২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পেট্রোলবোমায় নিহতদের স্মরণে ফলক নির্মাণ করা হোক

  • ড. জীবেন রায়

পেট্রোলবোমায় নিহতদের স্মরণে ফলক নির্মাণের কথা আমি বলেছিলাম আগের একটি লেখায়। বিষয়টি আবার পুনরুল্লেখ করছি। এক সময় বিপ্লবী আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতন হতো। রক্ত বন্যায় দেশ ভাসিয়ে ক্ষমতায় আসলেও বিপ্লবীদের তখন জয়জয়কার। আর যদি বিপ্লব পরাজিত হয় তাহলে একেবারে নিশ্চিহ্ন। হিটলার যদি জয়ী হতো তাহলে এই বিশ্বের চেহারাটা কেমন হতো? তখন বলতে হতো হিটলারের বিশ্বে সূর্য অস্ত যায় না। তা হয়নি। বরং হিটলার বাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এখন সময় বদলেছে। মনে হয় কার্ল মার্কসের চিন্তাধারাগুলো রূপায়ণে মানুষ আর রক্ত দিতে আগ্রহী নয়। সাধারণ মানুষদের কপাল তো আর ফিরে না। মানুষের কাছে ফ্রিডম একটা বড় সম্পদ। আজকের জমানায় ফ্রিডমকে দমিয়ে রাখা অসম্ভব। তাই নতুন করে আর বিপ্লব দেখা যায় না।

বাংলাদেশে তিন মাস ধরে একটা ভিন্নতর বিপ্লব সাধনের চেষ্টা হয়েছে। সেই বিপ্লবের হাতিয়ার ছিল পেট্রোলবোমা। দুঃখ অথবা সুখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, সেই পেট্রোলবোমা বিপ্লব জয়ী হয়নি। বরং জয়ী হয়েছে পেট্রোলবোমায় নিহতরা। এক্ষেত্রে গণতন্ত্রই পরোক্ষভাবে জয়ী হয়েছে। সুতরাং এক শ’ পঁয়ত্রিশজনের নামসহকারে একটা স্মৃতিফলক নিহতদের আত্মীয়স্বজনরা দাবি করতেই পারে। এই যে বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সুসভ্যতা অর্জন করেছে এর পেছনে কাদের অবদান? শান্তির এই যে বাতাস বইছে এখন এ তো পেট্রোলবোমায় নিহতদের পথ মারিয়েই এসেছে। লাশ নিয়ে রাজনীতি করার দিন শেষ হয়ে এসেছে। সাধারণ মানুষ এখন আর রাজনীতির সত্য-মিথ্যা বুলিকে তেমন একটা পাত্তা দেয় না। রাজনৈতিক দলগুলোই সাধারণ লোকদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলে।

ভারত-পাকিস্তান জন্ম থেকেই পরস্পর চিরশত্রু। অথচ দেখুন, ‘বজরঙ্গি ভাইজান’ সিনেমাটি কত কোটি লোক ইতিমধ্যে দেখেছে। কত কোটি টাকার পাহাড় জমেছে! কেন হয়েছে? ওই যে সাধারণ লোকের মায়া-মমতা একই রকম, সরকারী পর্যায়ে না হলেও।

এক সময় শেখ হাসিনাকে মেরে ফেলার জন্য মারাত্মক সব অভিযান চালানো হয়েছে। কত নেতা, নেত্রী, কর্মী নিহত হয়েছে, এটা তো কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। অথচ দেখুন, বেগম জিয়ার আন্দোলনের সময় ‘ফেইল্ড পেট্রোলবোমা বিপ্লব’ পরাজিত হলেও বেগম জিয়া এবং অন্যরা অক্ষতই রয়েছে। বোমা মেরে মেরে ফেলার চাইতে জেলে নেয়া ভাল নয়? প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির পতœী তো সেই সুযোগটাও পায়নি। সুখের বিষয়, বেগম জিয়ার ওপর প্রাণহানিকর কোন কিছু ঘটেনি। তবে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর মাধ্যমে বিপ্লব চিরতরেই বিদায় হয়েছে। সরকার ও বিরোধী যেই হোক না কেন, অহেতুক মৃত্যু অথবা খুনখারাবি কারও কাম্য নয় এবং বর্তমান জমানায় তা অচল। শেখ হাসিনা এবং তার অধস্তনরা বেগম জিয়াসহ নেতা-নেত্রীদের প্রাণহানিকর কোন অভিযান হতে দেয়নি। বর্তমান সরকার তো এর জন্য সর্বাগ্রে ধন্যবাদ পেতে পারে। অনেকেই হয়ত প্রশ্ন তুলবেন, অন্যান্য গুম, হত্যা– সেগুলো কি? পরে আসছি।

