২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইতিহাস না জানা প্রজন্মের প্রতি

  • অঞ্জন আচার্য

স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালী জাতির এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই বাঙালী। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন তিনি। আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে ডাক দিয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামের। সেই ডাকে প্রাণবাজি রেখেছিল বাংলার সাধারণ কিন্তু ভীষণ সাহসী সন্তানেরা। তাঁর স্বাধীনতার ডাক ও সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতির নির্দেশে পাল্টে যায় পুরো দেশের চিত্র। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালনের জন্য বাংলায় বিদ্রোহ-সংগ্রামের তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। বাঙালীর প্রচ- বিক্ষোভে একাত্তরের ৭ মার্চ রেডিও-টেলিভিশনে বঙ্গবন্ধুর অবিস্মরণীয় ও ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচার করতে বাধ্য হয় পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী। সেদিন প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধু ডাক দেন স্বাধীনতার। এদিকে বঙ্গবন্ধুর ডাকে চলতে থাকে অসহযোগ আন্দোলন। এ সময় স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য স্বাধীন বাংলা ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তৎকালীন পাকিস্তান বেতারের ঢাকা কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার না করায় প্রচ- ক্ষোভ কাজ করছিল মানুষের মনে। যুদ্ধের ময়দানে নামার প্রচ- তাড়নাও ছিল ছাত্র-যুবকের হৃদয়ে। সেই তাড়না থেকেই সেদিন সন্ধ্যাবেলায় শাহবাগে রেডিও অফিসে হামলা চালায় কয়েকজন তরুণ-যুবক। ৭ মার্চের ভাষণ এভাবেই তরুণ প্রজন্মকে ঘর থেকে টেনে এনেছিল। তরুণ-যুবক এবং বেতারকর্মীদের আন্দোলনের কারণে পাকিস্তানীরা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটি বেতারে প্রচার করতে বাধ্য হয়। ৮ মার্চ সকাল ৮টায় রেডিওতে ভেসে আসে বঙ্গবন্ধুর সেই অবিস্মরণীয় ভাষণÑ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

এরপর ইতিহাস। রক্ত, অশ্রু ও সংগ্রামের সুদীর্ঘ পথ পেরিয়ে ১৯৭১ সালে প্রিয় স্বদেশকে আমরা পাই স্বাধীন ভূখ- হিসেবে। বাঙালীর অমিত বিক্রম, অযুত শহীদের আত্মত্যাগ আর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসীম সাহসী নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ এবার পা দিলো স্বাধীনতার ৪৪ বছরে। ইতিহাসের পথপরিক্রমায় চার দশক খুব বেশি সময় না হলেও একটি দেশের গঠন ও বিকাশে কম সময় নয়। আর একটি দশক পর আমরা পৌঁছে যাব স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে। স্বাধীনতার ৪৪ বছরে পৌঁছে দেশের বিভিন্ন প্রসঙ্গে আমাদের অর্জন, সঙ্কট ও সম্ভাবনা আমরা খুঁজে দেখতে চেয়েছি আরও চেয়েছি এ অনুসন্ধান হোক তারুণ্যের চোখে। সেই তারুণ্য, যাদের প্রত্যেকের জন্ম স্বাধীন বাংলাদেশে, জন্মেই যারা পেয়েছে স্বাধীনতার আস্বাদ, পরাধীনতার শৃঙ্খল বিষয়ে যারা অনভিজ্ঞ এবং যারা দেখেনি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, পাকিস্তানী শোষণ সম্পর্কে যাদের প্রত্যক্ষ কোন ধারণা নেই। প্রিয় বাংলাদেশÑ যার সমৃদ্ধি আমাদের গৌরবান্বিত করে, যার ব্যর্থতা আমাদের বিদীর্ণ করে, সেই বাংলাদেশকে আরও বর্ণিল, প্রগতিশীল ও সমৃদ্ধ করতে আজকের তারুণ্যের অপার সম্ভাবনাই যে সবচেয়ে বড় শক্তি, তা আমরা বিশ্বাস করি। পূর্ব প্রজন্মের গৌরব ও কীর্তি পরবর্তী প্রজন্মের স্পর্ধিত হাতে এগিয়ে যায় সামনেÑ এটিই সমাজ প্রগতির শিক্ষা। আগামী দিনের বাংলাদেশ সব প্রজন্মের সম্মিলিত অংশগ্রহণে নিজের পায়ে সর্বময় মর্যাদায় বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেÑ এই বিশ্বাস অতিশয়োক্তি নয়।

একাত্তর আমাদের অর্থাৎ তরুণ প্রজন্মের কাছে কেবল শোনা গল্প। মা, বাবা কিংবা যুদ্ধে অংশ নেয়া স্বজনের স্মৃতিগল্প। সেদিন আমাদের জন্ম হয়নি। দেখিনি স্বাধীনতা শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো। শুনিনি সেদিন কবির কণ্ঠে সেই কবিতাখানি, অবাক হইনি তাঁর দৃপ্ত স্বাভাবিক পথচলায়। ভাবতেও পারি না, মাত্র একজন লোক কী করে কোটি কোটি বাঙালীকে মোহিত করেছিলেন। হোক না তা আমাদের কাছে অন্যের মুখে শোনা গল্প। তবু তো বাস্তব। তাই উপলব্ধি করি, কেবল একজন শেখ মুজিবুর রহমান কীভাবে নাড়া দিয়ে গিয়েছিলেন সারাদেশের তরুণ-যুবাদের! নাড়া দিয়েছিলেন পুরো জাতিকে, বাংলাকে! কিন্তু কতটুকু জানি আমরা তাঁর কথা, কিংবা তাঁর ভূমিকাকে কতটা স্মরণ করি? এই প্রজন্মের কাছে তিনি কি কেবল একটি নাম শেখ মুজিবুর রহমান, নাকি মহান নেতা বঙ্গবন্ধু অথবা স্বাধীনতার প্রতিশব্দ হয়ে আছেন? আমি মনে করি, তিনিই এই দেশের জন্মদাতা। তাঁর জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না। আর বাংলাদেশের জন্ম না হলে আমি আজ তাঁকে নিয়ে কথা বলতে পারতাম না। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু সব বিতর্কের উর্ধে। কিন্তু তাঁকে নিয়েই যখন বিতর্র্ক হয়, তখন লজ্জায় মরে যাই।

বঙ্গবন্ধু যে ময়দান থেকে ৭ মার্চ ভাষণ দিয়েছিলেন, উদ্বুদ্ধ করেছিলেন স্বাধীনতার স্বাদ পেতে এবং যে ময়দানে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করে, সেটি তৎকালীন রেসকোর্স আজকের সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান। সেখানে প্রতিদিনই সন্ধ্যায় জমে তরুণের মেলা। সেখানেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে। তাদের কথা, ‘বঙ্গবন্ধু কেবল একজন ভালো মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন যে কারও আদর্শ হওয়ার মতো। অনেক দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন আমাদের জন্য। এ প্রজন্মের আমরা যখন এখনকার রাজনীতিবিদদের প্রতি বিতৃষ্ণা জাগিয়ে রাজনীতি থেকে দূরে সরতে চাই, তখন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আমাদের তাঁর দেখানো পথে চলতে উৎসাহ জাগায়।’ একজনের মতে, ‘বঙ্গবন্ধু দেশের জন্য যা করেছেন, কিংবা তাঁর অবদান কোনভাবেই অস্বীকার করার নয়। আমি যে তাঁর দেশে জন্ম নিয়েছি, এটাই আমার জন্য গর্বের বিষয়।’ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তরুণ প্রজন্মের এই ভাবনা থেকে যে কথা বেরিয়ে আসে, তা হলো মৃত্যুর পরেও দেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতিরজনক এই দেশ থেকে হারিয়ে যাননি, যেতে পারেন না। তিনি চিরঞ্জীব।

স্বাধীনতার শক্তি আর বাঙালী জাতীয়তাবোধের চেতনাকে লালন করে স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরেও আমরা আমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। স্বাধীনতাবিরোধী কুচক্রী মহলের কর্মকা-, দলতন্ত্র, সামরিকতন্ত্র ও সুশাসনের অভাব আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে ও সোনার বাংলা গড়ায় বড় ধরনের বাধা। ৪৪ বছরে আমাদের যতটুকু এগিয়ে যাওয়া উচিত ছিল তা হয়নি ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে যে রাজনৈতিক অবস্থার সৃষ্টি হয়, তা আমাদের উন্নয়নের পথকে করেছে বাধাগ্রস্ত। স্বাধীনতার যে চেতনা ছিল, এই ৪৪ বছরের বেশি সময় তা রাষ্ট্রের কাজের ভিতর প্রতিফলিত হয়নি। যার ফলে রাষ্ট্রের যে বিকাশ হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি।

ইতিহাসবিদরা দেশের জন্য স্বপ্ন দেখেন না। দেশের জন্য স্বপ্ন দেখেন রাজনীতিবিদরা। এ স্বপ্নে আর্দশ থাকে, দর্শন থাকে। এ রকম স্বপ্ন যাঁরা দেখেন তাঁরাই স্বাপ্নিক। সেই স্বাপ্নিক রাজনীতিবিদরাই ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ইতিহাসবিদরা ইতিহাস সৃষ্টি করেন না, তারা কেবল ইতিহাস লিপিবদ্ধ ও বিশ্লেষণ করেন। তাই আজকের প্রজন্মকে জানতে হবে বাঙালীর মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে। তাঁর আদর্শ ও চেতনাকে বুকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধুর মতো করে ভালবাসতে হবে স্বদেশকে। আর ছয় বছর অতিক্রান্ত হলেই বাঙালী জাতি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবে। এর মধ্যে আমরা ক্রমশ হারাতে থাকবো একাত্তরের আগের বীর সংগ্রামী সন্তান ও একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। ইতোমধ্যে অনেক বীর সেনানীদের হারাতে হয়েছে।

বর্তমান বাংলাদেশে একাত্তরের পরে জন্ম নেয়া নাগরিকই বেশি, যাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের অভিজ্ঞতা নেই। ধীরে ধীরে এ জাতিকে আন্দোলন-সংগ্রামের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে দূরে সরে যেতে হবে। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। নতুন প্রজন্মকে স্বাধীনতা আন্দোলনে-সংগ্রামের অকুতোভয় বীর সন্তান ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যারা জীবিত রয়েছেন, তাদের সান্নিধ্যে বেশি বেশি করে আসতে হবে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর বহু বছর নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার ভুলপাঠ হাজির করা হয়েছে। সেদিকে নজর রেখে বাংলাদেশের শেকড়ের সন্ধান করে জানতে হবে স্বাধীনতার ইতিহাসের ইতিকথা ও বিস্তারিত পটভূমি। জানতে হবে তাদের কথা, যাদের আন্দোলন-সংগ্রামের ফল হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে একদিন জয়যুক্ত হয়েছিল লাল-সবুজের পতাকা।