২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শতাধিক জেএমবি জঙ্গী এখনও ধরা ছোঁয়ার বাইরে

  • সিরিজ বোমা হামলার দশ বছর

শংকুর কুমার দে ॥ জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) নামক জঙ্গী সংগঠনটিকে গত দশ বছরেও নিষ্ক্রিয় করা তো যায়-ই নি, বরং সক্রিয় হয়ে তারা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আস্তানা গড়ে তুলেছে পার্শ্ববর্তী ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও। ২০০৫ সালে বাংলাদেশের ৬৩ জেলায় সিরিজ বোমা বিস্ফোরণের পর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে ‘ব্যাকআপ অফিস’ হিসেবে বেছে নেয় জেএমবি জঙ্গী গোষ্ঠীটি। সিরিজ বোমার এজাহারভুক্তসহ দুর্ধর্ষ এমন ধরনের পলাতক শতাধিক জেএমবির জঙ্গী এখনও ধরা ছোঁয়ার বাইরে, যারা মোস্ট ওয়ান্টেড। জেএমবির জঙ্গীরাই এখন আবার বিভিন্ন নামের জঙ্গী সংগঠনের ব্যানারে নানা দল উপ-দলে বিভক্ত হয়ে ছোট ছোট স্কোয়াড গঠন করে তৎপরতা চালাচ্ছে। বাংলাদেশে ও ভারতেÑ দুই দেশেই তারা নাশকতা চালানোর জন্য তৎপরতা চালাচ্ছে বলে দাবি করেছে ঢাকার গোয়েন্দা সংস্থা ও ভারতীয় তদন্ত সংস্থা এনআইএ।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বাংলাদেশে নাশকতার পরিকল্পনায় সরাসরি জড়িত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমানের খাগড়াগড় কা-ের অভিযুক্ত জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। বর্ধমান খাগড়াগড়ের কা-ের যে অভিযুক্ত ২১ জঙ্গীকে অভিযুক্ত করে চার্জশীট দেয়া হয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশের ৪ জেএমবি’র জঙ্গীকে আসামি করা হয়েছে। এই ৪ জেএমবি জঙ্গী এখন কোথায়? এ ছাড়াও ৩ জেএমবির জঙ্গীসহ জেএমবি’র জঙ্গীরা তাদের ব্যাকআপ অফিস স্থাপন করেছিল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে, যাতে বাংলাদেশে ঝামেলায় পড়লে পশ্চিমবঙ্গে এসে আত্মগোপন করে আস্তানা গড়ে তুলতে পারে। আস্তানা থেকে বোমা তৈরি করে তারা বাংলাদেশেও পাঠিয়েছে। সিরিজ বোমা হামলার মতো না হলেও, দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তারা বোমা হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছিল। পাশাপাশি কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে ফিল্মী কায়দায় হত্যার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড তিন জঙ্গীর একজন সীমান্ত দিয়ে পালিয়ে ঢুকে পড়েছে বাংলাদেশে। অপর একজন আত্মগোপন করে কোথায় আছে তার হদিস পাচ্ছে না গোয়েন্দারা। বর্ধমান খাগড়াগড় কা-ের তদন্তে এই ধরনের তথ্য পেয়েছে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)। ভারতীয় তদন্ত সংস্থা সদ্য ঢাকা মহানগর গোযেন্দা পুলিশের হাতে গ্রেফতারকৃত ফাহিম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের কাছে।

ভারতের তদন্ত সংস্থা এনআইএ’র দাবি, জেএমবি’র এই তিন জঙ্গী হচ্ছে খাগড়াগড় বিস্ফোরণে অভিযুক্ত ইব্রাহিম শেখ ওরফে লাল মহম্মদ ওরফে লাল্টু। বাংলাদেশ থেকে আসা জেএমবি নেতা মামুদ ও হাতকাটা নাসিরুল্লাহ ওরফে সুহেল ও মাসুদ। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ থেকে জেএমবি নেতা মামুদ ও হাতকাটা নাসিরুল্লাহ ওরফে সুহেল মুর্শিদাবাদের জঙ্গীপুরে এসে রাজ্যে তাদের সংগঠনের গোড়াপত্তন করে। নাসিরুল্লাহ খাগড়াগড় বিস্ফোরণ কা-ের অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত এবং এখনও পলাতক। বাংলাদেশের রাজশাহীতে জেএমবির আস্তানায় নিয়ে গিয়ে সে জঙ্গীদের প্রশিক্ষণও দিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। ইব্রাহিম গত এপ্রিলে ঝাড়খ-ের পাকুডা থেকে ধরা পড়ে এই জেএমবি জঙ্গী।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে মুন্সীগঞ্জ ছাড়া দেশের ৬৩ জেলার সাড়ে ৪শ’ স্থানে পাঁচ শতাধিক বোমার বিম্ফোরণ ঘটায় নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)। সেই সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমেই জঙ্গী কার্যক্রমের প্রকাশ ঘটিয়ে সংগঠনটি গত ১০ বছর ধরে তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। জেএমবির ওই ঘটনায় দেশের ৬৩ জেলায় ১৬১টি মামলা হয়। আসামি করা হয় ৬৬০ জনকে। এর মধ্যে ৪৫৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিচার কার্যক্রম শেষ হয়েছে ১০৩টি মামলার। তার মধ্যে ১৫ জনের মৃত্যুদ-, ২৬৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ও ১১৮ জনকে খালাস দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে পলাতক রয়েছে ৫৩ জন। জঙ্গীদের শক্তির জানান দেয়া এই সিরিজ বোমা হামলার ৫৮টি মামলা এখনও বিচারাধীন। মামলার সাক্ষী ও সরকারী আইন কর্মকর্তাদের অবহেলায় এসব মামলা এখনও ঝুলে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব মামলার পলাতক ও জামিনে মুক্তি পাওয়া জঙ্গীরা অনেকে ফের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে গোপনে। আটক জঙ্গীরা কারাগারে বসেই কলকাঠি নাড়ছে বলে অভিযোগ আছে। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলার পর জেএমবির তখনকার শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই, আতাউর রহমান সানি, খালেদ সাইফুল্লাহ, আবদুল আউয়াল, ইফতেখার হাসান আল মামুন ও হাফেজ মাহমুদকে ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ রাতে রায়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়। এই ঘটনার মামলায় ধরা পড়া মৃত্যুদ-াদেশপ্রাপ্ত অপর ৬ জঙ্গীর মৃত্যুদ- এখনও কার্যকর করা হয়নি বলে জানা গেছে। শীর্ষ ৬ জঙ্গীর ফাঁসির পর জেএমবি অস্তিত্ব সংকটে পড়ে। তখন জেএমবির কারাবন্দী আমির মুফতি মাওলানা সাইদুর রহমান জাফরকে জেএমবির আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করার দায়িত্ব দেয়া হয়। প্রসঙ্গত, ওই সময় সাইদুর রহমান জামায়াতের কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য ছিলেন। সাইদুর রহমান গ্রেফতার হওয়ার পর তার জেএমবি নানা দলে উপদলে ভাগ হয়ে যায়। সর্বশেষ দল উপদলগুলো একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করে। কিছু ্দল উপদল একত্রিত হয়। বাদ বাকিগুলো যার যার মতোই চলতে থাকে। যারা একত্রিত হয়েছিল তারা জেএমবির কারাবন্দী আমির সাইদুর রহমানের ছেলে ফাহিমকে নেতা হিসেবে মেনে নেয়। অপর দলগুলোই নানা ছোট ছোট স্কোয়াড গঠন করে। সেইসব স্কোয়াডেরই একটি সদ্য নিষিদ্ধ আনসারুল্লাহ বাংলা টিম।

ঢাকার গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, এই মুহূর্তে জেএমবিসহ কোন জঙ্গী সংগঠনেরই বড় ধরনের নাশকতা চালানোর মতো ক্ষমতা নেই, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতা মুখে মেরুদ- ভেঙ্গে গেছে। বিচ্ছিন্নভাবে তৎপরতা চালাতে গিয়ে ধরা পড়ছে। দেশের ভেতরে ধাওয়া খেয়ে সীমান্ডের ওপার গিয়ে ঘাঁটি গেড়েছে ঠিকই, আবার সেখান থেকে ধাওয়া খেয়েও এখানে এসেও প্রকাশ্য আসতে পারছে না। জেএমবিসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠনগুলোর অনেক জঙ্গীই এখন আবার মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গী সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) মুখী হয়ে ধরাও পড়ছে। জঙ্গী সংগঠন ও জঙ্গী তৎপরতাবিরোধী অভিযান আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে এখন রুটিনওয়ার্ক। সুতরাং ভয়, আতঙ্ক কিংব্ াউদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই বলে মনে করেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

নির্বাচিত সংবাদ