২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

’৭৫ থেকে ’৮১- কেমন ছিল বাংলাদেশ?

  • গোলাম কুদ্দুছ

পঁচাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশ ঘোর অমাবশ্যায় ডুবে থাকা এক জনপদের নাম। একটা সময় পর্যন্ত অবস্থা এমন ছিল যে, কোন আশা নেই, ভালবাসা নেই, আছে শুধু লোমহর্ষক হত্যা আর ষড়যন্ত্রের জাল বুননের নানা কাহিনী। প্রতি মুহূর্তেই দৃশ্যপটের পবির্তন ঘটেছে আর মৃত্যু হয়েছে আমাদের স্বপ্নগুলোর। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত স্বপ্নগুলোকে হায়েনার দল ক্ষতবিক্ষত করে যেন প্রতিশোধের উন্মত্ততায় মেতে উঠেছিল। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতাকে নির্মমভাবে হত্যার পর সংবিধানকেও কাটাছেঁড়া করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শগুলোকে বিদায় করতে চেয়েছিল ক্ষমতা দখলকারী অপশক্তি। নতুন প্রজন্মের তরুণদের কাছে সে সময়গুলো যেন অনেকটা অস্পষ্ট-ধোঁয়াশা। ভবিষ্যত পথচলা নির্ধারণে ষড়যন্ত্র আর মিথ্যাচারের মুখোশ উন্মোচনে সহায়ক হতে পারে ভেবে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরবর্তী দহনকালের উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিয়ে এ নিবন্ধ রচনা।

ক.

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে যখন সপরিবারে হত্যা করা হয়, শেখ হাসিনা তখন স্বামীর সঙ্গে ছিলেন ব্রাসেলসে। সঙ্গে শেখ রেহানাও। সে কঠিন দুঃসময়ে এ পরিবারটিকে আগলে রেখেছিলেন ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া। জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর পরামর্শে সেদিন জীবন রক্ষার জন্য আশ্রয় মিলেছিল বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধুরাষ্ট্র ভারতে। রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করে ড. ওয়াজেদ মিয়া ভারত সরকারের কাছে লিখলেন, ‘শ্যালিকা রেহানা, স্ত্রী হাসিনা, শিশু ছেলে জয়, শিশু মেয়ে পুতুল এবং আমার নিজের কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও প্রাণ রক্ষার জন্য ভারত সরকারের নিকট কামনা করি রাজনৈতিক আশ্রয়।’ [সূত্র : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ, লেখক : এমএ ওয়াজেদ মিয়া, পৃষ্ঠা : ২৬]

তৎকালীন ইন্দিরা গান্ধীর সরকার শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়ার সিদ্ধান্ত জানালে ১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার জাম্বো জেটে দিল্লীর পালাম বিমানবন্দরে এসে পৌঁছুল শেখ হাসিনা ও পরিবারের জীবিত সদস্যরা। প্রথমে তাদের দিল্লীতে ডিফেন্স কলোনির একটি ফ্ল্যাটে এবং পরবর্তীতে ‘ইন্ডিয়া গেট’ সংলগ্ন পাণ্ডারা রোডস্থ একটি সরকারী বাড়ির দোতলার ফ্ল্যাটে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। ভারত সরকার ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়াকে ভারতীয় আণবিক শক্তি কমিশনে ‘পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপ’ প্রদান করে। ফেলোশিপের শর্তানুযায়ী ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়াকে বাসা ও অফিস যাতায়াতের সুবিধা ছাড়াও দৈনিক বাষট্টি রুপী (ভারতীয় মুদ্রা) পঞ্চাশ পয়সা ভাতা দেয়া হতো। এভাবেই কেটেছে জাতির জনকের দু’কন্যার সাদামাটা শঙ্কিত জীবন। দেশ-বিদেশের সংবাদ জানার জন্য ছিল একটিমাত্র ট্র্যানজিস্টার।

খ.

