২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আলোকচিত্রের জোরালো ভাষায় বঙ্গবন্ধু, সংগ্রাম স্বাধীনতার আলেখ্য

আলোকচিত্রের জোরালো ভাষায় বঙ্গবন্ধু, সংগ্রাম  স্বাধীনতার আলেখ্য
  • বাংলা একাডেমিতে আলোকচিত্র প্রদর্শনী;###; বাংলা একাডেমিতে বিশেষ প্রদর্শনী

মোরসালিন মিজান ॥ বেশ কিছু আলোকচিত্র প্রদর্শনী। পর পর। সব ক’টি আয়োজন থেকে আলো ফেলা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ওপর। বাঙালীর অবিসংবাদিত নেতাকে নানা দৃষ্টিকোন থেকে দেখা ও দেখানোর প্রয়াস লক্ষ্য করা গেছে। আলোকচিত্রের সংগ্রহ খুব দুর্লভ, এমন নয়। বেশিরভাগ দেখা। কিছু কমদেখা ও কাছাকাছি দেখা আলোকচিত্র। তবে বিষয় বঙ্গবন্ধু যেহেতু, আবেদন ফুরোয় না। বরং নতুন আবেদন নিয়ে সামনে আসে। হয়ত তাই শোকের মাস আগস্টে জাতির জনককে নিয়ে আরও একটি প্রদর্শনী। এবার আয়োজক বাংলা একাডেমি। ভাস্কর নভেরা প্রদর্শনী কক্ষে মঙ্গলবার এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এর আগে বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ছিল ভরপুর আয়োজন। আলোচনায় অংশ নেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। বাংলা একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসহ উপস্থিত ছিলেন অনেকে। বক্তারা বলেন, বঙ্গবন্ধু একই সঙ্গে ইতিহাসের সৃষ্টি ও স্রষ্টা। সেই ইতিহাসেরই এক টুকরো যেন আজকের আলোকচিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর কর্মময় জীবন স্মরণের পাশাপাশি তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে সবাইকে দেশপ্রেমিক, নির্লোভ ও আত্মত্যাগী হবার আহ্বান জানানো হয় অনুষ্ঠান থেকে। পরে সবাই মিলে প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন।

প্রদর্শনীর শিরোনাম- বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা। শব্দ সংখ্যা তিন বটে, একটি অন্যটির সঙ্গে দারুণ ঘনিষ্ঠ। নিবিড় সংশ্লিষ্টতার কারণে আলাদা মানে করা যায় না। বরং নিজের অজান্তেই মালাটি গাঁথা হয়ে যায়। এখানে এক ধরনের ফিরে দেখা। মুজিবের পুনর্পাঠ। সেই সঙ্গে ইতিহাসের বাঁকগুলো ঘুরে আসা। পরিভ্রমণের চমৎকার সুযোগ। প্রদর্শনী কক্ষটি নতুন। চার দেয়ালে জায়গা নিহায়ত কম নয়। পুরোটাজুড়ে আলোকচিত্র। সাংবাদিক প্রণব সাহা অপুর ব্যক্তিগত সংগ্রহ ও বাংলা একাডেমির কিছু নিজস্ব আলোকচিত্র দিয়ে সাজানো। মোট ছবি ১৮৬টি। আলোকচিত্রের কিছু মূল প্রিন্ট এখানে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে জোরালো শিল্পভাষা। সঙ্গত কারণেই বিশেষ গুরুত্বের হয়ে ওঠে প্রদর্শনীটি।

গ্যালারিতে জাতির জনকের অত্যুজ্জ্বল উপস্থিতি। সাদাকালো ছবিতেও প্রিয় পিতার মুখ যেন জ্বলজ্বল করছে। না, একলাটি নন। মুজিবের হাত ধরাধরি করে আছে বাঙালীর আন্দোলন সংগ্রামের ইতিহাস। অপেক্ষাকৃত কম দেখা একটি আলোকচিত্রের সামনে দাঁড়াতে হলো কিছু সময়। এখানে বক্তৃতা নয়, সেøাগানরত বঙ্গবন্ধু। রাজপথের লড়াকু সৈনিক বলতে যা বোঝায়, তিনি তাই। চিরবিদ্রোহী হাত শূন্যে ছুড়ে মেরেছেন। মুখে সুতীব্র চিৎকার। ছবির দুর্বল ক্যাপশন- উত্তাল মার্চে উত্তোলিত মুষ্টি। অবশ্য তাতে ছবির মহিমা বুঝতে সমস্যা হয় না। এই বঙ্গবন্ধুকে মূলত ক্যামেরাবন্দী করা হয়েছিল ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে। বঙ্গবন্ধু চিৎকার করে বিজয়ের মূলমন্ত্র ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করছিলেন। ছবির দিকে তাকিয়ে উত্তাল মার্চের প্রকৃত উত্তাপ এখনও টের পাওয়া যায় বৈকি! একাধিক আলোকচিত্রে আন্দোলন সংগ্রাম এগিয়ে নেয়ার ভূমিকায় বঙ্গবন্ধু। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের বার বার দেখা আলোকচিত্রটিও মহাকাব্যিক হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু মানুষের কতটা কাছাকাছি ছিলেন, কেমন আপনজন হয়ে ছিলেন, প্রদর্শনীর আলোকচিত্র এই সত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। দলের নেতাকর্মীর সঙ্গেও আত্মার সম্পর্ক ছিল মহানায়কের। সে সম্পর্ক নানা ব্যঞ্জনা পেয়েছে প্রদর্শনীতে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে যতটা নেতা মনে হয় ততটাই কর্মী তিনি মওলানা ভাসানীর সামনে। আলোকচিত্র তা পরিষ্কার দেখিয়ে দেয়। শেখ মুজিবের রাজনৈতিক শিক্ষা আচার ও চর্চার একটি পরিচয় এখান থেকে পাওয়া যায়। প্রদর্শনীর বাইরে থাকেনি বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিজীবন। সহধর্মিণী ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, কন্যা শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও শিশুপুত্র রাসেলের সঙ্গে যে মানুষটিকে দেখা যায়, মানতে হয়, তিনি অদ্ভুত এক সংসারী পুরুষ! এভাবে কঠিনে- কোমলে যার নির্মিতি, তাঁকে আবিষ্কারে আরও উৎসাহী হয়ে ওঠে মন।

