১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অভিজিত ও অনন্ত বিজয় হত্যাকাণ্ড ॥ পরিকল্পনা হয় কারাগারে

অভিজিত ও অনন্ত বিজয় হত্যাকাণ্ড ॥ পরিকল্পনা হয় কারাগারে
  • বন্দী মুফতি জসীমুদ্দিনের নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড;###;৩ জন গ্রেফতার

স্টাফ রিপোর্টার ॥ ব্লগার অভিজিৎ রায় ও অনন্ত বিজয় দাশ হত্যার মূল পরিকল্পনাকারীসহ ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। অভিজিৎ রায়কে যে ২ জন কুপিয়ে হত্যা করে, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে সাদেক তাদেরই একজন। অভিজিৎ হত্যায় সরাসরি অংশ নেয়া ৫ জনের মধ্যে অপর ৩ জনকে গ্রেফতারে অভিযান চলছে। গ্রেফতারকৃতরা সদ্য নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। হত্যার নির্দেশ আসে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে বন্দী জঙ্গী সংগঠনের আধ্যাত্মিক নেতা মুফতি জসীমুদ্দিন রাহমানীর কাছ থেকে। নির্দেশ মোতাবেক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে জঙ্গী সংগঠনের একেকটি সিøপার সেল। সিলেটের সুবিদবাজারে অনন্ত হত্যায় সরাসরি অংশ নেয় ৪ জন। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে কেউ অনন্ত হত্যায় সরাসরি অংশ নিয়েছিল কি না সে বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা লেখক প্রকৌশলী ড. অভিজিৎ রায়কে (৪২) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। বাধা দিতে গিয়ে তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যার (৪০) বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল হত্যাকারীদের চাপাতির কোপে কেটে পড়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক বন্যা বর্তমানে সেদেশেই অবস্থান করছেন।

পরদিন রাজধানীর শাহবাগ মডেল থানায় নিহতের পিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. অজয় কুমার রায় অজ্ঞাত খুনীদের আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলাটি তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ায় সেদেশের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই) ডিবি পুলিশকে মামলা তদন্তে সহায়তা করে আসছে। সংগৃহীত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগারে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন মঙ্গলবার রাত আটটা পর্যন্ত ডিবির হাতে পৌঁছেনি। হত্যার পর পরই ঘটনার দায় স্বীকার করে আনসার বাংলা-৭ নামের একটি সংগঠন সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়।

এছাড়া গত ১২ মে সকালে সিলেট নগরের সুবিদবাজারে নূরানী আবাসিক এলাকার চৌরাস্তায় চারজন মোটরসাইকেলযোগে ব্লগার লেখক ও তরুণ ব্যাংকার পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তা অনন্ত বিজয় দাশকে (৩২) প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে। হত্যা ঘটনায় দৈনিক সংবাদের সিলেটের ফটোসাংবাদিক ইদ্রিস আলী গ্রেফতার রয়েছে। আনসার বাংলা-৮ নামের একটি টুইটার এ্যাকাউন্ট থেকে আল কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা পরিচয়ে হত্যাকা-ের দায় স্বীকার করে। হত্যাকারীদের গ্রেফতারে সারাদেশেই অভিযান চলছে।

মঙ্গলবার র‌্যাব সদর দফতরে এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বাহিনীর লিগ্যাল এ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানান, সোমবার রাত সাড়ে ১০টায় র‌্যাব-৩ এর একটি দল রাজধানীর নীলক্ষেত এলাকা থেকে সাদেক আলী মিঠুকে (২৮) গ্রেফতার করে। তার পিতার নাম মোহাম্মদ আলী (মৃত)। বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানাধীন মাছুমপুর গ্রামে।

মিঠুর তথ্যমতে, সোমবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে র‌্যাব-৩ এর একটি দল আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অর্থ সরবরাহকারী ও সক্রিয় সদস্য এবং ব্লগার হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী তৌহিদুর রহমানকে (৫৮) ধানম-ির স্টার কাবাব রেস্টুরেন্টের কাছ থেকে গ্রেফতার করা হয়। তার পিতার নাম মৃত রশিদুর রহমান। গ্রাম-খরকী, বাড়ি যশোর জেলা সদরে। একই জায়গায় থেকে অপরজন মোঃ আমিনুল মল্লিককে (৩৫) গ্রেফতার করা হয়। তার পিতার নাম মৃত আব্দুল জব্বার মল্লিক। বাড়ি শরীয়তপুর জেলা সদরের সন্তোষপুর গ্রামে। গ্রেফতারকৃতরা সদ্য নিষিদ্ধ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য।

