১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মিয়ানমার সীমান্তের গ্যাস ব্লক ॥ ঝুঁকির মুখে

  • সাগরে সম্ভাবনাময় তিনটি ব্লক ইজারা দেয়াই হয়নি ;###;কূপ খননের প্রস্তুতি মিয়ানমারের ;###;সরকারকে সতর্ক করেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা

রশিদ মামুন ॥ সমুদ্রে মিয়ানমারের তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের গ্যাস ব্লক। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সমুদ্রসীমায় চারটি ব্লক সব থেকে সম্ভাবনাময়। এর মধ্যে ক্রিস এনার্জি এবং সান্তোসকে একটি ব্লক ইজারা দেয়া হয়েছে। যদিও সেখানে কাজই শুরু হয়নি। অন্য তিনটি ব্লক ইজারা দেয়ার কার্যক্রমই শুরু করেনি পেট্রোবাংলা। অন্যদিকে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ব্লকগুলোতে তৃতীয় মাত্রার ভূকম্পন জরিপ শেষ করে এখন কূপ খননের অপেক্ষায় রয়েছে। সমুদ্র সীমন্তবর্তী এলাকায় মিয়ানমারের গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম নিয়ে সরকারকে সতর্ক করে চিঠি দিয়েছে দেশের একটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা। প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা এবং বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রীর কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে মিয়ানমার বাংলাদেশের মূল্যবান খনিজ আহরণ করছে কি না তা বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

জানতে চাইলে ভূতাত্ত্বিক অধ্যাপক বদরুল ইমাম জনকণ্ঠকে বলেন, মিয়ানমার সীমান্তবর্তীসবগুলো ব্লকে কাজ শুরু করেছে। সেখানে বাংলাদেশ ব্লকগুলো ফেলে রেখেছে। মাত্র একটি ব্লক ইজারা দিয়েছে। অন্য তিনটি ব্লক এখনও ইজারা দেয়া হয়নি। তিনি মনে করেন সীমান্তবর্তী ব্লকগুলোতে মিয়ানমার গ্যাস ক্ষেত্র পেলে ঝুঁকির মুখে পড়বে বাংলাদেশের ব্লক। তিনি জানান, মিয়ানমার সমুদ্রসীমায় ব্লক এ-১, এ-২ এবং এ-৩ এ সুফু, সু এবং মিঞা নামের তিনটি বড় গ্যাস ক্ষেত্র পেয়েছে। সেই বিবেচনায় অন্য ব্লকগুলোও সম্ভাবনাময়। একই এলাকায় বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের সমুদ্রসীমায় ব্লকগুলোর অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের এই ব্লকগুলো গ্যাস প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময়।

বিগত ২০১২ সালে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণী সংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তি হয়। জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ল অব দ্য সি (ইটলস) ন্যায্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের অনুকূলে রায় দেন। এতে করে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে অমীমাংসিত ২০০ নটিক্যাল মাইলের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে মহীসোপান অঞ্চলে ন্যায্য হিস্যা লাভ করে। এতে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ফলে বাংলাদেশ এলাকায় ১১, ১২, ১৬ এবং ২১ নম্বর ব্লক বাংলাদেশ চাইলে ইজারা দিতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে ১১ নম্বর ব্লক ইজারা দেয়া হয়েছে। যেখানে এখনও কোন কাজ শুরু হয়নি। বেশ ঢাকঢোল বাজিয়ে ওই সময় সমুদ্র বিজয় উৎসব করে সরকার। কিন্তু পরবর্তীতে ভারতের সঙ্গেও সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত মামলার বিরোধ নিষ্পত্তিতে বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে। কিন্তু মিয়ানমার এবং ভারত কোন সমুদ্রসীমান্তবর্তী ব্লকেই তেল গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি সরকার। এই পরিস্থিতির মধ্যেই সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা এই চিঠি দিয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থা সরকারের কাছে দেয়া চিঠিতে বলছে, মিয়ানমার দ্রুততার সঙ্গে রাখাইন স্টেটের গভীর সমুদ্রের গ্যাস উত্তোলনের কাজ শুরু করেছে। এজন্য বাংলাদেশেও অবিলম্বে সমুদ্র সীমান্তবর্তী এলাকায় গ্যাস উত্তোলনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

