১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সময় এসেছে শত্রু-মিত্র চেনার

  • মমতাজ লতিফ

বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, এর জন্মের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর ডাকে লাখ লাখ নারী-পুরুষ যেমন মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মোৎসর্গ করে এবং লাখ লাখ নারী তাদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বজাতির জন্য একটি স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছিলেন, তেমনি ওই জন্মলগ্নেই জামায়াত, খুনী আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন করে এ দেশের জন্মের বিরুদ্ধে পাকিস্তানীদের পক্ষে প্রগতিশীল, উদার, মুক্তচিন্তা ও মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক মানুষকে হত্যা করেছিল। তাদের মধ্যে আছে ’৭১-এর খুনীদের জন্মদাতা গোলাম আযম, নিজামী, সাঈদী, মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, সাকা চৌধুরী, মীর কাশেম আলীসহ আরও অনেকে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকার, ’৭৩ সালেই। সত্যই দুর্ভাগ্য, বাঙালীর স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, চেতনা, বিশেষত অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালী সংস্কৃতি বিলুপ্তির লক্ষ্যে ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট অকল্পনীয় এক পরিকল্পিত নারকীয় হত্যাযজ্ঞ সংঘটনপূর্বক পুরো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ-চেতনাকেই হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চক্র। অর্থাৎ ’৭১-এ পরাজিত হয়ে ওই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দলগুলো তাদের বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্র কখনও বন্ধ করেনি। যখনই সুযোগ এসেছে তারা বঙ্গবন্ধুকে, তাঁর দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যার মাধ্যমে দুর্বল ও নিশ্চিহ্ন করার প্রক্রিয়া ’৭১-এ প্রথমবার, দ্বিতীয়বার ’৭৫-এ শুরু করে এখনও বন্ধ করেনি। এখনও নানামুখী প্রগতিশীল মানুষ খুন, দেশের সম্পদ ধ্বংস, দেশের অগ্রগতির পথ বন্ধ করার অপতৎপরতা তারা পরিচালনা করে চলেছে।

স্বাধীনতার পরপরই ওই অন্ধ, জঙ্গী, ওহাবীপন্থী জামায়াত ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দলগুলোসহ পাকিস্তান, আইএসআই, সিআইএ ও এর অর্থখেকো সুশীল সমাজের অনেকেই, যার বড় অংশ সংবাদপত্র, তখন পরিকল্পিতভাবে একটি কাজ করে গেছে, তা হচ্ছেÑ বঙ্গবন্ধু, তাঁর স্ত্রী, শেখ মণি, শেখ কামালসহ তাঁর পরিবারের, আওয়ামী লীগের নেতৃস্থানীয়দের নানাভাবে চরিত্রহনন করেছে।