মুফতি মাহমুদ খান জানান, হত্যাকা-ের মূল পরিকল্পনা হয় কারাগারে। আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের আধ্যাত্মিক নেতা মুফতি জসীমুদ্দিন রাহমানী হত্যার নেপথ্য কারিগর। অভিজিৎ ও অনন্ত বিজয়কে মুরতাদ ঘোষণা করা হয় আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের পক্ষ থেকে। সংগঠনের বিধান অনুযায়ী এবং জঙ্গী সংগঠনটির তরফ থেকে মুরতাদদের শাস্তি মৃত্যু বলে ঘোষণা করা হয়। রাহমানী কারাগারে থেকেই তার ঘনিষ্ঠ সহচর সাদেক আলী মিঠু ও ছোট ভাই আবুল বাশারের মাধ্যমে মুরতাদদের হত্যার নির্দেশ দেন। কারাগারে ও আদালতে আনা নেয়ার সময় রাহমানীর সঙ্গে তার ভাইয়ের এসব বিষয়ে কথা হতো। ২০১৩ সাল থেকে বাশার আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের হাল ধরে। এমনকি রাহমানীর নির্দেশনাগুলো আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অর্থ উপদেষ্টা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যের নাগরিক তৌহিদুল ইসলামের কাছে পৌঁছে দিত। তৌহিদুল ইসলাম হত্যার পুরো ছক কষতেন। তিনি নব্বই দশক থেকে যুক্তরাজ্য প্রবাসী। সেদেশে প্রযুক্তিবিদ্যায় পারদর্শী হিসেবে পরিচিত। প্রযুক্তির কল্যাণে রাহমানীর সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। রাহমানীর বক্তব্যে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অর্থের যোগান দিতে থাকেন।

প্রসঙ্গত, মুফতি রাহমানী রাজধানীর ধানম-ির হাতিমবাগ মসজিদের ইমাম থাকাকালীন বিভিন্ন বিষয়ে বয়ান দিতেন। তার সেই বয়ান জুমার খুতবা নামে ব্যাপক প্রচার পায়। এছাড়াও রাহমানীর বয়ান বই আকারে প্রকাশিতও হয়েছে। সেই ছাপাখানায় কাজ করত গ্রেফতারকৃত সাদেক। সাদেক ২০০৭ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত রাহমানীর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছিলেন। বিভিন্ন সময় গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে রাহমানীর সঙ্গে দেখা সাক্ষাত করতেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, অভিজিৎ ও অনন্ত হত্যার সকল কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও হত্যাকারীদের গতিবিধির উপর নজর রাখার দায়িত্ব ছিল তৌহিদুল ইসলামের ওপর। গ্রেফতারকৃত আমিনুল মল্লিক আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সক্রিয় সদস্য। তার প্রধান কাজ সংগঠনের যে সকল সদস্য আত্মগোপনে ও পালিয়ে দেশের বাইরে যেতে চায়, তাদের ভুয়া নামে পাসপোর্ট তৈরি করে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়া। তবে এখন পর্যন্ত আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কি পরিমাণ সদস্য দেশের বাইরে পালিয়ে গেছে তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান জানা যায়নি।

মুফতি মাহমুদ খান আরও জানান, অভিজিৎ রায় হত্যায় মোট ৫ জন সরাসরি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। এরমধ্যে রমজান ও নাঈম সরাসরি অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করে। অপর তিন জন ঘটনাস্থলের খুব কাছাকাছি ছিল। এছাড়াও অনেকেই আশপাশের এলাকায় অবস্থান নিয়ে থাকতে পারে। সরাসরি হত্যাকা-ে অংশ নেয়া অপর ৩ জন জুলহাস, জাফরান ও সাদিক পলাতক। তারা দেশের বাইরে চলে গেছে কিনা সে সম্পর্কে গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে তেমন কোন তথ্য মেলেনি।