১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতির পদ দখল করেন। বিপথগামী খুনী মেজরচক্র ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করে। খেয়াল-খুশি মতো আদেশ-অধ্যাদেশ জারি করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার চেষ্টা চালায়। ২৩ আগস্ট মোশতাক সরকার গ্রেফতার করে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন (অব.) এম মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমদ, এএইচএম কামরুজ্জামান, শেখ আবদুল আজিজ, আবদুস সামাদ আজাদ, এম কোরবান আলী, আবদুল কুদ্দুস মাখন, হাশেম উদ্দিন পাহাড়ীসহ আরও বেশ কয়েকজন নেতাকে। তাঁদের গ্রেফতারের পরদিন ২৪ আগস্ট মেজর জেনারেল কেএম শফিউল্লাহকে অপসারণ করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সারাদেশে সামরিক বিধি জারি করে বেশ কয়েকটি সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালত গঠন করা হয়। ৩০ আগস্ট এক সরকারী আদেশে সকল রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর জিল্লুর রহমান, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ এবং কয়েকদিনের ব্যবধানে আমির হোসেন আমু, গাজী গোলাম মোস্তফা, এমএ জলিল, এমএ মান্নান, সরদার আমজাদ হোসেন, নুরুল হক, এম শামসুদ্দোহা, এম মতিউর রহমানসহ অসংখ্য নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। এই সময় অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের নামে নির্যাতন-নিপীড়ন, বাড়িঘর ভাঙচুর, গ্রেফতার চালানো হয় দেশব্যাপী। অনেকে আশ্রয় নেন প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনÑ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, শেখ সেলিম, ওবায়দুল কাদের, ইসমত কাদির গামা, মো. নাসিম, মোস্তফা মহসিন মন্টু, শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর, লতিফ সিদ্দিকী, পংকজ ভট্টাচার্য, ডাঃ এসএ মালেক, এসএম ইউসুফ, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, খোকা রায়, রবিউল মুক্তাদিরসহ অসংখ্য নেতৃস্থানীয় সংগঠক। কাদের সিদ্দিকী বেশকিছু অনুসারীসহ মেঘালয়ে আশ্রয় নেন এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ ও খুনীদের বিতাড়িত করার জন্য প্রতিরোধের ডাক দেন। এ সময় খুনীচক্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বোস প্রফেসর আবদুল মতিন চৌধুরী এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মযহারুল ইসলামকে পদত্যাগে বাধ্য করে।

ক্ষমতা দখলকারী খুনীচক্র এ সময় বন্দুকের জোরে বিভিন্ন অধ্যাদেশ জারি করতে শুরু করে। ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জারি করা হয় কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’। এই অধ্যাদেশের মূল উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের রক্ষা করা। অধ্যাদেশে বলা হয়েছে যে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত কারো বিরুদ্ধে দেশের কোন আদালতে অভিযোগ পেশ করা যাবে না।

১৬ অক্টোবর এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে খন্দকার বীরউত্তমকে বিমানবাহিনী প্রধানের পদ থেকে অপসারণ করে পাকিস্তানপন্থী এমজি তাওয়াবকে বিমান বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করা হয়। ১৯৭৬ সালের ৫-৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াতে ইসলামের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এক সিরাতুন্নবী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন এমজি তওয়াব। সে সমাবেশে সেøাগান উঠেছিলÑ ‘তাওয়াব ভাই তওয়াব ভাই, চাঁদ তারা মার্কা পতাকা চাই।’

গ.

এ সময় সেনাবাহিনীতে চরম বিশৃঙ্খলা চলতে থাকে। খন্দকার মোশতাক এবং জেনারেল জিয়ার প্রশ্রয়ে খুনী ফারুক-ডালিম-রশীদ চক্রের ঔদ্ধ্যত্বপূর্ণ আচরণ সেনাবাহিনীর অনেকেই পছন্দ করেনি। এমনি পরিস্থিতিতে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ জেনারেল জিয়ার নিজস্ব বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৪৬ ব্রিগেডের কিছু তরুণ অফিসার দিয়ে জিয়াকে গৃহবন্দী করে সেনাবাহিনীর পদ থেকে অবসরের কাগজ স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নেন। পাল্টা অভ্যুত্থানের খবর পেয়ে সে রাতেই খুনী মোশতাক ও মেজরচক্র কারাভ্যন্তরে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহযোগী যারা বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিল তাদের হত্যার পরিকল্পনা করে। ৩ নবেম্বর শেষরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সকল নিয়মনীতি ভঙ্গ করে খুনীর দল কারাভ্যন্তরে প্রবেশ করে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এইচএম কামরুজ্জামানকে একটি কক্ষে জড়ো করে ব্রাশ ফায়ারে নির্মমভাবে হত্যা করে।

জাতীয় ৪ নেতাকে হত্যার পর সর্বত্র আতঙ্ক, বিশৃঙ্খলা ও গুজব প্রচার হতে থাকে। ৪ নবেম্বর আওয়ামী লীগ ধানমণ্ডি ৩২নং সড়ক পর্যন্ত এক শোক মিছিল বের করেÑ এ মিছিলে খালেদ মোশাররফের মা, ভাই রাশেদ মোশাররফ অংশ নেন। সর্বত্র প্রচার হতে থাকে যে, ভারতীয় সহযোগিতায় খালেদ মোশাররফ ক্ষমতা দখল করেছে। এমনি পরিস্থিতিতে কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান ঘটানোর জন্য ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ ও গণবাহিনীর নামে লিফলেট বিতরণ এবং বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। যাই হোক, পাল্টা অভ্যুত্থানে জেনারেল খালেদ মোশাররফ নিহত হন এবং জিয়া পুনরায় সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জাসদের অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং দেশী-বিদেশী চক্রান্তে জিয়া সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন।