উল্লেখ্য, বিদেশে, পাশ্চাত্যে এই ’চরিত্রহননের’ কাজটি খুবই পরিকল্পিতভাবে করা হয়। যখন সিআইএ কোন একটি দেশের নেতাকে হত্যা বা সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেছে তখন দেখা গেছে তার কয়েক বছর আগে ওই নেতা, তাঁর পরিবার ও স্বজনদের বিরুদ্ধে নানারকম মিথ্যা কল্পকাহিনী প্রচার করা হয়েছে, যাতে জনমানুষের মন তাদের প্রিয় নায়কের প্রতি বিমুখ হয়ে ওঠে। ’৭৪ সালে দেশে, ভারতে, সোভিয়েত ইউনিয়নে খরা হলে ফসল উৎপাদন বিপর্যস্ত হয়। দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। নানা জায়গায় লঙ্গরখানা খোলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে উচ্চমূল্যে খাদ্য ক্রয় করে বঙ্গবন্ধু দুর্ভিক্ষ মোকাবেলার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র খাদ্যবাহী জাহাজ দুটির গতিপথ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়, যাতে খাদ্য দেশে আসতে না পারে। এ সময় শোনা যায়, সিআইএ’র অর্থপুষ্ট একদল সাংবাদিক হেলিকপ্টারে উত্তরাঞ্চল সফর করে এক তরুণীর কাপড়ের অভাবে জাল পরে থাকার ছবিসহ বানোয়াট কাহিনী প্রকাশ করে। সেটি সে সময় সব কাগজে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। রক্ষীবাহিনী, মুজিববাহিনী, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বানোয়াট, অতিরঞ্জিত নানা খবর প্রচার হতে থাকে। সবচেয়ে বিশাল ভুল কাজটি এ সময় সংঘটিত হয়, যখন বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিপন্থীদের অপপ্রচারের ধাক্কায় মাঠ থেকে সরে যাচ্ছে, অনেকেই খুন হচ্ছে। তখন সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশু বাংলাদেশকে সুরক্ষা দিতে এগিয়ে না এসে ‘জনগণের সেবকসেনা’ তৈরির অসময়োচিত কল্পনা ও কার্যক্রম হাতে নিয়ে কর্নেল তাহেরসহ জাসদ নেতারা সরকারবিরোধী অথচ আত্মবিধ্বংসী কাজে নামে। তারা অতিভয়ঙ্কর একটি ক্ষেত্রে হাত দেয়, যখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে পাকিস্তান ফেরত সেনা ও মুক্তিযোদ্ধা সেনাদের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ বাঙালী সেনাবাহিনীর সদস্য হওয়ার প্রবণতা তখনও তৈরি হয়নি। ওই সেনাদের নিয়ে নানা রকম কাজ করার কারণে সম্ভবত কর্নেল তাহেরকে বঙ্গবন্ধু ড্রেজিং দ্বারা নদীর নাব্য বৃদ্ধির কাজে নিয়োগ দেন। আমার ব্যক্তিগত ধারণা হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর কাছে সে সময়ের জাসদ, কর্নেল তাহেরের ‘গণবাহিনী’ গঠন বিষয়ক কাজকর্ম, ‘বাংলাদেশী সেনাবাহিনী’ যেটি তাঁর উদ্যোগে গড়ে উঠছিল, তিনি যার দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সমরাস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ, বিমান সংগ্রহ করছিলেন, বিশেষত যে বাহিনীতে মাত্র সদ্য আগত পাকিস্তানী মগজধোলাইপ্রাপ্ত বাঙালী সেনারা যোগদান করেছে। অথচ ’৭১-এ যুদ্ধ করা বীর মুক্তিযোদ্ধারা এ বাহিনীর সূচনা করেছে। তাদের সে সময়ের অস্থিতিশীল অবস্থায় জাসদ এবং কর্নেল তাহেরের অপরিপক্ব ও অসময়োচিত কর্মকা-, ভাবনা-চিন্তা সরকার এবং জাতিকে নতুন ও কঠিন সমস্যায় ফেলবে বলে বাস্তববাদী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বঙ্গবন্ধু মনে করেছিলেন বলেই তিনি কর্নেল তাহেরকে সম্ভবত সেনাবাহিনী থেকে ড্রেজিং বিভাগে সরিয়ে দেন।

আজ ২০১৫ সালে এসে যখন আলোকচিত্রে দেখছি বঙ্গবন্ধু তাঁর হত্যার পরিকল্পনাকারী খন্দকার মোশতাককে স্নেহ-আদর করছেন, তখন মনে পড়ে কর্নেল তাহের তাঁর সেনাবাহিনীকে গণবাহিনীতে রূপান্তরের পরিকল্পনাটি আলোচনা করছেন বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রধান নায়ক, কর্নেল তাহেরের হবু খুনী জিয়াউর রহমানের সঙ্গে। যেন খোলামেলা আলাপ করে সেনাবাহিনীতে তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অন্যতম সঙ্গী নির্বাচন করেছিলেন। আজ বিস্ময়ে হতবাক হই, দূরদর্শী, বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন বঙ্গবন্ধু তাঁর হবু খুনী মোশতাককে কেন বিশ্বাস করলেন? তেমনি ধীমান, দেশপ্রেমিক, বঙ্গবন্ধুকে খুন করার পরও কেন কর্নেল তাহের তার হবু খুনী জিয়াকে বিশ্বাস করলেন? অন্তত সেনাদের মধ্যে আগস্টে বঙ্গবন্ধু ও নবেম্বরে চার জাতীয় নেতা হত্যার পর ওই খুনী সেনা সদস্যদের প্রচুর অর্থ দিয়ে ব্যাংকক থেকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর পরও কি ওই হত্যাকা-ে জিয়ার ভূমিকা থাকার বিষয়ে কর্নেল তাহেরের কোন সন্দেহ ছিল না? যুদ্ধক্ষেত্রেও তো জিয়ার বিতর্কিত কর্মকা- নিয়ে সেক্টর কমান্ডার ও সেনাদের ক্ষোভ ছিল, সেটি কি কর্নেল তাহের জানতেন না? বঙ্গবন্ধু জিয়াকে উপ-সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়ার ফাইলটি দীর্ঘকাল যাবত স্বাক্ষর করেননি। কেননা ওই ফাইলে তার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকা-ের অনেক অভিযোগ ছিল। এসব কারণে জিয়া বার বার সে সময়ের প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী নূরুল ইসলামের কাছে দেন-দরবার করত বলে নূরুল ইসলামের লেখা থেকে জানা যায়। বঙ্গবন্ধু ’৭১-এর যুদ্ধ দেখেননি। কিন্তু জিয়ার যুদ্ধবিরোধী কর্মকা- জেনে জিয়াকে উপ-প্রধান সেনাপতি পদে নিয়োগ দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। বরং ওই সময় তার সামরিক পদ থেকে বিচ্যুত হওয়ার অবস্থানে এসেছিল। পরে প্রতিমন্ত্রীর চাপে স্বাক্ষর করেন। কিন্তু ’৭১-এ খন্দকার মোশতাকের অপতৎপরতার কথা কি বঙ্গবন্ধু জানেননি?