জ্বালনি বিভাগ সূত্র জানায়, এখন সাগরে দেশের গ্যাস ব্লকগুলো ইজারা দেয়ার জন্য সরকার দ্বিতীয় মাত্রার জরিপ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করছে। দ্বিতীয় মাত্রার জরিপের পর দেশের সমুদ্র এলাকায় কী সম্পদের একটি ধারণা পাওয়া যাবে। এতে বিদেশী কোম্পানিগুলোও এই এলাকায় দরপত্রে অংশ নিতে আগ্রহ দেখাবে বলে মনে করা হচ্ছে। গত এক বছর ধরেই দ্বিতীয় মাত্রার জরিপের কথা বলা হলেও এখনও কোন কোম্পানিকে কাজ দিতেই পারেনি পেট্রোবাংলা। এ অবস্থায় সাগরে কবে নাগাদ তেল গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ শুরু হবে তা নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে পারছে না। দেশ ভয়ঙ্কর জ্বালানি সঙ্কটের দিকে ধাবিত হলেও সমুদ্রে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে যথেষ্ট তৎপরতা নেই পেট্রোবাংলার। উল্টো সমুদ্রসীমা থেকে বিদেশী কোম্পানিগুলো গ্যাস ব্লকে কাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যাচ্ছে।

ওই চিঠির সুপারিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সমুদ্র সীমান্তবর্তী রাখাইন প্রদেশের গভীর সমুদ্রে গ্যাস উত্তোলনের জন্য মিয়ানমার এরমধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি করেছে। এরমাধ্যমে বাংলাদেশের মূল্যবান খনিজ মিয়ানমার আহরণ করছে কি না তা বিশেষজ্ঞ কর্তৃক পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন বলে প্রতীয়মান।

চিঠিটিতে মিয়ানমারে সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের বিস্তারিত বিষয় তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি মিয়ানমারের খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় বিদেশী কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে গভীর সমুদ্রের গ্যাস অনুসন্ধানে পিএসসি স্বাক্ষর করেছে। এসব কোম্পানিগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শেল ওয়েল এবং জাপানভিত্তিক মিটস্যুউ ওয়েল কোম্পানি সঙ্গে রাখাইন স্টেটের গভীর সমুদ্রে এডি-৯ এবং এডি-১১সহ গভীর সমুদ্রে তিনটি ব্লকে অনুসন্ধানে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে এসব কোম্পানি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে গ্যাস উত্তোলনে সক্ষম হবে। সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সমুদ্র সীমানা চূড়ান্ত হওয়ার পরপরই মিয়ানমার এসব ব্লকে ত্রি-মাত্রিক ভূকম্পন জরিপ কাজ সম্পন্ন করে চুক্তি করতে সক্ষম হয়েছে।

মিয়ানমার সরকার রাখাইন স্টেটের আরও কয়েকটি গভীর সমুদ্র ব্লক কয়েকটি আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। কোম্পানিগুলোর মধ্যে ইউনিকল এবং কনোকো ফিলিপস-এর মতো কোম্পানি রয়েছে। উল্লেখ্য, রাখাইন স্টেটের চকপিউসহ নিকটবর্তী গভীর সমুদ্রের তিনটি ব্লক এ-১, এ-২ এবং এ-৩ থেকে গ্যাস উত্তোলন করছে দক্ষিণ কোরিয়ার দায়িয়ু কোম্পানি। আহরিত গ্যাস পাইপ লাইনের মাধ্যমে চীনে সরবরাহ করা হচ্ছে। মিয়ানমারের খনিজ সম্পদ বিভাগ ২০১৩ সালের অক্টোবরে প্রায় ২০টি গভীর সমুদ্র ব্লকে দরপত্র পক্রিয়া শুরু করেছিল। সরকারের তরফ থেকে জানানো হয় মিয়ানমারে সাত দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদ রয়েছে।