২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বুয়েট কী কোন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ চেয়ার-টেবিলে এখনও ইস্ট পাকিস্তান!

  • নামকাওয়াস্তে বঙ্গবন্ধু স্মরণ, নেই মুক্তিযুদ্ধের কোন ভাস্কর্য

স্টাফ রিপোর্টার ॥ জাতির জনকের শাহাদাতবার্ষিকীতে নানা আয়োজনে জাতি শোক দিবস পালন করলেও বরাবরের মতো এবারও নির্লিপ্ত বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) কর্তৃপক্ষ। ব্যাপক সমালোচনাতেও চেতনা ফিরছে না বুয়েটের কর্তাব্যক্তিদের। কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহে জাতীয় শোক দিবসে জাতির জনককে নিয়ে হয় না কোন আলোচনা, বহু দাবির পরেও হচ্ছে না মুক্তিযুদ্ধের কোন ভাস্কর্য। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান তাই বুয়েট বঙ্গবন্ধু পরিষদের আলোচনাসভায় এসে কর্তৃপক্ষের আচরণে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন। হতাশা ও ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, জাতির জনককে নিয়ে কথা বলতে যদি কারও আপত্তি থাকে, মুক্তিযুদ্ধকে যদি বিশ্বাস না হয় তাদের জন্য বাংলাদেশ নয়, পাকিস্তান।

নানা মহলের সমালোচনার পর এবার হয় ১৫ আগস্ট না হয় একদিন পরে হলেও জাতীয় শোক দিবসের আলোচনাসভাসহ নানা আয়োজনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রগতিশীল শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। শেষ পর্যন্ত দায়সারাগোছের একটি মিলাদ মাহফিল করেই বিতর্ক এড়ানোর বৃথা চেষ্টা চালানো হলো। তবে প্রশাসন নিজেদের বিতর্কিত চেহারা প্রকাশ করলেও অডিটরিয়ামে বুয়েট বঙ্গবন্ধু পরিষদ আয়োজন করেছিল জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা। আলোচনা হয় জাতির জনককে নিয়ে। বঙ্গবন্ধু পরিষদের এ আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক খালেদা একরাম। ছিলেন বুয়েট বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানসহ প্রগতিশীল শিক্ষক-কর্মকর্তারা। আগেই অভিযোগ উঠেছিল, বুয়েট শিক্ষক সমিতির বিশেষত কর্তৃপক্ষের জামাত-শিবির প্রীতি এবং শিক্ষকদের মাঝে জামাতি মানসিকতার প্রভাবের কারণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীতে কোন আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় না। কর্তৃপক্ষের কেউ কেউ চাইলেও বিশেষ এ গোষ্ঠী নাখোশ হবে এই ভয়ে দিনটিকে এড়িয়েই যেতে চান। এই রেওয়াজ বহুকাল ধরে চলছে। এবার ১৫ আগস্ট বুয়েট অডিটরিয়ামে বুয়েট বঙ্গবন্ধু পরিষদ আয়োজিত আলোচনাসভায় তাই প্রধান অতিথি ইউজিসির চেয়ারম্যান ড. আব্দুল মান্নান তাঁর বক্তব্যে প্রচ- ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক খালেদা একরাম অবশ্য বলার চেষ্টা করেছেন, ‘বুয়েট কর্তৃপক্ষ নাকি বঙ্গবন্ধুকে হৃদয়ে ধারণ করে।’ বাহ্যিক অনুষ্ঠানে না হলেও শিক্ষকরা বঙ্গবন্ধুকে হৃদয়ে ধারণ করেন।’ কিন্তু এই অবস্থানেও যে ক্ষোভ প্রশমন হচ্ছে না তা বোঝা গেল অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও অন্যদের কথাতেই। অনুষ্ঠানে দর্শক সারিতে বসা শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অভিযোগের সুরেই বলছিলেন, বুয়েট প্রাঙ্গণে এই দিনটিতে প্রশাসন কেবল দায়সারাভাবে একটি মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে। কিন্তু জাতির জনককে নিয়ে আলোচনা, তার হত্যাকারীদের নিয়ে আলোচনা সভার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ সব সময়ই উদাসীন। বুয়েট প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জামাতিকরণের কারণেই বুয়েটের এই দুরবস্থা। এর ফলে নতুন প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর জীবনচরিত এবং জীবনাদর্শ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ‘ব্ল্যাকআউটে’ থেকে যাচ্ছে।

কয়েক শিক্ষক ক্ষোভের সঙ্গে বলছিলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ৪(ক) ধারা অনুযায়ী সকল স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও শাখা কার্যালয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি প্রদর্শনের কথা বলা থাকলেও বুয়েটে সংবিধানের এই ধারা সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত। এটি একটি ধৃষ্টতা! বুয়েটের ভিসি অফিস ছাড়া অধিকাংশ ডিন, বিভাগীয় প্রধান বা হল প্রভোস্টদের অফিসে জাতির পিতার ছবি দেখা যায় না। অবিলম্বে এই বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে তারা মনে করেন। তারা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বুয়েটের জামাত-শিবির তোষণ এবং লালন-পালনের আখড়া হিসেবে পরিচিত তাদের ব্যথিত করে। এই বিষয়ে সরকারের সকল সংস্থার বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন।

কেবল দর্শকরাই নয়, অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ইউজিসি চেয়ারম্যান তাঁর বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য স্থাপন করার সরকারী সিদ্ধান্ত রয়েছে। এরপরেও বুয়েট চত্বরে মুক্তিযুদ্ধের কোন ভাস্কর্য না থাকা হতাশাজনক। তিনি আরও বলেন যারা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে, তাঁর জীবনাদর্শ নিয়ে কথা বলতে এবং এদেশের জন্য তাঁর সুদীর্ঘ ত্যাগের ইতিহাস তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ইতস্তত বোধ করেন, তাদের জন্য পাকিস্তানে যাবার পথ খোলা আছে। জাতির জনকের কথা বলতে গিয়ে অধ্যাপক ড. মান্নান বলেন ‘তাঁর নেতৃত্বের বলিষ্ঠতার কারণেই তাঁর প্রতি সৃষ্টি হয়েছিল এদেশের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন। মেজর জিয়া ছিলেন একজন অনিচ্ছুক মুক্তিযোদ্ধা। ২৬ মার্চেও তিনি সকালে সোয়াত জাহাজ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের আজ্ঞাবহ সামরিক অফিসার হিসেবে অস্ত্র খালাস করছিলেন। তখন ক্যাপ্টেন অলি আহমেদ (আজকের কর্নেল (অব) অলি আহমেদ) হন্তদন্ত হয়ে এসে মেজর জিয়াকে জানান যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে।

বুয়েট বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, আমরা দীর্ঘদিন যাবত বুয়েটে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ স্তম্ভের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে নীরবতা পালন করেছে এবং কোন দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। এ বিষয়ে ত্বরিত উদ্যোগ গ্রহণের জন্য তিনি বুয়েট উপাচার্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি আরও বলেন, বুয়েটের অনেক আসবাবপত্র এবং শ্রেণী কক্ষের চেয়ার টেবিলে এখনো ‘ইস্ট পাকিস্তান’ শব্দটি দেখা যায়। এটি লজ্জার!

নানা অভিযোগ নিয়ে কথা বলেন বুয়েট উপাচার্য। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু একজন উঁচু মাপের মানুষ ছিলেন। তাঁর জন্য আমরা দোয়া করি এবং মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে আমরা তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। বুয়েটে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য স্থাপনের ক্ষেত্রে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। কাজেই সেই বিষয়টিও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। আসবাবপত্রের ইস্ট পাকিস্তান লেখার ব্যাপারে আমার দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। তবে আলাদীনের চেরাগের মতো রাতারাতি কিছু করা সম্ভব নয়।