যাই হোক, ইতিহাসের ভুলভ্রান্তি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের শত্রুদের উত্থান ও তাদের শক্তিমান করেছে তা তো বলাই বাহুল্য। এখন আমরা ইতিহাসের আরেক মাহেন্দ্রক্ষণে অথবা আরেক ক্রান্তিলগ্নে উপস্থিত হয়েছি। কালটি জ্ঞান, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির। দিন দিন এর উন্নতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা বিজ্ঞানমনস্ক, মুক্তিযুদ্ধপন্থী তরুণ-তরুণীদের পাশে দেখা দিয়েছে আবারও সেই ’৭১-এর ধর্মের নামে মানুষ খুন, অবিজ্ঞানসুলভ, প্রাচীন অন্ধবিশ্বাসের প্রচারণা দ্বারা ‘ইমানী দায়িত্ব’কে বিজ্ঞানমনস্কদের খুন করার সঙ্গে যুক্ত করে ভুল পথে চালিত একদল তরুণ খুনী ব্লগারের জন্ম হয়েছে।

পাঠক, ভাল করে ভেবে দেখুন, ’ব্লগার মানে কাফের নাস্তিক’Ñ এই মিথ্যা কু-ব্যাখ্যাটি প্রচার করেছে ওই ’৭১-এর খুনী, ধর্মের মৌল নীতিকথা সম্পর্কে অজ্ঞ, জঙ্গীবাদী দলগুলো। অথচ তাদের অনুসারী যারা ’বাঁশের কেল্লা’, ’আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’ ইত্যাদি নামে ব্লগে প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক তরুণদের ‘কতল’ বা ‘খুন’ করার ঘোষণা দিচ্ছে তারাও কিন্তু ব্লগার। তবে তারা হচ্ছে জঙ্গী ব্লগার। পাঠক, আপনাদের ’৭১-এর আলবদরদের কথা স্মরণ এবং উপলব্ধি করতে হবে যে, ’৭১-এ বাঙালী যেমন মুক্তিযুদ্ধপন্থী ও পাকিস্তানপন্থী আলবদরÑ এই দু’ভাগে বিভক্ত ছিল, ঠিক তেমনি ২০১৫-তে প্রযুক্তির উন্নতির কারণে জন্ম হয়েছে বিজ্ঞানমনস্ক উদার ব্লগার ও বিজ্ঞানবিরোধী, ধর্মে অজ্ঞ, জঙ্গী খুনী ব্লগারদের।

সুতরাং এরাও ব্লগার, ওরাও ব্লগার। দু’দলের মধ্যে প্রথম দলের কর্মতৎপরতা, কাজ, পদক্ষেপ পুরোপুরি ’৭১-এর মুক্তিযোদ্ধা ও উদার বুদ্ধিজীবীদের মতো। বিপরীত দলের ব্লগারদের কাজ হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও হিন্দুবিরোধী, সাম্প্রদায়িক, জঙ্গী জিহাদীপন্থী এবং মুক্তিযুদ্ধপন্থী ব্লগারদের খুন করা।