এর মধ্যে জেনারেল ওসমানীর মধ্যস্থতায় খুনী মেজরচক্র নিরাপদে দেশত্যাগ করে। খন্দকার মোশতাক বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে ৩ নবেম্বর রাত ৮টায় খুনী মেজরচক্রকে ব্যাংকক পাঠিয়ে দেন। সে রাতে যারা দেশত্যাগ করে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনÑ ১. লে. কর্নেল খন্দকার আবদুর রশীদ, ২. মেজর শরিফুল হক ডালিম, ৩. মেজর আজিজ পাশা, ৪. মেজর মহিউদ্দিন, ৫. মেজর শাহরিয়ার ৬. মেজর বজলুল হুদা ৭. মেজর রাশেদ চৌধুরী ৮. মেজর নূর ৯. মেজর শরফুল হোসেন ১০. লেফটেন্যান্ট কিসমত হোসেন ১১. লে. খায়রুজ্জামান ১২. লে. আবদুল মাজেদ ১৩. হাবিলদার মোসলেউদ্দিন ১৪. নায়েক মারফত আলী ১৫. নায়েক মো. হাসেম।

ব্যাংকক পৌঁছেই এক সংবাদ সম্মেলন ডেকে লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করার কথা স্বদম্ভে ঘোষণা করে।

ঘ.

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে খন্দকার মোশতাক ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। সামরিক আইনের বিধি সংশোধন করে সুপ্রীমকোর্টের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের নিকট মোশতাক ক্ষমতা হস্তান্তর করেন ৬ নবেম্বর। ওইদিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণের পর প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম বেতারে জাতির উদ্দেশে এক ভাষণ প্রদান করেন। ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘... গত ১৫ আগস্ট কতিপয় অবসরপ্রাপ্ত এবং চাকরিচ্যুত সামরিক অফিসার এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও তাঁর পরিবার-পরিজনদের হত্যা করে। খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে সামরিক আইন জারি করেন। প্রকৃতপক্ষে এই ঘটনার সঙ্গে সামরিক বাহিনী সংশ্লিষ্ট ছিল না।

দেশবাসী আশা করেছিল, দেশে আইনশৃঙ্খলা ফিরে আসবে, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু আমরা সবাই নিরাশ হয়েছি। দেশে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি সম্প্রতি কারাগারে অন্তরীণ কিছু বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। ...দেশে সামরিক আইন জারি রয়েছে। আমি একটি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি। আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য দেশে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ন্যূনতম সময়ের মধ্যে অবাধ নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা। আমরা এই দায়িত্ব ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, অথবা সম্ভব হলে তার পূর্বেই পালন করতে বদ্ধপরিকর।’ [সূত্র : বঙ্গভবনে শেষ দিনগুলোÑ লেখক, আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, পৃষ্ঠা-৫৭]

ইতোমধ্যে জিয়াউর রহমান বন্দীদশা থেকে কর্নেল তাহেরের আনুকূল্যে মুক্তিলাভ করেন। ৭ নবেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব প্রথম দিকে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও গণবাহিনীর নেতা কর্নেল তাহেরের নিকট থাকলেও দ্রুতই দৃশ্যপটের পরিবর্তন হয়। মুক্ত হয়েই জিয়া দ্রুত দেশী-বিদেশী শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করে কর্নেল তাহের থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং ক্ষমতার মূল কেন্দ্রের কর্তৃত্ব নিয়ে নেন। যার কারণে প্রেসিডেন্ট সায়েম জাতির উদ্দেশে দেয়া প্রথম ভাষণের ২৪ ঘণ্টা পরই দ্বিতীয় ভাষণ দিতে বাধ্য হন। এ ভাষণে তিনি বলেন, ‘... পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিচালনার জন্য আমরা কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। প্রশাসনিক কার্যক্রম সুষ্ঠু পরিচালনার জন্যে দেশে সামরিক আইন প্রশাসন কাঠামো গঠন করা হয়েছে। এই কাঠামোতে রাষ্ট্রপতি স্বয়ং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হবেন। এতে তিনজন উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থাকবেন। তাঁরা হচ্ছেনÑ সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, নৌবাহিনী প্রধান কমোডর মোশাররফ হোসেন খান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এমজি তাওয়াব। দেশের চারটি বিভাগে চারজন আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসক থাকবেন।’ [সূত্র : প্রগুক্ত, পৃষ্ঠা-৫৯]