প্রদর্শনীতে সীমিত পরিসরে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধকালীন সময়টিকে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতি পর্ব। মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীদের ক্যামেরাবন্দী করা হয়েছে। খালি গা আর লুঙ্গি পরা গাঁয়ের তরুণ যুবারা দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করার শপথ নিয়েছে। প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। রণাঙ্গনে শত্রুর মোকাবেলা করতেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাঁদের সাদাকালো চোখে সোনালি স্বপ্নের ঝিলিক। চিত্রভাষায় বর্ণিত হয়েছে বাঙালীর আত্মত্যাগের ইতিহাস। শরণার্থী জীবনের দুঃখগাথা ফুটে উঠেছে। এ পর্যায়ে সামনে এসে দাঁড়ান মহীয়সী নারী মাদার তেরেসা। জীবন যন্ত্রণায় ছটফট করা মানুষের পাশে ঈশ্বরের প্রতিনিধির মতো দাঁড়িয়ে যান তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের সহায়তার হাতটি কত প্রশস্ত ছিল, কম উচ্চারিত সে সত্য ঘুরেফিরে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের অত্যন্ত বেদনাদায়ক অধ্যায়টির নাম গণহত্যা। একটি ছবির ক্যাপশন- মৃত্যুর মিছিলে বাঙালী। এখানেও দুর্বল অর্থ। মিছিল শব্দটি তুলে রাখা যেত অন্য কোথাও ব্যবহার করার জন্য। সে যাই হোক, ছবি তার নিজের কথাটি ঠিকই বলতে পেরেছে। পাকিস্তানী বাহিনীর বর্বর গণহত্যার এসব ছবি চলমান যুদ্ধাপরাধের বিচারের যৌক্তিকতাকে প্রমাণ করে। বিচার কার্য অব্যাহত রাখার তাগিদ দিয়ে যায়।

স্বাধীনতার পর দেশ গঠনের কঠিন কাজটি শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। আলোকচিত্রে তা প্রকাশিত। এখানেও অক্লান্ত বঙ্গবন্ধু। সকলকে নিয়ে সোনার বাংলা গড়ার সংগ্রাম অব্যাহত রাখার সুযোগ যদি তিনি পেতেন? ছবি দেখতে দেখতে মনে প্রশ্নটা উঁকি দেয়। ততক্ষণে ভিজে ওঠে চোখ।

প্রদর্শনীতে বঙ্গবন্ধুর নেপথ্যের শক্তি, প্রাণশক্তি বেগম ফজিলাতুন্নেছাকেও খুঁজে নেয়ার চেষ্টা হয়েছে। একটু ব্যতিক্রমী উপস্থাপনা। সরল এই মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বাংলা মায়ের মুখটিই দেখা যায় যেন।

সব মিলিয়ে ‘বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা।’ কিশোর পারেখ, রঘু রায়সহ বিখ্যাত কয়েক আলোকচিত্রীর ছবি এখানে স্থান পেয়েছে। তবে কোন্ ছবিটি কার তোলা, সে প্রশ্নের মীমাংসা হয়ত করে উঠতে পারেননি আয়োজকরা। তাই আলোকচিত্রীদের কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। আয়োজকরাও হয়ত একে বড়সড় দুর্বলতা মানবেন। ক্যাপশন লেখার জন্য আরও সময় দেয়ার ব্যাপার ছিল। প্রাসঙ্গিক তথ্য যোগ করার ছিল। এমন কিছু অভাব অনুভূত হয়েছে। তবে আলোকচিত্রের জোরালো ভাষা ও ইতিহাস চেতনা প্রদর্শনীটিকে বিশিষ্টার্থক করেছে। হয়ে উঠেছে বাঙালীর সংগ্রাম স্বাধীনতার আলেখ্য। সময় করে একবার দেখে আসতে পারেন ‘বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা।’ প্রদর্শনী চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।