সরকারের মুখপাত্ররা যখন উদারপন্থী ব্লগারদের উপদেশ দেন ধর্মকে কটাক্ষ করে কিছু না লেখার জন্য, তখন বোঝা যায় তারা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী, অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানচর্চাকারী ব্লগারদের উদ্দেশে উপদেশ দেন। কিন্তু যারা ধর্মের নামে এই বিজ্ঞানচর্চাকারী তরুণদের নাস্তিক, মুরতাদ ও প্রকাশ্যে ব্লগে খুন করার ঘোষণা দেয় তখন সরকার তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয় না, কোন হুমকি দেয় না কেনÑ এ প্রশ্ন আজ আমাদের সবার মনে। তাহলে কি ‘আলবদর’ গোষ্ঠীর জঙ্গী-খুনী-ব্লগাররা নিরপরাধ তরুণকে ’বধযোগ্য’ ঘোষণা করেও পার পেয়ে যাবে? সরকার মুক্তিযুদ্ধের পতাকা বহনকারী জ্ঞান-বিজ্ঞানে দেশকে উন্নতির পথে নিয়ে যেতে সক্ষম বিজ্ঞানমনস্ক, অসাম্প্রদায়িক তরুণ-তরুণীদের প্রতি কোন দায়িত্ব, সময়োপযোগী কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না? আমরা একালে জেনে-বুঝে কেন নিজের কবর খুঁড়ব? বরং আমরা তো অন্ধ, প্রাচীন বিশ্বাস, সাম্প্রদায়িকতাকে কবর দেব। পুলিশ, প্রশাসন, সরকার তো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ রক্ষাকারীদের রক্ষা করবে।

আমার গভীরভাবে বিশ্বাস হচ্ছেÑ বঙ্গবন্ধুর মতো তাঁর সুযোগ্য কন্যা, সরকারপ্রধানকে কোন একটি গোষ্ঠী আধুনিক, মুক্তমনা ব্লগারদের সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা জোগাচ্ছে। সর্বোপরি ওই ধর্মান্ধ, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কুচক্রী জঙ্গী দলের নেতারা এই মুক্তমনা ব্লগারদের পক্ষে সরকার অবস্থান গ্রহণ করলে তারা দেশে চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করবে বলে সম্ভবত হুমকি দিয়েছে। স্মরণ রাখতে হবে, তারা হচ্ছে বাংলাদেশবিরোধী, যাদের ’৭১, ’৭৫, ২০১৩ সময়কালের অপরাধের জন্য বিচার হওয়ার কথা। এই বিচারটি একবার শুরু করলে ওরা পালাতে পথ পাবে না। এটিই সভ্য মানুষের পথ। সরকার এটিই গ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধ ও এর রক্ষাকারীদের সুরক্ষা দেবে। আপোস তো শত্রুর সঙ্গে হয় না, তাতে কেবল পরাজয়ই আসে।

এখন সময় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের শত্রু ও মিত্রকে চেনার এবং শত্রুদের কঠোরহস্তে খুনের দণ্ডে দণ্ডিত করে শাস্তি প্রদানের। সময় এসেছে তরুণ প্রজন্মের উদার, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিচর্চাকারী মুক্তিযুদ্ধের মিত্রদের খুনীর চাপাতি থেকে রক্ষার। জঙ্গী ব্লগাররা ভবিষ্যতে গোলাম আযম, নিজামী, সাঈদী, তেঁতুল হুজুর হয়ে জাতিকে খুনী-জঙ্গী আইএসের রাজ্যে পরিণত করবে, অন্যদিকে তরুণ, উদার ব্লগাররা জন্ম দেবে ড. কুদরত-ই-খুদা, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, ড. সত্যেন বোস, ড. মাকসুমুল আলম, ড. মেহেদী হাসান, ড. কায়কোবাদ, ড. জাফর ইকবালদের মতো উদার মুক্তিযুদ্ধপন্থী বিজ্ঞানীর এবং শেখ মুজিব, তাজউদ্দীন, মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুলের, মতো বিশ্বস্ত, দেশপ্রেমিক, ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিক, কূটনীতিকÑ যাঁরা দেশকে জঙ্গীমুক্ত, উন্নত, আধুনিক দেশে পরিণত করবেন। যেখানে থাকবে সব ধর্মের, সব সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ, বজায় থাকবে শান্তি।

