁতী, অন্যসব তাঁতী হচ্ছে তাদের উপগোত্র। এ দলের তাঁতী মাহিলারা নাকে নোলক পরতেন। সাধারণত তাঁতীদের নিচু জাতের বলে গণ্য করা হতো। ‘শুদ্র’ পিতা ও ‘ক্ষত্রীয়’ মাতা থেকে তাঁতীরা জন্ম হয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়।

তাঁতীরা উত্তরাধিকারসূত্রে এই পেশা গ্রহণ করে থাকে। বাংলাদেশে তারা বিভিন্ন উপাধি যা বারাশ, বসাক, নন্দী, পাল, প্রামাণিক, সাধু, সরকার, শীল ইত্যাদি নামে সুপরিচিত। এসব উপাধিধারী প্রত্যেকেই বর্তমানে আলাদা আলাদা পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করেন। বসাক উপাধি এসেছে ধন্যাঢ্যদের কাছ থেকে, এরা বুনন কাজ করার মাধ্যমে কাপড় ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়েছে। ১৯২০ সালের প্রথমার্ধে শহুরে তাঁতীদের থেকে ভিন্ন প্রকৃতির একদল তাঁতী পূর্ববঙ্গে এসে আবাস গড়েন, তাদের বাংলার আসল তাঁতী বংশোদ্ভূত বলে গণ্য করা হয়। কথিত আছে যে, তারাই সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলের আগে সুতির কাপড় সরবরাহ করত। ক্রমে তাঁতীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তাদের পেশাগত ও চারিত্রিক পরিবর্ত হতে থাকে। মুঘল আমলে হিন্দু মুসলিম উভয়ে এই পেশার সঙ্গে জড়িত ছিল। ১৫১৮ সালের দিকে ‘দুয়ার্তে বারবোসা’ নামের একজন পর্তুগীজ পরিব্রাজক বাংলা ভ্রমণ করেছিলেন। তাঁর লেখায় সে সময়ের বিশিষ্ট কিছু কাপড়, যেমন- মেমোনা, চরলারি, চিনিবাপা, বালিহা ইত্যদি কথা উল্লেখ আছে। ১৬৭০ খ্রিস্টাব্দে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ ঢাকা, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, কিশোরগঞ্জ ও বাজিতপুরের তাঁত শিল্পের বিস্তারিত বিবরণ প্রাকাশ করেন। সিগমা, কাসা, মলমল, রেশমি, নীলা এবং টফেটা ছিল স্থানীয়ভাবে তৈরি কাপড়ের নাম।

বর্তমানে সময়ে বাংলাদেশে ঢাকা, টাঙ্গাইল, পাবনা, নরসিংদী, কুমিল্লা, রাজশাহীতে কয়েক লাখ তাঁতী বসবাস করে। এছাড়া সিলেটের উপজাতী, মনিপুরী, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজাতীদের মাঝে বিভিন্ন রকম তাঁতের প্রচলন আছে। টাঙ্গাইলের তাঁতীরা সুতি, সিল্ক, রো সিল্ক, হাফসিল্ক শাড়ি বুনছে। বিভিন্ন ধরনের শাড়ির থান আমরা টাঙ্গাইলে পাচ্ছি। এছাড়া ভাল কাপড় কটেজ সিস্টেমে উৎপাদিত হয়। পাবনা টাঙ্গাইলের কাছাকাছি হলেও ওদের কাপড়ের শৈল্পিক গুণ আলাদা। দুটি দুই ঘরানার শাড়ি। পাবনায় বেশির ভাগ চিত্তরঞ্জন হুক জ্যাকার্ড ও খটখটি জ্যাকার্ড তাঁত ব্যবহার হয়। পাবনায় সাধারণ কাপড় ছোট ছোট কারখানার মাধ্যমে তৈরি হয়। এদের উৎপাদনের হার টাঙ্গাইলের তুলনায় অনেক বেশি। তাঁতীদের যদি ভালভাবে কারিগরি ফর্মুলা শিখানো যায় এবং টেকনিক্যালি দিকগুলোতে প্রশিক্ষণ দেয়া যায়, তাহলে তারা আরও ভাল কাজ করবে।

সিল্কের আদিনিবাস রাজশাহী। যদিও এখন স্থানীয় সিল্কের উৎপাদন কমে গেছে। আমদানি করা ও স্থানীয় সিল্ক দিয়ে এখানে কয়েক লাখ তাঁত চলে। খটখটি ও ডগির লস্কর তাঁত রাজশাহীতে বেশি ব্যবহার হয়। এরা মূলত শাড়ির গ্রে, পাঞ্জাবির কাপড়, শাটিং ইত্যাদি তৈরি করে। রাজশাহীর তাঁতের ওপর নির্ভর করে অনেক ছাপাখানা চলে। আমাদের গর্ব জামদানির তাঁতীরা থাকে ডেমরার রূপগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ, তারাবো, রূপসী, দক্ষিণ রূপনী ইত্যাদি কয়েকটি গ্রামে। এই শিল্প বড়লোকের শিল্প। সাধারণত একটা শাড়ি তৈরি করতে দুইজন লোকের এক সপ্তাহ থেকে তিন মাস সময় লাগে। কিছুটা হলেও আজ এই শিল্প বিপর্যয়ের মুখে। কেননা এই শিল্পের কারিগররা অর্থের তাগিদে অন্য পেশার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। একটি শাড়ির মেট্রিয়াল কস্ট কম কিন্তু লেবার কস্ট বেশি। তাই উপমহাদেশে, ইউরোপ, আমেরিকায় এই জামদানির বাজার খুব জরুরী। নরসিংদীর তাঁতীরা শাড়ি, লুঙ্গি, শার্টিন, বিছানার চাদর থেকে সব ধরনের প্রচলিত কাপড় তৈরি করে থাকে। জনপ্রিয় চেক কাপড় এখানে তৈরি হয়, কিছু হয় পাবনাতে। কুমিল্লার খাদি কাপড়ের উল্লেখ করতে হয়। মুরাদনগরে ও চান্দিনার শহরতলীতেও বহু তাঁত চলে।