২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নারীর খোঁপা উপাখ্যান

  • রেজা ফারুক

‘মেঘবরণ কেশ গো কন্যা, মেঘবরণ কেশ

তোমার ওই রূপে মনে জেগেছে আবেশ’

এভাবেই নারীর রূপ আর নারীর কোমল কুন্তলকে নিয়ে কবির উপমাসদৃশ বন্দনার গীতিকা রচিত হয়েছে এবং এখনও রমণীস্ততির পঙক্তি বর্ষণধারার মতো ঝরে ঝরে পড়ছে।

সৃষ্টির আদি থেকেই নারীর মোহনীয় রূপময়তার গল্পকথা, কিংবদন্তিতুল্য এক অপার রহস্যের ভুবন তৈরি করে রেখেছে। প্রাকৃতিক নিয়মেই নারীর রূপসৌন্দর্য ভিন্ন এক আবেদন নিয়ে বিরাজমান।

ন্যাচারাল সেই সুন্দরের বিভাকে আরও আকর্ষণীয় এবং উজ্জ্বলতার করার প্রেক্ষিতেই যুগে যুগে রূপর্চ্চার বিষয়টা রমণীর সৌন্দর্য চর্চ্চার বৈশিষ্ট্যের গহনে যুক্ত হয়ে পড়েছে। আর সে কারণেই নারীর অনুপম রূপৈশ্বর্যকে ঘিরে অপার মুগ্ধতার সিম্ফনি মন্দ্রিত স্বরে বেজে ওঠে থেকে থেকে সুন্দরের পূজারীর হৃদয়ে।

খোঁপা সুন্দরী

বাঙালী নারীর রূপসুধায় রয়েছে ভিন্ন একমাত্রা। আর এই মাত্রার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নিবিড় স্নিগ্ধ কোমলতা। এই কোমলতাকে একটু ঘসে মেজে পরিশীলিত করার পরে যেন তা আরও বাক্সময় হয়ে ওঠে। রমণীর সাজসজ্জার প্রধান একটা বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত হলো চুলের পরিচর্যা। চুলের পরিচর্যায় সমকালীন আধুনিক সময়ে নানা বিন্যাস, নানা ফ্যাশন স্টাইল এবং বিবিধ উপকরণ যুক্ত হলেও আটপৌরে নারীর কেশ সজ্জায় খোঁপার বিকল্প কখনেও ছিল না, এখনও নেই। তবে অবশ্যই খোঁপা বাঁধা কিংবা চুল গ্রন্থিত করে খোঁপা গাঁথার উপযোগী চুল থাকতে হবে। লম্বা চুল থাকলে পরেই সুন্দর করে খোঁপা বাঁধা যায়। আর সে খোঁপায় যদি একটা লালগোলাপ গুঁজে দেয়া যায়, তাহলে সে খোঁপা হয়ে ওঠে অনন্য,-দর্শনীয়। খোঁপা কেবল নারীর সৌন্দর্য চেতনাকেই উৎকীর্ণ করে নাÑ নারীর ব্যক্তিত্ব এবং নান্দনিক অভিব্যক্তিকেও ফুটিয়ে তোলে নিবিড়ভাবে।

সেলিব্রিটি খোঁপা

রূপচর্চার ক্ষেত্রে সুন্দর করে চুলের বিন্যাস একটা অপরিহার্য বিষয়। খোঁপার পাশাপাশি বেণী, ঝুটির প্রচলন সর্বজনবিদিত। কিন্তু চলতি সময়ে পার্লারের যুগে বিউটি এক্সপার্টদের শিল্পিত ছোঁয়ায় ওই চুলের সাজসজ্জা হয়ে ওঠে আরও আকর্ষণীয় এবং মনোমুগ্ধকর গ্রাম বাংলার নারীরা এখনও দিনশেষে বিকেলের ফিকে আলোয় দাওয়ায় বসে ফ্রেমের আয়নায় মুখ রেখে লাল, সবুজ, নীল, হলুদ রঙের ফিতায় বেণী বা খোঁপা বেঁধে নিজেকে একটু আলাদাভাবে উপস্থাপনের প্রয়াস নেয়। পক্ষান্তরে নগরজীবনে সেই সাদাসিধে খোঁপাই বিউটিশিয়ানের তত্ত্বাবধানে হয়ে ওঠে গর্জিয়াস এবং চমৎকার। মুখের ছাঁচের সঙ্গে মিলিয়ে বিউটিশিয়ান খোঁপাটি বেঁধে দেন। এ ছাড়া বিয়ের কনের খোঁপা তো হয়ে ওঠে আরও অতুলনীয়।

সাধারণ খোঁপার বিবর্তন ঘটে পঞ্চাশ ও ষাটের দশক থেকে, যখন থেকে এদেশে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের সূচনা ঘটে। সেই সময় যে মহিলা বা নারীরা সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখার সুযোগ পেতেন তাঁদের মধ্যে ছবির নায়িকার চুলের সাজসজ্জার অনুকরণ করার বিষয়টা ছিল নিয়মিত ব্যাপার। চলচ্চিত্রের সেই সেলিব্রিটিদের অনুকরণের বিষয়টা বিগত চারদশকে আরও বিস্তৃতি লাভ করে এক নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আর ওই ক্ষেত্রটি ক্রমশ একটা জনপ্রিয় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে চুলের সাজসজ্জার বেলায়।

ঢাকার ছবির নায়িকা কবরী, সুচন্দা, শাবানা, ববিতা, অলিভিয়া, রোজিনার চুলের সজ্জার পাশাপাশি বোম্বের রেখা, হেমামালিনী এবং সুচিত্রা সেনসহ অন্য কলকাতার নায়িকাদের চুলের স্টাইলকেও নিজের চুলের বিন্যাসে ধারণ করার বিষয়টি ছিল স্বাভাবিক। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শহুরে মেয়েদের কাছে সুচিত্রা সেনের ঘাড় খোঁপা ও হেয়ার স্টাইল ছিল বিশেষ পছন্দের। এ ছাড়া রবীন্দ্র ঘরানার হেয়ার স্টাইলও যুগ যুগ ধরে রুচিশীল নারীর পছন্দের তালিকায় রয়েছে শীর্ষে।

পঞ্চাশ কিংবা ষাট দশকের সেই গতানুগতিক ধারার খোঁপায় এখন এসেছে চোখ জুড়ানো পরিবর্তন। নতুন আঙ্গিকে, ভিন্ন স্টাইলে এখন খোঁপা বাঁধার প্রচলন চলছে। তবে একথা সত্যি যে, শহরে বা উপশহরে চুলের খোঁপায় নতুনত্ব এলেও গ্রামীণ জনপদের নারীরা কিন্তু সেই চিরায়ত ধারার খোঁপাতেই নিজেকে সাজিয়ে কিংবা মানিয়ে নিয়ে অনায়াসে-অফুরন্ত আনন্দ ধারায় হয়ে ওঠেন কাব্যময়।