বর্তমান সরকারের এই অসম্ভব প্রাপ্তির বিপরীতে আমি বলতে চাই, বর্তমান সরকার মিডিয়াকে নিয়ে মাঝে-মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বক্তব্য দিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তুষ্টির কারণ হচ্ছে। পত্র-পত্রিকা কিংবা টকশো– সবাই দেশের ভালর জন্যই লিখে বা কথা বলে। এই ফ্রিডম থাকতেই হবে। অতি সহজ একটা উদাহরণ দেই। ঈদের শুভেচ্ছা শেখ হাসিনা এবং বেগম জিয়া, দু’জনেই দিয়েছেন। কোন পত্রিকার টাইটেল দেখবেন শুধু শেখ হাসিনা, আবার কোথাও বেগম জিয়া, আবার অন্য কোথাও দু’জনকেই টাইটেলে রেখেছেন। তাতে কি? অর্ধেক ভর্তি অথবা অর্ধেক খালি, যে যেভাবেই দেখুক, দু’জনই সঠিক।

অগ্রগতির মাইলফলক অবশ্যই এসেছে ক্রিকেটে। সরকার অবশ্যই এর কৃতিত্ব দাবি করতে পারে। সরকারের উৎসাহ আছে, আছে টাকার অনুদান এবং এতে কোন কারচুপির খবর নেই। এই সফলতা বিশ্বে বাংলাদেশকে একটা বিশেষ আসন দিয়েছে। তলাবিহীন ঝুড়ি আর কেউ বলতে পারবে না। মাশরাফির সুন্দর সুন্দর কথা বর্তমান প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক।

উল্টোদিকে ব্যাংকের টাকাকে নিজের টাকা মনে করে যথেচ্ছ ব্যবহার দেশের অর্থনীতির ক্ষতি এবং বিদেশী বিনিয়োগও ব্যাহত হচ্ছে। সরকারের কোনভাবেই এসবকে প্রশ্রয় দেয়া উচিত নয়।

নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বাংলাদেশকে সব সময় মাথার ওপর রাখছেন। দারিদ্র্য হটানো, শিশু মৃত্যুর হার কমানো ইত্যাদি বিষয়ে প্রফেসর সেন বাংলাদেশকে বরাবর প্রশংসা করেছেন। বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষায়ও অনেক তথ্য মিলছে। বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ, মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছাবে ভবিষ্যতে। শুধু তাই নয়, গড় আয়ু সত্তরে পৌঁছেছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

এসব কিছুর জন্য এই সরকার অবশ্যই কৃতিত্ব দাবি করতে পারে। যদিও সরকারের সঙ্গে সঙ্গে এনজিওগুলোর কথা না বললে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রধান চাবিকাটি নারী সমাজের ক্ষমতায়ন। আর এই কাজে এনজিওগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। ব্র্যাক আজ বিশ্বজুড়ে একটা বিরাট নাম। ব্যবসা ক্ষেত্রে স্যামসাং-এর নাম আজ সবাই জানে। অথচ এই স্যামসাং ১৯৫০ সালে একটি রেশমের মিল ছিল। বর্তমানে ৮০টি কোম্পানি আছে এর অধীনে এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে বিশ্ব লিডার। আমাদের দেশ থেকে এনজিও হিসেবে ব্র্যাক অনেকটা স্যামসাং-এর মতোই। তারপর গ্রামীণ ব্যাংক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই গ্রামীণ ব্যাংক নোবেল ছিনিয়ে এনেছে বাংলাদেশের জন্য। তারপর রয়েছে গণস্বাস্থ্য, প্রশিকা, নিজেরা করি, আরও শত শত এনজিও। অদূর ভবিষ্যতে এনজিওর ক্ষেত্রেও নোবেল আসবে বৈকি।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস বাংলাদেশে সবার কাছ থেকে বিশেষ করে সরকারের কাছ থেকেও সম্মান পাওয়ার যোগ্য। আইনের মারপ্যাঁচে যাই হোক না কেন, একজন ক্রিয়েটিভ মানুষ প্রফেসর ইউনূস বিশ্বে যেমন সমাদৃত, দেশেও তা হওয়া উচিত।

তিস্তা চুক্তি এখনও না হলেও বার্লিন ওয়াল ভাঙ্গার মতো কাজ করেছেন হাসিনা-মোদি, ছিটমহল শব্দটি ভেঙ্গে ফেলার জন্য। বঙ্গবন্ধুর সময়কাল থেকে শুরু হয়েছিল আর ভাগ্য সুপ্রসন্ন হাসিনার হাতেই তা সুসম্পন্ন হয়েছে। এই সরকারের ভোটব্যাংক নিশ্চয়ই বেড়েছে। সম্পূর্ণ কৃতিত্ব হাসিনা সরকারের।

