২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বন্ধু আমার ভাল থেকো সর্বত্র

  • মাহবুব রেজা

ওজি চন্দন। মানে হলো ওবায়দুল গণি চন্দন। ও আমার খুব কাছের বন্ধু। সারাক্ষণ চারপাশ মাতিয়ে রাখার দুর্দান্ত ক্ষমতা রয়েছে ওর। আমরা বন্ধুরা চন্দনকে নিয়ে বলাবলি করি, চন্দন আমাদের মধ্যে থাকলে আমাদের কোন সমস্যা নেই। কথা বলার দায়িত্বটা সে স্বেচ্ছায় কাঁধে নিয়ে নেবে। আর ও এতো মজার মজার কথা যে কোত্থেকে শিখল আল্লাই জানে! ও যখন কথা বলতে থাকে তখন ওর মধ্যে অন্য এক ধরনের ব্যাপার-স্যাপার কাজ করে। কখনও আক্রমণাত্মক, কখনও রক্ষণাত্মক, কখনও বল্গাহীন আবেগে কথা বলত চন্দন। আর ওর বন্ধুভাগ্যও বেশ। চন্দনকে প্রায়ই দেখতাম, নতুন নতুন বন্ধ-বান্ধব নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওর এই ব্যাপারটা বেশি ঘটত বইমেলায়। ওর এ রকম ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ টাইপের বন্ধু দেখে মাঝে মধ্যে আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতাম আর ভাবতাম, যাক, কয়েকদিনের জন্য চন্দনের সীমাহীন বকবক থেকে তো অন্তত রেহাই পাওয়া গেল।

১৯৯৪ সালে চন্দনকে দেখলাম হ্যাংলা-পাতলা টাইপের এক বন্ধুকে নিয়ে বইমেলায় ঢুকছে। চন্দনের মুখোমুখি হতেই ও পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, বন্ধু, ওর নাম বাদল। চন্দন সব সময় ওর বন্ধুদের ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধন করে। চন্দনের এই বন্ধু বলে ডাক দেয়ার মধ্যে আলাদা একটা মায়া ছিল।

বাদল চন্দনের কথায় কাচুমাচু। বোঝাই যায় বেশ লাজুক। পরনে জিনসের প্যান্ট। টাইট ফিটিং। ফুলহাতা শার্ট ইন করে পরা। পায়ে মডেলের কেডস। আর বাদলের গোঁফটাও বেশ দেখার মতো। গোঁফের দু’দিকে কোন হেরফের নেই। বাদলের এই অসহ্য পরিমিত মাপের গোঁফ দেখে আমার মনে হয়েছিল, বাদল বুঝি গোঁফ সাইজ করার সময় গজ-ফিতা নিয়ে বসে। তা না হলে দু’দিকে নির্ভুল সমান হয় কী করে! ক্লিন শেভ।

বইমেলায় কয়েকদিন আড্ডা দেয়ার পর বাদলের সঙ্গে কেমন করে যেন আমারও বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেল। বইমেলায় এলে আমরা আড্ডা দিতাম। চা খেতাম। তখনও জানি না বাদল ইমদাদুল হক মিলনের ছোট ভাই। প্রথম দিন ওর কথা আমার কানে বাজল। আমি বাদলকে বললাম, আপনার বাড়ি বুঝি বিক্রমপুর!

আমার কথায় বাদল বেশ খুশি, ক্যান বিক্রমপুরের ভাষা কী বোঝন যায়?

না বুঝলে কইলাম ক্যামনে? আমার নানিগো বাড়ি বিক্রমপুরÑ এই ভাষা চিনন যায়।

এরপর বাদলের সঙ্গে আমার দূরত্ব কমে যায়। আপনি থেকে তুমি।

যেদিন চন্দনের কাছে জানলাম বাদল মিলন ভায়ের ছোট ভাই সেদিন আমি বাদলকে মুখ ফসকে বলে ফেললাম, এর লাইগ্যাই তো কই তোমার চেহারার মইধ্যে হেই ধরনের একখান ছাপ পাওন যায়Ñ

কোন ধরনের ছাপ? বাদল বেশ অবাকিত।

মিলন ভাই-মিলন ভাই ধরনের একটা ছাপÑ

আমি হের ভাই লাগি না? ছাপ তো পড়বোই। গর্বে বাদলের চোখ-মুখ ঝিকিয়ে উঠল।

চন্দন এবার বাদলের দিকে তাকিয়ে আমাকে বলল, হুনো বন্ধু, আজিরা কথা কয়া লাভ নাই। বাদল হইলো বিক্রমপুরের অরিজিনাল পোলা আর তুমি হইলা ফলস।

বাদল এবার চন্দনের কথায় বলে উঠল, চন্দন, তুমি কী জানো, আমগো অঞ্চলে একটা কথা আছেÑ ‘বিক্রমপুরের পোলা, আশি টাকা তোলা।’ বাদলের মুখে তখন শিশুর মতো সরলতা।

শিশুর মতো সরলতায় মোড়ানো বাদলের মুখ এখনও আমার মনে পড়ে। বাদলকে দেখে বোঝা যেত না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে বাদল অনেক অসুখ বাঁধিয়ে ফেলেছিল। ডায়াবেটিসের তীব্র ধকল বাদল সহ্য করতে পারেনি। ’৯৮ সালে আমার বন্ধু বাদল হাসপাতালে মারা গেছে। বাদল বয়সে অনেক বড়, কিন্তু তারপরও কীভাবে যেন আমাদের বন্ধু হয়ে গেল, সেটা সত্যিই বিস্ময়কর। বাদল মারা যাওয়ার পর চন্দনকে দেখলে বাদলের কথা মনে পড়ত আমার। দেখতে দেখতে অনেক বছর পেরিয়ে গেল। চন্দনের কোন পরিবর্তন নেই। ও আগের মতো হাতের সামনে যাকে পায় তাকেই ‘সাইজ’ করে। অনর্গল কথা বলে। নন স্টপ। চন্দন যে কতবার আমাকে ‘সাইজ’ করেছে তার সাক্ষী অনেকেই। চন্দন যখন আমাকে ইচ্ছেমতো সাইজ করত তখন আমি ইচ্ছে করেই ‘রা-শব্দ’ করতাম না। আমি জানতাম আমার এই বন্ধু ভেতরে ভেতরে আসলে খুবই একা। গত বছরের আগস্ট মাসে চন্দনও একা একা বাদলের পথে হাঁটা ধরল।

এখনও বইমেলায় ঢুকলে আমার বাদলের কথা খুব করে মনে হয়। মনে হয় ভিড় ঠেলে কোত্থেকে বুঝি বাদল এসে দাঁড়াবে আমার সামনে। ছোটখাটো গড়নের, পরিপাটি বেশভূষায় বাদল হেসে দিয়ে বলবে, বন্ধু কহন আইলা মেলায়? আমি আইছি হেই কুন সময়?

নিয়ম করে আমি মেলায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর যাই, কিন্তু চন্দন মারা যাবার পর অজানা এক ভয় পেয়ে বসল আমাকে। পত্রিকার কাজ শেষ হয়ে যায় সন্ধ্যায়। কাজ শেষে ইস্কাটন থেকে বাংলামোটর মোড়ে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়াই। ভাবি, বাসে করে চলে কি যাব শাহবাগ? তারপর ওখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে বইমেলা। না, আমার আর শাহবাগ যাওয়া হয় না। রাস্তা পার হয়ে রিক্সা নিয়ে বাসায় ফিরে আসি। আমার ছেলেমেয়েরা বইমেলার সন্ধ্যায় তাদের বাবাই (ছোটবেলায় আমার মেয়ে ‘বাবাই’Ñ এই অদ্ভুত নামে আমাকে ডাকত) ঘরে পেয়ে ভীষণ অবাক! বইমেলায় গেলে বাদলের মতো চন্দনও যদি অন্ধকার ফুরে সামনে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে বসে, কী বন্ধু, তোমার খবর বার্তা কী?

চন্দন খুব সহজেই কঠিন, অপ্রিয় কথাটা যে কাউকে মুখের ওপর ঠাস্্ করে বলে দিতে পারে। ও যাকে পছন্দ করে না তাকে এড়িয়ে চলে। অপ্রিয় মানুষকে দৌড়ের ওপর রাখে সে। লেখালেখি নিয়ে ওর মধ্যে এক ধরনের অহঙ্কার ছিল।

নিজে দুর্দান্ত ভাল ছড়া লেখে, ছড়াটা বোঝেও ভালÑ তার ওপর সাহিত্যের সব মাধ্যম সম্পর্কে ওর জানাশোনা বেশ। যে কারণে ওর সামনে যদি কেউ সাহিত্য নিয়ে ‘ভাব’ দেখাতে যেত তাহলে তাকে অবধারিতভাবে ‘ব্যান্ডবক্স’ ধোলাই খেতে হতো চন্দনের। এ রকম বহু নজির রয়েছে আমাদের। শিশুসাহিত্য যারা করত তারা নানা কারণে চন্দনকে সমীহ করে চলত। সমীহ না করে উপায় কী!

॥ দুই ॥

একদিন বাদলের কথা মিলন ভাইকে বলতেই দেখি মুহূর্তে মিলন ভাইয়ের চেহারা ক্যামন যেন হয়ে গেল। মিলন ভাই আমার দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। আমি কথা ঘুরিয়ে অন্যদিকে নিয়ে গেলাম। মিলন ভাই সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন ব্যাপারটা। পরে বাদলকে নিয়ে ‘বাদলের মুখ’ শিরোনামে মিলন ভাই্ একটি অসাধারণ লেখা লিখেছিলেন। সেই লেখাটা পড়লে বুকটা আপনা-আপনি হিম হয়ে যায়। ‘ভায়ে ভায়ে এতো স্নেহ, কোথা গেলে পাবে কেহ’ লাইনগুলো বুক ঠেলে উঠে আসেÑ মিলন ভাইয়ের লেখাটা এমনই।

মিলন ভাই চন্দনকে খুব আদর করত। বাদলকেও।

athainidha15@yahoo.com