২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফের দুই শিশু কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা

  • সিলেট, খুলনা, বরগুনার পর এবার রাজধানী ও কেরানীগঞ্জে ঘটল এই নির্মম হত্যাযজ্ঞ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ মোবাইল চুরির অভিযোগে সোমবার রাজধানীতে দুই কিশোরকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিহত দুই কিশোরের নাম মোঃ রাজা (১৭) ও রাব্বি হাসান (১৩)।

সম্প্রতি চুরির অভিযোগে সিলেটে শিশু শেখ সামিউল আলম রাজন ও বরগুনায় রবিউল নামের দুই শিশুকে হত্যা করা হয়। খুলনায় কাজ ছেড়ে দেয়ায় নৃশংসভাবে খুন করা হয় শিশু রাকিবকে। সিলেট, খুলনা, বরগুনায় নির্যাতন চালিয়ে শিশু হত্যার ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড়ের মধ্যেই রাজধানী ও কেরানীগঞ্জে এ ঘটনা ঘটল।

রাজধানীর হাজারীবাগে চুরির অভিযোগে মোঃ রাজা (১৭) নামে এক কিশোরকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, হাজারীবাগ থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মোঃ আরজু মোবাইল ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগে রাজাকে পিটিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় বাসার সামনে ফেলে যান। পরে হাসপাতালে নেয়ার পর বিকেলে তার মৃত্যু হয়।

ঘটনার সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে হাজারীবাগ থানা পুলিশ। সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোন মামলা হয়নি বলে জানিয়েছেন ওই থানার ওসি (তদন্ত) খন্দকার মোহাম্মদ আলী। আটক তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে বলেও জানান তিনি।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রাজার ফুফু রতœা বেগম জানান, রাজা গণকটুলির ৪৬ নম্বর বাসায় থাকত। পাশের বাসায় থাকেন হাজারীবাগ থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মোঃ আরজু। সোমবার সকালে আরজু তার মোবাইল ফোন চুরির অভিযোগে রাজাকে বাসা থেকে নিজের বাসায় নিয়ে যান। সেখানে তাকে বেদম মারধর করে দুপুরের দিকে অজ্ঞান অবস্থায় বাসার সামনের রাস্তায় ফেলে যান। স্থানীয়দের সহযোগিতায় রতœা রাজাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে বিকেল ৫টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

রাজার মা শামসুন্নাহার দুই বছর আগে মারা গেছেন এবং তার বাবা বাবুল হোসেন চোখের সমস্যা নিয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানিয়েছেন রতœা বেগম। তিনি আরও জানান, মাদকে আসক্তি থাকায় রাজা মানসিকভাবে সুস্থ ছিল না।

অভিযোগ বিষয়ে ছাত্রলীগ নেতা মোঃ আরজু জানান, রবিবার রাত ৩টার দিকে তিনি রাজাকে তার বাসায় উঁকি দিতে দেখেছেন। সকালে ঘুম থেকে ওঠে তিনি বাসার ৪টি মোবাইল ফোন ও একটি ল্যাপটপ চুরি হওয়ার কথা শোনেন। এরপর সন্দেহবশত সোমবার সকালে রাজার বাসায় গিয়ে তার খোঁজ নিয়ে তাকে পায়নি। কিছু সময় পর এলাকার এক ছেলে রাজাকে ধরে নিয়ে আসে। ঘটনাটি রাজার খালাত ভাই শামীমকে জানানো হলে সে ক্ষিপ্ত হয়ে রাজাকে মারধর করে।

তবে রাজার ফুফু রতœা বেগমের দাবি, খবর পেয়ে রাজার বড় বোন রেশমা আরজুর বাসায় ছুটে যান। তিনি আরজুর হাতে-পায়ে ধরে রাজাকে ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ জানালেও আরজু তাকে ফেরত দেননি।

অন্যদিকে কেরানীগঞ্জ থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা জানান, কেরানীগঞ্জে মোবাইল চুরির অভিযোগে রাব্বি হাসান (১৩) নামে এক শিশুকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। রবিবার রাতে কালিগঞ্জে ইমরান গার্মেন্টস নামে একটি তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানের ভেতর এ ঘটনা ঘটে। সোমবার দুপুরে পুলিশ নিহতের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে।

নিহতের মামা বাবুল মিয়া জানান, ১৫ দিন আগে গ্রামের বাড়ি বরিশালের বানারীপাড়া থানার লবণছড়া থেকে মিরাজ নামে এক বন্ধুর সঙ্গে রাব্বি ঢাকার কেরানীগঞ্জে আসে। এরপর সে কালিগঞ্জের ‘ইমরান গার্মেন্টস’ নামে একটি তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে কাজে যোগ দেয়। রাব্বির বাবা মোঃ দুলাল পেশায় একজন কৃষক।

তিনি অভিযোগ করেন, রবিবার সন্ধ্যায় প্রতিষ্ঠানের এক কর্মচারীর একটি মোবাইল খোয়া যায়। এতে সবাই রাব্বিকে সন্দেহ করে। তখন প্রতিষ্ঠানের কয়েক কর্মচারী মিলে রাব্বিকে বেঁধে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। অবস্থা বেগতিক দেখে কর্মচারীরা রাব্বিকে বাথরুমে নিয়ে গলায় দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে ফাঁসির নাটক সাজায়। রাত ১২টার দিকে পাশের প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে তারা রাব্বিকে বাথরুম থেকে উদ্ধার করে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায় এবং রাব্বি আত্মহত্যা করেছে বলে প্রচার করে। হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহতের শরীরে বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন ও নীলাফুলা দাগ রয়েছে। রাব্বির মৃত্যু সংবাদ শুনে সঙ্গে থাকা মিরাজ নামে এক সহকর্মী পালিয়ে গেলেও আক্তার ও সেলিম নামে অপর দুই সহকর্মীকে কোতোয়ালি থানা পুলিশ আটক করে। পাশাপাশি তারা ঘটনাটি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় জানিয়ে দেয়। তবে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ কাউকে আটকের কথা অস্বীকার করেন।

এদিকে সোমবার দুপুরে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক মোজাম্মেল হোসেন হাসপাতালে গিয়ে নিহতের সুরতহাল তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ সেখানকার মর্গে পাঠিয়ে দেন।

তিনি জানান, শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে কিভাবে মৃত্যু হয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে না। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এলে মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে।

সোমবার বিকেলে কালিগঞ্জের ইমরান গার্মেন্টসে গিয়ে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পাশের দোকানদাররা জানান, রাব্বির মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর মালিকসহ অন্য কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলিয়ে পালিয়েছে।