এই সরকারের বড় কৃতিত্বের মধ্যে রয়েছে আরও দুটি বিষয়। এক. নাৎসীদের যেমন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল, ঠিক তেমনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী এবং জেনোসাইডে অংশগ্রহণের জন্য রুই-কাতলাদের বিচারে শাস্তি দেয়া হচ্ছে। আজকে ষাট বছর ও তদূর্ধ্ব জীবিত যারা আছে, ‘গ্যালাপে পল’ করুন, দেখবেন ওই ঘৃণ্য লোকগুলো সত্যিই অপরাধ করেছে কিনা? কত প্রভাবশালী দেশের চাপ সহ্য করে শেখ হাসিনাকে এগোতে হচ্ছে। তিনি এবং সরকার একক কৃতিত্বের অধিকারী। দুই. সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ। এক সময় সন্ত্রাসের আরাধ্য ভূমি ছিল এই বাংলাদেশ। দেশের ভিতরে সন্ত্রাস এবং বাইরে সন্ত্রাস পাচারে রীতিমতো সক্রিয় ছিল এক সময়কার সরকারের নানা সংগঠন। সন্ত্রাসের ফলাফল খুবই ক্ষণস্থায়ী। সন্ত্রাস দিয়ে ক্ষমতায় টেকা যায় না।

পেট্রোলবোমায় যখন মানুষ মারা যাচ্ছিল এক গ্রুপ বুদ্ধিজীবী চুপচাপ ছিল, বিএনপি নেতৃবৃন্দও চুপচাপ ছিল। এক মুখপাত্র তো পেট্রোলবোমায় নিহতদের ‘শহীদ’ আখ্যা দিয়েছিল। কিন্তু একটা ম্যাচের কাঠিই তো যথেষ্ট একটা বিশাল অগ্নিকা-ের জন্য। আপনি জেনেশুনে সেই কাঠি ধরাবেন কি? দমকল বাহিনীর সে আগুন নেভাতে নেভাতে শতাধিক প্রাণ চলে গেল না ফেরার দেশে। বিচার অবশ্যই হতে হবে। একটা মৃত্যুর জন্য অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এক ডজনের শাস্তি হয়ে থাকে। আর শতাধিক মানুষের মৃত্যুর জন্য কোন বিচার হবে না, এটা কি হতে পারে?

প্রশ্ন হচ্ছে, গুম, ক্রসফায়ার, পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু এবং পুলিশের হাতে পড়লেই আধমরা করে ফেলা– এগুলো কোন সভ্য সমাজের কাজ নয়। তবে এসব ঘটনা প্রতিটি দেশেই প্রতিনিয়ত ঘটছে। তবে এসব ঘটনার পরে বিচারে সবাই সোচ্চার হয়। অনেক ক্ষেত্রেই বিচার হয়। যুক্তরাষ্ট্রে তো অবশ্যই। বাংলাদেশে বেশকিছু হত্যাকা-ের কোন হদিসই পাওয়া যায় না। পুলিশ, র‌্যাব কিছুই বের করতে পারে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে ঝটপট কাজ করে ফেলে। প্রশ্নটা অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য। আইন সবার জন্য সমান। আইন এবং বিচার বিভাগকে অবশ্যই নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রতি দুটি যুগান্তকারী বিচারিক রায় হয়েছে। ওবামা কেয়ার এবং সমকামীদের নিয়ে। সুপ্রীমকোর্টের রায়ে মুক্ত বুদ্ধি ও ডেমোক্রেট মতাবলম্বীরা জয়ী হয়। কিন্তু রিপাকলিকান নেতৃবৃন্দ সুপ্রীমকোর্টের রায় এবং বিচারকদের তুলাধুনা করে ফেলেছে। মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা সবক্ষেত্রেই আছে– এই যুক্তরাষ্ট্রে। এমনকি বিচারের রায় নিয়েও।

তবে গুম, হত্যাকা-ের ফাইল কখনও বন্ধ করা উচিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রে কোন কেসের ফাইল কখনও বন্ধ হয় না। কুড়ি, ত্রিশ বছর পরে হলেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়।

ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা বলেই শেষ করছি। কেনিয়ায় প্রেসিডেন্ট ওবামা সম্প্রতি এক বক্তৃতায় বাংলাদেশের রেফারেন্স টেনেছেন। বাংলাদেশের কথা ওবামার কণ্ঠে আসাটাও এই ডিজিটাল সরকারের বিরাট একটা প্রাপ্তি। বাংলাদেশ ডিজিটাল না হলে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর কথপোকথন কেমন করে ইউটিউবে চলে আসে। বর্তমান যুগ শাণিত বুদ্ধির যুগ। পুরনো দিনের সঙ্গে সঙ্গে পুরনোদেরও বিদায় নেয়ার সময় এসেছে। নতুন প্রজন্মই একমাত্র ডিজিটাল বাংলাদেশে কা-ারীর ভূমিকা পালন করবে।

লেখক : আমেরিকা প্রবাসী অধ্যাপক

royjiben@yahoo.com