পুলিশ কর্মকর্তারা বার বার বলবেন, খুনীরা আমাদের নজরদারিতে আছে, আর ওদিকে ওদের পালাতে দেয়া হবে, ওদের গ্রেফতার করা হবে না, মুক্তমনা তরুণরা একের পর এক ওদের হাতে খুন হবেÑ এটি একবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ কথা আর নয়, খুনীদের গ্রেফতার দেখতে চাই। এভাবে দেশ চলতে পারে না। প্রয়োজনে না হয় আরেকটা মুক্তিযুদ্ধে নামব।

প্রধানমন্ত্রী এবং মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকার মুক্তিযুদ্ধপন্থী, বিজ্ঞান, প্রযুক্তিচর্চাকারী তরুণদের খুন করা হলে অবশ্যই তার নিন্দা জানাবেন এবং খুনীদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার করে সর্বোচ্চ দণ্ড দেবেন। খুন করার ঘোষণা, নাস্তিক, কাফের ঘোষণাকারীদের অবশ্যই গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ দ- দিতে হবে। একজন খুনীও যদি সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত হয় তাহলেই এ খুনের ঘোষণা ও খুন বন্ধ হবে। যারা খুন হয়েছে এরা কেউ ধর্ম নিয়ে লেখে না, লেখে বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, নতুন ধ্যান-ধারণা নিয়ে। নতুন ধারণা সব সময় পুরনোকে বাতিল করে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

সবশেষে, খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর স্থগিত রাখার প্রকৃত কারণ জানা দরকার। কেননা তিনি বলছেন, শীঘ্র সরকার পতন হবে এবং ওদিকে বিচারকরা রায়ের ওপর অপ্রত্যাশিতভাবে নির্বাচনের অপশন প্রস্তাব করেছেন, যখন নির্বাচনের সময় হয়নি। এদিকে আবার জিএসপি সুবিধা দেয়া হয়নি। এ সবকিছুর মধ্যে কোন যোগসূত্র আছে কিনা তার অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। খালেদা-তারেক ষড়যন্ত্র ছাড়া বাঁচতে পারে না। জানবেন, ওদের বাঁচার উপায় অন্যদের মরার মধ্যে নিহিত থাকে।

আরও উল্লেখ্য, অতি লজ্জার বিষয়Ñ ধর্মনিরপেক্ষ আওয়ামী লীগ, যে দলের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, সে দলের নেতা-সাংসদরা রাজশাহী, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, বাগেরহাট বিভিন্ন জেলায় হিন্দুদের বাড়ি-জমি-ক্ষেতখামার দখল করছে। এদের নির্যাতনে অনেক হিন্দু পরিবার আবারও দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। সরকারপ্রধানকে দ্রুত উপলব্ধি করতে হবেÑ আওয়ামী লীগ যদি জামায়াত-বিএনপির মতো সাম্প্রদায়িক আচরণ করে তাহলে মানুষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করবে কেন? উপরন্তু জামায়াত-বিএনপির খুনীরা, এমনকি সাতক্ষীরার মামুন হত্যাকারী পর্যন্ত আওয়ামী লীগে স্থান পেয়েছে। আমরা লজ্জায় নতশির। সন্দেহ নেই, শীঘ্রই এরা খালেদা-তারেকের নির্দেশে আওয়ামী লীগকে বঙ্গবন্ধু দূরে থাক, শেখ হাসিনার ভাবাদর্শের বিপরীতে খালেদা-তারেকের ভাবাদর্শে পরিণত করবে। দেশটাকে স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে তুলে দিচ্ছে যারা তাদের দল থেকে বহিষ্কার করুন। লুটপাট, সম্পদ দখল করে ধনী হচ্ছে যারা তাদের ধন বাজেয়াপ্ত করুন। এরা একদিকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজাচ্ছে অন্যদিকে লুটপাট করছে। এইসব নব্যকে দিয়ে কি আওয়ামী লীগের রাজনীতি চলে? পদক্ষেপ নিন, কঠোর হন, নতুবা সবাই এক নৌকায় বসে ডুবে যাব। সময়ের প্রয়োজনে কঠোর হন। সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে তরুণ ও মিত্রদের আস্থা বৃদ্ধি করুন।

লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক