২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

যৌথ তদন্তের বিধান রেখে সংশোধন হচ্ছে মানি লন্ডারিং আইন

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ অর্থদ-ের পরিমাণ দ্বিগুণ ও একাধিক সংস্থার যৌথ তদন্তের সুযোগ রেখে মুদ্রাপাচার আইন সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভা মুদ্রাপাচারের ক্ষেত্রে কেবল ঘুষ ও দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধ তদন্তের ভার দুর্নীতি দমন কমিশনের হাতে রেখে দুদক আইনও সংশোধনের অনুমোদন দিয়েছে। এ লক্ষ্যে সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ (সংশোধন) আইন-২০১৫’ এবং ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) আইন ২০১৫’ এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সাংবাদিকদের বলেন, মানি লন্ডারিং আইনের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকেও শক্তিশালী করা হচ্ছে। ২০১২ সালের মুদ্রাপাচার আইনে ৪ থেকে ১২ বছর কারাদ-ের বিধান রয়েছে। সংশোধিত আইনেও তা একই থাকছে। পরিবর্তন আনা হচ্ছে অর্থদ-ে।

বিদ্যমান আইনে পাচার হওয়া অর্থের কমপক্ষে দ্বিগুণ অথবা ১০ লাখ টাকার মধ্যে যেটি বেশি হবে- সেই পরিমাণ জরিমানার কথা বলা আছে। এই অংক বাড়িয়ে ১০ লাখের জায়গায় ২০ লাখ টাকা করা হচ্ছে। বর্তমান আইনে মুদ্রাপাচারের ঘটনা তদন্তের সার্বিক দায়িত্ব দেয়া ছিল দুদকের ওপর। কোন ক্ষেত্রে দুদক অন্য কোন সংস্থাকে দায়িত্ব দিলে তারপর তারা এ তদন্তে যুক্ত হতে পারত।

সংশোধিত আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, ঘুষ ও দুর্নীতি সংক্রান্ত মুদ্রা পাচারের ঘটনা ঘটলে তা তদন্তের দায়িত্ব দুদকের হাতে থাকবে। অন্যান্য অপরাধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থা তদন্তের দায়িত্ব নেবে। এর অনেকগুলো পুলিশ তদন্ত করবে। যেগুলো কাস্টমস রিলেটেড সেগুলো এনবিআর করবে, যেটা মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত সেটা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর করবে। এটা আইনে পরিষ্কার বলে দেয়া হয়েছে। মুদ্রাপাচার আইনে দুদকের ভার লাঘব করে দুদক আইনেও সংশোধনী আনা হচ্ছে।

সচিব বলেন, দুর্নীতি দমন আইনের তফসিলে এখন বলা আছে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর অধীন অপরাধসমূহ। এখানে সংশোধন করে বলা হয়েছে, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২ এর অধীন ঘুষ ও দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধসমূহ।

মন্ত্রিসভার গত বৈঠকে ‘দুনীতি দমন কমিশন (সংশোধন) আইন-২০১৫’ এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। আর সোমবার মুদ্রাপাচার আইন সংশোধনের খসড়া অনুমোদনের পর দুদক আইনের খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়।

বিদ্যমান মুদ্রাপাচার আইনে যৌথ তদন্তের বিধান না থাকলেও সংশোধনের খসড়ায় তা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ প্রয়োজনে একাধিক সংস্থা যৌথভাবে এ ধরনের অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে। এর ব্যাখ্যায় মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা বলেন, তদন্তকারী দলের বিধান ছিল না। এখন সেটা সৃষ্টি করা হয়েছে। কারণ মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টা খুব জটিল। মানি লন্ডারিংয়ের অর্থে অন্য কোন অপরাধ যেমন- খুন হয়েছে ইত্যাদি, সেক্ষেত্রে যৌথ তদন্ত দলের প্রয়োজন থাকতে পারে, যার মধ্যে হয়ত পুলিশের লোক থাকবে, এনবিআরের লোক থাকবে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের লোক থাকবে। কাজেই যেখানে প্রয়োজন যৌথ তদন্ত দল করা যাবেÑ সেই বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে এ আইনের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে জানিয়ে সচিব বলেন, তাদের ‘আরও ক্ষমতা’ দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, এখন যেটা আছে, সেটা বাংলাদেশ ব্যাংকের একটা অঙ্গ। ডেপুটি গবর্নরদের একজন এই ইউনিটের প্রধান হিসেবে কাজ করেন। একজন নির্বাহী পরিচালক সহকারী প্রধান হিসেবে কাজ করেন। অন্য যারা আছেন তারাও বাংলাদেশ ব্যাংকের।

ভারতসহ বিভিন্ন দেশে এ ইউনিটকে একটি স্বতন্ত্র সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার উদাহরণ টেনে সচিব বলেন, আমাদের একটা কমিটি আছে, মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি। ভারতের কমিটির নাম ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স কাউন্সিল। এটার প্রধান হচ্ছেন ভারতের অর্থমন্ত্রী। ভারতের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আওতার বাইরে, স্বতন্ত্র সংস্থা। তারা সরাসরি কাউন্সিলের কাছে রিপোর্ট করে।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনে মাঝামাঝি একটা অবস্থান স্থির করা হয়েছে। আসলে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান কার্যকর করতে সময় লাগে। এটা খুব ভাল হবে না। কাজেই আইনে বিধান রাখা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের আওতার মধ্যে একটা অপারেশনাল অটোনমি থাকবে। ফাংশনাল ইন্ডিপেন্ডেন্স থাকবে। অর্থাৎ কার্যক্ষেত্রে তারা অনেকটাই স্বাধীনতা ভোগ করবে।

আইন সংশোধনের পর বাংলাদেশে এ ইউনিটের প্রধান নিয়োগ দেবে সরকার। তিনি হবেন ডেপুটি গবর্নর পদমর্যাদার কেউ। সার্চ কমিটি গঠন করে এ নিয়োগ দেয়া হবে, যে কমিটিতে গবর্নরও থাকবেন।

সচিব বলেন, সংস্থার প্রধান যথেষ্ট অটোনমি নিয়ে এটা পরিচালনা করবেন। কিন্তু প্রশাসনিকভাবে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নরের আওতাধীন থাকবেন। অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গবর্নর নিয়োগ করবেন। অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে নয়। ইউনিটের প্রধান গবর্নরের মাধ্যমে জাতীয় কমিটির কাছে রিপোর্ট করবেন। তিনি নিয়োগ পাবেন চার বছরের মেয়াদে। সরকার ইচ্ছা করলে আরও এক মেয়াদের জন্য তাকে নিয়োগ দিতে পারবে।

এ সংস্থায় কেন্দ্রীয় বাংকের বাইরে থেকেও লোক নিয়োগের সুযোগ থাকবে জানিয়ে সচিব বলেন, এখানে দক্ষ লোক প্রয়োজন হতে পারে। সেখানে পুলিশের লোক দরকার হতে পারে, সেখানে এনবিআরের লোক দরকার হতে পারে, অন্য ব্যাংকের লোক দরকার হতে পারে।

এ ধরনের ক্ষেত্রে ইউনিটের প্রধান গবর্নরের মাধ্যমে সরকারকে অনুরোধ করবে এবং সরকার সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ‘ডেপুটেশনে’ পাঠাবে।

ব্যক্তিপর্যায়ে প্রতারণা, আত্মসাত ও জালিয়াতির মামলা তদন্ত করবে পুলিশ। আর সরকারী সম্পত্তি সংক্রান্ত প্রতারণা, সরকারী কর্মকর্তা ও ব্যাংকের কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকালে প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলা তদন্ত করবে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন হওয়ার আগে যেভাবে মামলা গ্রহণ ও তদন্ত করার এখতিয়ার ছিল সেভাবেই এখন পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে। এছাড়া বিচারাধীন মামলাও স্থানান্তরিত হবে বিশেষ আদালত থেকে বিচারিক হাকিমের আদালতে (জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে)। এসব বিধান রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) আইন-২০১৫ খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। আইনী এখতিয়ারের চক্করে প্রতারণা ও জালিয়াতির পাঁচটি ধারার মামলার ‘পাহাড়’ জমে ওঠার পর অবশেষে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন সংশোধন হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এদিকে মন্ত্রিসভার বৈঠকে নিজের লেখা কবিতা আবৃত্তি করে শুনিয়ে হাততালি কুড়িয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান।

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সাংবাদিকদের বলেন, ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালন সংক্রান্ত প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলার ভার দুদকের হাতেই থাকছে। আর সরকারী সম্পত্তি সম্পর্কিত এবং সরকারী ও ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালন সংক্রান্ত প্রতারণা বা জালিয়াতি মামলা ছাড়া অন্যান্য প্রতারণা ও জালিয়াতি মামলার দায়িত্ব পুলিশ পাবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগও পুলিশ তদন্ত করত। বিশেষ ক্ষেত্রে তদন্ত করত জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আর সেটা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টেই বিচার হতো। এ অপরাধ বিদ্যমান দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে তফসিলভুক্ত করা হয়। তিনি বলেন, মানি লন্ডারিং মামলা সবাই তদন্ত করতে পারবে না, বিশেষ বিধান রয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দ-বিধি ৪২০ ধারার অপরাধ প্রতারণা এবং ৪৬৭ ও ৪৬৮ ধারাসহ আত্মসাত ও জালিয়াতির মামলা দুদক আইন থেকে বিযুক্ত করা হচ্ছে। আইন পাসের পর এসব মামলা তদন্ত করতে হবে না দুদককে। এসব অপরাধের প্রচুর মামলা হয়েছে, যা স্পেশাল কোর্টে নিষ্পত্তি হতে দেরি হচ্ছে। এ সমস্যা দূর করতে এই বিষয়টি আইন থেকে বিযুক্ত করা হচ্ছে। আর প্রতারণা, আত্মসাত ও জালিয়াতির অভিযোগ নেয়ার এখতিয়ার দুদক আইনের তফসিলভুক্ত থাকায় পুলিশ মামলা নিতে চাইত না। আইন পাস হলে পুলিশ মামলা নিতে পারবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও বলেন, বর্তমানে দুদকে যেসব মামলা অনুসন্ধানে রয়েছে সেসব মামলা আর পরবর্তী পর্যায়ে যাবে না। তবে অভিযোগকারী নির্দিষ্ট আদালতে বা থানায় মামলা করতে পারবেন। যেসব মামলা তদন্তে রয়েছে সেসব মামলা এখতিয়ারভুক্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থা (পুলিশ) তদন্ত করবে। তদন্তের যে পর্যায়ে ছিল সে পর্যায় থেকেই তদন্ত কাজ শুরু করবে পুলিশ।

আর বিচারাধীন মামলাগুলো স্পেশাল কোর্ট থেকে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে মামলাগুলো স্থানান্তরিত হবে। স্পেশাল কোর্টে যে পর্যায়ে মামলাটি ছিল সে পর্যায় থেকে মামলার পরবর্তী কার্যক্রম চলবে।