অভিজিৎ হত্যাকা-ের ৩ ঘণ্টা আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হলের খেলার মাঠে ওই ৫ জন বৈঠক করে। প্রায় দেড় ঘণ্টার বৈঠক শেষে তারা বইমেলায় যায়। রমজান ও নাঈম অভিজিৎ রায়কে অনুসরণ করতে থাকে। টিএসসিতেই একটি বরই গাছের নিচে খানিকটা ঝাপসা অন্ধকারেই অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করে তারা।

রমজান কালোজিরা ও মধু বিক্রেতার ছদ্মবেশে রাজধানীতে ঘুরে বেড়ায়। হত্যাকা-ের পর তৌহিদুর রহমানের নির্দেশে সাদেক, জুলহাস ও জাফরানের দায়িত্ব ছিল অনলাইনের মাধ্যমে আনসারুল্লাহ বাংলার বিভিন্ন গাণিতিক সংখ্যায় দায় স্বীকার করা। তারই ধারাবাহিকতায় অভিজিৎ রায় হত্যার পর হত্যার দায় স্বীকার করে আনসার বাংলা-৭। আসামিদের মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। হস্তান্তরের আগে গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে যেসব এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সেসব এলাকার সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দায়ের হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে কেউ অনন্ত হত্যায় সরাসরি অংশ নিয়েছিল কিনা সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে তৌহিদুর রহমান। অপর দুই আসামি অনন্ত হত্যার বিষয়টি জানত বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদেই স্বীকার করেছে।

অভিজিৎ রায় হত্যার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অভিজিৎ রায় হত্যার দায় স্বীকার করে স্ট্যাটাস দেয়ার পর শফিউর রহমান ফারাবীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক ও ব্লগার প্রকৌশলী আহমেদ রাজীব হায়দার শোভন হত্যার পরেও ফারাবী হত্যার দায় স্বীকার করে স্টাটাস দিয়েছিল। এমনকি ফারাবীর জানাযা নামাজ আদায়কারী ঈমামকে হত্যার হুমকি দিয়েছিল। পরে চট্টগ্রাম পুলিশ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল রেলস্টেশন এলাকা থেকে ফারাবীকে গ্রেফতার করে। ফারাবী ছাত্রশিবিরের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। পরে তিনি নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন হিযবুত তাহরীরে যোগ দেয়। হিযবুত তাহরীরের পর সদ্য নিষিদ্ধ আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে যোগ দেয়। ফারাবীর কাছ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। অভিজিৎ হত্যায় সবমিলিয়ে ৭ জন জড়িত। একেক জন একেক ধরনের দায়িত্ব পালন করেছে। কেউ সরাসরি হত্যায় অংশ নিয়েছে। আবার কেউ কেউ আশপাশে অবস্থান করে পুরো এলাকার উপর নজরদারি করেছে। হত্যাকা-ে ৭টি মোবাইল ফোন ব্যবহার হয়েছে। এরমধ্যে একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার হয়েছে। অপর ৬টি মোবাইল ফোন ধ্বংস করে দিয়েছে হত্যাকারীরা।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, অভিজিৎ ও অনন্ত হত্যায় ৩ জন, ওয়াশিকুর রহমান বাবু হত্যায় ৩ জন, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয় হত্যার ২ জন গ্রেফতার হয়ে ৮ দিনের রিমান্ডে রয়েছে। ইতোপূর্বে রাজীব হত্যায় ৮ আসামির ৭ আসামিই গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছে। এছাড়া বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা ও ব্লগার আরিফ রায়হান দ্বীপ হত্যায় গ্রেফতার হয়ে মেজবাহ উদ্দিনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীসহ বিভিন্ন সময় গ্রেফতারকৃতদের দেয়া তথ্য পর্যালোচনা করে এবং গভীর তদন্ত চলমান থাকায় গোপীবাগে বিশ্ব ত্রাণকর্তা দাবিদার লুৎফুর রহমান ও তার ছেলেসহ ৬জন এবং ফার্মগেটের পূর্ব রাজাবাজারে চ্যানেল আইয়ের উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যার জট খুলে যেতে পারে।