বিচারপতি সায়েম রাষ্ট্রপতি হলেও বস্তুত সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় জেনারেল জিয়ার হাতে। ৮ থেকে ১০ নবেম্বরের মধ্যে জাসদ নেতা এমএ জলিল, আ.স.ম রব প্রমুখ জেল থেকে বেরিয়ে এলেও ২৩ ও ২৪ নবেম্বর পুনরায় এমএ জলিল, হাসানুল হক ইনুসহ জাসদ ও গণবাহিনীর অধিকাংশ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। ২৪ নবেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সলিমুল্লাহ হলের এক হাউস টিউটরের বাসা থেকে কর্নেল তাহের গ্রেফতার হন। কর্নেল তাহেরের মুক্তির লক্ষ্যে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেনকে জিম্মি করার উদ্যোগ নেয় বিপ্লবী গণবাহিনী। দলের ছয় সদস্য ঢাকার ধানমণ্ডিতে অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন দখলে নিতে গেলে আসাদ-বাচ্চু-মাসুদ-হারুন নামে চারজন গেরিলা নিরাপত্তা রক্ষীর গুলিতে নিহত হন এবং অবশিষ্ট দু’জন বেলাল ও সবুজ আহতাবস্থায় গ্রেফতার হন। এদের একজন ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সদস্য।

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজাকার, আলবদর ও আল শামস্ বাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি এক অধ্যাদেশ জারি করে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী দালালদের বিচারের জন্য সারাদেশে ৭৩টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ১৯৭৩ সালের ৩০ নবেম্বর পর্যন্ত এই আইনে ৩৭৪৭১ জনকে গ্রেফতার এবং অনেককে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তিও প্রদান করা হয়। ১৯৭৩ সালের ৩০ নবেম্বর সরকার এক আদেশে দালাল আইনে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে যারা খুন, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে অংশ নিয়েছিল তাদের ছাড়া অন্যদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে। অবশ্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পূর্বে সরকার জুলাই ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ্যাক্ট ১৯৭৩ বাংলাদেশ সংসদে পাস করিয়ে নেয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তি এবং ক্ষমতালোভী চক্রের সরকার ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর এক আদেশে দালাল আইন বাতিল করে দেয়। এর ফলে সমস্ত যুদ্ধাপরাধীদের কারাগার এবং অভিযোগ থেকে মুক্ত করে দেয়া হয়। শহীদদের রক্তস্নাত বাংলাদেশে বুক ফুলিয়ে চলতে শুরু“করে রাজাকার, আলবদর, আল শামস্ বাহিনীর সদস্যরা।

১ মে ১৯৭৬ ঢাকায় এক শ্রমিক সমাবেশে প্রদত্ত ভাষণে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু সরকারের সমালোচনা করে বলেন, সে সময় মানুষকে অবাধে ধর্ম পালন করতে দেয়া হয়নি। তার ঠিক দু’দিন পর ৩ মে ১৯৭৬ সরকার এক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সংবিধানের ৩৮নং অনুচ্ছেদ বাতিল করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল জেনারেল জিয়া সংবিধানের ৯ সংশোধনীর মাধ্যমে তা আইনে পরিণত করেন। এর ফলে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম, পিডিপি, নেজামে ইসলামসহ অপরাপর ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলসমূহ আবার তাদের তৎপরতা শুরু“করে। রাষ্ট্র-সমাজ আর রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয় যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত রাজাকার, আলবদর, আল শামস্ বাহিনীর সদস্যরা।

অপরদিকে ১৯৭৬ সালের ১৭ জুলাই এক বিশেষ সামরিক আদালতে ‘সরকার উৎখাত ও সেনাবাহিনীকে বিনাশ করার চেষ্টা চালানোর’- অভিযোগে জাসদনেতা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহেরকে মৃত্যুদণ্ড এবং এমএ জলিল, আ.স.ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, হাসানুল হক ইনু, তাত্ত্বিক নেতা সিরাজুল আলম খানসহ আরও অনেককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদের শাস্তি প্রদান করা হয়। কথিত আছে যে, জিয়াউর রহমানের অনমনীয় সিদ্ধান্তের কারণে আন্তর্জাতিক সকল আইনকানুন লঙ্ঘন করে ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।

ঙ.

১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই বিচারপতি সায়েমের সামরিক সরকার রাজনৈতিক দলবিধি জারি করে। ৩০ জুলাই থেকে শুরু“হয় ঘরোয়া রাজনীতি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ২৫ আগস্ট ১৯৭৬ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্যসহ নেতৃবৃন্দের আনুষ্ঠানিক বর্ধিতসভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’Ñ নামে দল পুনরুজ্জীবনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পূর্বোক্ত কমিটির সভাপতি এএইচএম কামরুজ্জামান ৩ নবেম্বর কারাগারে নিহত হন। সাধারণ সম্পাদক জিল্লুুর রহমান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক কারাগারে বন্দী। এমনি পরিস্থিতিতে সিনিয়র সহ-সভাপতি মহিউদ্দিন আহমদকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা হয়।

লেখক : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

চলবে...